ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

আমার শিরোনাম দেখে অনেক সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও অন্যান্য সেলিব্রিটিরা রাগ করতে পারেন। তাই তাদের কাছে আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

তারিখ ও বার: গত ১৩ জানুয়ারি, ২০১২ শুক্রবার। সময়: সকাল ৬টা। স্থান: টঙ্গী হোসেন মার্কেট।

দিনটা বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের প্রথম দিন ছিল। একজন গার্মেন্টস কর্মী গ্রামের বাড়ী টাঙ্গাঈল যাবে। কারণ ইজতেমা উপলক্ষ্যে ফ্যাক্টরী বন্ধ থাকবে ১ সপ্তাহ্। এখানে (টঙ্গী) স্বামীর সাথে থাকে। একমাত্র পুত্র সন্তান থাকে গ্রামের বাড়িতে নানীর কাছে। আগের দিন রাতে একমাত্র ছেলের জন্য নতুন জামা কিনল সে। সকাল হল, বাড়ী যাওয়ার জন্য তর সইছিল না। স্বামীকে তাড়াতাড়ি করার জন্য বলল। স্বামী বলল “তুমি এগিয়ে গিয়ে বাসস্ট্যান্ডে দাড়াও, আমি আসছি।” মেয়েটি গিয়ে দাড়াল বাসস্ট্যান্ডে। মুহুর্তের মধ্যে একটি চলন্ত ট্রাক এসে রাস্তার পাশে দাড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে চাপা দিয়ে চলে যায়। থেতলে যায় সমস্ত দেহ। ইজতেমা উপলক্ষে টহল পুলিশ রাস্তাতেই ছিল। তাই খুব তাড়াতাড়ি পুলিশ এসে লাশটি নিয়ে চলে গেল। সকালের রোদ উঠার আগেই লাশটি চলে গেল হাসপাতালের মর্গে। ২০-৩০ জন মানুষ স্বাক্ষী থাকল সেই ঘটনার। ৫-৬ ঘন্টা রক্তের ছোপ ছোপ দাগ থাকল পিচঢালা রাস্তায়। তার সেটিও মুছে গেল রাস্তার চলন্ত গাড়ির চাকার ঘষায় , ইজতেমা মাঠে জুমআর নামাজ পড়তে আসা মুসল্লীদের পায়ের চাপায় আর ধুলায়।

উপরের ঘটনাটি কোন টিভির ব্রেকিং নিউজে ছিল না। কিংবা ঘটনাটি জায়গা পায়নি কোন পত্রিকার ভিতরের পাতায়। তার জন্য তৈরি করা হয়নি কয়েক হরফের কোন প্রতিবেদন। তার জন্য কেউ মানববন্ধন করেনি। তার হত্যাকারী ট্রাক ড্রাইভারকে ধরার জন্য কোন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আল্টিমেটাম দেয় নাই। কোন সাংবাদিক তার জন্য রাস্তায় ক্যামেরা রেখে প্রতিবাদ করে নাই। তার সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার কেউ নেই। আচ্ছা বলুন তো, রুনি-সাগরের সন্তান মেঘ ও জনৈক গার্মেন্ট কর্মীর ছোট শিশুর মধ্যে পার্থক্য কোথায়? ছেলেটির মা যখন বেঁচে ছিল তখনও তো সে তার মা-বাবার আদর স্নেহ থেকে বঞ্চিত ছিল। কোন সাংবাদিক, কোন রাজনীতিবিদ কি তার খবর নিয়েছেন? দুঃখিত, কেনই বা তার খবর আপনারা নিবেন। সে তো আর কোন সেলিব্রিটির সন্তান না। তার মা-বাবা সামান্য শ্রমিক। দুইজনে মিলে ৫-৬ হাজার টাকা বেতন পেত। দেশ ও দশের উন্নয়নে তার কি কোন ভূমিকা আছে? তাকে নিয়ে বিরোধী দল তো রাজনীতি করতে পারবে না, তাই তাকে দেখতে যাবেনা কোন বিরোধী দলীয় নেতা।

একজন মিশুক মনির, একজন তারেক মাসুদের জন্য কত কিছু করলাম। (তাদের প্রতি সম্পুর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি বা তাদের অসম্মান করার জন্য বলছি না)। কত মানববন্ধন, কয়েকদিন জুড়ে টিভিগুলাতে কত স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠান। একটি টেলিভিশন তো ২৪ ঘন্টা করে কয়েকদিন এই ব্যাপারেই অনুষ্ঠান প্রচার করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সেই একই দূর্ঘটনায় গাড়ী চালক মুস্তাফিজ, তারেক মাসুদের প্রোডাকশন ম্যানেজার ওয়াসিম ও কর্মী জামালও নিহত হয়েছিলেন। তাদের কথা কি আমরা কেউ লিখেছি? কেউ কি তাদের খবর নিয়েছেন? কেনই বা নিবেন? তারা তো মানুষ না। তারা হলেন চাকর। দরিদ্রতা তাদের জন্য পাপ। কিন্তু এই তারেক মাসুদ সমাজের এই নিচু স্তরের মানুষদের নিয়েই কাজ করেছেন।

আজকের বাংলাদেশে দৈনিক কতজন মানুষ খুন হচ্ছেন? আমার চাইতে আপনারা সাংবাদিকরাই এই হিসাবটা ভাল জানেন। বিভিন্ন কারণে এই খুন গুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে যেমন: পারিবারিক, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, ব্যক্তিগত, প্রকাশ্য ইত্যাদি। মেহেরুন রুনি ও সাগর সরোয়ার এর হত্যাকান্ডটি কোন ধাপে ফেলবেন? প্রাথমিকভাবে যা বুঝা যাচ্ছে তা হল যারা তাদের খুন করেছে তারা তাদের পূর্ব পরিচিত ছিল। অর্থাৎ আমরা এই হত্যাকান্ডটিকে পারিবারিক/ ব্যক্তিগত হত্যাকান্ডের কাতারে ফেলতে পারি। কিন্তু পর দিন আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি থেকে কি বুঝলেন, পুলিশকে আন্দাজে একটা নির্দেশ দিলেন। ৪৮ ঘন্টার মধ্যে গ্রেফতার করতে হবে। আর আমাদের সাংবাদিক ভাইয়েরাও সেই অনুযায়ী নাচতে শুরু করলেন। কাউন্ট ডাউন্ড শুরু করলেন। ১২ ঘন্টা বাকী, ১০ ঘন্টা বাকী। এর মধ্যে গ্রেফতার না করতে পারলে হেন করে ফেলব, তেন করে ফেলব ইত্যাদি। সেই সাথে তাল মেলালো আমাদের বিরোধী দল। ৪৮ ঘন্টার মধ্যে গ্রেফতারে ব্যর্থ। ব্যস্ শুরু হল এবার নতুন দাবী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। দুইজন সাংবাদিক ব্যক্তিগত কারণে নিজ বাসভবনের সুরক্ষিত স্থানে হত্যা হলেন তার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে? কী আজব কথা? দেশে দৈনিক অনেক হত্যাকান্ড ঘটছে। সেটি প্রকাশ্যে হচ্ছে। এর মধ্যে অনেক রাজনৈতিক হত্যা কান্ড ঘটছে। পুলিশ কাস্টডিতে আসামী মারা যাচ্ছে। একজন জনপ্রিয় পৌর মেয়র মারা গেলেন তার জন্য সাংবাদিকরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ চাইলেন না। কয়েকদিন আগে ছাত্রলীগের হাতে শিরির কর্মী মারা গেল, ছাত্রলীগ কর্মীর হাতে ছাত্রলীগ কর্মী মারা গেল তার জন্য সাংবাদিকরা মন্ত্রীর পদত্যাগ চাইলেন না। তারা পদত্যাগ চাইছেন দুইটি ব্যক্তিগত হত্যাকান্ডের জন্য। আজব দেশে বসবাস করছি আমরা। সাংবাদিক সমাজের বিবেক কি লোপ পেয়েছে? নাকি তারা কোন একটি রাজনৈতিক দলের হয়ে চাটুকারী করছেন। নাকি তারা স্বার্থপর হয়ে গেছেন। আপনারা রাস্তা বন্ধ করে প্রতিবাদ করছেন। আপনারা আমাদের কেন ভোগাচ্ছেন। আপনারা না হয় কর্ম বিরতি করলেন রাস্তা বন্ধ করে। কিন্তু সেই রাস্তা দিয়ে তো আমাকেও আমার কর্মক্ষেত্রে যেতে হয়। আমার সন্তানটিতো সেই রাস্তা দিয়ে স্কুলে যাতায়াত করে। আমি অসুস্থ হলে তো সেই রাস্তা দিয়ে হাসপাতালে যাই। তাহলে আমাকে কেন ভোগাচ্ছেন? আমি বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক, তাই? আপনাদের দৃষ্টিতে আমি মানুষ নই। আরে ভাই মন্ত্রীর বাড়ী ঘেরাও করেন। তার গাড়িতে ঢিল মারেন। তাকে ভোগান। আমাকে কেন ভোগাচ্ছেন?

“হত্যাকাণ্ডের তিনদিন পার হলেও খুনীরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে মোশাররফ হোসেন অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।” (সুত্র- বিডিনিউজ২৪)। শ্রদ্ধেয় মোশাররফ হোসেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে ৩১ বছর আগে। ৩১ বছরের মধ্যে ১০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। কই তার হত্যাকারীদের একজনকেও তো ধরতে পারলেন না। সেখানে আপনি তিনদিনের মধ্যে সেটা আশা করেন? এই হত্যাকান্ডে রাজনীতির কোন মশলা নাই। তাই একে নিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ নাই। অহেতুক ব্যর্থ চেষ্টা করবেন না। আর কতদিন আপনারা লাশের রাজনীতি করবেন। প্রধানমন্ত্রী মেঘের দায়িত্ব নিয়েছেন। এটাকে আপনারা লোক দেখানো বলেছেন। এক কাজ করুন, আপনারা তাহলে ঐ গার্মেন্ট কর্মীর ছেলেটির দায়িত্ব নিন। ভোটের রাজনীতিতে এই ছেলেটিও আপনাদেরকে অনেক ভোট এনে দিবে। এমন অনেক বাচ্চা শিশু প্রতিদিন এতিম হচ্ছে আপনারা তাদেরও দায়িত্ব নিন। এগুলো কোন সাংবাদিক, কোন রাজনীতিবিদ বা কোন সেলিব্রিটির বাচ্চা না। এরা মানুষের বাচ্চা। ঐ গার্মেন্টস কর্মীরাই গড়ে তুলছে আপনার উন্নয়ন, গড়ে তুলেছে সভ্যতা, আনছে সমৃদ্ধি। তারা মানুষ। আমরা সাংবাদপত্র পড়ে, টেলিভিশন দেখে আপনাদের সাংবাদিক বানাই। ভোট দিয়ে রাজনীতিবিদ বানাই। সিনেমা হলে গিয়ে চলচ্চিত্রকার ও সেলিব্রেটি বানাই। নাগরিক হিসেবে আমারও অনেক অধিকার আছে। সেটি আদায়ে আপনারা সহযোগিতা করুন।