ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

 

বাংলাদেশের ‘সুশীল সমাজ’ সম্পর্কে একজন ব্লগার’র একটি মন্তব্য দিয়ে শুরু করতে চাই, তিনি বলছেন, “সুশীল সমাজ অর্থ ভদ্রলোকের সমাজ, কিন্তু বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে এটা হচ্ছে ইন্টেলেকচুয়াল ধান্ধাবাজদের একটা ক্লাব।” এখন আমরা একটু জানার চেষ্টা করি ‘সুশীল সমাজ’ এই হুজুগটি বাংলাদেশে কোথা থেকে এল। পাশ্চাত্যের Civil Society- এ শব্দযুগল বাংলাদেশে‘সুশীল সমাজ’ নাম ধারণ করেছে। Civil Society’র প্রকৃত বাংলা অনুবাদ হবে ‘নাগরিক সমাজ’। কিন্তু আমাদের দেশে একটি  বিশেষ গোষ্ঠী একটি  বিশেষ স্বার্থে Civil Society’র অনুবাদটিকে  ‘সুশীল সমাজ’ বা ‘বিশিষ্ট নাগরিক’ হিসেবে একেবারে পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন। এ সুশীল বাবুরা এ তকমাটা নিজেদের গায়ে বেশ ভালভাবে ঝুলিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে বোতলের গায়ে লেভেলে যা লিখা, বোতলের ভিতর তা নেই, আছে একেবারে উল্টোটা। উপরে ‘সুশীল সমাজ’ লিখা বোতলের ভিতর মোটেও সুশীলতা নেই, আছে ‘ইন্টেলেকচুয়াল ধান্ধা’।

Civil Society’র সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অক্সফোর্ড ডিকশনারী বলছে, “এটা হচ্ছে নাগরিকদের একটা সমাজ, যারা নাগরিকদের সাধারণ স্বার্থে যৌথভাবে কাজ করেন।” এ সম্পর্কে একটা অনলাইন ডিকশনারী বলছে,“ সিভিল সোসাইটির কাজে সাধারণ মানুষের ইচ্ছা ও স্বার্থ প্রতিফলিত হয়।” কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে তা কি হচ্ছে? না, এদেশের সিভিল সোসাইটির কর্মকাণ্ডে মোটেও এদেশের সাধারণ মানুষের ইচ্ছা প্রতিফলিত হয় না। আবার এটার একেবারে উলঙ্গ একটা প্রমাণ পাওয়া গেল তাদের সাম্প্রতিক ‘সংলাপ নাটকে’।

এ নাগরিক সমাজের তরফ থেকে সংলাপের জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও খালেদা জিয়াকে চিঠি দেয়া হল। দেশের চরমভাবে বিপন্ন মানুষরা বেশ আশার সাথেই বিষয়টি গ্রহণ করল। কিন্তু হায় এ কি! সংলাপের জন্য চিঠি দেয়া এ নাগরিক সমাজের একজন আকবর আলী খান কাল (১০.০২.২০১৫) রাত সাড়ে আট-টার দিকে একাত্তর টিভি’র একাত্তর সংযোগ অনুষ্ঠানে স্পষ্টভাবে বললেন বাংলাদেশে বর্তমানে পেট্রোল বোমা ছুড়ে নির্বিচারে যে গণহত্যা চালানো হচ্ছে তা মোটেও বিএনপি করছে না, তাই বেগম খালেদা জিয়াকে এ ব্যাপারে কোনভাবেই দায়ী করা যাবে না । তাহলে পেট্রোল বোমা ছুড়ে মানুষ হত্যা কারা করছে, অনুষ্ঠান সঞ্চালকের এ প্রশ্নের উত্তরে আকবর আলী খান কঠোরভাবে সরকারকেই দায়ী করলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত রাশেদা কে চৌধূরী বিলাপ শুরু করলেন বোমা হামলাকারীদের জনগণ কেন হাতেনাতে ধরে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করছে! বোমা হামলায় উদ্যত একজন খুনি বোমাটা ছুড়ে দিতে সক্ষম হলে তাতে কত মানুষ ভয়াবহ মৃত্যুর শিকার হবে সেটার প্রতি  রাশেদার এতটুকু মাথাব্যথা নাই, বরং বোমা হামলাকারীদের ধরে জনগণ কেন ধোলাই দিচ্ছে তাতেই ওনার সমস্ত মাথাব্যথা! সংলাপের চিঠি পাঠানো আকবর আলী খানদের এ সকল বক্তব্য রাষ্ট্রের বিপন্ন মানুষদের প্রতি নির্মম এক বিদ্রূপ নয় কি?

বেগম খালেদা জিয়ার আন্দোলনে পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে নির্মমভাবে মানুষ হত্যাযজ্ঞ চলছে, আকবর আলী খান কিভাবে বেগম খালেদা জিয়াকে এ নৃশংস গণহত্যা থেকে দায়মুক্তি দিলেন? তাহলে আকবর আলী খানরা কি খালেদা জিয়ার Agenda বাস্তবায়ন করার জন্য মাঠে নেমেছেন? ওনারা যদি মনে করেন সরকারই দেশে এ গণহত্যা চালাচ্ছে, তাহলে চলমান এ গণহত্যা বন্ধ করার জন্য ওনাদের খালেদা জিয়ার কাছে চিঠি দেয়ার কি প্রয়োজন ছিল? ওনারা যেহেতু বলছেন সরকারই দেশে এ গণহত্যা চালাচ্ছে, তাহলে এ গণহত্যা বন্ধ করার জন্য কড়া ভাষায় শুধু সরকারের কাছে চিঠি দিলেই তো হত। মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং খালেদা জিয়ার কাছেও চিঠি পাঠিয়ে সংলাপ, সংলাপ… এমন কা কা শুরু করে দেয়ার কি দরকার  ছিল? কেন এ নাটক? দেশের মানুষের অসহনীয় কাটা ঘায়ে কেন এ নুনের ছিটা? ধান্ধাবাজ তথাকথিত এ নাগরিক সমাজের কাছে দেশের মানুষ তো সাহায্যের জন্য ধর্না ধরেনি, তারপরেও কেন তাদের এ গায়ে পড়া পীরিতি ? কিসের ধান্ধায়, কি Agenda বাস্তবায়নে আবার তারা মাঠে নেমেছেন? খালেদা জিয়ার ক্ষমতা দখলের অবরোধ-হরতালে বিএনপি-জামাত জোট সাধারণ মানুষকে টার্গেট করেছে, সরকারকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য করতে তারা ঠাণ্ডা মাথায় প্ল্যান করে নৃশংস গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে।

এ সুশীলরা একবারও স্পষ্ট ভাষায় নির্মম, নৃশংস এ গণহত্যার নিন্দা জানিয়ে তা বন্ধ করার চেষ্টা করেনি। বরং অসুস্থ-বিবেকহীন এ সুশীল বিএনপি-জামাত জোটের  Agenda বাস্তবায়নেই  মাঠে নেমেছেন। তাদের এ হীন আচরণে এ দেশের মানুষের ধৈর্যচ্যুতি ঘটবেনা এ গ্যারান্টি কি দেয়া যায়? কদিন আগের নরসিংদীর গণপিটুনিতে সাত ডাকাত নিহত হবার ঘটনার মতো অন্যকোন গণপিটুনির ঘটনা এদেশে আবার ঘটবে না তা কি কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে? জনরোষ বলে কথা! আশা করি সুশীল জনরোষের এ বিষয়টি মাথায় রাখবেন।

সংলাপের চিঠি পাঠানো এ সুশীলদের কেউ কেউ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কছে নিজেদের কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমা ভিক্ষা করেন, মাননীয় ট্রাইব্যুনাল এ সম্পর্কে আদেশ এখনো দেননি। কারণ হচ্ছে, ট্রাইব্যুনাল ও ১৯৭১ সালের মহান শহীদদের উপর অবমাননাকর মন্তব্য করায় মাননীয় ট্রাইব্যুনাল ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বারগম্যানকে সাজা দেওয়ার পর এ সুশীল উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন। ধৃষ্টতা আর কাকে বলে! দেশ ও দেশের জনগণ বিপদাপন্ন হলে Western Civil Society ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাশে দাঁড়ায় আর আমাদের সুশীলরা সুযোগ নেয়!

তাহলে আমরা তাদের সুশীল কেন বলছি ভাই? প্লিজ, আসুন মত পালটাই।