ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

FB_IMG_1515748554964

 

মানুষ কি আসলে এই বৃক্ষের চেয়ে বেশি সুন্দর? বেশি নিঃস্বার্থ? বেশি প্রেমময়? না, কক্ষণো না! গাছ কিচ্ছু নেয় না, চায় না; সকলি উজার করে দেয়! তাহলে এমন মহৎপ্রাণকে বিনাশ করতে মানুষ কেন আজরাইল সাজতে যায়? ঈশ্বর বা প্রকৃতি সইবে তো?

এই গাছগুলোতে এক মমতাময়ী মায়ের স্পর্শ আছে তা-কি জানে গাছকর্তক যশোরের রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে ডিপার্টমেন্ট?

ইতিহাস বলছে, যশোরের জমিদার কালি পোদ্দার বাবু ১৮৪০ সালে যশোর থেকে কলকাতা পর্যন্ত একটি সড়ক নির্মাণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল তাঁর প্রিয় মা যেন ওই সড়ক ব্যবহার করে কলকাতা গিয়ে গঙ্গাস্নান করতে পারেন। মহিয়সী মা ভাবলেন রাস্তাটা তো তাঁর একার না। এই সড়ক ধরে হাজারো মানুষ তাদের রোজকার গন্তব্যে আসবে যাবে। সেকালে তো আর যাত্রী পারাপারে এখনকার মতো রংবেরঙের গাড়ি ছিল না। জমিদার বা সমাজের বিত্তবানরা শকট, পালকি বা ঘোড়াকেই বাহন হিসেবে ব্যবহার করতেন। আর সাধারণের ভরসা ছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত দু’টি পা। জমিদার বাবুর আর্য মা সেই অনার্য পদধারীদের যাত্রাপথের ক্লান্তি দূর করতে সড়কের দুইপাশে বৃক্ষরোপণের জন্য রাজকর্মচারীদের নির্দেশ দিলেন। যার বেশিরভাগ ছিল পরিবেশবান্ধব রেইন্ট্রি। আমরা গ্রামীণ মানুষেরা যেটাকে কড়ই গাছ বলে জানি। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় দেড়শ বছর ধরে একজন প্রেমময় মায়ের আশীর্বাপুষ্ট বৃক্ষরাজির সুশীতল ছায়ায় প্রাণ জুড়িয়ে চলেছে হাজার লক্ষ মানুষ।

এতদিন পরে এসে স্থানীয় সড়ক প্রশাসনের মনে হয়েছে বেনাপোলের পণ্য পরিবহনের জন্য যশোর থেকে বেনাপোল পর্যন্ত রাস্তা বড় করতে হবে। আর সেই বড়ত্বের প্রথম বলি হিসেবে ধার্য করা হয়েছে প্রাণদায়ীনি ২৭০০টি ঐতিহাসিক অমূল্য বৃক্ষ।

এই মহাসড়কটির এক ট্রাজিক ইতিহাসও আছে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতাসহ হাজারো শরণার্থী এই অনিন্দ্যসুন্দর পথটি ব্যবহার করে ভারতের শরণার্থী ক্যাম্পে পৌঁছেছে। সেসময় যন্ত্রণাক্লিষ্ট অসহায় মানুষকে একদণ্ড প্রশান্তি ও আশ্রয় দিয়েছে এই বৃক্ষরাজিই। দিনরাত জীবনযুদ্ধে বিপর্যস্ত অনাহারী মানুষের জন্য কিঞ্চিত বৃক্ষছায়াও যখন ছিল মাথার ওপর বিশাল ছাদ।

FB_IMG_1515748551349

 

আমরা কত ইতিহাস সংরক্ষণ করি। যা করলেও চলে এমন ঐতিহ্যও বহুমূল্য খরচে ধরে রাখবার চেষ্টা করি। কিন্তু যে ইতিহাসে একজন মায়ের অকৃত্রিম ভালোবাসা আর মহান মুক্তিযুদ্ধের করুণ স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার গলায় কেমনে আমরা ছুড়ি ধরি?

সড়কটির মালিকানা নিয়েও রাষ্ট্রীয় দুই প্রতিষ্ঠান রশি টানাটানি করছে। যশোর জেলা পরিষদ বলছে ওই সড়কের মালিকানা তাদের। আর সড়ক বিভাগ সেখানে নিজেদের মালিকানা দাবি করে ইতিমধ্যে সড়ক সম্প্রসারণে একনেকে তিনশো তেইশ কোটি টাকাও পাশ করিয়ে নিয়েছে! সড়ক বিভাগের অতি উৎসাহের কারণ কি তবে বহুমূল্যবান প্রায় তিন হাজার বৃক্ষ?

পরিবেশবাদী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সমাজচিন্তকরা বলছেন, গাছগুলোকে এমন ন্যাক্কারজনকভাবে কুঠারের তলায় ঠেলে না দিয়েও সড়ক সম্প্রসারণ করা যায়। কিন্তু এতগুলো গাছের যা মূল্য মানুষের লোভের শেকল থেকে ওরা মুক্ত হবে কিভাবে?

আমরা অপেক্ষা করি কখন ইউনেস্কো বিশ্ব হেরিটেজ ঘোষণা করবে! একটা সার্বভৌম রাষ্ট্রের চেয়ে কি ইউনেস্কো বড়? বাংলাদেশ সরকার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই ঐতিহাসিক সড়কটিকে জাতীয় ঐতিহ্য ঘোষণা করে গাছগুলোর বেঁচে থাকবার অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারে। সরকার চাইলেই যখন-তখন রাস্তা, ব্রিজ বা কালভার্ট বানিয়ে দিতে পারে। কিন্তু দেড়শো বছর বয়সী একটা বৃক্ষও কি কোনো শক্তিধরের পক্ষে হুটহাট বানিয়ে দেয়া সম্ভব?

বলা হচ্ছে, গাছগুলো নুইয়ে পড়ে বিশাল ডালপালা ছড়িয়ে সড়ক ঢেকে দিয়েছে। সেটা কি গাছের দায়? আপনি তার যত্ন নেবেন না আবার তাকে শিরদাঁড়া সোজা রাখতে বলবেন তা কি করে হয়? কালি পোদ্দার বাবু নির্মিত এই সড়কটি বর্তমানে ভারত অংশে পড়া পেট্রাপোল থেকে কলকাতা পর্যন্ত সড়কটিতেও একই সময়ে রোপণ করা গাছ শোভা পাচ্ছে।

দুঃখজনক হলো, কলকাতার রাজ্য সরকারও রাস্তা প্রশস্ত করার নামে আমাদের মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেখানে কাটা পড়ছে অন্তত ৪ হাজার গাছ। যাদের কোনো কোনোটির বয়স আবার তিনশো বছর। সেখানে অবশ্য পরিবেশবাদী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আন্দোলন হচ্ছে যাতে গাছগুলোর ওপর করাত-কুঠারের আচর না পড়ে। আমাদের সরকারও হয়ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে থাকবে। আমরা ভীষণ অনুকরণপ্রিয় জাতি। আর রাস্তাটা বড় করবার উদ্যোগটা একটা যৌথাচার, কারণ সড়কের নামই বিখ্যাত যশোর রোড। যে সড়কটি ব্রিটিশ আমল থেকেই যশোর ও কলকাতার সাথে সংযোগ সড়ক হিসেবে কাজ করছে। কারোরই ভাবনায় আসছে না, গাছ রক্ষা করে কিভাবে রাস্তা সম্প্রসারণ করা যায়!

FB_IMG_1515726943126

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এই সড়কটির মর্মগাঁথাকে উপজীব্য করে মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ‘September in Jessore Road’ -শিরোনামে তাঁর বিখ্যাত কবিতাটি লিখেছিলেন:

Millions of souls nineteenseventyone
homeless on Jessore road under grey sun
A million are dead, the million who can
Walk toward Calcutta from East Pakistan…

বাঙালি শরণার্থীদের সহায়তার জন্য যে কবিতাটিকে পরে গানে রূপান্তরিত করে কিংবদন্তি শিল্পী বব ডিলানের সহায়তায় ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ গাওয়া হয়েছিল।

আমরা চাই, প্রাচীন বৃক্ষগুলো একজন বৃক্ষ অন্তপ্রাণ মাকে মনে রেখে স্বমহিমায় হাজার বছর বেঁচে থাকুক। জমিদার বাবুর স্মৃতি জাগরুক রাখুক। আমাদের বাংলা মানুষের নিঃশ্বাসে ছড়াতে থাকুক বিশুদ্ধ অক্সিজেন। যশোর রোড তার চিরায়ত ঐতিহ্য না খোয়াক।

মানুষের মগজে বোধ জন্ম নিক। লোভের বেলুন চুপসে গিয়ে অন্তরে ভালোবাসা ও মমতা জায়গা করুক। তাহলে গাছেরাও বাঁচে, বাঁচে মানুষ।
……………
ছবিগুলো সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংগ্রহ করা।

ফারদিন ফেরদৌস: লেখক ও সাংবাদিক
১২ জানুয়ারি, ২০১৮