ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাষ্ট্র কাঠামো

আইন প্রণয়ন বিভাগ (সংসদ)

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত সংসদে আইন প্রণয়ন করা হয়। জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নে জনগণের অংশগ্রহনের সুযোগ থাকে না; সংখ্যাগরিষ্ঠ দলীয় ব্যবস্থার জন্য জনগণের সংখ্যালঘিষ্ঠ বা ক্ষুদ্র অংশের প্রতিনিধিত্ব সম্ভব হয় না এবং বিরোধীদলের বক্তব্য সাধারণত: ধর্তব্যে আসে না। সংসদ নেতার (প্রধানমন্ত্রী) ইচ্ছানুযায়ী আইন প্রণীত হয়। জনগণের স্বার্থে অথবা দলীয় বা শ্রেণী স্বার্থে আইন প্রণীত হতে হলে তা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদিচ্ছার উপরে নির্ভরশীল হয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাষ্ট্র কাঠামো

শুধুমাত্র নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জাতীয় সংসদে কোন‌ দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই সেটা গণতান্ত্রিক বিবেচ্য হতে পারে না; গণতন্ত্রের মূল বিষয় হলো দলমত, ধর্ম বর্ণ, শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে সকল জনগণের ইচ্ছা, আকাঙ্খা ও মতামতের ভিত্তিতে আইন প্রণীত হওয়া। আইন প্রণয়নে সকল জনগণের অংশগ্রহন ও মতামত দানের ব্যবস্থা করতে সংসদ ব্যবস্থার বিকেন্দ্রায়ন করে স্থানীয় সংসদ এবং কেন্দ্রীয় বা জাতীয় সংসদ গঠন করতে হবে।

স্থানীয় সংসদে সকল শ্রেনী-পেশা এবং দলমতের জনগণের প্রতিনিধিত্ব থাকবে এবং জাতীয় সংসদে প্রচলিত অঞ্চল ভিত্তিক প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে।

স্থানীয় সংসদে জনগণের সকল অংশের যেমন কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, আইনজীবি, ডাক্তার, ইনজিনিয়ার, সাংস্কৃতিক সংঘ,ক্রীড়া সংগঠন, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠী, সকল রাজনৈতিক দল ইত্যাদি সবার প্রতিনিধিত্ব থাকবে। আইনের প্রস্তাবিত খসড়া বিল স্থানীয় সংসদের মাধ্যমে পর্যালোচিত ও মতামত গ্রহনের পর জাতীয় সংসদে উত্থাপনের পদ্ধতি প্রচলন করতে হবে। স্থানীয় সংসদের মাধ্যমে জনমত গ্রহনের ভিত্তিতে পরে উচ্চতর পর্যায়ে অর্থাৎ জাতীয় সংসদে আইন প্রণীত হবে।

এই বিকল্প ব্যবস্থায় ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, পৌর এবং সিটি করপোরেশন সংসদ নামে স্থানীয় সংসদ গঠিত হবে

(ক) ইউনিয়ন সংসদ

ইউনিয়ন সংসদ সদস্য হবে ঃ
(১) পণ্য উৎপাদনকারী ও সেবাদানকারী পেশাজীবি সমিতির নির্বাচিত সভাপতি। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের সকল পেশাজীবি নিজ নিজ সমিতিভুক্ত হবে এবং প্রত্যেক সমিতির সভাপতি সংসদ সদস্য হবে।।

রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন নামে কোন পেশাজীবি সমিতি হবে না।

(২) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকগণ।
(৩) সকল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ( মসজিদ, মন্দির, গীর্জা,মঠ) প্রধান ইমাম ও পুরোহিতগণ।
(৪) সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনের ( ক্লাব সমূহ) নির্বাচিত সভাপতি গণ।
(৫) সকল ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর নির্বাচিত প্রতিনিধি
(৬) সকল রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত প্রতিনিধি।

সংসদ সদস্যদের ভোটে একজন ইউনিয়ন সংসদ নেতা / স্পিকার নির্বাচিত হবে। ইউনিয়ন সংসদ ইউনিয়নের বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুমোদন করবে যা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যকর করবে। ইউনিয়নের জনগণের কর্ম সংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগযোগ ব্যবস্থা, আইন শৃঙ্খলা, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি ও সেচ সহ প্রাকৃতিক, মৌলিক ও সামাজিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে নীতি নির্ধারণ ও প্রকল্প তৈরী করবে। ইউনিয়নের উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার জন্য নীতিসমূহ প্রণয়ন করবে। স্থানীয় নির্বাহী ব্যয়ের জন্য কর ও রাজস্ব নীতি নির্ধারণ ও আইন প্রণয়ন করবে। স্থানীয় কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ইউনিয়ন সঞ্চয় ও বিনিয়োগ তহবিল গঠনের নীতি প্রণয়ন করবে।

(খ) উপজেলা সংসদ

উপজেলা সংসদ সদস্য হবে প্রতি ইউনিয়ন হতে ১জন করে।
(১) পণ্য উৎপাদনকারী ও সেবাদানকারী পেশাজীবি সমিতির নির্বাচিত উপজেলা প্রতিনিধি
(২) নির্বাচিত উপজেলা শিক্ষক প্রতিনিধি
(৩) ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উপজেলা প্রতিনিধি
(৪) সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনের নির্বাচিত উপজেলা প্রতিনিধি
(৫) সকল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নির্বাচিত উপজেলা প্রতিনিধি
(৬) সকল রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত উপজেলা প্রতিনিধি।

উপজেলা পৌর এলাকা হতে ইউনিয়ন অনুরূপ নির্বাচিত উপজেলা প্রতিনিধি থাকবে। সংসদ সদস্যদের ভোটে একজন উপজেলা সংসদ নেতা/স্পীকার নির্বাচিত হবে। উপজেলা হতে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য উপজেলা সংসদের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করবেন এবং উপজেলার আওতার উর্ধ্বে সমস্যা বা দাবী জেলা সংসদ ও জাতীয় সংসদে উত্থাপন করবেন। উপজেলার জনগণ যাতে কর্মসংস্থান ও শ্রম দানের মাধ্যমে নিজদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, যোগাযোগ, জ্বালানি ইত্যাদি সমস্যাসমূহ সমাধান করে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে; উপজেলা সংসদ সেজন্য ইউনিয়ন সমূহের সাথে সমন্বয় করে উপযুক্ত প্রকল্প গ্রহন করবে। উপজেলা সঞ্চয় ও বিনিয়োগ তহবিল গঠনের নীতি ও আইন প্রণয়ন করবে এবং উপজেলার অধীন ইউনিয়ন সংসদ সমূহের প্রণীত নীতি ও আইনের সমন্বয় করবে। ইউনিয়ন সমূহের প্রণীত উন্নয়ন প্রকল্প ও বাজেট প্রয়োজনমত উপজেলা সংসদে পর্যালোচনা করে সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প ও বাজেট প্রণীত হবে। স্থানীয় উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার জন্য নীতিসমূহ প্রণয়ন এবং ইউনিয়ন উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থা পরিচালনার সমন্বয় করবে। উপজেলার কর ও রাজস্ব নীতি গ্রহন করবে।

(গ) জেলা সংসদ

জেলা সংসদের সদস্য হবে প্রতি উপজেলা হতে ১জন করে
(১) পণ্য উৎপাদনকারী ও সেবাদানকারী পেশাজীবি সিমিতির নির্বাচিত জেলা প্রতিনিধি
(২) নির্বাচিত জেলা শিক্ষক প্রতিনিধি
(৩) সকল ধর্মের জেলা প্রতিনিধি
(৪) সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনের নির্বাচিত জেলা প্রতিনিধি
(৫) সকল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নির্বাচিত জেলা প্রতিনিধি
(৬) সকল রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত জেলা প্রতিনিধি।

জেলার পৌর এলাকা হতে উপজেলা অনুরূপ নির্বাচিত জেলা প্রতিনিধি থাকবে। জেলা হতে (নির্বাচনী এলাকা ভিত্তিক) নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যগণ জেলা সংসদের সমন্বয়ক কমিটি হিসেবে কাজ করবেন এবং জেলা সংসদের আওতার উর্ধের সমস্যা বা দাবী জাতীয় সংসদে উত্থাপন করবেন। জেলার জনগণ যাতে কর্মসংস্থান ও শ্রমদানের মাধ্যমে নিজদের অন্ন,বস্ত্র, শিক্ষা, গৃহ, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, যোগাযোগ, জ্বালানি ইত্যাদি সমস্যা সমাধান করে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে তার জন্য জেলা সংসদ উপজেলা সমূহের সাথে সমন্বয় করে প্রকল্প গ্রহন করবে। জেলা সঞ্চয় ও বিনিয়োগ তহবিল গঠনের নীতি ও আইন প্রণয়ন করবে এবং জেলার অধীন উপজেলা ও ইউনিয়ন সংসদ সমূহ কতৃক প্রণীত নীতি ও আইন সমন্বয় করবে। জেলার উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার সমন্বিত নীতি, আইন প্রণয়ন করবে। উপজেলা সমূহের সাথে সমন্বয় করে জেলার উন্নয়ন প্রকল্প ও বাজেট প্রণয়ন করবে। জেলার নির্বাহী ব্যয় যাতে জেলার কর ও রাজস্ব দ্বারা নির্বাহ করা যায় তার জন্য উপজেলা সমূহের সাথে সমন্বয় করে নীতি ও আইন প্রণয়ন করবে।

(ঘ) পৌর সংসদ

পৌর সংসদ সদস্য হবে ইউনিয়ন সংসদ অনুরূপ
(১)সকল শ্রেণীপেশা সমিতির নির্বাচিত ওয়ার্ড সংসদ সদস্যগণ।
(২) প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক।
(৩) ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, পুরোহিত, পাদ্রী।
(৪) সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনের নির্বাচিত সভাপতি।
(৫) ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নির্বাচিত প্রতিনিধি।
(৬) প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত প্রতিনিধি।

ওয়ার্ড সংসদ সদস্যদের ভোটে একজন পৌর সংসদ নেতা/স্পীকার নির্বাচিত হবে। পৌর এলাকার যে সকল সমস্যা বা দাবী পৌরসভার আওতার উর্ধে সেগুলো উপজেলা সংসদে উত্থাপন করা হবে। আর যে সমস্যাগুলো উপজেলা সংসদের আওতার বাইরে সেগুলো পৌর এলাকার সমন্বয়ক হিসেবে জাতীয় সংসদ সদস্য কর্তৃক জেলা অথবা জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হবে। পৌর এলাকার জনগণ যাতে কর্মসংস্থান ও শ্রমদানের মাধ্যমে নিজদের অন্ন,বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহ, নিরাপত্তা, যোগাযোগ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ইত্যাদি সমস্যা সমাধান করে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে তার জন্য পৌর সংসদ পৌর সঞ্চয় ও বিনিয়োগ তহবিল গঠনের নীতি ও আইন প্রণয়ন করবে। পৌর এলাকার বাজেট প্রণয়ন করবে এবং পৌরসভার নির্বাহী ব্যয় যাতে নিজস্ব কর ও রাজস্ব আয়ে নির্বাহ করা যায় তার জন্য কর ও রাজস্ব নীতি গ্রহন করবে।

(ঙ) সিটি সংসদ

সিটি সংসদ সদস্য হবে— ইউনিয়ন সংসদ অনুরূপ ঃ
(১) সকল শ্রেণীপেশা সমিতির নির্বাচিত ওয়ার্ড সংসদ সদস্যগণ।
(২) প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক।
(৩) ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, পুরোহিত, পাদ্রী।
(৪) সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনের নির্বাচিত সভাপতি।
(৫) ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নির্বাচিত প্রতিনিধি।
(৬) প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত প্রতিনিধি।

ওয়ার্ড সংসদ সদস্যদের ভোটে একজন সিটি সংসদ নেতা /স্পীকার নির্বাচিত হবে। সিটি এলাকার যে সকল সমস্যা বা দাবী সিটি করপোরেশনের আওতার উর্ধে সেগুলো এলাকার জাতীয় সংসদ সদস্য কর্তৃক জেলা সংসদে এবং যে সমস্যা গুলো জেলা সংসদের আওতার বাইরে সেগুলো জেলা থেকে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যদের দ্বারা সমন্বয় করে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হবে। সিটি এলাকার জনগণ যাতে কর্মসংস্থান ও শ্রম দানের মাধ্যমে নিজদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহ, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ইত্যাদি সমস্যা সমাধান করে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে তার জন্য সিটি সঞ্চয় ও বিনিয়োগ তহবিল গঠনের নীতি ও আইন প্রণয়ন করবে। সিটি এলাকার বাজেট প্রণয়ন করবে এবং সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ব্যয় যাতে নিজস্ব কর ও রাজস্ব দ্বারা নির্বাহ করা যায় সে মোতাবেক নীতি এ আইন প্রণয়ন করবে।

(চ) জাতীয় সংসদ

নির্দিষ্ট ভোটার সংখ্যা ভিত্তিক আসনসমূহ হতে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে জাতীয় সংসদ গঠিত হবে।

সংবিধান প্রদত্ত অন্যান্য যোগ্যতাসহ স্থানীয় ( উপজেলা/জেলা) সংসদে নির্বাচিত হয়ে কমপক্ষে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা জাতীয় সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা ধরা হবে।

কোন দলীয় প্রার্থীর নমিনেশন উক্ত দলের নির্বাচনী এলাকার কাউন্সিলরদের অনুমোদনে দেয়া হবে।

নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যদের জবাবদিহিতার ব্যবস্থা তার নির্বাচনী এলাকার ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌর সংসদের কাছে থাকবে। নির্বাচিত হওয়ার পর কোন দলের সংসদ সদস্য না হয়ে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য রূপে কাজ করবেন। এজন্য জাতীয় সংসদে সরকারী দল ও বিরোধী দল প্রথা বিলুপ্ত করতে হবে।

গণ সংসদে গৃহীত জাতীয় নির্বাচনী মেনিফেস্টো এবং জাতীয় বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন জাতীয় সংসদে প্রণীত হবে। সদস্যগণ সংসদে কোন বিলের উপর তাদের সমর্থন বা বিরোধিতার অভিপ্রায় জানিয়ে স্পিকারের কাছে নাম জমা দেবেন এবং সংসদে বিলের সমর্থনে বা বিরোধিতায় অংশ গ্রহন করবেন। অত:পর ভোটের মাধ্যমে বিলের নিষ্পত্তি হবে। পাসকৃত বিল স্পিকারের স্বাক্ষরে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরিত হবে এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতি পেলে তা আইনে পরিণত হবে।

জাতীয় সংসদের নির্বাচন; বিজয়ী দলের সরকার গঠন; জনগণের সকল ক্ষমতা ৩০০ সংসদ সদস্যের কাছে কুক্ষিগত করাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া বলা যায় না। বরং জনগণের সার্বভৌমত্বকে সংসদ ও সচিবালয়ের চারদেয়ালের মধ্যে বন্দী করা হয়। সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা সমাধান নয়; রাষ্ট্রের মালিক জনগণ দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া সমাধান।

বর্তমান জাতীয় সংসদে সরকারী ও বিরোধী দলের সদস্যগণ যোগ দিয়ে যত বিতর্ক করুক তাতে হৈচৈ ব্যতীত জনগণের কোন উপকার সম্ভব নয়। কারণ সংসদে বিরোধীদল সংখ্যালঘু হওয়ায় তাদের বক্তব্য ধর্তব্যে আসে না। তাই সংসদ কার্যকর বা অকার্যকরের ব্যাপারে বিরোধীদলের কোন ভূমিকা নেই।

বর্তমান পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ কার্যকর প্রকৃত অর্থে দেশ ও জনগণের সমস্যা সমাধান বুঝায় না। সংসদ কার্যকর অর্থ জনগণের আকাঙ্খার বাস্তবায়ন অর্থাৎ জনগণের জীবনযাপনের সমস্যা সমাধান ও চাহিদা পূরণ যা স্থানীয় সংসদ ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহনের দ্বারা সফল করা সম্ভব।

(ছ) গণ সংসদ

সকল ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, পৌর, সিটি এবং জাতীয় সংসদ সদস্যদের নিয়ে গণ সংসদ গঠিত হবে। কোন জাতীয় ইস্যুতে প্রয়োজন হলে গণ সংসদ সদস্যদের ভোট গণভোট রূপে গৃহীত হবে।

প্রতি দশ বছর অন্তর গণ সংসদে দেশের সংবিধান পর্যালোচিত হবে এবং কোন সংশোধন, পরিবর্তন জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বদলে গণ সংসদের দুই- তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হবে যা দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কুফল হতে রক্ষা পেতে সাহায্য করবে।

সকল রাজনৈতিক দল কর্তৃক প্রণীত জাতীয় নির্বাচনী মেনিফেস্টো গণ সংসদে পর্যালোচনার পর একটা সমন্বিত মেনিফেস্টো অনুমোদিত হবে যা বাস্তবায়ন করা হবে নির্বাচনে বিজয়ী সরকারের দায়িত্ব। পাচ বৎসর মেয়াদি জাতীয় বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা গণ সংসদে অনুমোদিত হবে। প্রধান বিচারপতিসহ বিধিবদ্ধ কমিশন প্রধানদের নিয়োগ জাতীয় সংসদে নিষ্পত্তি না করে গণসংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদন করা যেতে পারে।

প্রশাসন বা নির্বাহী বিভাগ (নির্বাহী পরিষদ)

রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ সকল জনগণের জীবন যাপনের সমস্যা সমাধান ও চাহিদা পূরণের জন্য সংসদে প্রণীত নীতি ও আইন অনুসারে নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে। আইন প্রয়োগে ধর্ম, বর্ণ, দলমত বিশেষে কোন পক্ষপাতিত্ব করবে না। আধুনিক গণতান্ত্রিক বা বহুমত তান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার দ্বন্দ তাই “সকল জনগণের মতামত গ্রহন” এবং “রাষ্ট্র ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা” এ দুটো ধারণা ও পদ্ধতির মাঝে। অথবা বলা যায় সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত মোতাবেক রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রয়োগ বা শাসন এবং সংখ্যালঘুদের মত ও স্বার্থ রক্ষার মাঝে দ্বন্দ বা সমস্যা।

প্রচলিত গণতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিদের দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়ায় সংখ্যালঘুদের (বিরোধীদল সহ) দাবিদাওয়া ভোটের মাধ্যমে পরাজিত হয়।

সংখ্যালঘুরা নানা বঞ্চনার শিকার হয়। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠরা সর্বদা ক্ষমতাসীন হয় এবং প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এর কোন সমাধান নেই। সকল শ্রেণী-পেশা ও সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত স্থানীয় সংসদ ও স্থানীয় পরিষদ(ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, পৌর, সিটি) ব্যবস্থার অধীনে রাষ্ট্র পরিচালিত হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ নীতির প্যারাডক্স বা অসংগতি দূর করা সম্ভব।

(ক) ইউনিয়ন পরিষদ

ইউনিয়ন সংসদ সদস্যদের মধ্য হতে এবং ইউনিয়ন সংসদ সদস্যদের ভোটে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক( ইউনিয়ন সংসদ দ্বারা নির্ধারিত) নির্বাহী(কৃষি, শিক্ষা, আইন ও বিচার ইত্যাদি) সদস্য নির্বাচিত হবে। ইউনিয়নের কার্য নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মচারী ও সচিবালয় থাকবে। ইউনিয়ন সংসদ কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত এবং উচ্চতর সংসদ ও পরিষদ কতৃক প্রদত্ত দায়িত্ব সমূহ ইউনিয়ন পরিষদ কার্যকর করবে। ইউনিয়নের জনগণ যাতে কর্ম ও শ্রম দানের মাধ্যমে অন্ন,বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদি চাহিদা পূরণ করে শান্তিময় জীবনযাপন করতে পারে সেই লক্ষ্যে পরিষদ কাজ করবে। ইউনিয়নের নির্বাহী ব্যয় ইউনিয়নবাসীর প্রদত্ত কর এবং উর্ধতন স্থানীয় সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের দেয়া অনুদান হতে নির্বাহ করা হবে। ইউনিয়নের জনগণ যাতে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বিভিন্ন উৎপাদন কাজে নিযুক্ত হতে পারে তার জন্য প্রতি ইউনিয়নে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ তহবিল গড়ে তুলতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ ইউনিয়ন সংসদের কাছে জবাবদিহি করবে।

(খ) উপজেলা পরিষদ

উপজেলা সংসদ সদস্যদের মধ্য হতে এবং উপজেলা সংসদ সদস্যদের ভোটে ১ জন উপজেলা চেয়াম্যান এবং ১ জন ভাইস চেয়ারম্যান এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক(উপজেলা সংসদ দ্বারা নির্ধারিত) নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হবে। উপজেলার কার্য নির্বাহের জন্য বর্তমানে নিয়োজিত সরকারী কম কর্মকর্তাগণ উপজেলা সচিবালয়ের কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করবেন। উপজেলার জনগণ যাতে কর্ম ও শ্রমদানের মাধ্যমে নিজদের অন্ন, বস্ত্র, গৃহ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, যোগাযোগ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ইত্যাদি চাহিদা পূরণ করে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে সেই লক্ষ্যে উপজেলা পরিষদ কাজ করবে। উপজেলা সংসদ কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত এবং উর্ধতন কতৃপক্ষের দেয়া দায়িত্ব পরিষদ কার্যকরী করবে। উপজেলার বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা উপজেলা সংসদে অনুমোদিত হবে। উপজেলা পরিষদ উপজেলা সংসদের কাছে জবাবদিহি করবে।

(গ) জেলা পরিষদ

জেলা সংসদ সদস্যদের মধ্য হতে এবং জেলা সংসদ সদস্যদের ভোটে ১ জন চেয়াম্যান ও ১ জন ভাইস চেয়াম্যান এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক(জেলা সংসদ দ্বারা নির্ধারিত) নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হবে।জেলায় নিয়োজিত বর্তমান কর্মকর্তা ও কর্মচারী গণ জেলা সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী হিসেবে কাজ করবেন।জেলার জনগণ যাতে কর্মসংস্থান ও শ্রমমানের মাধ্যমে নিজদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহ, নিরাপত্তা, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, যোগাযোগ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ইত্যাদি সমস্যা সমাধান করে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে তার লক্ষ্যে জেলা পরিষদ কাজ করবে। জেলা সংসদ কতৃক প্রদত্ত সিদ্ধান্ত জেলা পরিষদ বাস্তবায়ন করবে এবং উর্ধতন কতৃপক্ষের দেয়া দায়িত্ব পালন করবে। জেলা সংসদ কর্তৃক প্রণীত জেলার বাজেট এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা জেলা পরিষদ বাস্তবায়ন করবে। জেলা পরিষদ জেলা সংসদের কাছে জবাবদিহি করবে।

(ঘ) পৌর পরিষদ

পৌর সংসদ সদস্যদের মধ্য হতে এবং পৌর সংসদ সদস্যদের ভোটে ১জন পৌর চেয়াম্যান ও ১জন পৌর ভাইস চেয়ারম্যান এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক( পৌর সংসদ দ্বারা নির্ধারিত) নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হবে। পৌরসভার অধীনে একটা সচিবালয় থাকবে। পৌর এলাকার জনগণ যাতে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহ, নিরাপত্তা, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ইত্যাদি সমস্যা সমাধান করে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে পৌর পরিষদ তার ব্যবস্থা করবে। পৌর সংসদ কতৃক অনুমোদিত বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা পৌর পরিষদ কার্যকরী করবে। পৌর পরিষদ পৌর সংসদের কাছে জবাবদিহি করবে।

(ঙ) সিটি পরিষদ

সিটি সংসদ সদস্যদের মধ্য হতে এবং সিটি সংসদ সদস্যদের ভোটে ১ জন চেয়ারম্যান ও ১ জন ভাইস চেয়ারম্যান এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক( সিটি সংসদ দ্বারা নির্ধারিত) নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হবে। সিটি পরিষদের একটা সচিবালয় থাকবে। সিটি এলাকার জনগণ যাতে কর্ম সংস্থানের মাধ্যমে নিজদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য,গৃহ, নিরাপত্তা, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, যোগযোগ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ইত্যাদি সমস্যা সমাধান করে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে সিটি পরিষদ তার ব্যবস্থা করবে। সিটি সংসদ কর্তৃক প্রণীত বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা সিটি পরিষদ বাস্তবায়ন করবে। সিটি পরিষদ সিটি সংসদের কাছে জবাবদিহি করবে।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে ইউনিয়ন, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে সংসদ ও পরিষদ ব্যবস্থার প্রবর্তন করলে আলাদা করে পৌর এবং সিটি করপোরেশন ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে না। তখন দ্বৈত দায়িত্ব ও শাসন যেমন এড়ানো যাবে; তেমনি আইন প্রণয়ন, নির্বাহী ও বিচারিক কার্য সহ সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড সমন্বিতভাবে সম্পন্ন করা যাবে। বর্তমান পৌর ও সিটি করপোরেশনের ন্যায় চেন অব কমান্ড ও অথরিটি এবং রিসোর্স এলোকেশন ও ম্যানেজমন্ট সহ দায়িত্ব কর্তব্যের কনফিউশন থাকবে না। তা ছাড়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অকার্যকারিতা ও দুর্নীতি দূর হবে।

(চ) কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পরিষদ

জাতীয় সংসদ সদস্যদের মধ্য হতে এবং জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য মন্ত্রীগণ নির্বাচিত হবেন। কেন্দ্রীয় সচিবালয় মন্ত্রিপরিষদের অধীনে কাজ করবে। জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্ত সমূহ মন্ত্রীপরিষদ কার্যকরী করবে। জাতীয় সংসদে অনুমোদিত বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা মন্ত্রীপরিষদ বাস্তবায়ন করবে। মন্ত্রী পরিষদ জাতীয় সংসদের কাছে জবাবদিহি করবে।

(ছ) সর্বোচ্চ পরিষদ

এই পরিষদ গঠিত হবে—
১। রাষ্ট্রপতি- সভাপতি;
২। উপরাষ্ট্রপতি—সহসভাপতি;
৩। জাতীয় সংসদের স্পিকার—সদস্য;
৪। প্রধান বিচারপতি—সদস্য;
৫। প্রধানমন্ত্রী—সদস্য;
৬। প্রধান নির্বাচন কমিশনার—সদস্য;
৭। প্রধান শ্রম ও কর্ম কমিশনার— সদস্য;
৮। প্রধান অর্থ ও পরিকল্পনা কমিশনার—সদস্য।

মেয়াদোত্তীর্ণ বা অন্য কোন কারণে সংসদ বা সরকার বাতিল হলে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সর্বোচ্চ পরিষদ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে এবং পরবর্তী জাতীয় সংসদের নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা দেবে। জাতীয় নিরাপত্তা, বৈদেশিক চুক্তি, রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ ব্যক্তি বা সংস্থার দুর্নীতি ইত্যাদি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সর্বোচ্চ পরিষদ পর্যালোচনা করবে ও সিদ্ধান্ত নেবে। এই পরিষদ হবে নির্বাহী ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান।

(জ) রাষ্ট্রপতি এবং উপরাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রের অধিবাসীদের শ্রদ্ধাভাজন, জ্ঞানী ও জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তি ভোটারদের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবে। রাষ্ট্রপতির অধীন রাষ্ট্রের আইন, নির্বাহী, বিচার ও লজিস্টিক বিভাগ কাজ করবে।

বিচার বিভাগ ( কোর্ট সমূহ)

আইনের আওতায় নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বিচার ব্যবস্থা নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত হবে। বিচার কার্য ও রায় লেখা সাধারণের বোধগম্য মাতৃভাষায় হতে হবে। আমলাতান্ত্রিক বিচার ব্যবস্থার গণতন্ত্রায়ন করতে অপরাধ তদন্ত প্রক্রিয়ায় জনপ্রতিনিধিত্ব এবং কোর্টে জুরী ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে। বিচার দ্রুত, জনসাধারণের জন্য সুবিধাজনক এবং সহজ ও সল্প ব্যয়ে পাওয়ার জন্য ইউনিয়ন স্তর হতে কোর্ট (দেওয়ানি, ফৌজদারী, মানবাধিকার) স্থাপন করতে হবে।

বেটেনকোর্টের রায়ের পর সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা পার্টি পরবর্তী উচ্চ কোর্টে আপীল করতে পারবে। কোন এলাকায় অপরাধ সংঘটিত হলে বা কোন বিবাদ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট এলাকার কোর্টের আদেশে তদন্ত কমিটি গঠিত হবে যার সদস্য হবে পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, আইন সদস্য এবং কমিটি সাক্ষী প্রমাণসহ কোর্টে অভিযোগপত্র বা রিপোর্ট দায়ের করবে। অত:পর নিয়ম অনুযায়ী এলাকার কোর্ট বিচার সম্পন্ন করবে। অধস্তন কোর্টের বিচারকদের পদের মেয়াদ ও দায়বদ্ধতা অনুচ্ছেদ ৯৬ অনুসারে নিশ্চিত করা হবে এবং প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সংসদের অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত হয়ে পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টে পাঠাতে হবে। অত:পর ৯৬(৩) অনুসারে সংসদে প্রণীত আইন মোতাবেক হাইকোর্ট উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।

(ক) ইউনিয়ন কোর্ট— ইউনিয়ন এলাকার বিচার পরিচালনার জন্য ইউনিয়ন কোর্ট থাকবে। ইউনিয়ন কোর্টের বিচারক এবং জুরী ইউনিয়ন সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে বিভাগীয় হাইকোর্ট কতৃক নিয়োজিত হবে।

(খ) উপজেলা কোর্ট-— উপজেলার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য উপজেলা কোর্ট স্থাপিত হবে। উপজেলার বিচারক ও জুরী উপজেলা সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় হাইকোর্ট কতৃক নিয়োগ প্রাপ্ত হবে।

(গ) জেলাকোর্ট-— জেলার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য জেলাকোর্ট স্থাপিত হবে। জেলার বিচারক ও জুরী জেলা সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় হাইকোর্ট কতৃক নিয়োজিত হবে।

(ঘ) পৌরকোর্ট—- পৌর এলাকার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য পৌরকোর্ট স্থাপিত হবে। পৌর কোর্টের বিচারক ও জুরী পৌর সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় হাইকোর্ট কতৃক নিয়োজিত হবে।

(ঙ) সিটিকোর্ট— সিটি এলাকার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য সিটিকোর্ট স্থাপিত হবে। সিটি কোর্টের বিচার ও জুরী সিটিসংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় হাইকোর্ট কতৃক নিয়োজিত হবে। উল্লেখ্য ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা কোর্ট (দেওয়ানি, ফৌজদারি, মানবাধিকার) স্থাপিত হলে পৌর ও সিটি কোর্টের প্রয়োজন হবে না।

স্থানীয় ( ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, পৌর, সিটি) কোর্টসমূহের বিচারক ও জুরী নিয়োগের যোগ্যতা অনুচ্ছেদ ১১৫ অনুসারে নির্ধারিত হবে।

(চ) হাইকোর্ট —- প্রত্যেক বিভাগে একটা স্থায়ী হাইকোর্ট থাকবে। হাইকোর্টের বিচারক ও জুরী প্রধান বিচারপতির সুপারিশে রাষ্ট্রপতি কতৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হবে এবং উক্ত নিয়োগ জাতীয় সংসদে অথবা গণসংসদে অনুমোদিত হতে হবে।

(ছ) সুপ্রীমকোর্ট (আপিল বিভাগ)-

রাজধানীতে আপিলকোর্ট স্থাপিত হবে। আপিলকোর্টের বিচারক ও জুরী প্রধান বিচারপতির সুপারিশে রাষ্ট্রপতি কতৃক নিয়োজিত হবে এবং উক্ত নিয়োগ জাতীয়সংসদ কতৃক অনুমোদিত হতে হবে। সকল কোর্টের বিচারক ও জুরীদের নিয়োজিত হওয়ার যোগ্যতা সংবিধান (অনুচ্ছেদ ৯৫) প্রদত্ত বিধি অনুসারে নির্ধারিত হবে। প্রধান বিচারপতির নিয়োগ রাষ্ট্রপতি কতৃক প্রদত্ত হবে এবং উক্ত নিয়োগ জাতীয় সংসদে অনুমোদিত হতে হবে। তবে জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্ত যেহেতু দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতায় গৃহীত হয়; সেহেতু প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের নিয়োগ ও অভিশংসন নির্ধারিত হওয়া উচিৎ গণসংসদের অনুমোদনে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের যোগ্যতা অনুচ্ছেদ ৯৫ অনুসারে নির্ধারিত হবে।

লজিস্টিক বিভাগ

রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন, নির্বাহী কার্য ও বিচার সহ প্রয়োজনীয় কর্ম সম্পাদনের জন্য জনপ্রতিনিধি, বেতনভুক্ত কর্মচারী এবং অর্থ-সম্পদ যোগান দিতে লজিস্টিক বিভাগ কাজ করবে। নির্বাচন কমিশন, কর্ম কমিশন এবং অডিট ও অর্থ কমিশন লজিস্টিক বিভাগের অধীন গঠিত হবে।

১। নির্বাচন কমিশন

অনুচ্ছেদ ১১৮ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় (জাতীয়) নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে এবংঅনুচ্ছেদ ১১৯ ও সপ্তম ভাগে বর্ণিত অন্যান্য অনুচ্ছেদের বিধি অনুসারে দায়িত্ব পালন করবে। জাতীয় নির্বাচন কমিশন গণসংসদ দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য জাতীয় নির্বাচন কমিশন কতৃক স্থানীয় নির্বাচন কমিশন (ইউনয়ন, উপজেলা, জেলা,পৌর, সিটি) গঠিত হবে এবং স্থানীয় নির্বাচন কমিশন সমূহ সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সংসদ দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে। স্থানীয় নির্বাচন কমিশন অনুচ্ছেদে ১১৯ প্রদত্ত এবং স্থানীয়ভাবে পযোজ্য প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করবে।

২। শ্রম ও কর্ম কমিশন( সরকারী কর্ম কমিশন)

অনুচ্ছেদ ১৩৭, ১৩৮, ১৩৯ অনুযায়ী কেন্দ্রীয়(জাতীয়) শ্রম ও কর্ম কমিশন গঠিত হবে এবং অনুচ্ছেদ ১৪০, ১৪১ অনুসারে দায়িত্ব পালন করবে। কেন্দ্রীয় কর্মকমিশন কেন্দ্রীয় সরকারে নিয়োগ বিষয়ে দায়িত্ব পালন করবে। জাতীয় শ্রম ও কর্মকমিশন গণসংসদে অনুমোদিত হতে হবে। স্থানীয় শ্রম ও কর্ম কমিশন জাতীয় শ্রম ও কর্ম কমিশন কর্তৃক গঠিত হবে এবং স্থানীয়( ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, পৌর, সিটি) কমিশন সমূহ সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সংসদে অনুমোদিত হতে হবে। স্থানীয় কমিশন স্থানীয় সরকারে নিয়োগ বিষয়ে কাজ করবে।

৩। হিসাব নিরীক্ষক ও অর্থ কমিশন

অনুচ্ছেদ ১২৭, ১২৮ অনুসারে মহাহিসাব নিরীক্ষক এবং সংবিধান প্রদত্ত বিধি অনুসারে কেন্দ্রীয় অর্থ কমিশন গঠিত হবে। জাতীয় হিসাব নিরীক্ষক ও অর্থ কমিশন গণ সংসদে অনুমোদিত হতে হবে। স্থানীয় হিসাব নিরীক্ষক ও অর্থ কমিশন জাতীয় হিসাব নিরীক্ষক ও অর্থ কমিশন কর্তৃক গঠিত হবে এবং সংশ্লিষ্ট স্থানীয় (ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা,পৌর, সিটি) সংসদে অনুমোদিত হতে হবে।

১৯৭২ সালের সংবিধানের পর্যালোচনা এবং সংস্কারের এই রূপরেখা প্রস্তাবের উদ্দেশ্য:

১। দলীয় রাজনীতি ও দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সরকার গঠনের ফলে সমাজে যে বিভাজন ও দ্বন্দ সৃষ্টি হয় তার নিরসন করে ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠন।

২। ধর্ম,বর্ণ, ভাষা, জাতিগোষ্ঠী,মত, আদর্শ প্রভৃতি নিজস্বতার কারণে যারা সমাজে সংখ্যালঘু; তারাও যাতে রাষ্ট্রের সকল(আইন প্রণয়ন, নির্বাহী, বিচার, লজিস্টিক) কর্মে অংশগ্রহন করে রাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধান।

৩। মুক্তবাজার অথবা কমান্ড অর্থনীতির বদলে স্থানীয় অর্থ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের সকল জনগণ যাতে কর্মসংস্থান করে নিজদের সকল চাহিদা পূরণ করতে পারে এবং দেশের সকল সম্পদের উপর জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় তার নিশ্চয়তা দান করা।

৪। রাষ্ট্র সকল জনগণের এবং জনগণের বিধানমতে ও জনগণের অংশগ্রহণে রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া।

৫। প্রস্তাবনায় বর্ণিত সংবিধানের মূলনীতি; প্রথমভাগের অনুচ্ছেদ ৭এ প্রদত্ত জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং সর্বোচ্চ আইন হিসেবে সংবিধানের প্রাধান্য; দ্বিতীয় ভাগে প্রদত্ত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ এবং তৃতীয় ভাগে বিধায়িত মৌলিক অধিকারসমূহ বাস্তবায়নের জন্য ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গঠন করা।

***
মুক্তিযোদ্ধার চোখে: সংবিধান, সমস্যা, পর্যালোচনা ও সমাধানে কিছু প্রস্তাব- পর্ব ১
মুক্তিযোদ্ধার চোখে: সংবিধান, সমস্যা, পর্যালোচনা ও সমাধানে কিছু প্রস্তাব- পর্ব ২
মুক্তিযোদ্ধার চোখে: সংবিধান, সমস্যা, পর্যালোচনা ও সমাধানে কিছু প্রস্তাব- পর্ব ৩
মুক্তিযোদ্ধার চোখে: সংবিধান, সমস্যা, পর্যালোচনা ও সমাধানে কিছু প্রস্তাব- পর্ব ৪

***
ফিচার ছবি: ইন্টারনেট