ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

শাসন ও শোষণ মূলক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে কমুনিজম বা সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার পর প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র (Direct Democracy), অংশগ্রহন মূলক গণতন্ত্র ( Participatory Democracy), আর্থিক গণতন্ত্র ( Economic Democracy) ইত্যাদি নামে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এসব আলোচনায় প্রতিনিধিত্ব মূলক ( Representative Democracy) গণতন্ত্রের সংস্কারের বিষয় প্রাধান্য পাচ্ছে। কিন্তু শোষণ মূলক ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য অর্থব্যবস্থা গণতন্ত্রায়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে না। অথচ শোষণ মূলক ব্যবস্থাই “ রাষ্ট্র বনাম জনগণ” অবস্থা সৃষ্টির মৌলিক কারণ।

সমাজে শোষণ মূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় দুই প্রকারের ক্ষমতা কেন্দ্রায়ন ও কুক্ষিগত করার ফলে— ১। রাষ্ট্রীয় সামাজিক ( socio- political Power) ক্ষমতা কেন্দ্রায়নের ফলে কতৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা স্থাপিত হয় এবং সমাজে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অকার্যকর হয়। সোসিও- পলিটিকাল ক্ষমতার কেন্দ্রায়ন হয় নির্বাচন ও আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে। সার্বজনীন ভোটাধিকারের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতার যে অংশীদারিত্ব জনগণের কাছে দেয়া হয় তা ভোটদানের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে কুক্ষিগত করা হয়। প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বস্তরে ( আইন, নির্বাহী, বিচার) জনগণের অংশগ্রহন না থাকায় সামান্য সংখ্যক প্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়; জনগণের সার্বভৌমত্ব নস্যাত হয়। এই সমস্যার সমাধানকল্পে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র ও অংশগ্রহন মূলক গণতন্ত্রের কথা বলা হচ্ছে। যেখানে ব্যক্তিকে প্রদত্ত রাষ্ট্র ক্ষমতা ( ভোটাধিকার) প্রশ্নাতীতভাবে হস্তান্তরিত হবে না; বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহনের মাধ্যমে ব্যক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যবহার করতে সক্ষম হবে এবং আইন প্রণয়নে, নির্বাহী কাজে, বিচার ব্যবস্থায় এবং আর্থিক নীতি ও বাজেট নির্ধারণে ভোটারদের অংশগ্রহন থাকবে।

২। আর্থ-সামাজিক (socio- Economic Power) ক্ষমতা কেন্দ্রায়নের ফলে শোষণ মূলক ব্যবস্থা স্থাপিত হয় এবং সমাজে বেকারত্ব, দারিদ্র ও অসহায় শ্রমজীবিদের সৃষ্টি হয়। আর্থ-সামাজিক ক্ষমতার কেন্দ্রায়ন হয় সম্পদ ও উতপাদনের উপায়ের মালিকানা কুক্ষিগত করার মাধ্যমে। সম্পদ ও উতপাদনের উপায় ব্যক্তি ও শ্রেণীর কাছে কুক্ষিগত হলে সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী শ্রমবিক্রয়কারী শ্রেণীতে পরিণত হয়। এবং মার্ক্সীয় তত্বে দেখান হয়েছে যে “ক্যাপিটাল উদ্বৃত্বমূল্য আত্মসাতের মাধ্যমে শ্রমকে শোষণ করে”। অতএব ক্যাপিটালের মালিকানার অংশীদারিত্ব শ্রমদানকারীর ভাগে নিশ্চিত করা না গেলে উক্ত আত্মসাত করা মূল্যের অংশ শ্রমদানকারীরা পাবে না এবং শোষণ বন্ধ হবে না। আর্থিক গণতন্ত্রে তথা ইকোনমিক ডেমোক্রেসিতে এই বিষয়টা স্পষ্ট হওয়া বিশেষ প্রয়োজন। কারণ ক্যাপিটালের মালিকানা ধনিক শ্রেণী বা রাষ্ট্রের ( সমাজতন্ত্র) কাছে কুক্ষিগত রেখে সমাজ থেকে শোষণ নির্মূল করা যাবে না।

সমাজে আয়ের উপায়গুলো হলো —-১। মুজুরী, বেতন, বোনাস ইত্যাদি যা শ্রম বিক্রয়ের বিনিময়ে অর্জন করা হয়। ২। খাজনা, ভাড়া, টোল, রাজস্ব ইত্যাদি সম্পদ, সরঞ্জাম, অবকাঠামো ইত্যাদি ভাড়া দিয়ে ও রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে আয় করা হয়। ৩। লাভ, কমিশন ইত্যাদি যা পণ্য ও সেবা বিক্রয়ের মাধ্যমে আয় করা হয়। ৪। সুদ, ডিভিডেন্ড ইত্যাদি যা অর্থলগ্নি ও পুজি খাটিয়ে আয় হয়। এখানে শ্রমবিক্রয়কারীরা ১ নং এ বর্ণিত আয় ব্যতীত অন্য ২,৩,৪ নং এর আয় পায় না। কারণ মালিকানা না থাকায় ক্যাপিটাল সংক্রান্ত আয় তাদের অংশে যায় না। কারণ আয় বন্টিত হয় উতপাদনের ফ্যাক্টর হিসেবে। সুতরাং ক্যাপিটালের অংশীদারিত্ব শ্রমদানকারী শ্রমিকদের না থাকলে শোষণ বন্ধ হবে না।

বাংলাদেশে কৃষি উতপাদনের উপায় ( ভূমি) ক্ষুদ্র মালিকানা ব্যবস্থায় কৃষি উতপদন কার্য চালু আছে। কিন্তু কৃষি সংক্রান্ত অন্য বিষয় যেমন সেচ, জলাবদ্ধতা দূর, বন্যা নিয়ন্ত্রন, বিদ্যুত সরবরাহ, সংরক্ষণাগার, বাজার ব্যবস্থা ইত্যাদির সমবায় ও আধুনিকায়ন না হওয়ায় ক্ষুদে উতপাদক কৃষকরা উতপাদন বৃদ্ধি করতে পারলেও তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মধ্যসত্বভোগীরা ব্যবসায়ী ক্যাপিটালের দ্বারা শোষণ করছে। একই ভাবে ক্ষুদ্র শিল্প উতপদনকারীরা ( কামার, কুমোর, তাতী, জেলে, গোয়ালা ইত্যাদি) তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় না; তারা আড়তদার, বড় ব্যবসায়ীদের দ্বারা শোষিত হয়।

উক্ত সমস্যা সমাধানের জন্য উতপাদনকারীদের মালিকানায় ক্যাপিটাল ফান্ড গড়ে তুলতে স্থানীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগ তহবিল গঠন করতে হবে। ক্যাপিটালের মালিকানায় ক্ষুদে উতপাদনকারীদের অংশীদারীত্ব বহাল করতে; আর্থিক প্রবাহ চক্রের ( সঞ্চয়- বিনিয়োগ- উতপাদন- বিনিময়- বন্টন- ) কর্মকান্ডে সহজে অংশ নিতে এবং স্থানীয় জনগণ আর্থিক নীতি ও বাজেট প্রণয়নের মাধ্যমে আর্থিক প্রবাহ চক্রের প্রতিটা ক্ষেত্রে অংশ নিয়ে নিজদের সমস্যার সমাধান করতে পারে সেজন্য স্থানীয় স্থানীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগ তহবিল ব্যবহৃত হবে। শ্রমজীবি জনগণকে ক্যাপিটালের মালিকানা দিতে স্থানীয় ( ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা) সঞ্চয় ও বিনিয়োগ তহবিল গড়ে তুলতে হবে যার ৬০% হবে স্থানীয় অধিবাসীদের; ২০% হবে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ( ব্যাংক, বীমা, শেয়ার মার্কেট ইত্যাদি) গুলোর এবং ২০% হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। ফান্ডের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে একই হারে অর্থাৎ ৬০%, ২০%, ২০% প্রতিনিধিত্ব থাকবে। স্থানীয় সংসদ ( ইউনিয়ন সংসদ, উপজেলা সংসদ, জেলা সংসদ) সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত অর্থ পরিষদ গঠিত হবে যার সদস্য হবে পণ্য ও সেবা উতপাদনকারীদের প্রতিনিধি। এই পরিষদ সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সার্বিক তত্বাবধান করবে এবং ফান্ড শিডিউল ব্যাংকে একাউন্টের মাধ্যমে অপারেট করা হবে। এই ফান্ড স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান, উতপাদন, কৃষি দ্রব্য সংরক্ষণ, বাজারজাত ইত্যাদিতে অর্থ সরবরাহ করবে। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলায় এই ফান্ড গড়ে তুললে প্রচলিত ঋণ ব্যবস্থার( ব্যাংক, এন জি ও) শোষণ বন্ধ হবে। এভাবে অর্থ ব্যবস্থার গণতন্ত্রায়ন করলে আর্থিক প্রবৃদ্ধি উতপাদনকারী শ্রমজীবিদের মাঝে বিতরিত হবে; শোষণের মাধ্যমে ধনী দরিদ্র সৃষ্টি বন্ধ হবে এবং শোষণমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করা যাবে।