ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

লজিস্টিক সাপোর্ট

রাষ্ট্রের তিনটা বিভাগের স্থলে অন্যতম চতুর্থ বিভাগ হিসেব লজিস্টিক সাপোর্ট বিভাগ গঠন করা আবশ্যক।

সমাজবদ্ধ জীবনযাপনের কারণে কিছু সেবা বা সামাজিক চাহিদা একক বা ব্যক্তি উদ্যোগে পূরণ করা সম্ভব নয় এবং যা পূরণ করতে সামাজিক সংগঠন ও রাষ্ট্রের প্রয়োজন হয়। তাই রাষ্ট্র সেবামূলক সামাজিক সংগঠন। রাষ্ট্র সেবাদান করবে এবং জনগণ সেবা গ্রহন করবে; এটাই রাষ্ট্র ও জনগণের মাঝের মৌলিক সম্পর্ক।

এজন্য রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যয়ভার জনগণের।

সুতরাং রাষ্ট্র দ্বারা যে সকল সেবা মানুষ পেতে চাইবে সে সকল সেবা প্রদানের ব্যবস্থা রাষ্ট্রে সংস্থাপন করা ও তার ব্যয় বহন করা জনগণের দায়িত্ব। সেই ব্যয় জনগণ প্রদত্ত কর বা রাজস্ব হতে, জনগণের অনুমোদিত এবং জনগণের প্রণীত আইন অনুযায়ী হবে।
রাষ্ট্রীয় সেবাকর্ম করতে লজিস্টিক সাপোর্ট হিসেবে প্রয়োজন হয় জনবল, অর্থ-সম্পদ, অবকাঠামো ইত্যাদি। সাধারণত: জনবল সরবরাহ করা হয় নির্বাচন কমিশন (জনপ্রতিনিধি) ও কর্ম কমিশন (বেতনভোগী সরকারী কর্মচারী) এবং সরকারী কাজে নিয়োগ প্রদানের মাধ্যমে। অর্থ-সম্পদ সংগ্রহ করা হয় জনগণের কাছ হতে কর, রাজস্ব ইত্যাদি আদায় যা জাতীয় সংসদে অনুমোদিত বাজেট বরাদ্ধ অনুসারে অর্থ-সম্পদ ব্যবহার বা ব্যয় করা হয়।

এই ব্যয় ( জনবল ও অর্থ-সম্পদ) যারা ব্যয় করেন ( রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগ সমূহ) তাদের কর্তৃত্ব নির্ধারণ ও অনুমোদিত হওয়া বিধিসম্মত হতে পারে না।

এটা নিরপেক্ষভাবে জনগণের প্রতিনিধিত্বে রাষ্ট্রের আর একটি স্বাধীন বিভাগ কর্তৃক নির্ধারণ ও অনুমোদন হওয়া বিধিসম্মত। অতএব রাষ্ট্রের চারটি বিভাগ পরস্পর স্বাধীন হলে সোসিও-পলিটিক্যাল ক্ষমতা এবং সোসিও-ইকোনমিক ক্ষমতার বিভাজন নিশ্চিত হবে। প্রচলিত নির্বাচন কমিশন, কর্ম কমিশন, অর্থ কমিশন( কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অডিট বিভাগ ইত্যাদি) নির্বাহী বিভাগের কোন মন্ত্রণালয়ের অধীন না হয়ে লজিস্টিক সাপোর্ট বিভাগ হিসেবে রাষ্ট্রপতির অধীন গঠন করতে হবে।

রাষ্ট্রের ৪টা বিভাগের ২টা অর্থাৎ আইন প্রণয়ন (সংসদ) ও নির্বাহী বিভাগ জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার পদ্ধতি বর্তমান সমাজে স্বীকৃত।

কিন্তু বিচার ও বিধিবদ্ধ কমিশন সমূহ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার পদ্ধতি আজও সমাজে স্বীকৃত নয়।

দল ও মতের নিরপেক্ষতা বজায় রেখে রাষ্ট্রের কর্মকান্ড পরিচালনার ধারণা থেকে জনগণের প্রতিনিধিত্ব এড়িয়ে বিচার ও বিধিবদ্ধ কমিশন গঠন ও পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়। রাষ্ট্র দলও মত নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সকল জনগণের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আধুনিক রাষ্ট্রে বহু দলমত ও ধর্মের লোকের বসবাস অবধারিত।

কিন্তু রাষ্ট্র হবে সকল জনগণের প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রয়োগ হবে সকলের প্রতি নিরপেক্ষ নীতিতে।

তবে এই নিরপেক্ষতার নীতি বজায় রাখতে গিয়ে জনগণের সার্বভৌমত্বকে আমলাতন্ত্রের অধীন করা সমীচীন নয়। বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন বিধিবদ্ধ কমিশন এবং সংসদীয় কমিটি, ন্যায়পাল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক প্রভৃতি সাংবিধানিক পদ আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সৃষ্টি করে যার ন্যায়পরায়ণতা, ব্যক্তির সততা ও চরিত্র নির্ভর হয়।

কারণ জনগণের কাছে জবাবদিহিতার কোন ব্যবস্থা এইসব পদ বা ব্যবস্থার বেলায় থাকে না।

কিন্তু জনগণের নিকট জবাবদিহিতা বিহীন রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের কোন সংস্থা ঐশী বা প্রভু তন্ত্রের সৃষ্টি করে। সুতরাং রাষ্ট্রীয় কর্মে প্রয়োজনীয় জনবল, অর্থ-সম্পদ সহ অন্য যে কোন সংস্থা অথবা ব্যবস্থা জনগণের বা জনগণের প্রতিনিধিদের অধীনে গঠিত ও পরিচালিত হওয়া আবশ্যক এবং জনগণকে সেবার নিশ্চয়তা দিতে স্থানীয় পর্যায়ে বিকেন্দ্রায়ন করা প্রয়োজন।

জীবন যাপনের সকল কর্মকান্ডে অর্থ-সম্পদের প্রয়োজনীয়তা বিদ্যমান এবং সম্পদের উপর শ্রম দানের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ হয়। এজন্য রাষ্ট্রের অর্থ-সম্পদ ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানে অনুচ্ছেদ ১৩,১৪,১৫,১৬ তে বিধান দেয়া হয়েছে যা অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

এই চেতনা বাস্তবায়নে অর্থ-ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হবে জনগণের কর্মসংস্থান।

বাংলাদেশের সনাতনি পেশাজীবি গণ আধুনিক প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থার কাছে পরাজিত হয়ে বেকারে পরিণত হচ্ছে। তাদের কর্মসংস্থানের জন্য শিল্পায়ন প্রয়োজন যা হতে হবে শ্রমঘন; পুঁজিঘন নয়

সুতরাং পেশাভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমবায়ের মাধ্যমে পুজি সঞ্চয় করে শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হবে। এই লক্ষ্যে জাতীয় অর্থ-ব্যবস্থাকে কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠিত করতে হবে। স্থানীয় অর্থব্যবস্থা গড়ে তুলতে গ্রামবাংলার প্রতি ইউনিয়নে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ তহবিল গঠন করতে হবে।

এই তহবিলের ৬০% হবে ইউনিয়নবাসীর নিজস্ব সঞ্চয়; ২০% সঞ্চয় হবে ব্যাংক, বীমা, ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিনিয়োগ হবে ২০%। এই তহবিলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের ৬০% হবে ইউনিয়নের সঞ্চয়কারীদের নির্বাচিত প্রতিনিধি; ২০% হবে বিনিয়োগকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য এবং ২০% হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়োজিত সদস্য।

এই অর্থ ইউনিয়নবাসীর কর্মসংস্থান মূলক প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হবে এবং কোন নির্বাহী ব্যয় এই তহবিল থেকে করা যাবে না।

একই পদ্ধতিতে উপজেলা, জেলা, পৌর, সিটি করপোরেশনে স্থানীয় সঞ্চয় তহবিল গড়ে তুলতে হবে।

সাধারণভাবে ইউনিয়ন তহবিল ৫ কোটি; উপজেলা ও পৌর তহবিল ১০ কোটি; জেলা তহবিল ২০ কোটি এবং সিটি তহবিল ৫০ কোটি টাকা নিয়ে শুরু করা যেতে পারে।

সঞ্চয় ও বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থের পরিমাণের শেয়ার অনুসারে লাভ পাবে। জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে নির্দিষ্ট করে বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরী করতে হবে। জাতীয় বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা জাতীয় সংসদে অনুমোদিত হবে এবং স্থানীয় বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সংসদে অনুমোদিত হবে। স্থানীয় জনগণের চাহিদা পূরণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে স্থানীয় বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা হবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

অতএব মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাষ্ট্র হবে আইন প্রণয়ন (সংসদ) ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ(নির্বাহী) ব্যবস্থা, আইন ভঙ্গের প্রতিকার (বিচার) ব্যবস্থা এবং লজিস্টিক সাপোর্ট বিভাগ সমন্বয়ে।

এই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ( সার্বভৌম ক্ষমতা ও সার্বভৌম মালিকানা) জনগণের এবং রাষ্ট্র পরিচালিত হবে জনগণের কর্তৃত্বে ও অংশ গ্রহণে।

জনগণের নির্ধারিত চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ক্ষমতা ও রিসোর্স যা জনগণ রাষ্ট্রকে প্রদান করবে সেটাই রাষ্ট্র ব্যবহার করবে।

প্রাচীন প্রভুতন্ত্র, রাজতন্ত্র, কলোনীয়তন্ত্র প্রভৃতির রাষ্ট্র ক্ষমতা এবং রাষ্ট্র মালিকানার ধারণা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাষ্ট্রের ধারণার বিপরীত। প্রভুতন্ত্র, রাজতন্ত্র প্রভৃতি রাষ্ট্র ছিল শাসনকারীদের ভোগবিলাসের জন্য।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাষ্ট্র হলো জনগণের চাহিদা পূরণের জন্য। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সর্বময় ক্ষমতা ও সর্বময় মালিকানা জনগণের এবং জনগণের পক্ষে রাষ্ট্র জনগণ প্রদত্ত সেই ক্ষমতা ও মালিকানা ব্যবস্থাপনা করার অধিকারী হয়। এজন্য রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা জনগণের কাছে।

জাতীয় সংসদের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সমস্যা হলো—জাতীয় সংসদে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পদ্ধতিতে। কিন্তু রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের সংস্থা, পদ বা প্রতিষ্ঠান জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, শ্রেণী-পেশা,দলমত নির্বিশেষে সকল জনগণের এবং জাতীয় সংসদসহ এ সকল প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা দলীয় না হয়ে জনগণের কাছে হওয়া অত্যাবশ্যক। তা না হলে রাষ্ট্র শান্তিপূর্ণ ও সকল মানুষের বাসযোগ্য হয় না। সুতরাং

রাষ্ট্র প্রধান (অনু:৫২), সরকার প্রধান (অনু: ৫৭(২), প্রধান বিচারপতি ও বিচারকগণ (অনু:৯৬), নির্বাচন কমিশন( অনু: ১১৮(৫),কর্ম কমিশন (অনু: ১৩৯(২), মহাহিসাব নিরীক্ষক (অনু: ১২৯(২) প্রভৃতিগণের জবাবদিহিতা জাতীয় সংসদের বদলে গণ সংসদের মাধ্যমে হওয়া আবশ্যক; প্রয়োজনে গণভোটের ব্যবস্থা হতে পারে।

মানব সমাজে ক্ষমতার ব্যবহার ও মালিকানা ভোগের দুইটা ধারা দেখা যায়

(১) একচ্ছত্র অধিপতি ধারা

আদিম যুগে দলপতি, গোষ্ঠীপতি; বর্বর যুগে নিষ্ঠুর রাজারা; প্রাচীন সভ্যতার (মিশর, মায়া, ইনকা, গ্রীক, মহাভারত, রোম, চায়না) প্রভু তান্ত্রিক সমাজের প্রভুরা; অদৃশ্য মহাপ্রভু ভিত্তিক ( ঈশ্বর, দেবদেবী, ভগবান, আল্লাহ, সৃষ্টিকর্তা) ধর্মগ্রন্থে (বেদ, বাইবেল, কুরাণ, ত্রিপিটক প্রভৃতি) প্রদত্ত আদেশ নির্দেশ; একনায়কতন্ত্রে এক ব্যক্তির বা গুটিকয়েক ব্যক্তির একচ্ছত্র কতৃত্বে ক্ষমতা ব্যবহৃত হয়।। এই সমাজে ও রাষ্ট্রে বিধিবিধান, আইন প্রণয়ন একচ্ছত্র ক্ষমতাধারী দ্বারা করা হয়; যাদের উপর আইন নীতি, নির্দেশ, হুকুম প্রয়োগ করা হয় তাদের ইচ্ছা বা মতামতের অধিকার থাকে না।

(২) শাসিতের মতামত দানের ধারা

যাদের উপর আইন, ক্ষমতা বা মালিকানা নীতি প্রয়োগ করা হয় তাদের সম্মতি দেয়ার অধিকার থাকে। যেমনঃ

(ক) আদিম যুগে গোত্রপতির গোত্রের সদস্যদের মতামত নেয়া( ট্রাইবাল ল’); গ্রীসের নগর রাষ্ট্রে নাগরিকদের সমর্থনে শাসনকর্তা নির্বাচন; রোমের পার্লামেন্টে অভিজাতদের দ্বারা আইন প্রণয়ন; রাজা গোপালের নির্বাচন; আরবে মদিনা সনদ; ব্রিটেনে ম্যাগনাকার্টা প্রভৃতি সীমিত আকারে শাসিতদের থেকে ক্ষমতার অনুমোদন নেয়ার উদাহরণ।

(খ) অত:পর আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৭৭৬খৃ) এবং গণতান্ত্রিক সরকারের ঘোষণায় বলা হয় “ গভ:মেন্ট অব দি পিপল, বাই দি পিপল এন্ড ফর দি পিপল; ফরাসী বিপ্লবে (১৭৮৯ খৃ:) রাজা ও অভিজাতদের বদলে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্র ক্ষমতা ও সম্পদের মালিকানার অধিকার ঘোষণা এবং সাম্য,মৈত্র, স্বাধীনতার ( বুর্জোয়া গণতন্ত্র) বাণী ঘোষণা করা হয়; রাশিয়া বিপ্লবে ( ১৯১৭ খৃ) রাজতন্ত্রের উৎখাত করে ঘোষণা করা হয় “ অল পাওয়ার টু দি সোভিয়েট” এবং বাংলাদেশে সামরিকতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র ও আমলাতন্ত্র অবসানের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ঘোষণা করা হয় “ প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ” অনু: ৭; “ প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহন নিশ্চিত হইবে” অনু:১১।

আজকের সমাজে গণতন্ত্রকে প্রত্যক্ষ এবং জনগণের অংশ গ্রহন মূলক করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচলন করা হচ্ছে

যেমন ভারতে পঞ্চায়েত পদ্ধতি;ইংল্যান্ডে লোকাল গভ:মেন্টের কাছে অধিকতর দায়িত্ব ও ক্ষমতা অর্পন; আমেরিকায় লোকাল গভ:মেন্ট পরিচালনায় নির্বাচিত কর্মকর্তাদের নিয়োগ; সুইজার ল্যান্ডে জনগণের ক্ষমতায়নে ক্যান্টন ও কমিউনকে স্বায়ত্তশাসন দেয়া ইত্যাদি।

বিশেষ করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন ও স্থানীয় চাহিদাসমূহ পূরণে নিজস্ব নিয়মনীতি ও আইন প্রণয়ণের অধিকার দিয়ে কমিউনকে স্বাবলম্ভী ইউনিট হিসেবে কাজ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সুতরাং আধুনিক রাষ্ট্রীয় ধারণায় জনগণের সার্বভৌমত্বকে এবং রাষ্ট্রপরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহনকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।

জনগণের সার্বভৌমত্ব তথা সার্বভৌম সোসিও-পলিটিক্যাল এবং সোসিও-ইকোনমিক ক্ষমতা রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবহার করতে হলে তিনটা মৌলিক নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন—–

(১) ক্ষমতার বিভাজন ও বিকেন্দ্রায়ন অর্থাৎ সংসদ, নির্বাহী, বিচার ও লজিস্টিক সাপোর্ট বিভাগের মাঝে ক্ষমতার বন্টন বা বিভাজন করতে হবে যাতে বিভাগগুলো পরস্পর স্বাধীনভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়নের জন্য উক্ত বিভাগ সমূহ জনগণ স্তরে(ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা) বিন্যাস করতে হবে।

(২) জনগণের অংশ গ্রহণে ও কর্তৃত্বে ক্ষমতার ব্যবহার করতে বিভাগ সমূহের সর্বস্তরে জনগণের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে।

(৩) রাষ্ট্রের বিভাগ সমূহের জবাবদিহিতা জনগণের কাছে থাকতে হবে যা জাতীয় সংসদ,গণসংসদ বা গণভোটের মাধ্যমে করা যায়।

প্রতিনিধিত্বের এবং প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যবহারের মৌলিক শর্ত দুটো

(ক) মালিকের প্রদত্ত ক্ষমতা মালিক প্রণীত (প্রতিনিধি প্রণীত নয়) আইন অনুসারে ব্যবহার করা;

(খ) মালিকের কাছে জবাবদিহিতা করা। সংসদ সদস্যদের জবাবদিহিতা ধরা হয় ৫ বৎসর বা একটা মেয়াদের পর নির্বাচনে ভোটারদের সমর্থন চাওয়া।

কিন্তু মেয়াদের কালে ক্ষমতা ব্যবহারে তারা সার্বভৌম। নির্বাচনে পরাজিত হলে তাকে জবাবদিহিতা করা হলো ধরে নেয়া নিতান্তই শিশু ভোলানো খেলা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।

সংসদ সদস্যদের অবাধ ক্ষমতার ব্যবহার ও রিয়েল-টাইম জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না থাকায় রাজনীতিতে লাগামহীন দুর্নীতি চলছে এবং দুর্নীতি না করা ব্যক্তির সদিচ্ছা নির্ভর হয়ে দাড়িয়েছে।

প্রচলিত পদ্ধতিতে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা সংসদ (স্থায়ী কমিটি ব্যবস্থা) এবং বিচার বিভাগের ( কোর্টের মাধ্যমে) কাছে। সরকারের জবাবদিহিতার জন্য অনুচ্ছেদ ৫৭(২)

সংসদের সংখ্যাগিরষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারাইলে প্রধান মন্ত্রী পদত্যাগ করিবেন কিংবা সংসদ ভাঙ্গিয়া দিবার জন্য রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শদান করিবেন..

যার কার্যকারিতা অকেজো হয়ে গেছে অনুচ্ছেদ ৭০ এর ফলে।

কোন সদস্য সংসদে নিজ দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে; এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন না করা বা অনাস্থা আনা কখন সম্ভব না।

রাষ্ট্রপতির জবাবদিহিতা অনুচ্ছেদ ৫২ তে ( রাষ্ট্রপতির অভিশংসন) থাকলে ও যেহেতু রাষ্ট্রপতি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ভোটে নির্বাচিত; সেহেতু অনুচ্ছেদ ৭০ অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপন অসম্ভব করে দিয়েছে।

বিচার বিভাগের জবাবদিহিতার ব্যবস্থা অনুচ্ছেদ ৯৬(২) ( বিচারকদের পদের মেয়াদ)

প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অনূন্য দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাব ক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোন বিচারককে অপসারিত করা যাইবে না

বিচারকগণ যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত; সেহেতু তাদের বিরুদ্ধে সংসদে ব্যবস্থা গ্রহন ৭০ বিধির শর্তে অসম্ভব হয়ে যায়।

সংসদ, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ সমূহের জনগণের কাছে জবাবদিহিতার সুনির্দিষ্ট কোন ব্যবস্থা বা বিধি সংবিধানে না থাকায় ঈশ্বর ও বিবেকের কাছে জবাবদিহিতার কথা বলা হয়। অথচ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব জনগণের এবং প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মচারীর জবাবদিহিতা জনগণের কাছে করা বিধিসম্মত; এবং সেটাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

জবাবদিহিতার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় থাকা অত্যাবশ্যক; তা না হলে রাষ্ট্র স্বৈরাচারী হয়ে যায়।

জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা সুনির্দিষ্ট প্রয়োগ পদ্ধতিতে বাস্তবায়িত না হলে তার কোন কার্যকারিতা থাকে না।

বিচার বিভাগের দায়বদ্ধতা হিসেবে বিচারপতিদের জবাবদিহিতা সংসদের কাছে অনু: ৯৬(২); বিচার বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে দায়বদ্ধতা;নির্বাহী বিভাগের দায়বদ্ধতা হিসেবে রাষ্ট্রপতির অভিশংসন অনু: ৫২ এর দ্বারা সংসদের কাছে এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়বদ্ধতা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনু: ৫৭ এর মাধ্যমে রাখা হয়েছে। আর সংসদের দায়বদ্ধতা নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছে যা সাধারণত: মেয়াদ শেষে কার্যকরী করার সুযোগ আসে।

কিন্তু মেয়াদান্তে নির্বাচনের মাধ্যমে জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের প্রচেষ্টা নিতান্তই অকেজো; এ ঠিক অপরাধীকে বিনাবিচারে ছেড়ে দেয়ার মত। আর যে সংসদ এভাবে ছাড়া পায় তার কাছে দেয়া হয়েছে নির্বাহী ও বিচার বিভাগের দায়বদ্ধতা এবং জবাবদিহিতার দায়িত্ব!

তাছাড়া এভাবে অতি-পরোক্ষভাবে জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার বিলাসী স্বপ্ন দেখার কারণে রাষ্ট্র ব্যবস্থা গণবিরোধী হয়ে গেছে।

এর একমাত্র সমাধান জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির বিধান সংবিধানে বিধিবদ্ধ করা।

প্রথমত: সংসদ সদস্যদের জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকতে হবে এলাকার স্থানীয় সংসদের মাধ্যমে নির্বাচনী এলাকার জনগণের কাছে এবং

স্থানীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে অনাস্থা জ্ঞাপন করা হলে সংসদ সদস্যপদ বাতিলের আইন থাকতে হবে।

নির্বাহী ব্যবস্থার দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সংসদের মাধ্যমে জনগণের কাছে থাকা উচিৎ যে জন্য অনু: ১১, ৫৯, ৬০ অনুসারে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করা আবশ্যক।
স্থানীয় সংসদের মাধ্যমে জাতীয় সংসদ সদস্য, সিটি করপোরেশন চেয়ারম্যান, পৌরসভার চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়াম্যানদের জবাবদিহিতা এবং স্থানীয় কোর্টের ( ইউনিয়ন কোর্ট, উপজেলা কোর্ট, পৌরকোর্ট, সিটিকোর্ট) মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থার বিকেন্দ্রায়ন করলে নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয় ও দুর্নীতি বন্ধ হবে।

কারণ তখন নির্বাচনে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও তা তেমন লাভজনক হবে না।

অনুচ্ছেদ ৭৬(সংসদের স্থায়ী কমিটিসমূহ) এবং অনুচ্ছেদ ৭৭( ন্যায়পাল) বিধি দ্বারা মন্ত্রণালয়, সরকারী কর্মচারী, সংবিধিবদ্ধ কতৃপক্ষ, আইনের প্রস্তাব পরীক্ষা, আইনের বলবৎ, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রভৃতি বিষয়ে ক্ষমতা অর্পণ করে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার অভিপ্রায় প্রকাশ করা হয়েছে।

কিন্তু স্থায়ী কমিটি, ন্যায়পাল সবই আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা সেখানে জনগণের কোন অংশগ্রহন বা ক্ষমতা নেই। তাছাড়া ন্যায়পাল যদি ন্যায় না করেন তা হলে কি হবে। এধরণের ব্যক্তির সততা ও সদিচ্ছা নির্ভর ব্যবস্থা জবাবদিহিতার নিশ্চয়তা দেয় না।