ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 
??????????????

আমার মা ক’দিন আগে তাঁর ছোট নাতনি সম্প্রীতাকে কাঁধে নিয়ে বাইরে ঘুরতে বেরিয়েছেন। পাশের বাড়ি বয়োজ্যেষ্ঠ খালাম্মা এই দৃশ্য দেখেই হায় হায় করে ওঠলেন:
ইয়া আল্লাহ! এইডা কি করছো, মাইয়া মাইনষেরে কাঁধে তুলছো। এইটা কিছুতেই করতে নাই! মাইয়াদের কাঁধে নিলে ধানের দাম বাইড়া যায়! দ্যাশে আকাল পড়ে!
পড়িমরি করে মা তাঁর আদরের নাতনিকে কোলে নিয়ে নিলেন!

আমি এই ঘটনা মায়ের মুখে শোনার পর থেকে ৫ মাস বয়সী ছোট কইন্যাকে নিয়মিত কাঁধে নিয়ে ঘুরি। আকাশ দেখাই। গাছ দেখাই। কাকপক্ষী দেখাই। ও খুব করে হাসে। ধানের দাম বাড়ার ঘটনা ও জানতে বা বুঝতে পারলে হয়ত হাসত না। আমি চাই ধানের দাম বাড়ুক। এইদেশের কৃষক কোনোদিন তাঁদের ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় না। আমার পুষ্পের মতো পুত:পবিত্র মেয়েটার কল্যাণে নারীবিদ্বেষি ওই খালাম্মারা বেশি দাম দিয়ে চাল কিনে খাক। কৃষকের বন্ধু হোক আমার সম্প্রীতা।
PhotoFunia-1506777299

আমার এক শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু খুব হাদিস-কুরআন জানা মানুষ। দুই কন্যা সন্তানের পর এবার তাদের কোল আলো করে পুত্র সন্তান আসছে। তিনি হরহামেশাই বলে বেড়ান:
দ্যাশে মাইয়া মানুষ বাইড়া যাইতেসে এটা কিয়ামতের লক্ষণ! ঘরে ঘরে সবার কইন্যা সন্তান হইতেসে। যত অশান্তির মূল নাকি এইটাই।
তিনি ইসলাম ধর্মকে সাক্ষী রেখে আরও বলে যান:
যেই দেশ মাইয়া মাইনষে চালায় সেই দেশে অনাচার লাইগাই থাকব!
কিন্তু তিনি ঘূর্ণাক্ষরেও ভাবেন না, তাঁর ঘরের মা, কন্যা অথবা প্রিয়তমা জায়াও তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী অনাচার বা কিয়ামতের কারণ ঘটিয়ে চলেছে। তিনি তাহলে কিয়ামতের মতো দু:সময় তাঁর বেডে বা ঘরে রাখেন কি করে?
আমার যদি আরবের শেখেদের মতো বহু বিবাহের রুচি বা অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকত, তবে আমি কয়েক ডজন কন্যা সন্তানের জনক হতাম। আমি চাই পৃথিবীতে খুব শিগগিরই কিয়ামত নামুক। পুরুষতান্ত্রিকতার ‘ফ্যানাটিক’রা কিয়ামত বা শেষ বিচারের ভয়াবহতার মুখোমুখি এখনই হোক!

আমার এক নিকটাত্মীয় সমাজের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন মানুষ। এক কন্যা ও পুত্রসন্তানের জনক। পুত্র ও কন্যা দু’জনকেই তিনি প্রতিষ্ঠিত মানুষ করেছেন। খোদার ইচ্ছায় পুত্রের ঘরে পুত্রসন্তান হয়েছে। আর মেয়ের ঘরে হয়েছে মেয়ে। আমার এই মুরুব্বী আত্মীয়টি পুত্রের ঘরের পুত্র নিয়ে প্রায়শ খুব সহাস্য ও গর্বের সাথে জানান দেন, আমার একমাত্র বংশধর দাদুভাই।
কিন্তু মেয়ের সন্তানেরা তাঁর বংশধর না মোটেও!
আমি ভাবি, যদি এই মানুষটির ঘরে একমাত্র বা দুইমাত্র কন্যা সন্তান থাকত, তবে তিনি বংশধর বলতেন কাকে?

সবচে’ জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকের মালিক ও তরুণদের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ ধনী মার্ক জাকারবার্গের দুই কন্যা। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দুই কন্যা। আরেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনেরও মাত্রই এক কন্যা। তাহলে এই বিখ্যাত মানুষদের বংশধর নাই! আমার প্রিয় আত্মীয়টি তাই বলবেন হয়ত!
21125382_10103996696998971_9026128102099043001_o

আমার প্রথম মেয়ে সুখপ্রীতা জন্মের পর সবাই সান্ত্বনা দিয়েছেন:
প্রথম সন্তান মেয়ে হওয়াটা খুব ভাগ্যের ব্যাপার। সংসারে উন্নতি হয়। মজার ব্যাপার হলো আমার দ্বিতীয় সন্তানটি মেয়ে হওয়ার খবরেও সেই আত্মীয়রাই সান্ত্বনার হাদিস কুরআন খুলে দিয়েছেন।
কালকে আমার এক চাচার সাথে দেখা, তিনি বলছেন:
ফারদিন, তুমি তো বেহেস্ত কিইন্যা ফেলছো। দুই মাইয়া যার বেহেস্ত তাঁর কনফার্ম।
লও ঠ্যালা, এক ধার্মিক মানুষের কাছে মেয়ে মানুষ মানে কিয়ামত। আরেকজনের কাছে স্বর্গের লোভ!

মুসলিম ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কুরআনের সুরা আশ-শুরা’র ৪৯-৫০ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব একমাত্র আল্লাহতায়ালারই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে পুত্র ও কন্যা উভয় সন্তানই দান করেন।আর যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ ক্ষমতাধর।’
এই আয়াতের আলোকে তাফসীরে কুরতুবি মোতাবেক বলা হয়েছে, ‘যে নারীর গর্ভ থেকে প্রথম কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করবে, সে পূন্যময়ী!’
অন্যদিকে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যার তিনটি কন্যা বা তিনটি বোন আছে, অথবা দু’টি কন্যা সন্তান কিংবা বোন রয়েছে এবং সে তাদের সাথে উত্তমভাবে জীবন অতিবাহিত করে, তাদের অধিকারসমুহ আদায়ের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে, তবে আল্লাহতায়ালা তাকে বিনিময় স্বরূপ জান্নাত দান করবেন!’

তো কন্যা সন্তানের ব্যাপারে সবাই এমনতর হাদিস কুরআনের মর্মবাণী সান্ত্বনাস্বরূপ শোনান। কিন্তু তলে তলে প্রত্যেকেই পুত্রসন্তান যাচঞা করেন। কারণ তারা বিশ্বাস করেন বৃদ্ধ বয়সে পুত্র তাদের ভাত,কাপড় ও আশ্রয় দেবে। মেয়েকে মানুষ করে কোনো ফায়দা নাই। তারা তো বিয়ে হলেই পরের ঘরে চলে যাবে। এটা যে কতবড় নিম্নস্তরের মানসিকতা তা বুঝতে মহাজ্ঞানী হওয়ার দরকার নেই। ‘মা’-এর কথা বাদই দিলাম, ‘মা’-এর উদর কি মনে রাখে গোল্ডফিশ সন্তান? নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীর দিকে আরেকবার তাকান তো, সব উজার করে দিয়ে কী ভালোই না বাসেন তাকে! তাহলে কন্যা সন্তানে যাদের এত অরুচি বউ ভালোবাসবার গোসাই তারা হন কি করে?

এক পুত্র ও এক কন্যাসন্তানের জনক একজন কলীগের কথা বলি। যিনি কিছুদিন আগে খুব অহংকার করে বলছিলেন: পুতের বাপ হওয়া এত সোজা না! পুতের বাপ হইতে ক্ষমতা লাগে, ভাগ্য লাগে!
উনার মুখের ওপর বলতে ইচ্ছে করছিল: বউটা বাদ দিয়ে পুতের বাপ হন দেখি কেমন মুরোদে ব্যাটা আপনি বুঝবক্ষণ! ঈশ্বর, প্রকৃতি অথবা নিয়তি যদি আপনাকে বন্ধ্যা করে রাখত তবে এত অহংকার থাকত কোথায়? কিছুই বলিনি। যদি কোনোদিন দেখি শখের পুতে উনাকে নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে চাওয়ায় মেয়ের বাসায় জায়গা নিতে হয়েছে সেদিন নাহয় দু’কথা শোনানো যাবে!

কন্যা শিশুর অসম্মানে সবক্ষেত্রে শুধুমাত্র পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাই দায়ী এমন নয় তা নিবন্ধটির শুরুতেই প্রমাণ দিয়েছি। নারীই নারীর শত্রু এটা বঙ্গভূমিতে বড়ই প্রচলিত কথা! এক পরিচিত নারীকে জানি যিনি সরকারের প্রথমশ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। সম্প্রতি তার ৬ষ্ঠ তম কন্যা হয়েছে পুতের আশায়। হয়ত তার স্বামী খুব করে ছেলে সন্তান চাইছেন, বউকে চাপে রেখেছেন- এমনটা ভাবা যেতে পারে। কিন্তু ওই সুশিক্ষিত নারীর কথায় বোঝা যায় ‘ছেলে কেমনে নাহয় এর শেষ দেখে ছাড়বেন’ তিনি! বিস্ময়কর হলেও সত্যি, এই আধুনিক যুগেও কন্যা শিশুকে অবজ্ঞা করবার মতো এমন চিন্তার বৈকল্য সমাজ সংসারে চালু আছে!

ধার্মিক বাঙালি ঘুষ খাওয়া, সুদ খাওয়া, দুর্নীতি করা, অন্যের অনিষ্ট করা, খুন-ধর্ষণ করা, ব্যাভিচার করা এবং দেশ ধ্বংসের বেলায় হাদিস কুরআনের দোহাই মানে না। কিন্তু ইসলামিক পারিবারিক আইনে আছে পৈত্রিক সম্পত্তিতে ভাইয়ের ওয়ান থার্ড পাবে বোন, সেই আইন মানার বেলায় পুরুষের জ্ঞান খুব টনটনে। কন্যা জন্মের দায় ওই কন্যাটির নিজের না হলেও ধর্মের জুজুতে পিতা বা ভাইয়ের পুরুষতান্ত্রিক বঞ্চনা মেনে নেয়ার দায় কেন কন্যা সন্তানের থাকতে আছে? পিতার ঔরস বা মায়ের জঠরের আবার নারী পুরুষ বিভাজন কিসের। মনুষ্য অথবা প্রাণি জন্ম পুরোটাই মাতা-পিতার যৌথ আনন্দাচার। প্রকৃতির এমন নিয়মের ব্যতিচার করার আপনি কে?

আমার প্রথম সন্তান সুখপ্রীতা হেরা আর দ্বিতীয় সন্তান সম্প্রীতা সারাহ! ওদের নিয়ে অশেষ সুখে আছি আমরা। কন্যারা আমাদের জন্য ঈশ্বরের অপার আশীর্বাদ। পুত্রের বাবারা যা খুশি তা ভাবুন। আমার এই সুন্দর সুশোভন সন্তানেরাই আমার বংশের আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ। পুরুষালি সান্ত্বনার স্বর্গ নয়,ওদের মুখের দিকে তাকালেই আমার পৃথিবীটা স্বর্গ হয়ে যায়। আমার আনন্দ আশ্রমে প্রতিটা দিন প্রতিটা ক্ষণই কন্যাসন্তান দিবস। পুত্রের জন্য ৩৬৪ দিন আর কন্যার ১ দিন তা কিছুতেই হতে পারে না!

আমি নিয়ত সমস্বরে ভালোবেসেই উচ্চারণ করি, আমি এক ভাগ্যবান কন্যাদায়গ্রস্ত গর্বিত পিতা! পৃথিবীর তাবৎ কন্যা শিশু একচুল বেশিও না কমও না মানুষ হিসেবে পুত্রের সমান অধিকার ও ভালোবাসায় বাঁচুক।

ফারদিন ফেরদৌস: লেখক ও সাংবাদিক
৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৭