ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 
20170817_135719

১.
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মাহবুবুল হক ভূঁইয়া ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিভাগের প্রথমবর্ষের কিছু শিক্ষার্থীকে ব্যবহারিক পরীক্ষার আগে পাঠ বুঝিয়ে দেয়ায় ছাত্রলীগ ওই শিক্ষককে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়েছে। ওই শিক্ষকের বহিষ্কারও চাইছে তারা। এখন প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহতও করা হচ্ছে!

আচ্ছা বীরপুঙ্গব ছাত্রলীগ আপনারা যে, জাতীয় শোক দিবসে দামি গরু-ছাগল-পাঠা জবাই করে দেশজুড়ে বিরিয়ানি-খিচুড়ি-তেহারি খাওয়ার উৎসব করলেন, মেজবানে ভুঁড়িভোজ করলেন, কোথাও কোথাও দেখলাম গানাবাজানার আয়োজনও করলেন; দেশের বন্যার্তদের ভয়াল দুর্বিপাক নিয়ে কিঞ্চিৎ ভাবনাও আপনাদের মাথায় এলো না; এখন আপনারাই বলুন আসল দেশদ্রোহী, নির্লজ্জ ও বেহায়া কারা?

২.
যে দিনটিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর শিশুপুত্র রাসেল ও পরিবারের সকল স্বজনসহ এক হৃদয়বিদারক ট্রাজেডিতে শাহাদাত বরণ করলেন ঠিক সেইদিনটিতে গোশত দিয়ে রসিয়ে রসিয়ে খাওয়াটা আসে কিভাবে আপনাদের?

খাওয়া-দাওয়া নিয়ে কামড়াকামড়িটাকে আপনারা শোক পালন বলতে পারেন; কোনো মানবিক মানুষ তা বলবে না!

বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে ভুলুন্ঠিত করা সেই আপনারা শিক্ষক মাহবুবের শিক্ষকসুলভ দায়িত্বপালন নিয়ে কথা বলবার অধিকার রাখেন না! শোকের দিনে কোনো শিক্ষক তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব হিসেবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান বিলাতে পারবেন না এমন বিধি ন্যায্যতার আদালতে চলতে পারে না।

৩.
আমরা মনে করি, শিক্ষক তাঁর দায়িত্বপালনে যথার্থ ন্যায়নিষ্ঠ ছিলেন। বিদ্যার আলো ছড়িয়ে দেয়ার সাথে শোক দিবসের চেতনার কোনো কনফ্লিক্ট থাকতে পারে না। ওইদিন আপনারা খেয়েছেন, ঘুমিয়েছেন, শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়েছেন, বন্ধুর সাথে আড্ডা দিয়েছেন, হেসেছেন, ঘুরেছেন, মাতমের নাটক করেছেন; কেউ আপনাদের বাধা দেয়নি। আপনাদের তুলনায় এই শিক্ষক বড় বেশি ভালো কাজ করেছেন; গুরু হিসেবে শিষ্যদের প্রতি দায়িত্ববোধের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। আমরা এই শিক্ষককেই সাধুবাদ জানাব। আপনারা যারা এই ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে খন্দকার মোশতাকের মতো লোকদেখানো বঙ্গবন্ধু’র চেতনা সমুন্নত রাখার জিগির তুলছেন তাদের জন্য অগণন নিন্দা।

অবিলম্বে ওই শিক্ষকের ওপর থেকে সব ধরণের মানসিক চাপ তোলে নিয়ে তাঁর স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিশ্চিতের দাবি জানাই। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী ছাত্রলীগ ক্যাডারদের বিরুদ্ধে দলীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। সবার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর সত্যিকারের চেতনা জাগ্রত হোক। আত্মশুদ্ধি চর্চা হোক সকলের আরাধ্য।

পাদটীকা:

এরইমধ্যে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ছাত্রলীগের চাপের মুখে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং শিক্ষক মাহবুবুল হক ভূঁইয়াকে একমাসের বাধ্যতামূলক ছুটিও দেয়া হয়েছে। এই হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের দলদাস উপাচার্য ও তাদের সভাসদদের কাজ! এ এক বিস্ময়কর সময়ে এসে উপস্থিত হয়েছি আমরা। তিলকে তাল বানিয়ে যেভাবে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে হেনস্থা করা হচ্ছে তা দেখলে বঙ্গবন্ধু নিজেও বিস্ময়ে বিমূঢ় হতেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমরা আবার আপনার বিচক্ষণতার দ্বারস্থ হচ্ছি। এর আগে আপনি আরেক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ইউএনও তারিক সালমন অয়নকে বেপথো দলবাজদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। শিক্ষক মাহবুবের বিষয়টাও আপনি দেখুন প্লিজ।

আমরা বঙ্গবন্ধুকে প্রাণপণ ভালোবাসি। কিন্তু নানা বিতর্কের জন্ম দিয়ে দলদাস, চাটুকার ও লোকদেখানো বঙ্গবন্ধুপ্রেমী উপাচার্য, দলীয় নেতা ও উড়ে এসে জুড়ে বসা ছাত্রলীগের হাইব্রিড ক্যাডাররা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসা তো দূরে থাক, জাতির পিতার আদর্শ ও চেতনাকে এক অতল গহবরেই নিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। যা সইবার শক্তি আর আমাদের নেই!

ফারদিন ফেরদৌস
সুখেরছায়া
১৭ আগস্ট ২০১৭