ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

‘ফজলুল হকের মন্তব্যের জবাব’ শিরোনামে শনিবারের চিঠি গত ১০ সেপ্টেম্বর একটি পেষ্ট দিয়েছিলেন। তাতে তিনি যে কৈফিয়ত দিয়েছিলেন তার প্রেক্ষিতে আমি একটি মন্তব্য করেছিলাম। সেটিতে সর্বশেষ তার কাছে চারটি প্রশ্ন রেখেছিলাম। কিন্তু তিনি এখন পর্যন্ত প্রশ্নগুলোর জবাব দেননি।
আমার প্রশ্ন সম্বলিত মন্তব্যটি ছিল-

আমার প্রথম মন্তব্যের মূলকথা ছিল-

এ সময়ে জামাত-শিবির প্রসঙ্গ কেন। এখন তো দেশের সমস্যা জামাত-শিবির নয়। মানুষের দৃষ্টিকে ভিন্নদিকে প্রবাহিত করার জন্য এটা অপকৌশল।

দ্বিতীয় মন্তব্যে আমি নিজেই বলেছি-

জামাত স্বাধীনতার বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছিল অথ্যাৎ তারা অখন্ড পাকিস্তান চেয়েছিল। শুধু জামাত নয়, আরও কয়েকটি ইসলামী ও বামপন্থী দলের একই অবস্থান ছিল। দেশ স্বাধীন হওযার পর থেকে জামাত দেশের অস্তিত্ব মেনে নিয়ে রাজনীতি করছে। আর জামাত শিবিরের রাজনীতিকে আওয়ামীলীগ-বিএনপি সবাই স্বীকার করে নিয়েছে একসাথে আন্দোলন করে, সংসদে বসে।

এই মন্তব্যে আরেকটি দিক ছিল-

স্বাধীনতা বিরোধীতা আর মানবতা বিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ কী এক জিনিস? জামাত দলীয়ভাবে রাজাকার বাহিনী গঠন করেছে এমন কোন প্রমাণ কী আছে? পাকিস্তান সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গঠিত এসব বাহিনীতে ব্যক্তিগতভাবে অনেকে যোগ দিয়েছিল। অনেক পাড়ায় যুবকদের ভাগ করে মুক্তিবাহিনী ও রাজাকার বাহিনীতে পাঠানোর খবর আমরা শুনি।

মস্তব্যের আরেকটি দিক ছিল-

শুধু স্বাধীনতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থানের কারনে যদি কোন দলের বিচার হতে হয়, তাহলে সেটা শুধু জামাতের বেলায় হবে কেন? অন্য দলগুলো বাদ যাবে কেন। আর তখন জামাতের শক্তি সামর্থ অনেক কম ছিল।

আরেকটি দিক ছিল-

যুদ্ধাপরাধের বিচার থেকে বিচার মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারে গেল কেন? আর মানবতা বিরোধী অপরাধ যুদ্ধাপরাধীরাইতো করেছে। আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত হয় সামরিক অফিসাররা। তাদের অধীন সৈনিকদের পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধী সাবস্ত করা যায় না। বঙ্গবন্ধু যে ১৯৫ জন কে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন তাদের ছেড়ে দেয়া হলো। এখন কেবল জামাতের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে ধরে বিচার করা হচ্ছে।

আরেকটি দিক ছিল-

যে ট্রাইব্যুনালে বিচার হচ্ছে সেই ট্রাইব্যুনালের প্রধান বিচারপতি ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি তাদের গণতদন্ত কমিশনের উকিল ছিলেন। তিনি কিভাবে ন্যায়বিচার করবেন? আর ট্রাইব্যুনালে যারা আইনজীবী ও তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে আছেন তারা যে ভাষায় কথা বলছেন তাতে তাদের নিরপেক্ষতার কোন কিছু থাকছে?

আরেকটি দিক ছিল———

ট্রাইব্যুনাল তাদের সুবিধামতো বধি বানাচ্ছ,আসামীদের জামীন বন্ধ রাখছ,অভিযোগপত্রের বিষয়ে আসামী পক্ষকে অন্ধকারে রাখছ, বিদেশী আইনজীবী নিয়োগ দিতে দিচ্ছেনা। আসামী পক্ষের কোন আবেদনই ট্রাইব্যুনাল আমলে নিচ্ছেনা। অভিযোগ গঠনের আগেই আসামীদের অপরাধী আখ্যায়তি করে কথা বলা হচ্ছ।এগুলোকে আপনি স্বাভাবিক বলবেন ? আইনের ব্যাপারে আর্ন্তজাতিক মহল থেকে আপত্তি এসেছে। আইনের ১৭টি ধারায় সংশোধনের কথা এসছে।সেগুলো আমলেই নেয়া হলোনা।

জবাবে আপনি আলাদা পোস্টে যা বলেছেন তাতে আমার মন্তব্যের জবাব কী আপনি দিয়েছেন?

এক:
আমি নিজেই যেখানে বলেছি জামাত স্বাধীনতার বিরোধী ছিল, যেখানে যে পত্রিকার নাম শুনলে আপনাদের মাউথ ওয়াশ করতে হয় সেই পত্রিকার উদ্ধৃতি দিয়ে পোষ্টটিকে দীর্ঘ করলেন। জামাতের এসব বক্তব্য অবশ্যই তাদের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে ছিল এবং তাদের রাজনৈতিক অবস্থান যে সঠিক ছিল না সেটা স্বাধীন বাংলাদেশকে মেনে নিয়ে এদেশে আলাদা রাজনৈতিক দল হিসেবে রাজনীতি করার মধ্য দিয়েই তা পরিস্কার হয়ে উঠে।
এসব বক্তব্য প্রমাণ করেনা তারা মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছেন। যদি তাই হয় তাহলে মানবতা বিরোধী বা যুদ্ধাপরাধের সংজ্ঞা পাল্টাতে হবে।

দুই:
আল-বদর বাহিনীর পুরো স্কোয়াডই ছিল ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্যদের নিয়ে- ।
না এটা মোটেও প্রমাণ করেনা। আলবদর বাহিনী ছাত্রসংঘের সদস্যদের তৈরী তার প্রমাণ দেখান পারলে।

তিন:
জামাতের সাথে আন্দোলনের ব্যাপারে যে যুক্তি দাঁড় করালেন তা হাসির খোরাক । যে জামাতের নাম উচ্চারণ করলেই আপনাদের মুখ নাপাক হয়ে যায়, যাদের শেষ করতে পারলেই যেন বাঁচেন তাদের সাথে একসাথে বসাকে ইয়াহিয়ার সাথে বৈঠকের সাথে তুলনা করলেন। বাহ চমৎকার! কিসের সাথে কী, পান্তা ভাতে ঘি।

চার:
স্বাধীন দেশে জামাতের বিরোধিতার ব্যাপারে যা বললেন তাতেও আমার মন্তব্যের জবাব নেই। আপনি তাহলে পরিস্কারভাবে বলে দিন স্বাধীনতার বিরোধীতার জন্যই বিচার হচ্ছে। আর সেই বিচার যদি হয় স্বাধীনতার বিরোধীতাকারি সকল দল, ব্যক্তিকে তার আওতায় নিয়ে আসেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী পরিবারের সাথে সম্পর্কিত যারা আছে তাদেরকেও। সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সাহেবদেরকেও। সেই বুকের পাটা নো নেই।

পাঁচ:
জামাত স্বাধীন দেশের বিপক্ষে কাজ করছে এটা তার প্রমাণ হলো? যে স্টাইলে যাদের বিচার করছেন তাকে রাজনৈতিক বলাটা একেবাইে বাস্তব। স্বাভাবিক নিয়মে আইনের স্বাভাবিক গতিতে বিচার করলে এটা কেউই বলতে পারতো না। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমও একই কথা বলেছে। দি ইকোনমিষ্ট কী বলেছে একটু দেখে নিতে পারেন।

জামাতের জঙ্গী সংশ্লিস্টতার কোন প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে, কোথায় পেলেন আপনি? মিডিয়া দুরবীন নিয়ে খুঁজে নানাভাবে জামাতের লিংক আপ বার করার চেস্টা করেছে। এখন পর্যন্ত পারেনি। পারলে এতো দিনে জামাত নিষিদ্ধ হয়ে যেত, হুজির মতো।
আর ইসলামী ব্যাংকে কেন যে কোন ব্যাংকে সন্দেহজনক লেনদেন হতে পারে। সেটা জামাতের বিষয় নয়। ইসলামী ব্যাংক জামাত সমর্থিত লোকদের হতে পারে সেটা জামাত নিয়ন্ত্রন করেনা।

ছয়:
’৭০ এর নির্বাচনে জামাতের চেয়ে আরও বড় দল ছিল যারা পরবর্তীতে স্বাাধীনতা বিরোধী ছিল তাদের প্রসঙ্গ বাদ কেন সেই প্রসঙ্গ এনেছিলাম। কারণ এখন জামাতই রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর। সেটাই আপনাদের মাথা ব্যাথা।

সাত:
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিষয়ে আপনি সেটা বলেছেন সেটা আমার প্রশ্নের জবাব হলোনা। স্বাধীনতার বিরোধীতা করাই কী মানবতা বিরোধী অপরাধ। আর মানবতা বিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ যারা করলো তাদের বিচারের কোন খবর নেই আপনাদের ভাষায় যারা সহযোগী তাদের বিচার নিয়ে কী মাতামাতি আপনাদের। আপনি যে তথ্য প্রমান উপস্থাপন করলেন তাতে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বললে অসুবিধা কোথায় ছিল। নাম পরিবর্তন করতে হলো কেন? আবার ডোমেস্টিক বিচার বলা হচ্ছে কেন? আন্তর্জাতিক আইনজীবীদের আসতে দেয়া হচ্ছেনা কেন?
এজন্য যে, যুদ্ধাপরাধী বললে মূল যুদ্ধাপরাধীদের আগে বিচার করতে হবে। সেটা করার মুরোদ আপনাদের নেই। জামাতিরে পেয়েছেনতো তাদের শায়েস্তা করবেন তাই এতোকিছু।

সর্বশেষ যে সব গল্প উপস্থাপন করলেন এ ধরনেবর গল্প দিয়েই জামাত নেতাদের বিচারের চার্জশীট সাজানো হচ্ছে। এগুলোকে আমলে নেয়ার জন্য আইন ও বিধি আপনারাই তৈরী করেছেন। এগুলো পৃথিবীর কোন আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয় কিনা সময়ই বলে দেবে। গায়ের জোরে সাময়িকভাবে অনেক কিছু করা যায়, বলা যায়, কিন্তু সেটা স্থায়ী হয় না।

শাহরিয়ার কবিরদের তৈরী, লেখা, গল্প, নাটক, উপন্যাস ডকুমেন্টারি দিয়ে বিনোদিত হওয়া যায়, কিংবা কারো বিরুদ্ধে ঘৃনা-বিদ্বেষ ছড়ানো যায়, সত্যিকার বিচার করা যায় না। বিচার করতে হলে সাক্ষ্য প্রমাণ লাগে। অবশ্য আপনাদের রাজ্যে সে ধরনের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য প্রমানের দরকার পড়বেনা।

সর্বশেষ শনিবারের চিঠির কাছে প্রশ্ন রাখলাম
১. স্বাধীনতার পর সাড়ে তিন বছর আওয়ামীলীগ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ক্ষমতায় ছিল। তখন যুদ্ধাপরাধীদের নামের তালিকা হয়েছিল। তাতে জামাতের বর্তমান নেতাদের নাম কেন ছিল না। কেন শুধু ১৯৫ সামরিক কমকর্তার নাম ছিল। তদের ছেড়ে দেয়া হলো কেন? এখন বিচার হলে প্রথমে তাদের বিচার এখন হবেনা কেন?

২. ওই সময় রাজাকার-দালালদের একটি তালিকা হয়েছিল এবং সেই তালিকা থেকে কয়েক শ’ লোকের বিচার হয়েছিল সেই তালিকার কোনটিতে কেন জামাতের এসব নেতাদের নাম ছিল না ?

৩. স্বাধীনতার এতো বছরে এসব জামাতীরা হত্যা, ধর্ষণ অগ্নি সংযোগের মতো ঘটনার সাথে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে দেশের কোথাও কোন মামলাতো দুরে থাক ডিজি পর্যন্ত হয়নি কেন?

৪. জামাত এতোই অপকর্ম করলে সর্বশেষ সংবিধান সংশোধনের সময় ধর্মভিত্তিক দল বা জামাতকে স্বাধীনতায় নেতৃত্বদানকারি দল আ’লীগ নিষিদ্ধ করলনা কেন ?

শনিবারের চিঠি বা ব্লগে তার সহযোদ্ধাদের কেউ এই চারটি প্রশ্নের জবাব দেবেন কী ?