ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

আমার আপনার সামনে একজন পথশিশু যখন হাত পেতে কিছু চায় তা দেখতে কেমন লাগে? তারওপর কোমলমতি শিশুরা যদি পায়ে ধরে কিছু না পাওয়া পর্যন্ত ফ্রিজ হয়ে বসে থাকে তখন অনুভূতিটা কেমন হয়?

আমরা কি আদৌ ভাবি কোন প্রেক্ষিতে একজন বয়স্ক মানুষ, প্রতিবন্ধী কিংবা অনাথ কোনো শিশুকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামতে হয়? সমাজে সত্যিকার অর্থেই বিপুলসংখ্যক মানুষ অসহায় অবস্থায় আছে। তার চেয়েও বেশিসংখ্যক বিত্তবান মানুষ আছে যারা তাদের মানবিক হাত বাড়িয়ে দিলে নিশ্চিতই মানুষের অসহায়ত্ব দূর হতে পারে। বিশেষ করে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসা-শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার বঞ্চিত শিশুরা মানুষ হওয়ার দিশাটা খুঁজে পেতে পারে। কিন্তু সমাজ থেকে ভিক্ষাবৃত্তি দূর করবার চেষ্টা না করে বিপুলসংখ্যক অসাধু মানুষ বরং ভিক্ষুকদের পুঁজি করে অদ্ভুতুড়ে বাণিজ্য করে!

সরকারি হিসেবে ঢাকা শহরে ৫০ হাজার ভিক্ষুক রয়েছে। যদিও বেসরকারি পরিসংখ্যান বলছে, এ সংখ্যা অন্তত ৩ লাখ। সারাদেশের হিসেবে এ সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে কয়েকগুণ।

দু:খজনক হলেও সত্যি পেটের দায়ে পড়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামার চেয়ে ভিক্ষাব্যবসায়ীদের সংখ্যা বেশি। সেসব লোভী ভিক্ষা সওদাগররা সারাদেশ থেকে অসহায় পঙ্গু বা প্রতিবন্ধীদের ঢাকা শহরে জড়ো করে! এমনকি মায়ের কোল খালি করে শিশুদের চুরি করে তাদের হাত পা কেটে পঙ্গু করে দিয়ে ভিক্ষের উপযোগীও করে তোলে! এভাবে বিভিন্ন পন্থায় খোদ ঢাকা শহরেই ভিক্ষা কারবারিরা প্রতিদিন আয় করে ২০ কোটি টাকা। মাসের হিসেবে যা ৬০০ কোটি টাকা প্রায়। প্রান্তিক পেটেভাতে ভিক্ষুকরা এই বাণিজ্যের কানাকড়ি না পেলেও ভিক্ষুকের দালালশ্রেণি অনেকেই আঙ্গুল ফুলে গলাগাছ বনে গেছে। অথচ শিশু বা অসহায়দের ভাগ্যের কোনো বদল নেই। আর আমরা পরকালের চিন্তায় অথবা মানবতার দাবিতে কত অজানা ভিক্ষা ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ব্যালেন্স ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করে তুলছি!
ছবিটি ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে সাভারের নবীনগর থেকে তোলা। ছবি: আবুল হাসান।

তবে জনমানুষের এমনতর সমস্যা চিহ্নিত করে দূর করবার প্রারম্ভিক ও বড় দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সরকার কি তার ওপর অর্পিত দায়িত্বপালনে আদৌ আন্তরিক?

সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্যে জানা যাচ্ছে, দেশে দারিদ্র নিরসনে সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ও ভিক্ষাবৃত্তির মতো অমর্যাদাকর পেশা থেকে নিবৃত্ত করার লক্ষ্যে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর আবাসন, ভরন-পোষণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য সরকারের রাজস্ব খাতের অর্থায়নে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ শীর্ষক কর্মসূচি হাতে নেয়। আগষ্ট ২০১০ খ্রিঃ থেকে এ কর্মসূচির কার্যক্রম শুরু হয়। এর মূল লক্ষ্য হল ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদেরকে আয়বর্ধক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করা। পরোক্ষভাবে ভিক্ষুকদের পরিবারকে সহায়তা প্রদান এবং সর্বোপরি সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধন। এই প্রকল্প বিভিন্ন এনজিও’র মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। ঢাকঢোল
পেটানো এই কর্মসূচি এখনও বেশ চলছে!
যদিও অর্ধযুগের বেশি সময় ধরে কোটি কোটি টাকা খরচ করার পরেও ভিক্ষাবৃত্তির রমরমা বাণিজ্য যেখানে ছিল ঠিক সেখানেই আছে। অসহায় ভিক্ষুকদের কোনো দিনবদল ঘটেনি। তাহলে এসব প্রকল্প গ্রহণের মাজেজাটা কী? সংশ্লিষ্টদের পকেট ভারি হওয়া ছাড়া এর সুদূরপ্রসারী কোনো ফল আছে কি? সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে সমাজ উন্নয়নে কাজ না করেও টাকা তোলে নেয়াটাও একধরণের আধুনিক ও অভিনব ভিক্ষাবৃত্তিরই নামান্তর।

কবি শেখ হাবিবুর রহমানের ‘নবীর শিক্ষা’ নামে একটি কবিতা আছে। জনৈক দীনদরিদ্র এক লোক বিবি-বাচ্চাসহ তিনদিন অভুক্ত থাকার পর নবী(সা.)-এর কাছে গেলেন কিছু সাহায্য চাইতে। নবী বললেন, তোমার ঘরে কোনো জিনিস নেই? লোকটি একটি কম্বল থাকার কথা জানাল। নবী কম্বলটি নিয়ে এসে তা বিক্রি করে অর্ধেক মূল্য অসহায় লোকটির খাবার কিনতে দিলেন আর বাকি অর্ধেক টাকা দিয়ে একটি কুঠার কিনে দিয়ে বনে গিয়ে গাছ কেটে জীবিকা নির্বাহের পরামর্শ দিলেন। এভাবে লোকটার দু:খ ঘুচল। ওই কবিতার শেষ ক’টি পঙক্তি এমন-
নবীর শিক্ষা ক’রোনা ভিক্ষা
মেহনত ক’রো সবে!

কিন্তু বাঙালি মুসলমান নবীর বুদ্ধি শুনবে এমন ধর্মাচারী তারা না। বরং ভিক্ষাবাণিজ্যে পাওয়া অর্থে ফি-বছর হজ্ব করে নিজেদের ইজ্জতের উচ্চতা এভারেস্টে নিয়ে যাবে, ভালো শিশুকে পঙ্গু করবে, শিশুমনে বিকৃতির ভাইরাস প্রবিষ্ট করবে আর মানুষের মধ্যে দুর্বলতা, হতাশা, অসহায়ত্ব ও দারিদ্রতার চাষ করে বেড়াবে! বিস্ময়কর সত্যি এটাই!

শিশুরা পায়ে ধরে থাকবে, আপনি বিব্রত হবেন, আপনার মনে কারুণ্য ভর করবে, ছবি তুলবেন, ক্ষণিকের জন্য হাহুতাশ করবেন এই যা! কিন্তু যে বুড়ো ভণ্ড-বদমাশ ইবলিশের সারথীরা শিশুদেরকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামিয়ে দিয়ে ফাইভ স্টার হোটেলে গিয়ে এসি খায়, মাসে মাসে বিদেশ ভ্রমণ করে তাকে না ছুঁতে পারব আমরা না পারবে ভাবলেশহীন এই রাষ্ট্র! কাজেই ভিক্ষুকের জাতি হিসেবে আমাদের যে বদনাম ছিল, ভবিষ্যতে এই অস্বস্তিকর বদনাম ঘুচে যাবে তা আর কে বলতে পারে?

ফারদিন ফেরদৌস : লেখক ও সাংবাদিক
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮