ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 
facebook_1506411790480

১.
অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশ সরকার হয়ত ধরেই নিয়েছে রোহিঙ্গাদের আর কোনোদিন নিজ জন্মভূমিতে ফিরবার উপায় নেই। আমরাও এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে চলেছি। মিয়ানমারও বলে দিয়েছে ওরা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বাঙালি অভিবাসী; তাই কস্মিনকালেও রোহিঙ্গাদের বার্মার নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রশ্নই নাই! পৃথিবীর সুপার পাওয়াররা বাংলাদেশের মানবিকতার ভূয়সী প্রশংসা করছে, ত্রাণ পাঠাচ্ছে, অর্থ দিচ্ছে বটে তবে বিচারের তালগাছটা মিয়ানমারে সযত্নে রেখে দেয়ার পর!
এমন একটা পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য নোয়াখালীর হাতিয়ায় নতুন জেগে ওঠা ভূমি ঠেঙ্গার চর বা ভাসানচর জাতীয় দ্বীপ ডেভেলপ করার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ সরকার!
আগের জামানায় ভারতবর্ষের ভিন্নমতাবলম্বীদেরকে সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে আন্দামান-নিকোবরে দ্বীপান্তর দেয়া হতো। অনেকটা রূপকথা গল্পসম্ভার ‘ঠাকুর মা’র ঝুলির বনবাস দেয়ার মতো! মানুষকে কোনো একটি দ্বীপে আটকে রাখার চেয়ে নিজেদের স্বাধিকার আন্দোলনে আত্মাহুতি দেয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা সর্বার্থে ভালো। কিন্তু বিপন্ন রোহিঙ্গা মানুষদের কপালে স্বাধিকার বলে সত্যিই কিছু নাই। আমরা সেই সম্ভাবনাটাকেও বুঝি দেখানো ‘মানবতা’র গিলোটিনে হত্যা করে ফেলেছি!

facebook_1506412712392

২.
এবারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের এদেশে আসার একমাস পূর্তির দিনে বলতে বাধ্য হচ্ছি, সাড়ে চার লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে নিজের দেশে ঢুকতে দিয়ে বাংলাদেশ বিরাট ভুল করেছে। এর মাশুল ভবিষ্যতে আমাদেরকে কীভাবে গুণতে হয় তার ওপর নির্ভর করেই নির্ণিত হবে ভুলের সঠিক ইতিহাস।

সন্ত্রাসী হামলার যে জুজুকে ভর করে বার্মিজ আর্মি রোহিঙ্গাদের জাতিসত্তা নিধনের সুযোগটা পেল তাতে আমরা কেবল অনুঘটকই হলাম। কোনো একটি নিপীড়িত জাতির ত্রাণকর্তাতো হতে পারলাম না! কী হতো, যদি বাংলাদেশ তার সীমান্ত সিলগালা করে রাখত? একজন রোহিঙ্গাকেও বাংলাদেশে ঢুকতে না দিত? বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা মানুষ মারা পড়ত? অগণন নারী ধর্ষণের শিকার হতো? এটা ভেবে যাদের মানবিকতার বাঁধ ভেঙ্গে যাচ্ছে, বুক ভারাক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে তাদেরকে একবার ভয়াল একাত্তরকে স্মরণ করতে বলব। বাঙালি মানুষের সাথে কী না করেছে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী ও তাদের এদেশের সতীর্থরা! ৩০ লাখ মানুষকে শহীদ করেছে। চার লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম লুটেছে। মায়ের সামনে তার শিশু সন্তানকে আছড়ে মেরেছে। পিতার সামনে কন্যা ধর্ষিত হয়েছে। বুদ্ধিজীবীদের তুলে নিয়ে জীবন্ত মানুষের চোখ উপড়ে ফেলে বস্তায় ভরেছে। এটা কে করেছে? আমাদের মুসলমান ভাই! সে তুলনায় রাখাইনে কী এমন হয়েছে একটু তুল্যমূল্যে বিচার করলেই মেলাতে পারবেন। আমাদের সাত কোটি বাঙালির মধ্যে দেড়কোটি রিফিউজি হয়েছিলাম বটে বাকিরা কিন্তু দেশে থেকে পাকিস্তানের বর্বর ও নৃশংস সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছি।

পক্ষান্তরে রোহিঙ্গাদের ১৪ লাখ মানুষের ১০ লাখই এখন বাংলাদেশ এডাপ্ট করেছে। যাদের আর কোনোদিন নিজেদের ভিটায় ফেরার সম্ভাবনা নেই।

facebook_1506411842301

৩.
একবার ভাবুন তো এদেশে আসা সাড়ে চার লাখ মানুষকেই কি বার্মিজ আর্মি মেরে ফেলতে পারত? তর্কের খাতিরে ধরে নেই যদি ওরা ইতিহাসের আরেকটি অন্যতম জঘন্য গণহত্যা চালিয়ে অর্ধেক রোহিঙ্গা মানুষকে মেরেই ফেলত, বাকিরা তো একদিন নিজ মাতৃভূমিতে স্বস্তির নি:শ্বাস নিলেও নিতে পারত।

আমি মনে করি, আমরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তাদের লড়াই করবার মানসিকতাকে হরণ করেছি। স্বাধীনতায় উন্মুখ একটা জাতিগোষ্ঠীকে ভবঘুরে করে দিয়েছি। তাদেরকে আজীবনের জন্য বাস্তুচ্যুত করে দিয়েছি। সাথে রোহিঙ্গাদের জন্য আজীবন ক্ষতিকর কিছু অর্বাচীন সন্ত্রাসীগোষ্ঠীকে রক্ষা করেছি।

কেউ কেউ বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত না খুলে দিলে দেশের প্রতিক্রিয়াশীলদের আন্দোলনের চাপে সরকারের অবস্থা নড়বড়ে হয়ে যেত। কিন্তু সরকার বাঁচাতে মিয়ানমারের চাপানো মানবিক যুদ্ধের ফাঁদে পা দেয়া কি দেশের জন্য মঙ্গল হলো? বোমারু বিমান কিংবা মিজাইল নিক্ষেপ করে যুদ্ধবাজির চেয়েও এটা যে বিধ্বংসী ও বিপর্যয়কর যুদ্ধ একদিন নিশ্চয় তা বুঝব!
এই মানুষগুলো এখন একধরণের বন্দি জীবনযাপন করবে। আর ওদেরকে খাদ্য ও নিরাপত্তা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের অর্থনীতিরও বারোটা বাজবে! সামনে আরও বিচিত্র সংকট এসে উপস্থিত হবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়!

ভোটের বাজার ঠিক রাখতে মানবিকতা দেখাতে গিয়ে আমরা প্রথম ক্ষতি করলাম এই বিপন্ন মানুষগুলোর। এই মানুষগুলোর মানবিক অধিকার বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও খাদ্য আমাদের পক্ষে কিছুতেই নিশ্চিত করা সম্ভবপর হবে না।

দ্বিতীয়ত সবদিক দিয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ল বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের নিয়ে গুটিবাজি করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সক্ষমতায় উদীয়মান বাংলাদেশের বারোটা বাজাতে বিশ্বমোড়লদেরও সুযোগ করা দেয়া হলো। তারচেয়ে এই কি ভালো ছিল না, রোহিঙ্গা মানুষের দায়ভার যেহেতু মিয়ানমারের, তাদের সাথেই যদি ওরা মিটিয়ে নেয়ার সুযোগ পেতো? বোঝাপড়া করবার সুযোগ পেত? রক্ত না ঝরালে কোথায় কবে দেশ মিলেছে, অধিকার মিলেছে?

দ্বীপে বন্দি অর্ধমৃত জীবনের বুঝা বয়ে বেড়াবার চেয়ে নিজেদের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে সাতবার আত্মাহুতি দেয়াও শ্রেয়তর। অধিকার আদায়ে বহমান নদীর মতো শহীদের রক্তবিন্দুর কাছে শোষকের রক্তচক্ষুর পরাজয় কবে না ঘটেছে? লাখো মানুষের মানবীয় অধিকার নিশ্চিত করার অক্ষমতা নিয়ে কিভাবে আমরা ঢোলপেটানো মানবিক হই? নাফ নদী পাড়ের বিপাকে পড়া রোহিঙ্গা মানুষের মহত্তম হয়ে ওঠবার সুযোগ নিশ্চিত না করে কীভাবে আমরা তাদেরকে গিনিপিগ করে তুলতে পারলাম?

ফারদিন ফেরদৌস: লেখক ও সাংবাদিক
২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭