ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

মাউন্টেইনের তলে পরিত্যাক্ত দীর্ঘ রেলওয়ে টানেলের গভীরে ঢুকে উষ্ণতা ফিরে পাই।

কোরিয়ায় বসন্ত এসে গেছে, শুভ্র চেরির স্নিগ্ধতা চারদিকে। দক্ষিণের দিকে এর প্রকাশ আরো মাদকতাময়। সিউল থেকে চার ঘন্টার পথ পেরিয়ে ছিয়ংদো এসেছি এই মাদকতায় ভাসবো বলে। কিন্তু বসন্তের হিম বাতাস আর ঝড়ো বৃষ্টি সব মাটি করে দেয়।

ছিয়ংদোর চারদিকে মাউন্টেইনের ভাঁজে ভাঁজে মেঘ খেলা করছে। শহরের বেশ খানিকটা বাইরে আমরা; আঁকাবাকা পাহাড়ি পথ মাড়িয়ে এগিয়ে চলেছি। বাসের জানালা বৃষ্টির ছাঁটে ঘোলা হয়ে আসছে। জ্যাকেটের হাতায় ঘষে ঘষে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি। প্রকৃতির এই অপার্থিব রূপ দু`চোখে ভরে ভরে নিতে চাই যে!

টানেল থেকে বেশ খানিকটা দূরে পার্কিং। লোকজন তেমন চোখে পড়ে না। বৃষ্টির মাথায় দৌড়ে এক দোকানের ছাউনিতে আশ্রয় নিই। পারসিমন ফলের শুকনো আধা শুকনো আচারের প্যাকেট, ভিনেগার বোতল ইকসু, আর ওয়াইন। থরে থরে সাজানো। বৃদ্ধা দোকানি আচার দিয়ে আপ্যায়ন করে। আশে পাশে এমন আরো দোকান। সব বৃদ্ধারা চালাচ্ছে। ফ্রি পারসিমন খাওয়ানোর উদ্দেশ্য ব্যাখা করে আমাদের কোঅর্ডিনেটর ইয়ুনহি কুয়াক। ফেরার সময় এই বৃদ্ধার দোকান থেকেই যেন কয়েকটা বোতল কিনে নিয়ে যাই আরকি! পাগল!

টানেল এখান থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। দু`ধারে চোখ-জ্বালা-ধরা চেরি। কোরিয়ান ট্র্যাডিশনাল বাড়িঘর, হ্যানক। সারি সারি রেস্টুরেন্ট। সব শূন্য। এখন ট্যুরিস্ট সিজন নয়। উপরন্তু ঠাণ্ডা, আর বৃষ্টি।

পারসিমন আচার চাখতে চাখতে একসময় টানেলের সামনে পৌঁছে যাই। রেল লাইন ঢুকে গেছে মাউন্টেইনের গহ্বরে। মুখে কাঠের তৈরি ভারি গেট। খোলা পকেটটুকু দিয়ে সোনালি আলোর মেলা চোখে পড়ে। এই ছিয়ংদোর ওয়াইন টানেল।

ভেতরে ঢুকে থ` বনে যাই। সত্যিই আলোর মেলা! টানেলের একপাশের দেয়াল ঘেঁষে পায়ে চলার সরু পথ। অপর পাশে সারি সারি দোকান। সব ওয়াইনের। মায়াবি আলোয় ভরা চারদিক। পরিত্যাক্ত টানেলের ভারী গ্রানাইট আর লাল ইট ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়নি। পাথরের গা বেয়ে কোথাও কোথাও পানি চুঁইয়ে পড়ছে। দোকানগুলোর পাশে সারিবদ্ধ টেবিল-চেয়ার। এন্টিক সব। আমি কোরিয়ার বিখ্যাত এবং সম্ভবত, পৃথিবীর একমাত্র ওয়াইন টানেলের ভেতরে একটা টেবিল দখল করে বসে পড়ি।

জেসন ডাইনেস্টির আমলে মাউন্টেইন খুদে এ টানেল তৈরি। ছয় বছরের নির্মাণ কাজ শেষে ১৯০৪ সনে এতে ট্রেন চলাচল শুরু করে। তারপর প্রকৃতির নিয়মে একসময় অকেজো হয়ে পড়ে। পরিত্যাক্ত পড়ে থাকে অনেক বছর। স্থানীয় কৃষক পরিবারগুলো নির্জন টানেলের ভেতরে পারসিমন ফল গ্যাঁজানো শুরু করে। ভেতরের ন্যাচারাল তাপমাত্রা এ জন্য খুবই যুতসই। সর্বদা ১৫ সেলসিয়াস। বাতাসের আদ্রতা সারা বছরই ৬০-৭০% এর মধ্যে। আস্তে আস্তে কৃষকদের কাছে এর গুরুত্ব বাড়তে থাকে; সরকারি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।

অবশেষে ২০০৬ সনে কিছু সংস্কার শেষে স্থানীয় কমিউনিটির উদ্যোগে এটি ওয়াইন টানেল হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তারপর কোরিয়ার ট্যুরিস্ট মানচিত্রে সোনালি মুকুটের স্বীকৃতি পেতে এর সময় লাগে না মোটেও।

পারসিমন কোরিয়ার অত্যন্ত জনপ্রিয় ফল। ছিয়ংদো এলাকায় বেশি ফলে। শরতের শেষে রসে ভরপুর পাকা হলুদ পারসিমন স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়। ভিটামিন এ আর সি সমৃদ্ধ। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এ ফল ব্রঙ্কাইটিস, ডায়াবেটিক, উচ্চ রক্তচাপের অসুখে ভাল কাজ দেয়। ত্বকের জন্যও ভাল। এমনকি, ক্যান্সারেও নাকি উপকারী। সে যাই হোক, বর্তমানে এ শিল্প স্থানীয় পরিবারগুলোর রুটি-রুজির যোগান দিচ্ছে, এটাই বড় কথা।

বলা বাহুল্য, পারসিমন ওয়াইন সমগ্র কোরিয়াতে ভীষণভাবে আদৃত। চিজ আর চকোলেটের সাথে এক পেয়ালা পারসিমনের স্বাদ অপার্থিব; শুনে এসেছি। বাঙালের আবার ওয়াইনের স্বাদ! চোখ বন্ধ করে পেয়ালায় চুমুক দিই। ছেলেবেলায় গ্রীষ্মের তাপদাহে মাঠের ধারে তালের একগ্লাস ঝাঁঝালো রসের যে স্বাদ, এ জিনিস তার চেয়ে বেশি কিছু নয় মোটেও। কি জানি, বেশি বলা হয়ে গেল কি না!

টানেল এক কিলোমিটারের মত দীর্ঘ। এর মধ্যে দেড় লাখের মত বোতল রয়েছে। পাথরের গায়ে থরে থরে সাজিয়ে রাখা। কাঁচের উপর মায়াবি আলোর বিচ্ছুরণ। পায়ে চলার পথে রঙিন ফুলের সারি। ডেটিংয়ের জন্য সত্যিই স্বর্গ। জোড়ায় জোড়ায় কপোত-কপোতি মুখোমুখি ঝুঁকে নিচু স্বরে কথা বলছে। হাতে পারসিমনের পেয়ালা। টেবিলে চিজ আর চকোলেট। কুয়াক জানায়, সামারে এখানে ভীষণ ভিড় হয়। কারণ এর ভেতরের শীতল তাপমাত্রা। পরিবার-পরিজন নিয়ে সবাই বেড়াতে আসে। ট্যুরিস্টের ঢল নামে তখন।

টানেলের ভেতরে ওয়াইন স্টোরেজের নানা আয়োজন চোখে পড়ে। বোতল তো রয়েছেই, ওয়াইন পিপাও। প্রথম পিপা দেখছি। কী বিশাল সাইজ এক একটার। সিল করা। ফারমেন্টেশন চলছে।

স্টোরেজ আর ক্যাফে ছাড়াও ট্যুরিস্টদের বিনোদনের জন্য ভেতরের বড় একটা অংশ জুড়ে আর্ট গ্যালারি করা হয়েছে। ছোট্ট কাগজের টুকরোয় নিজের কোন গোপন ইচ্ছের কথা লিখে গ্যালারির দেয়ালে ঝুলিয়ে দাও। কাগজের ডিজাইনও ওয়াইন বোতলের। রঙ সাদা আর সোনালি। অপূর্ব! এক কোটির মত কাগজ-বোতল গ্যালারির দেয়ালে ঝুলছে। বেশিও হতে পারে। কে আর গুণে দেখেছে!

কোঅর্ডিনেটর ইয়ুনহি কোয়াক আমাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন; ক্যামেরা আর স্ট্যান্ড হাতে বারবার পেছনে পড়ে যাচ্ছি। তাকে খুশি করার জন্য বলি, কুয়াক, বিশ্বাস করো, ফটোগ্রাফির জন্য এই টানেল একটা সত্যিকারের স্বর্গ। আমি এর মধ্যে হারিয়ে গেলে দু:খিত হবো না মোটেই।

ছবি: ফারুক জোয়ার্দ্দার
অন্যান্য লেখা:

হ্যানক গাঁয়ের রঙ

সিউলে শতদল

সেই থেকে নীলের মাছেরা অভিশপ্ত (প্রথম পর্ব),(দ্বিতীয় পর্ব),(তৃতীয় পর্ব),(চতুর্থ পর্ব)

মারশা মাতরুয়াহ’র নির্জনতায় প্রেম

মনপোড়ে, মনপুরা!

পয়লা’র ষাঁড় ও স্বামীগণ

কোরবানির মিসকিনগণ

নীল নীল আম্রকানন