ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

তৃতীয় পর্বের পর

Deep Blue Water of Lake Naser, Aswan, Egypt

লেক নাসের ও ফিলে টেম্পল (ভিডিও)

‘ওজাইরিস মিশরীয় ইতিহাসের প্রথম শাসক যার মরদেহ মমিতে পরিণত করে সমাহিত করা হয়। এই এগিলকিয়া পর্বতের চূড়ায়, ফিলে টেম্পলের মূল প্রার্থনাকক্ষের গভীরে, সুরক্ষিত সমাধিক্ষেত্রে। আইসিসের সঞ্চিত রত্ন-মানিক্য, আর হাজারো ব্যবহার্য সামগ্রী সমেত। সেই বহুমূল্য কফিনে, যার ভেতরে সিসাবদ্ধ করে সেথ তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। এরপর ওজাইরিসের পুনর্জন্ম হয় এবং সে অনন্তলোকে পিতা ইশ্বর গেবের কাছে প্রত্যাগমন করে। সেখানে দেবতাদের দেবতা হয়ে ওঠে সে। সে অন্য কাহিনী।

‘এদিকে পুত্র হোরাসকে গর্ভে নিয়ে আইসিস নীলনদের অববাহিকায় ক্ষেমিসের প্যাপিরাস জঙ্গলে আত্মগোপন করে। নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে বাধ্য হয় সে। প্যাপিরাস জঙ্গল মূলত একটি ক্ষুদ্রাকায় ভাসমান দ্বীপ। আইসিস এখানেই হোরাসকে জন্ম দেয়। তাকে বড়ও করে এখানেই। এ কারণে দ্বীপটিকে হোরাসের নীড় বলা হয়।

‘আইসিসের জীবন ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সেদিনের প্রচণ্ড আলোকচ্ছটায় ওজাইরিসের অলৌকিক উত্থান এবং আইসিসের গর্ভধারণের কাহিনী সেথ জেনে গিয়েছিল। আতঙ্কিত ভীরু কাপুরুষ সেথের সাধ্য কি যে সে এ কাহিনী অবিশ্বাস করে! তাই আইসিস ও হোরাসকে হত্যা ব্যতীত আর কোন পথ সেথের সামনে খোলা ছিল না। এ হত্যাচেষ্টা নিয়েও অনেক গল্প রয়েছে। শিশু হোরাস একবার বিষাক্ত সাপের কামড়ে মরতে বসেছিল। কোন কোন লিপিতে প্রমাণ পাওয়া যায়, ঐ সাপ আসলে সেথের প্রেরিত ছিল। এ কারণে সাপকে অভিশপ্ত বা শয়তানের প্রতীক হিসেবে মিশরীয় মিথলজিতে বিবেচনা করা হয়েছে।’

ফিলে টেম্পলের খসে পড়া দেয়ালের উপর বসে আমরা এক ইজিপ্সিয়ান বৃদ্ধের দীর্ঘ কাহিনী শুনে চলেছি। সালতানাত অব ওমানের ফাতমা আলাব্রি, ইকুয়েডরের জেসিকা মেরেসি আর আমি। কী নির্বোধের মতো এক উন্মাদ বৃদ্ধের বয়ান গোগ্রাসে গিলে চলেছি! উঠে পড়া যাচ্ছে না কিছুতেই। আমি আইসিসের মাতৃরূপ দেখতে পাচ্ছি। পরম আকাঙ্ক্ষিত অপরূপা নারী নয়। তেজস্বিনী অসীম সাহসিনীও নয়। আইসিস শুধুই মমতাময়ী মা একজন। পুত্রস্নেহবৎসল সে। আমি তার জন্য বেদনা বোধ করতে থাকি।

বৃদ্ধ লোকটাকে ক্লান্ত মনে হয়। ভাল করে মুখের দিকে চাইতে চেষ্টা করি। ময়লার স্তরের নিচে তার শুকনো খসখসে চামড়া এন্টিকের মতই মনে হয়। সে বলে চলে, ‘হ্যা, আইসিসের এই মাতৃরূপই তাকে ইতিহাসে অনন্য করেছে। বিশেষ স্থানে অধীষ্ঠিত করেছে। তোমরা নিশ্চয় জানো যে মিশরীয় মিথলজিতে ঈশ্বর ও সাধারণ মানুষের অবস্থান পরিষ্কারভাবে আলাদা। কিন্তু আইসিসের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটতে দেখা যায়। শিশু হোরাসের নিরাপত্তার জন্য সে পৃথিবীর এপ্রান্ত-ওপ্রান্ত ছুটে বেড়িয়েছে। খুব সাধারণ একজন নারী হিসেবে। কেউ তার পরিচয় জানতে পারেনি। এমনকি জীবন ধারণের জন্য সে সাধারণ মানুষের দাক্ষিণ্যও গ্রহণ করেছে নির্দ্বিধায়। আইসিসের সাধারণের দেবী হয়ে ওঠার এটাই মূল রহস্য। প্রাচীন মিশরীয় শিল্পকলার মূল মোটিফ এটাই। সেখানে আইসিস মাতৃরূপেই প্রবলভাবে উপস্থিত। এই মন্দিরের সর্বত্র তা’ নানাভাবে দৃশ্যমান।

‘এই যে টেম্পল তোমরা পরিদর্শন করছো, ষষ্ঠ শতাব্দি পর্যন্ত এর জৌলুস অক্ষুণ্ন ছিল। দেবী আইসিসকে উৎসর্গীকৃত এ টেম্পলে ধর্মীয় আচার মেনে পুর্জা-অর্চনা চলতো। বাইজান্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান দ্য গ্রেট এর আমলে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। খ্রিস্ট ধর্মের প্রসারে জাস্টিনিয়ানের ভূমিকার কথা তোমরা নিশ্চয় জানো। তার সেনাপতি নার্সেস মিশরের উজান এলাকা আক্রমণ করে সমগ্র টেম্পল কমপ্লেক্স ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। পুরোহিতদের বন্দি করে এবং স্বর্গীয় বহু নিদর্শন লুট করে কনস্টান্টিনেপোল নিয়ে যায়। পরবর্তীতে ফিলে টেম্পল রোমান বাহিনীর গ্যারিসন হিসেবেও কিছুকাল ব্যবহৃত হয়েছে।

‘তোমরা নিশ্চয় খেয়াল করেছো, মূল মন্দির চত্ত্বরে প্রবেশের মুখেই কয়েকটি ছোট আকারের মন্দির রয়েছে। এর মধ্যে আইসিসকে উৎসর্গীকৃত মন্দিরটির মূল কাঠামো ও থামগুলো দৃশ্যমান আছে। একটি মন্দির দেবতা হোথরকে উৎসর্গীকৃত। মূল কমপ্লেক্সের ভেতরের দিকে দুটি চেম্বারের দেয়াল নানান কাল্পনিক ও সাঙ্কেতিক শিল্পকর্মে পরিপূর্ণ। অবশ্য পুরো কমপ্লেক্সের সকল দেয়ালগাত্রই আইসিস-ওজাইরিসের খোদাই শিল্পকর্মে ভরা। কিন্তু হোরাসের খোদাইকর্মগুলো কম ক্ষতিগ্রস্ত, প্রায় অবিকৃতই রয়ে গেছে। তোমরা লক্ষ্য করেছো কি?’

আমি জেসিকার চোখে তাকাই। ফাতমার দিকেও। না, আমরা কেউ লক্ষ্য করিনি তো! টেম্পলের প্রতিটি দেয়ালের প্রতি ইঞ্চি স্থান মিশরীয় মিথলজির হাজারো সাঙ্কেতিক ভাষা, প্রতীক, ছবি আর কাহিনীতে পূর্ণ। কোন শূন্য স্থান নেই। আজকের আগে অবধি আইসিস, ওজাইরিস, হোরাস, আনুবিস, হোথর, সেথ, নেপথিস, থোথ কিংবা গেব, রা কাকেই বা চিনতাম আমি! কারই বা নাম শুনেছি!

Philae Temple

বৃদ্ধ বলে চলে, ‘আইসিসের ক্রোড়ে দুগ্ধ পানরত শিশু হোরাসের খোদাইকর্মগুলো তোমরা ভাল করে লক্ষ্য করো। কী চিরন্তন! কী সত্যি! মমতাময়ী মায়ের বুকে শিশুপুত্র দুগ্ধপানরত। এ তো শিশু যীশু, মাতা মেরির ক্রোড়ে, দুগ্ধ পান করছে! বাইজেন্টাইন বাহিনী এই চিত্রকর্মগুলোকে অস্বীকার করবে কি করে? তারা তো খ্রিস্ট ধর্মের প্রসারকেই ব্রত হিসেবে নিয়েছিল। সুতরাং তারা ভুল বুঝে, ভুল বিশ্বাসে আইসিসের বুকে শিশু হোরাসকে রক্ষা করেছে, মাতা মেরির ক্রোড়ে শিশু যীশু ভেবে।

‘সুতরাং যে কারণে টেম্পলের অন্যান্য খোদাইকর্ম তারা আঘাত করে, খুঁচিয়ে, খুঁটিয়ে ধ্বংস করেছে, সেই একই কারণে শিশু হোরাস-মাতা আইসিসের খোদাইকর্মগুলো তারা রক্ষা করতে চেয়েছে।

‘তরুণ হোরাস বীর বিক্রম হয়ে ওঠে। মা আইসিসের আশীষ তার সাথে। পিতা ওজাইরিসের প্রতিষ্ঠিত স্বর্গরাজ্য মিশরের সিংহাসন ফিরে পেতে সে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। চাচা সেথের সাথে অনিবার্যভাবে মরণপণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় সে। কিন্তু সেথের কুটকৌশলে বার বার হারতে থাকে। মা আইসিস সন্তান হোরাসকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেয়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে সে সেথকে ধারালো টেঁটা দিয়ে আক্রমণ করে। কিন্তু সেথ উল্টো আইসিসকেই আঘাত করে বসে। ধারালো মেইসের আঘাতে আইসিসের দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দেবতা থোথ কাটা মাথার স্থানে গরুর মাথা স্থাপন করে আইসিসকে সে যাত্রায় রক্ষা করে। এ কারণে তোমরা মিশরীয় বিভিন্ন মন্দির গাত্রে চিত্রকলায় গরুর মাথাওয়ালা আইসিসকে হামেশাই দেখতে পাবে।

‘সিংহাসনের দাবিতে শেষ পর্যন্ত দেবতাদের আদালতে মামলা ঠুকে দেয় হোরাস। বিচারক অবশ্যই তার দাদা ঈশ্বর গেব। ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির দেবতা এতুম বেঞ্চের সদস্য। দেবতা থোথ দু’পক্ষের মধ্যে মধ্যস্ততাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ। পৃথিবীর আদালতের মতই স্বর্গীয় এ মামলা দীর্ঘদিন ধরে চলে। তুমুল তর্কবিতর্ক ও যুক্তি খণ্ডন হয়। শেষ পর্যন্ত বিচার-বেঞ্চ সমস্যা সমাধানের জন্য ওজাইরিসকে পত্র লিখার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ ওজাইরিস পুতপবিত্র। সে কেবল পরজীবনের ঈশ্বরই নয়, বরং মৃত্যু, রূপান্তর ও পুনর্জীবনেরও ঈশ্বর। সুতরাং সে-ই সত্যিকারের ন্যায়বিচারক। ওজাইরিস তার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে, রক্তপাতের মধ্য দিয়ে, অসৎ উপায়ে ক্ষমতা দখল কখনো বৈধ হতে পারে না। অথচ সেথ তাই করেছে। হোরাস কাউকে হত্যা করেনি। সুতরাং হোরাসই যোগ্য শাসক। দেবতাদের আদালত ওজাইরিসের যুক্তি মেনে নিতে বাধ্য হয়। হোরাস মিশরের বৈধ শাসক হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

‘দেবতা ওজাইরিস ও দেবী আইসিসের সন্তান বীর হোরাস আনুষ্ঠানিকভাবে মিশরের সিংহাসন লাভ করে। সুতরাং সে ঈশ্বর মনোনীত রাজা। পৃথিবীতে জন্ম নেয়া প্রথম মানব-শাসকও বটে। সে ম্যান-গড। মিশরের প্রথম ফারাও বা ফেরাউন।’

[আগামী পর্বে  সমাপ্ত]

ভ্রমনের অন্যান্য গল্প:

সেই থেকে নীলের মাছেরা অভিশপ্ত (তৃতীয় পর্ব)(দ্বিতীয় পর্ব)(প্রথম পর্ব)

মারশা মাতরুয়াহ’র নির্জনতায় প্রেম

মনপোড়ে, মনপুরা!

নীল নীল আম্রকানন

অন্যান্য: 

পয়লা’র ষাঁড় ও স্বামীগণ

কোরবানির মিসকিনগণ