ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

অনেক দিন পর লিখতে বসলাম। কিভাবে শুরু করব বুঝতে পারছি না।

আচ্ছা শুরু করি। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে কোথা থেকে? উত্তরটা একদম সোজা- তৈরি পোশাক শিল্প তথা গার্মেন্টস শিল্প থেকে। আর এতে কর্মরত আছে প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিক, যার অধিকাংশ নারী শ্রমিক। আবার সেই নারী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ শিশু, অর্থাৎ যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে।

পত্রিকা খুললেই আমরা যৌন হয়রানির বিভিন্ন খবর পড়ে থাকি। স্কুলে, মাদ্রাসায় ছাত্রী যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দ্বারা ছাত্রী কিংবা সহকর্মী শিক্ষিকা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। কোন কর্পোরেট হাউজের নারী কর্মকর্তা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে পুরুষ সহকর্মীর দ্বারা। আবার কোন নারী কিংবা শিশু যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে তার প্রতিবেশীর দ্বারা। কিন্তু প্রতিনিয়ত গার্মেন্টস এ নারী কর্মীরা যে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে, তার খবর আমরা সংবাদপত্রে কিংবা মিডিয়ায় পাই না। অবশ্য এটা পাওয়ার কথাও না। আমরা তো কেউ তাদের খবর নেই না। খবর নেই তখন, যথন তারা রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। যখন তারা শিল্প কারখানা ভাংচুর করে, রাস্তায় গাড়ী ভাংচুর করে। আমাদের সামনে তখন তাদের নেগেটিভ বিষয়গুলো ভেসে উঠে।

যাক মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসে। গাজীপুরে দেশের একটি স্বনামধন্য গ্রুপ অব কোম্পানীর পোশাক শিল্প কারখানায় আমার মানব সম্পদ কর্মকর্তা পদে চাকুরী করার সুযোগ হয়েছিল। শিল্প কারখানার নামটি আমি বলছি না, কারণ তাতে হয়তো মনে করবেন যে, আমি ব্যক্তিগত আক্রোশে কথাগুলো বলছি। সেখানে অনেক কিছুই বেশ কাছে থেকে দেখেছি। ঐ চাকুরীটা না করলে আমার এ সম্পর্কে কোন ধারনাই হতো না। আজকে আমি আমার সেই অভিজ্ঞতা থেকে আপনাদের কাছে কিছু শেয়ার করব।

সেখানে আমি চাকুরী করেছি ৩ মাস ১২ দিন। আমরা জানি দৈনিক সাধারণ কর্মঘণ্টা হচ্ছে ৮ ঘন্টা। তার অতিরিক্ত সময় (ওভারটাইম) কাজ করলে তাকে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া হয়। বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী একজন শ্রমিককে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ ঘন্টা অতিরিক্ত কাজ করাতে পারবে। কিন্তু আদতে কি তা হচ্ছে? না দেশের অধিকাংশ শিল্প কারখানায় এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। এই শ্রমিকদের দ্বারা ঘন্টার পর ঘন্টা অতিরিক্ত কাজ করানো হচ্ছে। করানো হচ্ছে রাত্রীকালীন ডিউটি (নাইট ডিউটি)। অথচ তারা যে বায়ারের কাজ করছে, তাদের চাওয়া হচ্ছে কোন শ্রমিককে সপ্তাহে ৬০ ঘন্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। (১ দিন সাপ্তাহিক ছুটি, ৬ কর্মদিবস x ৮ ঘন্টা = ৪৮ ঘন্টা এবং ৬ দিন x ২ঘন্টা অতিরিক্ত= ১২ ঘন্টা, অর্থাৎ সর্বমোট ৪৮ ঘন্টা + ১২ ঘন্টা = ৬০ ঘন্টা কাজ করাতে পারবে)। কিন্তু বাস্তবে কাজ করানো হচ্ছে এর চাইতে অনেক বেশি। কাজ করানো হচ্ছে ছুটির দিন গুলাতে। এই অতিরিক্ত ঘন্টার জন্য শ্রমিকরা প্রতি ঘন্টায় মজুরি পাচ্ছে ১৪ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৪ টাকা পর্যন্ত। তারপরেও তাদের অতিরিক্ত ঘন্টা থেকে কাটা হচ্ছে ইচ্ছেমত। ১০০ ঘন্টা ওভারটাইম করলে তাকে হয়তো ৮০ ঘন্টা কিংবা তার চাইতেও কম দেওয়া হচ্ছে। যাতে মালিকের খরচ কিছুটা বাঁচিয়ে মুনাফার পরিমানটা আরো বাড়ানো যায়। গার্মেন্টস মালিকরা অতিরিক্ত মুনাফার আশায় শ্রমিকদের পশুর মত খাটাতে তাদের বিবেকে বাঁধে না। স্ত্রীর জন্য নতুন ডায়মন্ডের গহনা, মেয়ের জন্য লাখ টাকা দামের জামা ও গহনা, ছেলের জন্য বিএমডব্লিউ গাড়ি, নিজের জন্য একটা গাড়ি; প্রত্যেকের নামে কোন হাউজিং কোম্পানীতে প্লট ক্রয় কিংবা পরবর্তী কারখানা স্থাপনের জন্য জমি ক্রয় করার জন্য টাকা থাকলেও এই শ্রমিকদের পাওনা দেওয়ার মতো কোন টাকা তাদের থাকে না। ঈদের সময় উৎসব ভাতা কিংবা বেতন দিতে তাদের কষ্ট হলেও। ঈদটা সিঙ্গাপুর, লন্ডন কিংবা হংকং এ করতে তাদের কোন কষ্টই হয় না।

কর্মক্ষেত্রে ১৮ বছরের নিচে কোন শ্রমিক নিয়োগে আইনত নিষেধ থাকলেও, তারা মানছে না কোন নিষেধ। ইচ্ছেমত নিয়োগ দিচ্ছে শিশু শ্রমিক। কোন বায়ার/ অডিটর এলেই তাদের পিছনের দরজা দিয়ে বের করে দেওয়া হচ্ছে। তাদেরকেও করানো হচ্ছে অমানবিক পরিশ্রম। নারী শ্রমিক, এমনকি গর্ভবতী নারী শ্রমিকদেরকে দিয়েও নাইট ডিউটি করানো হচ্ছে অমানবিক ভাবে। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, গার্মেন্টেস এ প্রতিটি নারী শ্রমিকই যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। রাস্তা দিয়ে হেটে যাওয়া নারীদের প্রতি পরোক্ষ ভাবে বাজে ইঙ্গিত করলেই তাকে আমরা ইভ টিজিং বলি। আর বাংলাদেশের আইন বলছে ইভ টিজিং একটি যৌন হয়রানি। আর গার্মেন্টস এ পানের থেকে চুন খসলেই শ্রমিকদের তথা নারী শ্রমিকদের সরাসরি অশ্লীল গালাগালি করা হচ্ছে। এমনকি তাদের দৈহিক নির্যাতন ও মানসিক নির্যাতনও করা হচ্ছে। আমি আপনাদের একদিনের একটি ঘটনা উদাহরণ হিসেবে বলি, “ একদিন আমার সহকর্মী মানব সম্পদ কর্মকর্তার নিকট এসে একজন সহকারী প্রোডাকশন ম্যানেজার (এপিএম) একজন নারী শ্রমিককে জোড় পূর্বক অব্যহতি ফর্মে স্বাক্ষর করতে বলেন। যদিও শ্রম আইন অনুযায়ী এ কাজটি অবৈধ। কম্প্লায়েন্স অফিসার বিষয়টির বিস্তারিত জানতে চান এপিএম ও ঐ নারী শ্রমিকের কাছে। এপিএম বলল যে, এই নারী শ্রমিক কাজে খুবই ‍দূর্বল তাকে দরকার নাই। পরে ঐ নারী শ্রমিক ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজনের কাছ থেকে জানা যায় যে, ঘটনার আগেরদিন শুক্রবার ছিল। ঐ দিন কারখানা খোলা ছিল, কিন্তু ঐ নারী শ্রমিক শুক্রবার অনুপস্থিত ছিল। ফলে এপিএম তাকে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করছিল। নারী শ্রমিকটি তার প্রতিবাদ করলে এপিএম তাকে মারধর করে এমনটি মেয়েটির গোপনাঙ্গে আঘাত করে। পরবর্তীতে মালিক পক্ষকে বিষয়টি জানানো হলে তারা ঐ এপিএম এর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা তো নেবে দূরের কথা, তারা ঐ মেয়ে শ্রমিককে বরখাস্ত করার নির্দেশ দেয়। সেখানকার প্রতিটি নারী শ্রমিককে হয়রানি হতে হয় তার পুরুষ সহকর্মী দ্বারা কিংবা উচ্চপদস্থ বস্ দ্বারা। পেটের দায় মিটাতে একটি চাকুরীর জন্য, ১০০-২০০ টাকা বেতন বৃদ্ধির জন্য পদে পদে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে তারা। তাদের আর্তনাদ কারখানার দেয়াল ভেদ করে বাইরে আসতে পারে না। সেই আর্তনাদ পৌছায় না কোন সাংবাদিকের কানে। তাদের এ আর্তনাদের কথা ছাপা হয়না কোন পত্রিকায়। যাদের গায়ের ঘামের দুর্গন্ধ দেশের অর্থনীতির অক্সিজেন হয়ে আমাদের দেশকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমরা পারছিনা সেই অক্সিজেনের মূল্য দিতে। বরঞ্চ আমরা তাদের প্রতিটি পদে পদে করে চলেছি হেয় প্রতিপন্ন। আমদের মনে রাখতে হবে তারাই আমাদের মা, বোন ও কন্যা।

———————-

আমার লেখায় অনেক ভুল থাকতে পারে, তার জন্য ক্ষমা চাইছি।