ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

গ্রন্থাগারকে লাইব্রেরি নামেই বেশি চিনি আমরা। দেশের সিংহভাগ মানুষ লাইব্রেরি বলতে বুঝে বইয়ের দোকানকে। বইয়ের দোকানগুলোর নামের সাথে লাইব্রেরি শব্দ যুক্ত থাকাই এর কারণ। সমাজে গ্রন্থাগারের অনুপস্থিতি ও অবমূল্যায়নের সুযোগে এই বইয়ের দোকানগুলোই তাদের নিকট গ্রন্থাগার হয়ে গিয়েছে। যে কারণে আমরা জানিনা লাইব্রেরি মানে বই কিংবা শিক্ষাসামগ্রী বিক্রির স্থান নয়। লাইব্রেরি মানে জ্ঞান সংগ্রহের স্থান, জ্ঞান সংরক্ষণের স্থান, জ্ঞান সংগঠনের স্থান, জ্ঞান অনুসন্ধানের স্থান, জ্ঞান বিতরণের স্থান, জ্ঞান বিকাশের স্থান।

গ্রন্থাগার একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান।  সংজ্ঞায়ন করলে বলা যায়, যে সামাজিক প্রতিষ্ঠানে জ্ঞান সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিতরণ করা হয় তাকেই গ্রন্থাগার বলে। জ্ঞানচর্চার অন্যতম উপকরণ বই, পত্রিকা, সাময়িকী ইত্যাদি সংরক্ষণের কেন্দ্র হচ্ছে গ্রন্থাগার। এজন্য গ্রন্থাগারকে বলা হয়ে থাকে জ্ঞানের ভাণ্ডার। গ্রন্থাগার শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অপরিহার্য হিসেবেই বিবেচিত নয়। বিভিন্ন অফিস, আদালত, গবেষণা কেন্দ্র, মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, দপ্তর, পরিদপ্তর, এনজিও, ল’ ফার্মসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও একান্ত প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে গ্রন্থাগার বিবেচিত। গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য হলো, তথ্যসম্পদ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিতরণ ও তথ্যসেবা দানের মাধ্যমে শিক্ষা, গবেষণা ও অন্যান্য মৌল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা।

 

চিত্র: চীনের ন্যাশনাল লাইব্রেরি। সূত্র: en.chinaculture.org

মানব সভ্যতায় গ্রন্থাগারের উদ্ভব ঘটেছে সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগেই। মানুষ যখন গাছের বাকল কিংবা পাথরে খোদাই করে লিখতো, তখন থেকেই মানুষের মধ্যে জ্ঞানকে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেই তখন থেকেই গ্রন্থাগারের উদ্ভব। অতীতে রাজা-বাদশাহদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিশাল বিশাল গ্রন্থাগার গড়ে উঠেছিলো। প্রাচীন গ্রন্থাগার হিসেবে পরিচিত আসুরবানিপালের গ্রন্থাগার, আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার, পার্গামাম গ্রন্থাগারগুলোর ইতিহাস থেকে আমরা তার নমুনা দেখতে পাই। মধ্যযুগে ইউরোপ যখন বিদ্যালয় কাকে বলে জানতো না, তখন স্পেনের মুসলিমরা জ্ঞান চর্চার জন্যে যে অগণিত বই ব্যবহার করতো তার নামের তালিকাটাই ছিল ৪৪ খণ্ডে বিভক্ত। স্পেনের তৎকালিন কার্ডোভা লাইব্রেরীতে ধর্মীয় গ্রন্থাদি, গণিতশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র, দর্শন, আইন ইত্যাদি বিষয়ের প্রায় চল্লিশ লাখের এক বিশাল সংগ্রহশালা গড়ে উঠেছিল।

তবে প্রাচীন ও মধ্যযুগের একটি প্রধান সমস্যা ছিলো গ্রন্থ ও গ্রন্থাগারের উপর নগ্ন হামলা। আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাচীনতম গ্রন্থাগারটি ধ্বংস করা হয়েছিল। ফরাসি দেশে হিটলারের আমলে নাৎসিরা অনেক গ্রন্থাগারের বই পুড়িয়ে দিয়েছিল। খোদ রাজধানী বার্লিন শহরে বেবেল লাইব্রেরির বইগুলো রাজপথে এনে সমস্ত রাত ধরে পুড়িয়েছিল নাৎসিরা। এই গ্রন্থাগারটি ব্যবহার করতেন কার্ল মার্কস, ফেডরিখ এঙ্গেলস্‌ ও হেগেলের মতো দার্শনিকগণ। ১৪৯২ সালে স্পেনকে করায়ত্ব করার পর খ্রিস্টানরা সেখানকার কার্ডোভা লাইব্রেরিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, কর্ডোভা লাইব্রেরির গ্রন্থসমূহের ধ্বংসাবশেষের স্তুপে গোয়াদেল কুইভার নদীর স্রোত বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। যুগে যুগে এসব গ্রন্থাগার ধ্বংসের মূলে কখনো ছিলো পরাজিত পক্ষের উপর ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো, কখনো বা ছিলো ভিন্ন জাতির শ্রেষ্ঠত্ব, কীর্তি ও আবিস্কারকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা।

অতীতের যুদ্ধ-বিগ্রহগুলোতে এসব ধ্বংসযজ্ঞের কারণে অনেক পুরনো সভ্যতা ও ইতিহাস সম্পর্কে আমরা কিছুই জানতে পারিনি। পরবর্তীতে অবশ্য যুদ্ধের আন্তর্জাতিক নীতিমালায় গ্রন্থাগারসহ সভ্যতার পরিচায়ক স্থাপনাসমূহ ধ্বংসের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কারণ গ্রন্থাগারগুলো পুরনো সভ্যতাসমূহের পরিচয় কৃষ্টি সংস্কৃতি সংরক্ষণ করে যুগ থেকে যুগ, শতাব্দি থেকে শতাব্দি ধরে। তখন থেকেই মনুষ্য সমাজে গ্রন্থাগার তার প্রাপ্য মর্যাদা পেতে শুরু করে।

বাংলাদেশের যশোর, বরিশাল, রংপুর ও বগুড়ায় সর্বপ্রথম ১৮৫৪ সালে সরকারিভাবে ৪টি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে ৬৪টি জেলার প্রত্যেকটিতে গণগ্রন্থাগার রয়েছে। গণগ্রন্থাগার তৈরি করা হয় সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের গ্রন্থাগারগুলোর সাথে সকল শ্রেণীর মানুষের যোগাযোগ নেই বললেই চলে। বিসিএস শিক্ষার্থী ছাড়া সেগুলোতে অন্যদের দেখা মেলেনা। একটি দেশের শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে গ্রন্থাগার। উচ্চশিক্ষার হার সমৃদ্ধ দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখবো সেখানকার সমাজে গ্রন্থাগারের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। কেরালা প্রদেশ ভারতের একমাত্র শতভাগ শিক্ষার হার সমৃদ্ধ প্রদেশ হয়েছে সমাজের সর্বস্তরে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা ও এর সাথে মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা তৈরির মাধ্যমেই।

গ্রন্থাগার জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কার্যকরী ভূমিকা রাখে। আমাদের রাজনীতিকরা তাদের বক্তৃতা বিবৃতিতে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বার বার উচ্চারণ করলেও আজ পর্যন্ত কোনো সরকারই গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা কিংবা সংস্কারের প্রতি জোর দেয়নি। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে একটি গ্রন্থাগার আইন পর্যন্ত প্রণয়ন হয়নি। গ্রন্থাগার পেশাজীবিরা দীর্ঘদিন ধরেই যার জন্য আন্দোলন করে আসছেন।

সামাজিক, অর্থনৈতিক, যোগাযোগ, নারীর ক্ষমতায়নসহ সব সূচকে প্রতিনিয়তই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি পরিচালনার জন্য সৃষ্টি করা হচ্ছে নতুন নতুন পদ। উন্মুক্ত করা হচ্ছে পদোন্নতির ব্যবস্থা। ধারাবাহিকভাবে দেয়া হচ্ছে পদোন্নতিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে বাস্তবতা হচ্ছে পুরো এর বিপরীত। সম্ভবত মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, পরিদপ্তরে (গণগ্রন্থাগার ও বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রন্থাগার ব্যতীত) শুধু গ্রন্থাগারিক ও মসজিদের ইমামদের কোনো পদোন্নতির ব্যবস্থা নেই।

আরো করুণ দশা স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় নিয়োজিত গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের। আজ পর্যন্ত তাদেরকে পূর্ণ শিক্ষক হিসেবেই মর্যাদা দেয়া হয়নি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোর গভর্নিং বডি সংবিধি ২০১৫-এ গ্রন্থাগারিকদের শিক্ষক হিসেবে বলা হলেও বাস্তবে সেটা কর্যকর হচ্ছে না। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বোর্ড তো গ্রন্থাগারিক ও সহকারী গ্রন্থাগারিকরা শিক্ষক হিসেবে গণ্য হইবেন না বলে পরিপত্র জারি করেছেন। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ গ্রন্থাগারিকদের সেবা প্রদানের পরিবর্তে অন্যান্য কাজের দায়িত্ব দিচ্ছেন এবং প্রায়ই তারা কর্তৃপক্ষের রুঢ় আচরণের শিকার হচ্ছেন। এভাবেই চলছে বাংলাদেশের গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের হতাশায় ভরা জীবন।

তবে হাজারো হতাশার ভিড়ে আনন্দের খবর হচ্ছে বাংলাদেশে প্রথমবারের মত পালিত হয়েছে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস। অনেক প্রতীক্ষার পর সরকার ৫ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। এবারের দিবসটির স্লোগান ছিলো ‘বই পড়ি, স্বদেশ গড়ি’। বাংলাদেশে গ্রন্থাগার আন্দোলনের জন্য এই দিনটি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। গ্রন্থাগার আন্দোলনকারীদের জন্য এটি একটি বিজয়। একটি বড় অর্জন। দীর্ঘদিন পর অবহেলিত গ্রন্থাগার ও গ্রন্থাগার পেশাজীবিদের ন্যয্য দাবি আদায়ের অন্তত একটি উপলক্ষ্য পাওয়া গেলো। এই উপলক্ষ্যের হাত ধরে শীগ্রই এদেশে একটি কার্যকরী গ্রন্থাগার আইনও প্রণয়ন হবে। মোটকথা এই দিবস বাংলাদেশে গ্রন্থাগার বিপ্লবের পথকেই উন্মোচন করবে।

আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতেও গ্রন্থাগার আইন প্রণয়ন করা হয়েছে কয়েক যুগ আগেই। আমাদের কাছের পশ্চিমবঙ্গে উচ্চ আদালতের নির্দেশে কলেজগুলোয় লাইব্রেরিয়ান, সহকারী লাইব্রেরিয়ান, ডেপুটি লাইব্রেরিয়ানদের টিচিং স্টাফ হিসেবে গণ্য করে শিক্ষকদের সমান সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মত করে বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের উপযুক্ত পদমর্যাদা ও পদোন্নতির ব্যবস্থা নির্ধারণ করে কর্তৃপক্ষ পরিপত্র জারি করবেন- এ প্রত্যাশা ভুক্তভোগী গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের।

গ্রন্থাগার এখন কেবলই গ্রন্থাগার নেই। এখন একে বলা হয় ইনফরমেশন সেন্টার বা তথ্যকেন্দ্র। বর্তমান তথ্য বিষ্ফোরণের যুগে এ এক অপরিহার্য উপাদান। বর্তমানে এখানে শুধু বইই থাকে না। এখানে থাকে কম্পিউটারাইজড তথ্য সামগ্রী, অডিও-ভিডিও সামগ্রী, ই-বুক, ই-জার্নাল, আরো অসংখ্য আধুনিক তথ্য সামগ্রী। এখন আর গ্রন্থাগার চার দেয়ালের মধ্যেও আবদ্ধ নেই। ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন গ্রন্থাগার পৌঁছে গেছে মানুষের ঘরে ঘরে। ওপেক সেবার মাধ্যমে এখন ঘরে বসেই তথ্য অনুসন্ধান ও বই রিজার্ভ করতে পারছে ব্যবহারকারীরা।

তথ্য থেকেই জ্ঞানের উৎপত্তি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে ও বিভিন্ন মাধ্যমে থাকা জ্ঞানকে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সংগঠনের মাধ্যমে সঠিক গ্রাহককে সঠিক তথ্যটি সঠিক সময়ে প্রদান করে গ্রন্থাগার তথা তথ্যকেন্দ্র। চীন দেশের একটি প্রবাদের মাধ্যমেই লেখা শেষ করবো। প্রবাদটি হলো- ‘তুমি যদি এক বছরের পরিকল্পনা করো তাহলে শস্য রোপণ কর, তুমি যদি দশ বছরের পরিকল্পনা করো তাহলে গাছ লাগাও, আর যদি হাজার বছরের পরিকল্পনা করে থাক তাহলে মানুষ তৈরি কর।’ আসুন আমরা হাজার বছরের পরিকল্পনা করি। মানুষকে জ্ঞানের ভাণ্ডার গ্রন্থাগারমুখী করি।