ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বাংলাদেশে রাজনীতির নামে যা চলছে তাকে গণতন্ত্র বলা যায় না। ব্যক্তিতন্ত্র ও দলতন্ত্রের চরম অবস্থায় দুর্নীতি এবং দুর্বৃত্তিতন্ত্র এখন আমাদের মরণ ফাদ। রাজনীতির অঙ্গন লোভী, লুটেরা, সন্ত্রাসী, প্রতারক, ধোকাবাজদের দখলে। গণতন্ত্রের নামে জনগণকে ভোটদানের ফাদে ফেলে শাসন শোষণ অত্যাচার, নিপীড়ন করা হচ্ছে। ভোটের মাধ্যমে বড়জোর ব্যক্তি ও দলের ক্ষমতা দখলের পরিবর্তন হচ্ছে; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের নিয়ন্ত্রন যা গণতন্ত্রের মৌলিক কার্যকর শর্ত তা না থাকায় ঘুরে ফিরে ব্যক্তিতন্ত্র ও দলতন্ত্রের দৌরাত্ম স্থাপিত হচ্ছে। বহুদলীয় রাজনীতির নামে বাংলাদেশে আজ ফ্রি-স্টাইল চলছে; রাজনীতিবিদরা যেমন ইচ্ছা তেমন বলা ও করার উর্বর ক্ষেত্র পেয়েছে।

কিন্তু সেজন্য রাজনীতি নিষিদ্ধ বা বহুদলীয় ব্যবস্থা বন্ধ করার চিন্তা করা মারাত্মক ভ্রম। কেননা এর বিপরীতে আছে একদলীয় ব্যবস্থা, একনায়ক্তন্ত্র, সামরিকতন্ত্র যা আরও ভয়াবহ। বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল ধর্ম বর্ণ, শ্রাণী পেশা ও আদর্শের মানুষের মত প্রকাশ এবং রাজনীতিতে অংশ গ্রহনের সুযোগ দেয় যা সমাজকে প্রগতিশীল করে ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। তবে বহুদলীয় ব্যবস্থায় সমাজে বিভাজন, দলীয় ও গোষ্ঠী স্বার্থ ইত্যাদির সংঘাত সৃষ্টির সুযোগ ও থাকে। বাংলাদেশে যা এখন লাগামহীনভাবে চলছে। ব্যক্তি ও দলের ক্ষমতা বদলের নির্বাচনের রাজনীতি দিয়ে এর সমাধান হবে না। রাজনৈতিক পদ্ধতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। যাতে ব্যক্তি ও দল রাজনীতির নামে জনগণকে বিভক্ত করে শাসন শোষণ করতে না পারে। জনগণের কাছে জবাবদিহিতা (শুধু নির্বাচনের দ্বারা নয়) করার নিশ্চয়তা বিধানই হবে সংস্কারের মূল লক্ষ্য।

প্রত্যেকের মত প্রকাশ ও সংগঠন করার স্বাধীনতাকে কার্যকর রাখতে বহুদলীয় রাজনীতি অবশ্যই থাকতে হবে। তবে ফ্রি-স্টাইলের অবসান করতে দেশের সংবিধানের আওতায় সব দল ও গোষ্ঠী তাদের লিখিত রাজনৈতিক মেনিফেস্টো তৈরী ও প্রচার করবে। সকল দলের মেনিফেস্টো তৃণমূল পর্যায় হতে স্থানীয় সংসদ ( ইউনিয়ন/ওয়ার্ড সংসদ, উপজেলা সংসদ, জেলা সংসদ) এবং জাতীয় সংসদে আলোচনার মাধ্যমে একটা খসড়া মেনিফেস্টো তৈরী করা হবে। খসড়া মেনিফেস্টো গণসংসদের তিন চতুর্থাংশ ( ৭৫%) শংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হবার পর তা হবে জাতীয় মেনিফেস্টো। যা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্থানীয় ও জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে বিজয়ী সদস্যগণ উক্ত মেনিফেস্টো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করবেন। জাতীয় সংসদে সরকারী দল ও বিরোধী দল প্রথার বিলোপ করতে হবে। সংসদে উত্থাপিত বিলের পক্ষে ও বিপক্ষে যারা বলতে চান তারা স্পীকারের কাছে তাদের নাম দেবেন এবং আলোচনা শেষে ভোটের মাধ্যমে বিল গৃহীত হবে।

দলমত, ধর্ম বর্ণ, ভাষা সংস্কৃতি, সংখ্যালঘু নির্বিশেষে রাষ্ট্র সকলের। অতএব বহুদলীয় ব্যবস্থাকে ঐক্যবদ্ধ করে রাষ্ট্র ব্যবস্থার ঐক্য সাধনই হবে কল্যাণকর সংস্কার। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার সরকার গঠন প্রথা বাতিল করে সকল সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে সরকার প্রধান (প্রধানমন্ত্রী) ও অন্যান্য মন্ত্রীদের নির্বাচন করে মন্ত্রী পরিষদ বা সরকার গঠন করতে হবে। এভাবে সংসদ ও সরকার গঠন করলে বিভাজন ও দলীয় সঙ্ঘাত বন্ধ করা যাবে।সংসদ সদস্যগণ জনগণের প্রতিনিধি; কোন দলের প্রতিনিধি হওয়া বঞ্ছনীয় নয়। তেমনি একজন মন্ত্রি দেশের সবার জন্য; তিনি কোন দলের হতে পারেন না। বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকে সরকারের বিরোধীতা ও ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের জন্য বিশৃঙ্খলা সৃস্টি জনগণের কাম্য নয়। তাই নির্বাচিত হয়ে জাতীয় মেনিফেস্টো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করা সকল সংসদ সদস্যের কর্তব্য।