ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

Bangabandhu-7+March

১.
খানিক আগে আমার রিডিং রুমের জানালার পাশ দিয়েই আনন্দ শোভাযাত্রাটা চলে গেল! প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীরা বাদ্যের তালে তালে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে প্রজাপতির মতো নাচতে নাচতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। তাল দিচ্ছে ব্যান্ডের বিকট শব্দ আর ক্লারিওনেট, ঝুমকা, ঝাঁঝসহ অন্য বাদ্যযন্ত্রের হাই ডেসিবল শব্দসহযোগে ঝুমুরতালের দেশাত্মবোধক সুর!
সেই সাথে মাইকে বাজছে বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের অবিস্মরণীয় ভাষণ। কিন্তু ব্যান্ডের তীব্র শব্দে ভাষণটা পরিষ্কার অনুধাবন করা যাচ্ছে না!
সদ্য ইউনেস্কো হেরিটেজে স্থান পাওয়া ভাষণটার সাথে ইংরেজি বাজনার উচ্চমাত্রার শব্দটা মিশে গিয়ে এমন এক উদ্ভট শব্দ সৃষ্টি হচ্ছে যা আসলে আমাদের দেশজ রাজনীতির সামগ্রিক গোলমেলে চালচিত্রের সাথেই ভালো যেতে পারে! কিন্তু ভাষণের মূল চেতনা, সৌন্দর্য বা দেশাত্মবোধের সাথে তা বড়ই কনফ্লিক্ট করে! অতি আড়ম্বর আর আয়োজন কি ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত কোনো ক্লাসিকের মর্যাদা বাড়াতে পারে? একটা স্বাধীন দেশ এনে দেয়া বঙ্গবন্ধুর মতো দূরদর্শী নেতা ও মহানুভব মানুষের তুলনায় ইউনেস্কো নামের ছোট্ট একখানা আপিস বড় হতে পারে, এটা কিছুতেই বিশ্বাস করি না।

♦বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে আমরা রাজনীতির মহাকাব্য বলে বিশ্বাস করি!
♦ভাষনটিতে পাকিস্তানের ২৩ বছরের শোষণ, নিষ্পেষণ, বর্বরতা, নির্মমতার ট্রাজিক ইতিহাস আছে!
♦ভাষণটিতে বাঙালির ২৩ বছরের নিদারুণ দু:খের কথা বর্ণনা করেছেন রাজনীতির কবি!
♦সর্বোপরি পাকিস্তানের দু:শাসন থেকে বাঙালির মুক্তির কংক্রিট নির্দেশনার অমূল্য উপাখ্যান এই ভাষণ!

এমন এক ট্রাজিক ইতিহাসের সাথে আনন্দ শোভাযাত্রা কেমনে যায়? এক মহত্তম টেক্সট ভাষণের সাথে হাতি, ঘোড়া, হাই ডেসিবলের ড্রাম, বাঁশি তথা ইংরেজি বাদ্যবাজনা কেমনে সিনক্রোনাইজ করে? ক্লাস বাদ দিয়ে ইশকুলের শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ এবং কড়া রৌদ্রে মহাসড়কের কয়েক মাইলজুড়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া ওই ভাষণের চেতনার সাথে কীভাবে সাযুজ্য হতে পারে?

celebrating-7-march-speech-04

২.
বিডিনিউজ২৪.কম-এর সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছে, ‘আজকের আনন্দ শোভাযাত্রায় দেশের সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারির বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণে লিখিত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গেল মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দেয়া সেই নির্দেশনায় জানানো হয়, “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ইউনেস্কোর ‘ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার’-এ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ‘বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্যের’ স্বীকৃতি লাভের অসামান্য অর্জনকে ২৫ নভেম্বর ঢাকা মহানগরীসহ সকল জেলা ও উপজেলায় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’র মাধ্যমে উদযাপনের কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। বর্ণাঢ্য, আকর্ষণীয় ও সর্বাঙ্গীন সুন্দরভাবে উক্ত কর্মসূচি একযোগে সারা দেশে উদযাপনের জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট সকলকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এই কর্মসূচি উদযাপনের জন্য মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের ঢাকায় অবস্থানরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বলা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।‘

আমরা দেখলাম, এই আনন্দ শোভাযাত্রাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে গিয়ে একটা রাজনৈতিক রূপ দেয়া হলো। একজন সরকারি কর্মকর্তাও নিশ্চয় রাজনীতি সচেতন হবেন। দেশের ও দশের জন্য সর্বজনীন কোনো কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে তাদের সাংবিধানিক বাঁধা থাকবার কথাও নয়। কিন্তু দেশের সব রাজনৈতিক দলকে তো এই উদযাপনে শামিল করবার কথা ভাবাই হয়নি। কাজেই ধরেই নেয়া যায় এটা ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের একার অনুষ্ঠান। যেটা বাস্তবায়ন করছে আওয়ামীলীগ সরকার। তাহলে এমনধারার অনুষ্ঠানে সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অংশগ্রহণ কীভাবে বাধ্যতামূলক করা যায়? এমনটা করবার নৈতিক ভিত্তিই বা কী? আজীবন পাকিস্তানপন্থি জামায়াতের মতাদর্শে বিশ্বাসী যে মানুষটি সরকারি কর্মচারী তার ওপর ৭ মার্চের ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ চাপিয়ে দিয়ে তাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অনুষ্ঠানে টেনে নিলেই তার বিশ্বাসের বদল ঘটবে এমনটা মনে করবার কোনো কারণ আছে কী? মানছি, পাকিস্তানপন্থি বাংলাদেশিরাও স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস পালন করেন; কিন্তু তারা কি তা মন থেকে করেন? মনে নেয়া আর মেনে নেয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে! বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মতো এমন ঐতিহাসিক সত্য আর হালের ঘোষিত ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ সবার ওপর লোক দেখানো চাপিয়ে দেয়ার কিঞ্চিৎ জরুরতও আছে বলে আমরা মনে করি না।

celebrating-7-march-speech-01
৩.
৪৬ বছর আগে ঢাকা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) স্বাধীনতাকামী বাঙালিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানানো বঙ্গবন্ধুর মহাকাব্যিক ভাষণ, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম!’ –এখনো স্বাধীনতাকামী মানুষের বুকে অবিনাশী বাতিঘর। যেখানকার আলোতে সবাই পথের দিশা পান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার এমন আলোকবর্তিকা অতিব্যবহারে জাজ্বল্যমান হয়না বরং ম্রিয়মানই হয়।
আমরা বিশ্বাস করি, স্বাধীনতার সূত্রপাতকারী ভাষণ নিয়ে আনন্দ উদযাপনের এমন সিদ্ধান্ত সংবেদনশীল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাবনাপ্রসূত নয়। অতি উৎসাহী কোনো দলদাস আমলা অথবা দলের দ্বিতীয় সাড়ির কোনো নেতা এমনতর বাধ্যতামূলক ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’র উদগাতা; যিনি আদৌ জানেন না ‘ট্রাজি-পয়েটিক হিস্টরি’ কীভাবে উদযাপন করতে হয়! তিনি জানেন না, ‘রক্ত যখন দিয়েছি আরও দেব, এদেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ’-এর মতো ট্রাজি-পয়েটিক কথাগুলোর সাথে হাতি-ঘোড়া, ঢোল-ডগর, আনন্দ-উল্লাস, হৈহুল্লোড়, মাতামাতি কিছুতেই যেতে পারে না, যাওয়া উচিৎ না!

দেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের অলিখিত ভাষণে সামগ্রিক মুক্তি সংগ্রামের কথা বলেছিলেন বটে। কিন্তু আমাদের অবরুদ্ধ চৈতন্যের মুক্তি এখনো ঘটেনি!

ফারদিন ফেরদৌস: লেখক ও সাংবাদিক
২৫ নভেম্বর ২০১৭