ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

আমরা প্রায়ই বলি ” স্বাধীনতা পেয়েছি; কিন্তু কাঙ্খিত বাংলাদেশ আজও পাইনি”। বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, মুক্তিযোদ্ধা সবার মনে একটা স্বাধীন বাংলাদেশের আকাঙ্খা ছিল। কিন্তু সেই স্বাধীন বাংলাদেশ কেমন হবে, কেমন হবে তার অর্থব্যবস্থা; কৃষি, শিল্প, শিক্ষা,স্বাস্থ্য ইত্যাদি বাবস্থাই বা কেমন হবে। এসব চিন্তাচেতনা যে একেবারে ছিল না তা নয়; তবে সে সব চিন্তাচেতনা ছিল বিচ্ছিন্নভাবে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল ও তার অঙ্গ সংগঠনের মাঝে। থিসিস, এন্টিথিসিস ও সিন্থিসিস হয়ে যে মৌলিক দর্শন তৈরী হয় তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সমসাময়িক সময়ে গড়ে ওঠে নাই। রুশো, ভলতেয়ারের সমাজ ও রাষ্ট্র দর্শন থেকে যেমন ফরাসি বিপ্লবের উৎপত্তি; কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলসের দর্শন থেকে যেমন কম্যুনিস্ট পার্টি ও রাশিয়ার বিপ্লবের সৃষ্টি; তেমনভাবে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পিছনে মৌলিক সমাজ ও রাষ্ট্র দর্শন ছিল না।

পাকিস্তানি দখলদারিত্ব থেকে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের জনগণের ঐক্যবদ্ধ আকাঙ্খা ছিল। ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬ দফা, ৭ই মার্চের ভাষণ ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে সকল চেতনা তৈরী হয়েছিল তা ছিল পাকিস্তানিদের থেকে স্বাধীনতা অর্জন; অত্যাচার নিপীড়ন ও শোষণ থেকে মুক্তি।

তবে স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটা সমাজ ও রাষ্ট্র দর্শন দেয়া হয়েছে সংবিধানের প্রস্তাবনা, ১ম, ২য় ও ৩য় ভাগে। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে—- ” গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি”; মহান আদর্শ— জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানের মূলনীতি হইবে”;– “সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে”; ” আমরা যাহাতে স্বাধীন সত্তায় সমৃদ্ধি লাভ করিতে পারি এবং মানবজাতির প্রগতিশীল আশা আকাঙ্খার সহিত সঙ্গতি রক্ষা করিয়া আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে পূর্ণ ভূমিকা পালন করিতে পারি, সেই জন্য বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি স্বরূপ এই সংবিধানের প্রাধান্য অক্ষুন্ন রাখা এবং ইহার রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান আমাদের পবিত্র কর্তব্য।

১ম ভাগ অনু ৭ এ বলা হয়েছে ” প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ”। ২য় ভাগ অনু ৮ থেকে অনু ২৫ এ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ঘোষণায় বলা হয়াছে ” শোষণমুক্তি, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মালিকানা নীতি, কৃষক ও শ্রমিকের মুক্তি, রাষ্ট্রের দায়িত্বে মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা, গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লব, অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা, সুযোগের সমতা, অধিকার ও কর্তব্য্ রূপে কর্ম, সরকারি কর্মচারীদের কর্তব্য, নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ’ ইত্যাদি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হইবে। ৩য় ভাগ অনু ২৬ থেকে ৪৭ এ মৌলিক অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে ” আইনের দৃষ্টিতে সমতা, ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক কারণে বৈষম্য না করা, সরকারি নিয়োগে সুযোগের সমতা, আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, জবরদস্তি শ্রম নিষেধ, চলাফেরার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা, চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতা, পেশা ও বৃত্তির স্বাধীনতা, সম্পত্তির অধিকার ইতাদি”

কিন্তু সংবিধানের প্রস্তাবনা, ১ম, ২য় ও ৩য় ভাগে বিধায়িত সমাজ ও রাষ্ট্র দর্শন যাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলি তা বাস্তবায়নের জন্য যে আইন প্রনয়ন, নির্বাহী, বিচার ইত্যাদি বিধান ৪র্থ,৫ম,৬ষ্ট,৭ম,৮ম,৯ম, ) ১০ম ভাগে দেয়া হয়েছে তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দেয় না। ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নকারী রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তে ফিরে গেলাম পূর্ব পাকিস্তানি আমলাতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায়। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর পূর্ব রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং ১৬ ডিসেম্বর পরবর্তী রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যে শুধু ব্যক্তির পরিবর্তন হোল; রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তন হোল না।

কারণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা স্বাধীনতা সংগ্রামের দর্শনে পরিষ্কারভাবে ছিল না। ওই সময়ে স্বাধীনতার পক্ষের দলগুলোর মধ্যে ছিল বামপন্থী সমাজতান্ত্রিক চিন্তা, উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চেতনা, ধর্ম ভীরু ডানপন্থী চেতনা। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে যার সিনথিসিস হতে পারে নাই।

তবে ১৯৭২ সালে প্রদত্ত সমাজ ও রাষ্ট্র দর্শন কাঙ্খিত বাংলাদেশের ভিত্তি এবং উক্ত দর্শনে বিধায়িত কল্যাণ মুলক রাষ্ট্র গঠন করা বাংলাদেশের সকল নাগরিকের দায়িত্ব। স্বাধীনতা বিরোধীরা যে ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে তার নিষ্পত্তি ১৯৭১ সালে হয়ে গেছে। যদিও ১৯৭৫ সালের গণ হত্যার মাধ্যমে জিয়ার নেতৃত্বে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেছিল; তথাপি তারা তখন ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা জনগণের কাছে বলতে সাহস পায় নাই।সংবিধানে পরিবর্তন আনলে ও তা ছিল জনগণের অগোচরে।জিয়া, এরশাদ, খালেদা নিজামীর দীর্ঘ সময়ের লালন পালন ও ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে আজ ও তারা জনগণের মাঝে তেমন কোন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে নাই। আজ ও তারা জনগণের স্বাধীন ভোটাধিকার প্রয়োগকে ভয় পায়। বর্তমানে সৃষ্ট বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তত্তাবধায়ক সরকার প্রভৃতি এজেন্ডা নিয়ে এদেশের জনগণ মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গ করে নাই। স্বার্থান্বেষী সুবিধাবাদীদের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের এই কুটকৌশল নস্যাত করার জন্য সকল সচেতন নাগরিককে সংগঠিত ও সোচ্চার হতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন, পরিবর্তন ও সংস্কার করে উপযুক্ত রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠন করতে হবে। তবে সংবিধানের এই সংস্কার করতে প্রথমে সকল দলমত ও শ্রেণীপেশার নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে গণ সংসদ গঠন করতে হবে ( গণ সংসদ গঠিত হবে ইউনিয়ন সংসদ, উপজেলা সংসদ, জেলা সংসদ ও জাতীয় সংসদ সদস্যদের নিয়ে)