ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বীরাঙ্গনা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর প্রয়াণের খবর বিশ্বের যত গণমাধ্যম তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করেছে সেখানেই ধর্মান্ধ, গোঁড়া ও মৌলবাদী বাঙালি বিষোদগারে মেতে ওঠেছে। বাংলাদেশের ধর্ম শিক্ষকরা কি তবে এমনতর কলুষপূর্ণ বিদ্বেষ শিক্ষা দিচ্ছেন সবাইকে? না হলে বেশিরভাগ নেটিজেন বৈধার্মিক আখ্যা দিয়ে ভাস্কর প্রিয়ভাষিণী ও অধ্যাপক জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে চরম অশালীন ও নীতি বিবর্জিত ভাষায় আক্রমণ করে কিভাবে? ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আমি অসভ্য বাংলাদেশিদের উলঙ্গ ও বর্বরোচিত উল্লম্ফন দেখতে পাচ্ছি।

মিস্টার শিক্ষামন্ত্রী আপনি না বিদেশে জ্ঞান রফতানির ঘোষণা দিয়েছেন? কিন্তু আপনার এই জঘন্য জ্ঞান সভ্য পৃথিবী দূরের কথা, হাবিয়া দোযখেও জায়গা হওয়ার কথা না। সবার আগে দেশের মানুষকে সভ্যতা ও নীতিবোধ শেখান। তারপর উন্নয়নের জোয়ারের গীত গাইয়েন।

মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করা প্রিয়ভাষিণী কিংবা জাফর ইকবাল জীবনে কোনোদিন ধর্মাচারী কিংবা কোনো মানুষকেই এতটুকু কটু কথা বলেননি। একজন প্রিয়ভাষিণী দেশ জন্মের কালে নিজের সম্ভ্রম বাজি রেখে আমাদের বাংলাদেশ উপহার দিয়েছিলেন। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া বাঙালিয়ানার আলোকবর্তিকা বয়ে বেড়িয়ে জীবদ্দশায় নিবিষ্ট মনে ভাস্কর্য চর্চা করে নিজেকে শিল্পের শিখরে উন্নীত করে গেছেন। আর বিজ্ঞান শিক্ষক ড. জাফর ইকবাল তরুণ প্রজন্মকে যুক্তি ও বিজ্ঞান চর্চার পথ দেখিয়ে আধুনিক মানুষ গড়বার কারিগরের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। দেশাত্মবোধ ও মানুষ অন্তপ্রাণ এই দু-জন মানুষ ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি বা মাতামাতি কিছুই করেননি। পৃথিবীর কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নিন্দা-মন্দও করেননি। জীবনে কোনোদিন ছোটখাটো অন্যায় করেছেন বা মানুষ ঠকিয়েছেন এমনও শুনিনি। তাহলে তাদের উদ্দেশ্যে এত বিষোদগার, এত ঘৃণা, এত হিংসা কেন?

কারণ একটাই, একজন ধর্মান্ধ ও উগ্রবাদী মানুষ যুক্তি ও বিজ্ঞান জানে না, মানেও না। কেবলমাত্র আখেরাতের চিন্তাশীলরা নিয়ম করে দিনে পাঁচবার প্রার্থনালয়ে যায়, মাথায় ধর্মীয় লেবাস পরে, মাসাবধি উপবাস করে, ঢাকঢোল পিটিয়ে সবাইকে জানান দিয়ে তীর্থে যায়, আবার সমানতালে পাল্লা দিয়ে মিথ্যা বলে, চাতুরি করে, লোক ঠকায়, দেশ বিরোধিতা করে, ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে, অন্যের জমি জবরদখলও করে!

বাংলাদেশে রোজ এত অন্যায় ও অনাচারের ঘটনা ঘটে, তার সবটাই করে ওই ধর্মের ধ্বজাধারীরাই। উদারনৈতিক ও মানবতাবাদীরা মানুষ, দেশ ও প্রকৃতির বিরুদ্ধে এতটুকু অসদাচারী হন না। কাউকে আঘাত বা আক্রমণও করতে যান না। তারপরও বকধার্মিক কর্তৃক অবিরাম জিঘাংসা এমনকি প্রাণনাশেরও শিকার হয়ে চলেছেন নিখাদ মানুষেরা।

পুরাণে আছে, ‘যে প্রার্থনা সকল অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে আপনাকে বিরত রাখতে পারল না তা কোনো প্রার্থনা নয়।’ তাহলে হে গালাগালপ্রিয় দুর্মর নোংরা নেটিজেন প্রজন্ম, আপনারা কিসের ইবাদত, প্রার্থনা বা ধর্ম পালন করেন?

মহান ঈশ্বর আপনাদেরকে আদৌ ক্ষমা করতে পারবেন কি? আমরা মনে করি, আপনারাই নরকের শোভা হবেন। কারণ ঈশ্বর মন্দ বা অসুন্দরের সাথে কখনোই থাকেন না। প্রিয়ভাষিণী বা জাফর ইকবালরা জন্ম-জন্মান্তরে সুখী থাকবেন। কারণ মানুষকে ভালোবাসবার ঐশ্বরিক গুণই তারা বহন করেছেন বা বহন করে চলেছেন। নিন্দুক বা হিংসুটেদের জন্য নয়, স্বর্গ কেবলমাত্র ভালো মানুষের জন্যই রিজার্ভ থাকবে।

অতএব, হে বাজে প্রজন্ম সংযত হোন। জ্ঞানচক্ষু খুলুন। ঈশ্বরের দোহাই লাগে।

ফারদিন ফেরদৌস: লেখক ও সাংবাদিক
গাজীপুর।