ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

সকল মানুষের দেহ ও মন জৈব প্রক্রিয়া(জেনেটিক প্রসেস) এবং পরিবেশ প্রক্রিয়া(ফেনোটিক প্রসেস) দ্বারা গঠিত হয়। পরিবেশ প্রক্রিয়া দু’ধরণের (ক) প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং (খ) সামাজিক পরিবেশ। সাধারণত প্রত্যেক মানুষ বর্তমান পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করে। তবে পরিবেশ ( প্রাকৃতিক ও সামাজিক) অসহনীয় হলে তা ত্যাগ করে অন্য ভাল পরিবেশে যাওয়ার চেষ্টা করে।কিন্তু সবার পক্ষে তার নিজ পরিবেশ ত্যাগ করা সম্ভব হয় না।সমাজের কিছু মানুষ পরিবেশের (সমাজ) পরিবর্তন করতে সচেষ্ট হয়।তবে এই পরিবর্তনের জন্য সমাজের অধিকাংশ মানুষকে পরিবর্তনের স্থিরকৃত লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে হয়।

একটা দেশ বা রাষ্ট্রের জনগণ কি ধরণের সামাজিক পরিবেশ চায় সেটা ঠিক করাকেই স্থিরকৃত লক্ষ্য বলা হয়। লক্ষ্য ধার্য করতে হলে জনগণের অধিকাংশ ব্যক্তির চিন্তা চেতনায় উক্ত লক্ষ্য ধারণ করার প্রয়োজন হয়।ব্যক্তির চিন্তা চেতনা গঠনে প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ কাজ করে। মানুষ জৈবভাবে দৈহিক ও মানসিক কিছু সামর্থ্য নিয়ে জন্মগ্রহন করে।অতঃপর প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ থেকে শিক্ষা গ্রহন ও অনুশীলনের মাধ্যমে একজন জৈব মানুষ সামাজিক মানুষে পরিণত হয়।এই শিক্ষা অনানুষ্ঠানিকভাবে পরিবেশ থেকে(দেখা, মেলামিশা, অভিজ্ঞতা) গৃহীত হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান( স্কুল, কলেজ) থেকে গৃহীত হয়।বিশেষ করে মানুষের মস্তিষ্কের গঠন যেখানে চিন্তা,চেতনা, জ্ঞান সৃষ্টি হয় এবং যে জ্ঞানবুদ্ধি মানুষের সকল ক্রিয়াকর্ম নিয়ন্ত্রন করে; সেই মস্তিষ্কের চিন্তা, চেতনা ও জ্ঞানের স্তরগুলো তৈরী হয় প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ থেকে পঞ্চেন্দ্রিয়ের দ্বারা ইনপুট সমূহ গ্রহনের মাধ্যমে। নবজাত মানব শিশুর মস্তিষ্ক খাতার সাদা পাতার ন্যায় যা প্রায় ১০০ কোটি নিউরন দ্বারা গঠিত। জন্মের পর মস্তিষ্ক ক্রিয়া-ক্ষমতা শিক্ষার মাধ্যমে তৈরী হয়। মানুষ যেমন শিক্ষা গ্রহন করে; সে তেমন মানুষে পরিণত হয়।জৈব মানুষ ব্যক্তি মানুষে রূপান্তরিত হয়।একজন সামাজিক ব্যক্তি প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের প্রোডাক্ট।এজন্য দেশের সামাজিক পরিবেশ ও শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত ব্যক্তি সৃষ্টির হাতিয়ার।

বাংলাদেশের সামাজিক পরিবেশ ও শিক্ষা ব্যবস্থা আধুনিক প্রগতিশীল ব্যক্তি বা সামাজিক মানুষ সৃষ্টির জন্য খুব বেশী উপযোগী নয়।বিশেষ করে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মনস্ক কর্মক্ষম মানুষ তৈরীর উপযোগী নয়।তাছাড়া সংবিধানের ১ম,২য় ও ৩য় ভাগে বিধায়িত রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য অর্জনে ঐক্যবদ্ধ চেতনা(মুক্তিযুদ্ধের চেতনা) বিশিষ্ট ব্যক্তি সৃষ্টির উপযোগী একক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় স্থিরকৃত লক্ষ্য অর্জনের জন্য দেশে ঐক্যবদ্ধ চেতনার জনগণের অভাব রয়েছে। যদিও সংবিধানের অনু-১৭ অনুযায়ী দেশে একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন, সমাজের প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে; তথাপি দেশে কিন্ডারগার্টেন, মক্তব মাদ্রাসা, ক্যাডেট কলেজ প্রভৃতি নানামুখী শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয় চেতনা বিরোধী এবং চেতনার ঐক্য বিনাশী মানুষ সৃষ্টি করছে।চিন্তার স্বাধীনতার অভাবে সমাজে মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির মানুষের অভাব সৃষ্টি হচ্ছে।অবিলম্বে প্রাথমিক শিক্ষা পদ্ধতির বিভাজন নিরসন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মনস্ক নাগরিক সৃষ্টির উপযোগী প্রাথমিক শিক্ষা পদ্ধতির প্রচলন করা আবশ্যক।