ক্যাটেগরিঃ আর্ত মানবতা

 

শীত শুরু হওয়ার পর সবার মন ভাঁপা পিঠার মতো নরম হয়ে যায় । মন যেন শীতের উষ্ণতায় জমে গিয়ে রোদ্দুর খোঁজ করে । কিছুটা পরশে গলবে আর সমানে মাথায় আর শরীরে মাখবে_অসম্ভব নিদারুণ সুখ । সেই মাখামাখির প্রবণতা থেকে হয়ত কিছুটা শরীর নাড়াচাড়া করার জন্য আমরাও অজুহাত খুঁজছিলাম । শীতকালে শীতার্ত মানুষগুলোর জন্য উষ্ণতা খোঁজার অজুহাতটাতে আমরা বেশ মাথা ঘামালাম । এইটা এমন এক ইস্যু যা দিয়ে একসাথে দান কিংবা সহানুভূতি এবং বড় একটা ব্যানার নিয়ে হাসিমুখে ছবি তোলার সুবর্ণ সুযোগ তৈরী হয় । আর সবাই সেই সব কর্মকাণ্ড দেখে বাহ বাহ কি মহৎ কার্য করছে_কি মহৎ এইসব মানুষ বলে প্রশংসায় সবগুলো দাঁত বিনা বাধায় দেখিয়ে দিবে । আর উপর থেকে ঈশ্বর সবার জন্য স্বর্গ কনফার্ম করে স্বর্গীয় শরবত প্রস্তুত রাখবে ।

কিন্তু সেই সব কল্পনার দৃশ্যগুলো চিত্রায়িত হওয়ার আগে কতগুলো প্রশ্ন ভীষণ যন্ত্রণা শুরু করলো_বলা যায় রীতিমত জ্বালাতন করে খাচ্ছিল ।

প্রশ্ন : শীতার্ত করা ?
উত্তর : বাঙলাদেশের নাগরিক ।
প্রশ্ন : আমরা যারা শীতার্তদের দান বা সহানুভূতি প্রদান করতে চাই তারা কারা ?
উত্তর : বাঙলাদেশের নাগরিক ।
প্রশ্ন : বাঙলাদেশের নাগরিক কারা ?
উত্তর : ওরা সবাই মানুষ ।
প্রশ্ন : একই দেশের একই রাষ্ট্রের মানুষ হয়ে কি করে কতগুলো গুটিকয়েক মানুষ বিশাল সংখ্যক মানুষকে দান বা সহানুভূতি করতে পারি ?
উত্তর : আমরাও মানুষ বাঙলাদেশের নাগরিক_ওরাও মানুষ বাঙলাদেশের নাগরিক তাহলে একই দেশে একই রাষ্ট্রে এক আল্লাহ, ভগবান, ঈশ্বরের সৃষ্ট মানুষ কিভাবে আরেকদল মানুষকে দান বা সহানুভূতি প্রদান করতে পারে । তার মানে যারা দান বা সহানুভূতি করছে একদল মানুষকে তারা নিশ্চয় ঈশ্বরীয় ক্ষমতার মানুষ, সাধারণ মানুষ নয় !
প্রশ্ন : একই রাষ্ট্রের একই নাগরিক একই দায় দায়িত্ব নিয়ে বসবাস করলেও কেন রাষ্ট্রের নাগরিকে নাগরিকে পার্থক্য_কোথায় সমস্যা_কিসের কারণে এইসব হচ্ছে ?
উত্তর : উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আমরা নিজেরা নিজেদের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে যাই ।
প্রশ্ন : রাষ্ট্র তার সকল দাবি ও সুবিধা নাগরিক থেকে আদায় করে নিবে আর একদল বিশাল সংখ্যক নাগরিক রাষ্ট্র থেকে তার অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে_সেই বঞ্চনা নিয়ে আমরা দান/খয়রাত কিংবা সহানুভূতি কিংবা ব্যবসা শুরু করবো ?
উত্তর : না আমরা এই রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করবো ।
প্রশ্ন : রাষ্ট্রের এই অন্যায়ের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ কিভাবে করবো ?
উত্তর : নিজেদের চেতনার বিকাশ ঘটাবো যাতে আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি কিভাবে সেই বিশাল সংখ্যক মানুষের সাথে সাথে আমরাও বঞ্চিত হচ্ছি । কারণ বৈষ্যমের রাষ্ট্রে কেউ শোষণ এবং অধিকার হরণের বাইরে নয় । শীতবস্ত্র বিতরণে মাধ্যমেই আমাদের প্রতিবাদ । কেননা এই শীতবস্ত্র বিতরণের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রাষ্ট্রীয় বৈষম্য গুলোকে নিজ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখা এবং নিজেদের চেতনাকে প্রতিরোধের জায়গায় নিয়ে যাওয়া । এটাই আমাদের প্রতিবাদের ভাষা ।

এই প্রতিবাদের ভাষা জেনে শীতবস্ত্র ও অর্থ সংগ্রহে নেমে পড়লাম । পাবলিহা আলাভি’র নেতৃত্বে নুসরাত মিশু, দিপংকর দীপু, মোঃ বাবর, কায়সার উদ্দিন চৌধুরী, ফয়সল অভিকে নিয়ে একটা টিম গঠিত হলো । পরবর্তীতে সেই টিমে তারেক আনোয়ার, পূর্বা, নকিবুল কাদের চৌধুরী, আসিফ খান, ইসমাইল, তানভীর মাহমুদও যুক্ত হলো । ফেইসবুক ইভেন্ট এর মাধ্যমে এবং মাঠ পর্যায়ে কাজ করে অর্থ ও শীতবস্ত্র সংগ্রহ শুরু হলো । মাঠ পর্যায়ে কাজ করার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় নুসরাত মিশু আহত হয়ে বিশ্রামে গেলো যা খুব বেদনাদায়ক । তবুও খুব উদ্দমে চলছিল কার্যক্রম । সবার সহযোগিতায় নির্ধারিত সময়ে বেশ ভালভাবেই সংগ্রহ হলো অর্থ ও শীতবস্ত্র । আমরা জানি, সকল বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের পক্ষে সম্ভব না । বঞ্চিতরাই রাষ্ট্র থেকে তাদের অধিকার আদায় করে নিবে । তাই এক মাসের কার্যক্রমে সংগ্রহিত বস্ত্র ও অর্থ দিয়ে বঞ্চিত মানুষের সামান্য অংশের পাশে দাঁড়ানো যায় । সবার দেওয়া অর্থ ও বস্ত্র আমরা রাষ্ট্রের ছোট বঞ্চিত অংশের নাগরিকদের শীতবস্ত্র বিতরণ করে দেখিয়ে দিতে চাই; আমরা যদি সবার কাছে সহযোগিতা নিয়ে কিছু সংখ্যক বঞ্চিত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে পারি তাহলে তুমি রাষ্ট্র বাঙলাদেশের সকল নাগরিকের পয়সা নিয়ে কি করো ?? তোমাকে তো রাষ্ট্র আমরা সবাই পয়সা দিয়ে থাকি সেগুলো যায় কোথায় ? কোথায় গাফলা যে রাষ্ট্র তুমি কিছু মানুষকে অধিকার উপর অধিকার দিয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছো আর বিশাল সংখ্যক নাগরিকদের অধিকার বঞ্চিত করছো । তাই আমরা সবার কাছ থেকে অর্থ ও শীতবস্ত্র সংগ্রহ করে যথার্থ বিতরণ করে_রাষ্ট্র তোমাকে প্রতিবাদ জানিয়ে দিচ্ছি ।

অবশেষে সবার কাছ থেকে সংগ্রহিত অর্থ দিয়ে যখন শীতবস্ত্র কিনতে বাজারে গেলাম তখন বেশ বড় একটা ধাক্কা খেলাম । যার দোকানে শীতবস্ত্র কিনতে গেলাম তিনি আমাদের উদ্দেশ্য জেনে তার দোকানের সবচেয়ে মোটা ও দামি কম্বল এবং জ্যাকেট বিনামূলে দিয়ে এই প্রতিবাদে শরিক হয়ে গেলেন এবং তিনি খোঁজ দিয়ে দিলেন কোথায় সর্বনিম্ন দামে কম্বল পাওয়া যায় । আমরা সেই ব্যবসায়ির সহযোগিতায় কম্বল ও সোয়েটার কিনলাম । আরো একটা মনে রাখার মতো বিষয়, কিনে আনা কম্বল ও সোয়েটার যে ভ্যানওয়ালা বহন করে এনে দিয়েছিল তিনিও এই উদ্দেশ্যের কথা শুনে তার ভাড়া সর্বনিম্ন কম রেখে প্রতিবাদের সাথে শরিক হয়েছিলেন ।

এর মধ্যে শীতবস্ত্র সংগ্রহ ও ক্রয় করা হলেও বিতরণের স্থান নিধারণ হয়নি । আমরা বরাবরই প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেতে চেয়েছি যেখানে সচরাচর কেউ যায় না কারণ দেখতে চেয়েছি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষগুলো অধিকার হারানোর পদ্ধতি এবং শোষণের মাত্রা_যাতে আমাদের চেতনা দৃঢ়তার সাথে সাথে প্রতিরোধের সংকল্পও তীব্র থেকে তীব্রতর হয় । রাঙ্গুনিয়া ও খাগড়াছড়ি’র পাহাড়ি পল্লীর সাথে যোগাযোগ করতে করতে অবশেষে ১৮ই ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি জেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়নে শীতবস্ত্র বিতরণ নির্ধারণ হলো । পাহাড়ি অঞ্চল নির্ধারনের পেছনে যুক্তি ছিল; পাহাড়ি সংস্কৃতি, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, রাষ্ট্রীয় শোষণ নিপীড়ন ও আচরণগুলো খুব কাছ থেকে দেখা ও প্রকৃত বিষয়গুলো কিছুটা জানার চেষ্টা করা । এর মধ্যে ফটোগ্রাফার হাসান মুরাদ তার ক্যামেরা নিয়ে এই প্রতিবাদে যোগ দিয়ে দিয়েছে । পাহাড়ের মানুষগুলোর প্রকৃত চিত্রগুলো ক্যামেরার চোখ দিয়ে সবাইকে দেখানোর চেষ্টা করা । যার ভেতর হয়ত রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক অনেক কথাই নিশ্চুপে বলে দিবে । সব কিছু তো আর লিখে কিংবা মুখে বলাটা সহজ ও নিরাপদ না ।

জিয়া উদ্দিন শিমুল ভাইয়ের পরিবহন সহযোগিতায় ১৮ই ডিসেম্বর সকাল ৭.২০মিনিটে জামাল খান মোড় থেকে বর্মাছড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম । খোলা পিকআপ এর পিঠে শীতের ঠাণ্ডা ভালোই তলোয়ান চালাচ্ছিল । তবে পাবলিহা ও পূর্বার রান্না করা নুডুলস, টোস্ট এবং আসিফের আনা ওয়েফার বেশ শক্তির যোগান দিয়েছিল । বেলা আনুমানিক নয়টায় বিবিরহাট বাজারে বর্মাছড়ির মেম্বার আমাদের রিসিভ করে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলো বর্মাছড়ির দিকে । বিবিরহাট থেকে ক্রমশ কর্ণফূলি চা বাগানের ভেতর দিয়ে গহীন ও দুর্গম পথে ঢুকে যাচ্ছিলাম । একটা সময় গিয়ে সিএনজি চালিত পিকআপ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বর্মাছড়ি যেতে পারলো না । পিকআপটি সেখানেই রেখে স্থানীয় মেম্বার এর সহযোগিতায় চাঁদের গাড়ি(জিপ) নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করলাম দুর্গম বর্মাছড়ির উদ্দেশ্যে অবশেষে বেলা আনুমানিক সাড়ে এগারোটা নাগদ বর্মাছড়ি উপস্থিত হয়ে গেলাম । কুতুবছড়ি প্রাইমারী স্কুল মাঠে জিপ থেকে সকল শীতবস্ত্র নিয়ে রাখা হলো । উক্ত পাহাড়ি পল্লীর হেড ম্যান এর সাথে কথা হলে_তাকে জানালাম আমরা খুব সামান্য শীতবস্ত্র এনেছি যা দিয়ে একশ বিশটা পরিবারকে কম্বল, সোয়েটার, শার্ট, প্যান্ট, মেয়ে ও বাচ্চাদের কাপড় দিতে পারবো এবং সবচেয়ে প্রবীণ ১৫জনকে এককভাবে সবচেয়ে উষ্ণ জ্যাকেট দিতে পারবো । তিনি আমাদের জানালেন, বর্মাছড়ির নয়টি ওয়ার্ডের ১১জন করে সবচেয়ে দরিদ্র ও বিত্ত-সহায়হীন পরিবারের লিস্ট করছেন এবং বাকী যে শীতবস্ত্রগুলো থাকবে উক্ত পল্লীর দরিদ্র চাকমা ও মারমাদের মাঝে বিতরণ করতে_এই বলে তিনি কিছু সময় চেয়ে নিলেন । লিস্ট তৈরী করার সময়ে আমরা স্কুল মাঠে প্লাস্টিক বিছিয়ে কম্বল, সোয়েটার, জ্যাকেট, শার্ট, প্যান্ট, মেয়ে ও বাচ্চাদের কাপড় স্তুপ করে রাখলাম । রাখার পর একটা চমৎকার ও শিক্ষনীয় দৃশ্য চোখে পড়লো । দেখলাম পাহাড়িরা সবাই বস্ত্র গুলো ধরে ধরে দেখছে_কেউ কেউ আবার নিজের গায়ে হচ্ছে কিনা দেখছে এবং পরস্পর নানা খুনসুটি করছে কিন্তু একটা বস্ত্রও কেউ না বলে নিয়ে যাচ্ছে না কিংবা কাড়াকাড়ি হুড়হুড়ি করছে না । বাঙালিদের মাঝে যদি এমন উন্মুক্ত করে শীতবস্ত্র ফেলে রাখতাম তাহলে এতক্ষণে ঠেলাঠেলি থেকে শুরু করে মারামারি ও লুট হয়ে যেত এবং সেটায় বাধা দিলে আমরাও গণধোলায় খেতাম । বর্মাছড়ির পাহাড়িদের এই আচরণে বিস্মিত হলাম এবং বুঝলাম শহুরে যান্ত্রিক সভ্যতায় মানুষগুলোর মানসিক অবস্থা ও পাহাড়ে বিদুৎহীন পল্লীর এই মানুষগুলোর মানসিক অবস্থা আর মূল্যবোধের ভীষণ পার্থক্য । রীতিমত বাঙালি আচরণে লজ্জাবোধ হচ্ছিল ।

বর্মাছড়ির ৯টি ওয়ার্ডের মেম্বাররা তাদের ওয়ার্ডের সবচেয়ে দরিদ্র ও সহায় সম্বলহীন পরিবারে লিস্ট নিয়ে চলে এলো । আমরা বিতরণে স্থানে দাঁড়িয়ে গেলাম আর মেম্বাররা তার নিজ নিজ ওয়ার্ডের নেতৃত্ব দিয়ে একে একে নামধরে ডাক ছিল আর খুব সুশৃঙ্খলভাবে পরিবারগুলো শীতবস্ত্রগুলো নিয়ে নিয়ে চলে গেল । লিস্টের বাইরে কেউ কোন রূপ টানাটানি কিংবা হুড়াহুড়ি করেনি । আবারও মনে পড়ে গেলো যদি শহরের কোন এলাকায় এমন উন্মুক্তভাবে শীতবস্ত্র বিতরণ করতাম তাহলে জান নিয়ে আর বাড়ি ফেরা হতো না এবং উল্লেখযোগ্য বিষয় বিতরণের মূলে ছিলো মেয়েরা রীতিমত আক্রান্ত হয়ে যেতে । একে একে এক নাম্বার ওয়ার্ড শেষ করে নয় নাম্বার ওয়ার্ডের পরিবারগুলোর মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ শেষ করে লিষ্টের বাইরে অবস্থারত পল্লীর সহায় সম্বলহীন মানুষগুলো মাঝে অবশিষ্ট বস্ত্র ও কম্বলগুলো বিতরণ করলাম । এখানেও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল; পাহাড়ি মানুষগুলো শুধু হাত বাড়িয়ে ছিল কেউ আমাদের হাত থেকে কিংবা উন্মুক্ত রাখা বস্ত্রগুলো টান দিয়ে নিয়ে যায়নি ! কি অবাক ব্যাপার_কি চমৎকার তাদের আচরণ কতটা সভ্য হলে তারা এমন আচরণ করতে পারে । অনেক গুলো বাড়িয়ে দেওয়া হাতের মধ্যে অল্প কয়েকটি হাতকেই শীতবস্ত্র দিতে পেরেছি আর বাকিরা না পেয়ে কোন রূপ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে চমৎকারভাবে সুশৃঙ্খলভাবে চলে গেল । সম্পূর্ণ শীতবস্ত্র বিতরণে কেউ কোন বিশৃংখলা করেনি এবং বিতরণের সময়টা ছিল দিন ও জনসম্মুখে । সভ্য শহুরে এলাকা হলে আরো একবার নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে কেঁপে উঠলাম । বিতরণের শুরুতে ইউএনডিপি’র একটা মেডিকেল প্রজেক্টের লোকজন আমাদের সাথে দেখা করতে আসলো । তাদের জানতে চাওয়া ছিল; আমরা কারা ? কিভাবে আমাদের অর্থায়ন হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি । আমাদের অর্থায়ন যখন সাধারণ আমজনতা_এই কথা জানার পর তাদের মেডিকেল টিমের লিডার পাল্টা মন্তব্যে বলেছিল; “আমাদের গ্লোবাল ফাণ্ড” । কথাটা মনের ভেতর বেশ বেজেছিল আমার ব্যাক্তিগতভাবে ।

শীতবস্ত্র বিতরণ শেষে পল্লীর হেড ম্যান বিশ্রাম নিতে বললো এবং কিছু খাবার খেতে অনুরোধ জানালো। আমরা বিশ্রাম করতে করতে ওনারা কচি ডাবের পানি এবং গরম গরম গরুর দুধ নিয়ে আসলো । সেই খাবারগুলো খেতে খেতে কথা হচ্ছিল আর কথায় কথায় জানতে পারলাম ডাবগুলো আনা হয়েছে প্রায় পাচ মাইল দুরে অন্য পল্লী থেকে । তাদের আত্মীয়তা এবং আন্তরিকতায় আরেকবার মুগ্ধ হলাম । প্রায় বিশ থেকে পঁচিশটা ডাব কত না কষ্ট করে তারা বহন করে এনেছে । এরপর নিকটবর্তী মারমা পল্লী ঘুরে দেখতে বের হলাম । মারমা পল্লী যেতে যেতে খেয়াল করলাম আশে পাশে সত্যিই কোন নারিকেল গাছ নেই । আরো একবার পাহাড়িদের আন্তরিকতায় বিনম্র শ্রদ্ধাবোধ জাগলো । মারমা পল্লীতে ঢুকার পথে দেখলাম পাহাড়ি চড়াতে একজন নারী গোসল করছে এবং কয়েকজন পানি সংগ্রহ করছে । একটা বিষয় খেয়াল করলাম; কর্ণফুলি চা বাগানে বিদুৎ সুবিধা থাকলেও চা বাগান সীমানার পাঁচ ছয় মাইল দুরত্বে পাহাড়ি পল্লীগুলোতে বিদুৎ সুবিধা দিতে পারতো রাষ্ট্র তাহলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অন্তত সৌর বিদুৎ নিয়ে এনজিও ও ব্যবসায়িদের সুযোগসন্ধানী ব্যবসা বন্ধ হতো । মারমা পল্লীতে প্রায় ২০টির মতো পরিবার বাস করে যাদের বেশীরভাগই কৃষিকাজের সাথে জড়িত এবং অল্প কয়েকটি বাড়ি ব্যতিত সবার খড়ের ছাউনি ও মাটির তৈরী ঘরে বাস করে । কোথাও কোন পাকা বাড়ি দেখিনি এবং ঘরের ভেতর খুব বেশী আসবাবপত্রও তেমন নজরে পড়েনি যাকে বলে একদম মাটির সান্নিধ্যে বসবাস । বিষয়টা আমার ব্যাক্তিগতভাবে খুব মনে লাগলো কারণ মাটির সাথে সরাসরি বাস করে বলে ওদের আচরণ ও স্বভাব মাটির মতো_যেটা শহুরে ও সভ্য সমাজে তেমন একটা দেখা যায় না । যাকে বলে প্রকৃতির মতো শুদ্ধ আচরণ ও অনুভূতি । মারমা পল্লীতে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়লো নারী ও পুরুষ সমানে তাদের নিজেদের তৈরী হুক্কায় তামাক খাচ্ছে_আমিও সেই হুক্কায় তামাকের স্বাদ নিয়ে বুঝলাম চরম কড়া একদম মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে । অথচ সভ্য সমাজে নারীরা পুরুষের সাথে পল্লা না দিয়ে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিড়ি সিগারেট খেলে_সমাজ গেল গেল বলে হৈ হৈ রৈ রৈ রব ওঠিয়ে নৈতিকতা বিসর্জন হয়ে গেলো বলে নানা রকম সমালোচনার জন্ম দেয় । এখানটায় এসে হুমায়ুন আজাদ এর “নারী” বইটাকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা উচিত বলে হয় । তাহলে অন্তত নারীবাদ নামক নতুন ব্যবসার প্রসার কিছুটা কমে আসতো । মারমা পল্লীতে ঘুরতে ঘুরতে এবং শীতবস্ত্র বিতরণে একটা বিষয় খেয়াল করলাম পাহাড়ি নারীদের পোশাক যথেষ্ট বিনম্র উদার তার মানে পাহাড়ে নারী ও পুরুষ সম্পর্ক কতটা মানবিক এবং মনুষ্যত্ববোধ সম্পন্ন যার ফলে নারীরা এতোটা স্বাধীন চলাফেরা করার অধিকার রাখে । যদি সভ্য শিক্ষিত শহুরে সমাজে এমন বিনম্র উদার পোশাকে কোন নারী চলাফেরা করতো বাঙালি পুরুষের ধর্ষণ থেকে ফতোয়ায় দোরা মেরে সেই নারীকে নিচ্ছিন্ন করে দিতো । পাহাড়িরা কতটা মানবিক এবং মর্যাদা সম্পন্ন মানুষ্য সম্পর্ক গড়ে তুলেছে তাদের নারী ও পুরুষদের মাঝে । সেটা কি সভ্য বাঙালি পাড়ায় সম্ভব ? আমরা কোন পার্থক্য কিংবা বৈষম্য করার জন্য বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছি না_শুধু মাত্র মানবিক দিকগুলোকে অনুধাবন করার চেষ্টা করছি ।

মারমা পল্লী ঘুরে এসে কুতুবছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আরো একবার খাওয়া দাওয়া পর্ব করতে করতে দেখা হয়ে গেলো কুতুবছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের সাথে । তার কাছ থেকে জানতে পারলাম ১৯৮৫ সাল থেকে পল্লীর সবার সহযোগিতায় এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা একশ বিশ জন এবং নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা সত্তুর জন্য । প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি সরকারী করার কথা চলছে । শিক্ষার্থীদের বই খাতা এবং শিক্ষকদের বেতন পল্লীর সবার সহযোগিতায় করা হয় । আশা রাখি রাষ্ট্র খুব শীঘ্রই প্রাথমিক এবং নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে সরকারী করে শিক্ষার সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করবে নয়ত কোন এনজিও বা ফাউন্ডেশন এই সুযোগে ঢুকে গিয়ে দিব্যি ধান্ধার নতুন ক্ষেত্র পেয়ে যাবে ।

বিকাল চারটায় আমরা শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম এবং চলে যাওয়ার সময় আন্তরিকতার সরুপ পাহাড়ি আলু উপহার দিলো । অন্ধকার হওয়ার আগেই পাহাড়কে পেছনে রেখে চা বাগান অতিক্রম করতে করতে সভ্য শহুরে সমাজে ফিরে আসতে লাগলাম । সরাসরি ফলাফল কি হলো আমরা কেউ জানি না কিংবা কতটুকু প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হলো তাও জানি না তবে এতটুকু জেনে গেছি অধিকার কেউ কাউকে দিবে না_না কোন মানবাধিকার সংস্থা না কোন এনজিও কিংবা আন্তজার্তিক সংস্থাগুলো । আমাদের অধিকার রাষ্ট্র থেকে আমাদের নিজেদেরই আদায় করে নিতে হবে এটাই শুধু চেতনায় চুপটি করে বসে গেলো ।

বাড়তি কিছু কথা : এই প্রতিবাদে সবাই আমাদের ব্যানার বা নাম জানতে চেয়েছে । কিন্তু আমরা কোন নাম জানাতে পারিনি বারবারই বলেছি কর্মই আমাদের নাম ঠিক করে দিবে । হয়ত সামনের আরো কর্ম আমাদের নাম কিংবা ব্যানার ঠিক করে দিবে । এই যাত্রায় জাতীয় পতাকাই ব্যানার ছিল । আর কিছু মানুষের কাছে আমরা কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই; প্রথমত যারা শীতবস্ত্র ও অর্থ সংগ্রহে সরাসরি অর্থ ও বস্ত্র দিয়েছেন তাদেরকে, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ি মহসিন ভাইকে, আমীর আব্বাস দা, লেনিন, দুলাল, ছোটন, মারবা, অলোকেশ দা, পল্লীর সকল মেম্বার ও চেয়ারম্যান সাহেবকে, অর্জুনদা, পিক আপ ও চাঁদের গাড়ির ড্রাইভার, শাকিল এবং পল্লীর সকল নাগরিকদের । আমরা যখনই কাজ করেছি তখন অনেকে তাদের ব্যানার ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করতে বলেছিল_আমরা তা করিনি । কেউ কেউ আবার পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলে কার্যক্রমের প্রতিবেদন করিয়ে দিবে বলে আকডুম বাকডুম বহু কিছু বলেছিল_আমরা কোন কিছুই ধার ধারিনি : কাজ করে গেছি স্বাধীনভাবে আমাদের মতো করেই । শীতবস্ত্র বিতরণ শেষে কেউ কেউ আবার প্রেস রিলিজের কথা বলেছিল সেই দিকেও যাইনি । আমরা শুধু বুঝি তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া_তথ্য শেয়ার করা আমাদের মতো করে আমাদের ভাষায় । যাবতীয় তাত্ত্বিক বিবেচনা ও ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি দেখবেন আশা রাখি । এবং আমাদের প্রতিবাদের ভাষা আমাদের মতোই সাধারণ তাই সুশীল বাক্য বিন্যাস পরিহার করে একটা অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে করতে কিছু কথা নিরাপদ ভঙ্গিমায় শেয়ার করে গেলাম । কেউ বুঝলে মন্দ না আবার না বুঝলেও মন্দ না ।

যেভাবে আমরা শুরু করেছিলাম :
বাঙলাদেশে শীত এসে পড়লো । অনেকেই এই শীতকে উপভোগ করবে রাঙ্গামাটি, বান্দরবন কিংবা কক্সবাজার ভ্রমণ করে আবার কেউ কেউ রাত বিরাতে বার-বি-কিউ করবে ছাদে-মাঠে কিংবা প্রান্তরে । তীব্র এই শীতে মা তার সন্তানকে উষ্ণতায় জড়িয়ে ধরে ওম দিবে কিংবা স্ত্রী তার স্বামীকে উষ্ণ চাদরে জড়িয়ে কাপুনির তীব্রতা বুঝতে দিবে না । যারা ভালো আছে তাদের জন্য শীত মানে নতুন কিছু নয় ঋতুর পরিবর্তন মাত্র কিংবা বিনোদন ও উৎসব পর্ব । কিন্তু বাঙলাদেশের যারা ভালো থাকে না তাদের জন্য ঋতুর এই পরিবর্তন শীত হচ্ছে ঠাণ্ডার সাথে যুদ্ধ করা । যাদের কাছে ক্ষুধা নিবারণের জন্য খাদ্য জোগাড় করাই মূল বেঁচে থাকা সেখানে শীত থেকে বাঁচার কোন অস্ত্র তাদের নেই । তাই বাঙলাদেশের সেই সব দরিদ্র, নিঃস্ব মানুষগুলো শীতে শারীরিক কষ্ট পায়- যা আমরা দেখি পথে চলতে, টিভির পর্দায় কিংবা পত্রিকায় । বাঙলাদেশের নিঃস্ব এই মানুষগুলোর কষ্ট শুধু দেখলে আর জানলেই হবে ? তাদের পাশে কি দাঁড়াবো না ? অবশ্যই দাঁড়াবো আমরা সবাই মানুষ । পশু পাখির দুঃখ কষ্ট যদি মানুষকে কাঁদায় তাহলে বাঙলাদেশের এই সব নিঃস্ব মানুষগুলোর দুঃখ কষ্ট আমাদের শুধু কাঁদবে না বরং জাগাবে, চেতনার দুয়ার খুলে দিবে । যদিও এই নিঃস্ব মানুষগুলো বাঙলাদেশেরই নাগরিক । বাঙলাদেশ নামক রাষ্ট্র এইসব নিঃস্ব মানুষগুলোকে শীত থেকে বাঁচানোর দায়িত্ব নেওয়ার কথা । কিন্তু বাঙলাদেশ রাষ্ট্র সে দায়িত্ব নেয় না । বরং এই নিঃস্ব মানুষগুলো দুঃখ কষ্টকে পুঁজি করে এনজিওসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী ফাউন্ডেশন তাদের জীবিকার বাহন হিসেবে নিয়েছে । আমারও কি তাই করবো না ? কখনও না । আমরা নবীন প্রজন্ম আমাদের ভেতর আছে উদ্যম, আছে সৎ সাহস আমরা কোন কিছুর ধার ধারি না মানুষের জন্য কাজ করতে । এবার শীতে যেসব নিঃস্ব মানুষ ঠাণ্ডায় কষ্ট পাবে তাদের পাশে আমরা সাধ্যমত পাশে থাকবো, আমাদের মানবিক উষ্ণ দিয়ে ওদের বাঁচিয়ে রাখবো এটা দেখার জন্য :- একদিন বাঙলাদেশ রাষ্ট্র তার সকল নাগরিক’কে শীতের ঠাণ্ডা থেকে রক্ষ করছে, কোথাও কেউ মানবিক আবেদন করছে না “আপনারা শীতার্তদের পাশে দাঁড়ান” ।

আমাদের এই সামান্য শীতার্তদের পাশে দাঁড়ানোর আবেদনে কি দেশ উদ্ধার হয়ে যাবে নাকি সকল শীতার্তদের শীতের কষ্ট আমরা দুর করে দিবো ? নাকি আমরা কোন এনজিও বা ফাউন্ডেশন শীতার্ত মানুষগুলোর কষ্ট ও দুঃখকে পুঁজি করে পয়সা বানাবো ? না কখনও না । আমাদের মূল উদ্দেশ্য আমাদের সামান্য মানবিক প্রচেষ্টার দেখাদেখি অন্যরাও এগিয়ে আসবে মানবিক কাজে আর বাঙলাদেশের সবাই যদি এভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ায় তাহলে একদিন দেখা যাবে বাঙলাদেশের দুঃখী মানুষগুলো একা না, সবাই এক সাথে সুখী হচ্ছে আর সবাই এক সাথে দুঃখকে দুর করছে আর এভাবে সবাই এক নিজেদের অধিকার আদায়ে । এবং সাথে বাঙলাদেশ রাষ্ট্রকে জানিয়ে রাখা : হে বাঙলাদেশ রাষ্ট্র বাঙলাদেশের সকল নাগরিক তোমাকে অর্থ দেয় অথচ তুমি তোমার নাগরিক এর দায় দায়িত্ব নিতে পারো না, তাদের সকলকে শীত থেকে বাঁচাতে পারো না ।

তাই আসুন আমরা এই শীতে শীতার্ত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াই । পারি আর না পারি অন্তত চেষ্টা করি ।

বি : দ্র: এটা কোন এনজিও কিংবা ফাউন্ডেশন কতৃক পরিচালিত কার্যক্রম নয় সম্পূর্ণ ভাই ব্রাদার সিস্টারদের ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো কার্যক্রম ।