ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

একাদশ শতাব্দীতে সোমদেব কর্তৃক পাওয়া সংস্কৃত ভাষায় লেখা কথাসরিৎসাগরে বর্ণিত বেতালের পঁচিশটি কাহিনী গুচ্ছের কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি। যেখানে রাজা বিক্রমাদিত্য এবং বেতাল নামক এক বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন প্রাণীর মধ্যে গল্প ও যুক্তির খেলা চলে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষাভাষীকে সেই বেতাল পঁচিশি বা ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ বহু আগেই চিনিয়ে গেছেন। কিন্তু আজকালের বাঙালিকে রাজা বিক্রম বা তার কথাসঙ্গী বেতালকে না চিনলেও চলে। যুক্তিতে মন নাই কারো, হুজুগই প্রথম ও শেষ কথা। বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে এই কথাটা বেজায় খাটে। এখন একাদশ শতাব্দী না হলেও একাদশ জাতীয় নির্বাচন হলো এর দারুণ দৃষ্টান্ত।

সাতচল্লিশ বছর ধরে পোড় খাওয়ার পর মহাকাল দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আবারও একটা সুযোগ এনে দিয়েছিল। রাজনীতিতে তারা সর্বৈব শুদ্ধাচার চর্চা করতে পারত। কিন্তু না আওয়ামী লীগ বা বিএনপি সেই পুরনো পথেই হেঁটে চলেছে।  এবারের গল্প হবে রাজনীতির ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’।

দেশের বড় দুই দল এমন কিছু প্রার্থীকে মনোনয়ন দৌড়ে রেখেছেন যারা আইন প্রণয়ন তো দূরে থাক, আইন নিজেই তাদের দেখে ভীতসন্ত্রস্ত ও দৌড়ের ওপর থাকবে। খুনীর বাবা, মাদক ব্যবসায়ীর স্ত্রী, দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত, ভূমিদস্যু, হিন্দুর জমি জবরদখলকারী, মামলাবাজ,  এলাকার ত্রাস, গরীবের ওপর নিপীড়নকারী, জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষক, একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্তদের পুত্র/ভাই/স্ত্রী কেউ নমিনেশন থেকে বাদ যায়নি। যেনতেনভাবে এদের কেউ না কেউ পাশ করে সংসদে গিয়ে চেয়ার দখল করবে নিশ্চয়। কিন্তু এরা দেশ ও দশের উন্নয়ন বা উপকারে কী আইনটা পাশ করবে?

এই মাত্র কিছুদিন আগেই বিএনপি রাজনৈতিক সংস্কারের অনেক বড় বুলি আওড়েছিল। তারা ক্ষমতায় এলে প্রতিহিংসার রাজনীতি করবে না। সমঝোতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করবে। অতীতে তারা যে ভুল করেছে, ভবিষ্যতে আর সে পথ মাড়াবে না। আমরা ভেবেছিলাম, বাহ! এক যুগ ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির তবে বোধোদয় ঘটেছে। কিন্তু জঙ্গি সংশ্লিষ্ট, মানবতাবিরোধী অপরাধীর উত্তারাধিকার আর খালেদা জিয়াকে মাইনাস করা ফেলনা পলিটিশান দিয়ে সমঝোতার বা ঔদার্যের রাজনীতি চর্চার স্বপ্ন কোনোদিনই সফল হবে না।

আক্রোশ জমিয়ে রাখা নিজামী-সাঈদীর সন্তানেরা আওয়ামী লীগকে ছেড়ে কথা বলবে এমনটা পাগলেও ভাববে না। অতএব বিএনপির কাছে সহিংসতা ও সাংঘর্ষিক রাজনীতির বীজই রোপিত থেকে গেল। ক্ষমতা পেলে আবার একদিন তা মহীরূহরূপে আবির্ভূত হবে। হিংসা, মারামারি ও হানাহানি এবং প্রাণহানিতেই কেটে যাবে আরও বেশকিছু কাল।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ লাগাতার দশ বছরের শাসন থেকে অনেক কিছু শিক্ষা নিতে পারত।  আপাতত যেসব এমপি-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগের পাহাড় জমে গিয়েছিল, মেইনস্ট্রিমের গণমাধ্যমে যাদের আমলনামা ফলাও করে প্রকাশিত বা প্রচারিত হয়েছে তাদেরকে বাদ দিলে নির্বাচনের খুব বেশি অঙ্গহানি হতো না। কিন্তু তারা তা পারেনি। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া জামায়াতের ঘাঁটিতে কাটা দিয়ে কাটা তোলার নীতিতে সাবেক জামায়াত নেতা আবু রেজা মোহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীকে আবারও মনোনয়ন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। যুদ্ধাপরাধের দায়ে নিবন্ধন বাতিল হওয়া ধর্ম ব্যবসায়ী সেই জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ কথা বলবে কোন মুখে?

ভালো সিদ্ধান্ত বা গণবান্ধব কার্যক্রমের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সবার মন জোগাতে পারত। কিন্তু  ধর্মনিরপেক্ষ ও সামাজিক সাম্যে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ শুধুমাত্র বিএনপির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে উগ্র ডানপন্থায় বিলীন হতে যাচ্ছে। মানবতার জন্য এটা অবশ্যই ঘোর অমানিশা। জাত পাত, ধর্ম বর্ণ বা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষের পক্ষে সমঅধিকারের ভিত্তিতে কথা বলবার রাজনীতি আমরা সহসাই হারিয়ে ফেললাম হয়ত।

বোধ ও বিবেকের বিস্ময়কর অবনমন আমাদের। দৃষ্টান্তমূলক ভালো কাজ নয়, কে কার চেয়ে বেশি নীচে নামতে পারে এই নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে দেশে অব্যাহত খুন, জখম, ধর্ষণ, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, মাদক ব্যবসা, অত্যাচার, অনাচার, দুর্নীতি, দখল আর নারী বিদ্বেষ আরও বেগবান হবে কোনো সন্দেহ নেই।

আর তার নজির এখনই দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনের আগেই এ প্রার্থী ও প্রার্থীর অফিসে আগুন দিচ্ছে। অমুক প্রার্থীকে নমিনেশন না দেওয়ায় তার সমর্থকেরা রাস্তা অচল করে দিচ্ছে।

আমাদের সংবিধানের আইনসভা বা সংসদ সংক্রান্ত প্রথম অনুচ্ছেদ ৬৫’তে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত হইবে’। আগামী ৩০ ডিসেম্বর ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে যাদেরকে আমরা সংসদে পাঠাবো বলে স্থির করে রাখছি তাদের অধিকাংশের চালচিত্র দেখে পঁয়ষট্টি অনুচ্ছেদ কি মিটিমিটি হাসছে না?

সেকালে বেতাল নানা গল্পে রাজা বিক্রমাদিত্যের জ্ঞানচক্ষু খুলে দিয়েছিল। আর একালে আমাদের পলিটিশানরা নিজেরাই বেতাল হয়ে বসে আছে। আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ ও এখানকার নিরীহ মানুষের মঙ্গলের জন্য কারো কথা গায়ে মাখার সময় তাদের কোথায়?