ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

 

বিশ্ব চরাচরের যা-কিছু মহান ও চির কল্যাণকর তা অর্জনের পেছনে অর্ধেক কৃতিত্ব নারীর আর অর্ধেক পুরুষের। পুরুষতন্ত্র অথবা পিতৃতান্ত্রিকতা এটা না মানলেও সাম্য ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম অবশ্য অভেদ মানুষের কথা বলতে গিয়ে সোৎসাহে নারীর জয়গান করেছেন। হাজার বছর ধরে পুরুষের একদেশদর্শীতার বিরুদ্ধাচারণ করতে গিয়ে ‘নারী’ শিরোনামে নাতিদীর্ঘ কবিতাও লিখেছেন। সেখানে তিনি যুগে যুগে কন্যা, জায়া ও জননীরূপী নারীকে যারা ঘৃণা ও অসম্মান করে এসেছে তাদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। কবি নারী ও পুরুষের সৌহার্দ্যপূর্ণ সুষম সম্পর্কের বর্ণনায় যথার্থ উচ্চারণ করেছেনঃ

শস্যক্ষেত্র উর্বর হ’ল, পুরুষ চালাল হাল,
নারী সে মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল।

তবে কবি কল্পিত নারীর বঞ্চনা ও লাঞ্ছণার দিন ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। সাম্যবাদী নজরুল কিংবা নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া নিশ্চিতই আজকের বাংলাদেশ দেখলে খুশি হতেন। রোকেয়ার অবরোধবাসিনী নারীরা আজ সত্যি জেগে ওঠছে। দায়িত্ব-কর্তব্য, কর্মকুশলতা কিংবা সংস্কৃতি চর্চায় পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলছে তারা। শত বাঁধা-বিপত্তি সত্ত্বেও নারীর বিস্ময়কর বহুরূপী কর্মগুণ ক্রমশ প্রকাশ পাচ্ছে। পুরুষের মগজে এককালে পাথর সমান বিশ্বাস ছিল, নারী কোনোদিন ঘরের বাইরে যেতে পারবে না। তার একমাত্র কাজ সন্তান লালন-পালন আর গৃহকর্মীর একপেশে দায়িত্বপালন। বাইরের উৎসবে অংশগ্রহণ ছিল অলীক কল্পনা।

কিন্তু আজকের বাংলাদেশে বাসন্তী রঙা শাড়ি পরে স্কুটি চালাতে চালাতে নারীরও থাকতে আছে উৎসব-উল্লাসের স্বাধীনতা। পেছনে অপার বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকুক না পুরুষতান্ত্রিক সফেদ বিশ্ব। এটা না মানার দিন সমাপ্ত যে, বিশ্ব মানুষকে বাঁচাতে হলে মাকে এগিয়ে রাখতে হবে সর্বাগ্রে।

গত মঙ্গলবার ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিনে রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় জাতীয় জাদুঘরের সামনে জ্যামের মধ্যে তোলা একটি ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। জহিরুল হক নামের এক ব্যক্তির তোলা ছবিটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বসন্তের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন অনেকেই। নেটিজেনরা পুরুষের সমান্তরালে নারীর এমন বাসন্তী রূপকে যারপরনাই স্বাগত জানিয়েছে।

শুদ্ধ শুভ্রা’র ভাইরাল হওয়া ছবি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নেয়া।

 

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এক তরুণী নিজের স্কুটি নিয়ে জ্যামে আটকে আছেন। সবার চোখ আটকে যাচ্ছে সেদিকেই। নারীটি বাসন্তী রঙা শাড়ি পরেছেন। আবার একই রঙের স্কুটিও চালাচ্ছেন। অপার বিস্ময় নিয়ে এটাই দেখছেন সবাই। সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে সাধারণ মানুষের এমন বিস্ময় চেপে রাখবার সুযোগ একদমই নেই। খবর নিয়ে জানা গেছে, ছবির তরুণীটি মানিকগঞ্জের মেয়ে শুদ্ধ শুভ্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ওই ছাত্রী বাংলাদেশ উদীচি শিল্পগোষ্ঠী ডিইউ সংসদের সাধারণ সম্পাদক। তিনি থিয়েটার কর্মী হিসেবেও কাজ করেন। যিনি ঢাকার রাস্তায় বাসন্তী সাজে সোশ্যাল মিডিয়াবাজদের হাতে ক্যামেরাবন্দী হন।

তরুণীটির মাথায় হেলমেট পরিহিত ছিলেন না, তাই ট্রাফিক নিরাপত্তা আইন ভঙ্গ করেছেন বলে অনেকে সমালোচনা করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ নেটিজেনরা একে নারীর স্বাধীনতার স্মারক হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। সাম্প্রতিককালে পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রা কিংবা অন্য কোনো সাংস্কৃতিক উৎসবে নারী নিপীড়নের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। এমন বাস্তবতার মধ্যেও বসন্ত উৎসবের মতো জাতীয় উৎসবে নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে যোগ দেয়ার উৎসাহ দেখাতে পারছেন, কোনো পুরুষ সঙ্গীর সাহচর্য ছাড়া ঘরের বাইরে বের হতে পারছেন এটা সামাজিক সমতার ক্ষেত্রে নিশ্চিতই ইতিবাচক ঘটনা। বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বলে এখানে নারীকে ঘরের বাইরে বের হওয়া কিংবা বাংলা সাংস্কৃতিক উৎসবে যোগ দেয়ার ব্যাপারে গোঁড়া ও মৌলবাদী ধর্মগুরুদের নিরুৎসাহিত করবার প্রবণতা রয়েছে। সাম্প্রদায়িক রক্ষণশীলরা কখনোই চাননা নারীরাও পুরুষের পাশাপাশি কাজ করুক কিংবা উৎসব আয়োজনে হৈহুল্লোড় করুক। এমন বাস্তবতায় বর্ষবরণ, বসন্ত উৎসব কিংবা ভ্যালেন্টাইন্স ডে উৎসবে শুভ্রার মতো তরুণীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় গভীর আশাবাদ জাগানিয়াই বটে।

 

উনিশ শতকের আধুনিকবাদী ব্রিটিশ সাহিত্যিক ভার্জিনিয়া উলফ বলেছিলেন, ‘নারী সম্ভবত মহাজগতের সবচেয়ে আলোচিত প্রাণি।’ আর নেতিবাচকার্থে এই আলোচনার একমাত্র কারিগর স্বার্থপর পুরুষ। অন্যদিকে বিশ শতকের নারীবাদের জননীরূপে পরিচিত ফরাসী দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার বলেছেন, ‘ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে যে পুরুষেরা সবসময় নিজেদের হাতে ধরে রেখেছে সব বস্তুগত ক্ষমতা; পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার আদিকাল থেকে তারা নারীকে পরনির্ভর অবস্থায় রাখাকেই মনে করেছে সবচেয়ে ভালো; তাদের আইনগত বিধিবিধান তৈরি হয়েছে নারীর বিরুদ্ধে; এবং এভাবে তাকে সুস্পষ্টরূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে অপরূপে।

পুরুষ তার প্রয়োজনে অপররূপী নারীকে বন্দী করতে বরাবর নানা কুৎসিত অভিধায় সাজায়। আর এভাবে হাজার বছর ধরে সৃষ্টি করে নিয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতা। বাধ্য হয়ে নারীকে তার পথের দিশা খুঁজে নিতে পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে হয়েছে। নারীদের জন্য পুরুষের সমান সামাজিক ও আইনগত অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের উদ্দেশ্যে ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপে নারী স্বাধীনতাবাদ নামে উদারপন্থি আন্দোলনের সূচনা ঘটে। সমাজতন্ত্রীদের মতে সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা ব্যতীত নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা সুনিশ্চিত করা সম্ভবপর নয়। অন্যদিকে ধর্মীয় গোষ্ঠীরা মনে করে তাদের ধর্মীয় সমাজ ব্যবস্থার মধ্যেই নারীর যথার্থ মর্যাদা নিহিত।

কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। সকল ফোরামেই মৌলবাদী ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর প্রথম উচ্চারণই থাকে, যেকোনো মূল্যে নারীকে ঘরের ভিতর বন্দী করে রাখার কুযুক্তি সম্পর্কিত। নারীকে বাইরে বেরুলেই পিতৃ বা স্বামীস্থানীয় একজন পুরুষ সঙ্গীকে সাথে নিয়ে অবগুণ্ঠিত হয়ে বাড়ির বাইরে বের হতে হবে। ভিন্ন পুরুষের সামনে কথা বলবার অধিকারটুকুও রহিত করা হয়েছে। পুরুষ নারীকে গৌণ ও দ্বিতীয় লিঙ্গ প্রমাণ করতে ঈশ্বর, ধর্ম, দর্শন, নীতিশাস্ত্র নানা কাব্য গল্পের অবতারণা করে রেখেছে। নারীকে পুরুষ ভাবে তার হাতের পুতুল বা শোষিত শ্রেণি। প্রকৃতিগতভাবে শারীরিক সক্ষমতায় পুরুষের চেয়ে নারী কমনীয় বলে তার বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতাকেও অবলীলায় অস্বীকার করে চলেছে পুরুষ। সামগ্রিক পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা মানেই পুরুষের জয়গান আর নারীর নিন্দা। এখানে পুরুষ যদি অন্ধ বা বধিরও হয় পুরুষ অবতার। আর নারী যদি কোনো সংসারের ত্রাণকর্তাও হয় তবু অচ্ছুৎ!

 


পুরুষ তার নিজের জন্য একচ্ছত্রভাবে আত্মম্ভরিতা সৃজন করে নিয়েছে। ঠুনকো অজুহাতেই স্ত্রীকে বলতে পারে, আমি ওকে আজই তালাক দেব, আজই দেব! আর ধর্মমতে তিনবার ওই কর্মটি করলেই তালাক হয়েও যায়। কিন্তু স্বামী নামের হায়েনার শত অন্যায় অত্যাচারেও স্ত্রীর তালাক শব্দ উচ্চারণ করবার অধিকার নেই। অথচ পুরুষতন্ত্র একা কখনোই শাশ্বত বা সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ন্তা নয়। মানুষকে তার মহিমা নিয়ে টিকে থাকতে হলে নারীপুরুষের সাম্যভিত্তিক সভ্যতাই প্রতিষ্ঠিত করবার সংগ্রাম করে যেতে হবে। এমন সংগ্রামের সারথি বা পুরোধা হতে হবে সবার আগে শুভ্রাদের মতো সাহসী ও স্বাধীনচেতা নারীদেরই।

ধীরলয়ে হলেও বাংলাদেশে নারীর অবস্থান বদলাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের ২০১৭ সালের র‍্যাংকিং এ বাংলাদেশে জেন্ডার সমতায় সারাবিশ্বে ৪৭ তম, আর দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে ৬ষ্ঠ। বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলে শিশুর চেয়ে মেয়ে শিশুর ভর্তির হার বেশি এবং গত কয়েক বছরের এসএসসি ও এইসএসসির ফলাফল থেকেও দেখা যায় সব শিক্ষাবোর্ডেই ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের ফলাফল ভালো। বাংলাদেশে স্বাধীন হওয়ার পর দীর্ঘসময় দেশ শাসনের অভিজ্ঞতা রয়েছে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মতো দুইজন প্রাজ্ঞ নারীরই। বাংলাদেশের প্রধান দুইদলের প্রধান নারী। দেশের প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের স্পিকারও নারী। এমন একটা অবস্থার মধ্যে এখনো নারীকে রুখবার বা অবদমিত করে রাখার বাসনা উদ্ভট-অলীক কল্পনা ছাড়া কিছু নয়।

আমরা চাই ঘরে-বাইরে নারী হোক পুরুষের সমান্তরাল। নারী ও পুরুষের যুথবদ্ধতায় এগিয়ে চলুক মানুষ ও আমাদের মাতৃভূমি। যুগল কন্ঠে মন্দ্রিত হোক শাশ্বত রাবীন্দ্রিক বাণীঃ

ভাগ্যের পায়ে দুর্বল প্রাণে ভিক্ষা না যেন যাচি।
কিছু নাই ভয়, জানি নিশ্চয় তুমি আছ আমি আছি।

.

ফারদিন ফেরদৌস: লেখক ও সাংবাদিক
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।