ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

চোর-পুলিশ-ডাকাত-পাবলিক

ছোটবেলায় আমরা ভাইবোনরা মিলে একটা খেলা খেলতাম, ‘চোর-পুলিশ’। খেলায় ৬টা পোস্ট থাকতো রাজা, রানী, মন্ত্রী, চোর, পুলিশ, ডাকাত। ৬টা কাগজে আলাদা করে নাম লেখা থাকতো। বারবার ৬টা কাগজ ফালানো হতো এবং সবাই একটা করে কাগজ তুলে নিতো। তারপর পোস্ট অনুযায়ী পয়েন্ট ভাগ হতো। রাজা সবচে বেশি, তারপর রানী, তারপর মন্ত্রী। তবে পুলিশের পয়েন্টে একটা ভেজাল ছিলো। সেটাই ছিলো খেলার মজা! পুলিশকে পালা অনুযায়ী চোর/ ডাকাত খুঁজে বের করতে হতো ২ জনের মধ্যে। যে ২ জনের হাতে চোর, ডাকাতের কাগজ পড়েছে তাদের পুলিশের সামনে দাড়া করানো হতো। ১-১০ গোনার মধ্যে বলতে হবে, কে চোর বা ডাকাত? ঠিক ধরতে পারলে পুলিশের পয়েন্ট, চোর/ ডাকাতের পয়েন্ট কাটা। আর ভূল বললে পুলিশের পয়েন্ট কাটা, চোর+ডাকাত দুজনেই পয়েন্ট পাবে। এই ঝামেলার কারনে আমরা কেউই সাধারণত চোর/ পুলিশ/ ডাকাত হতে চাইতাম না। পুলিশ তো একদমই না!!

পুলিশের কাজ আসলেই ঝামেলার। কারও চেহারায় তো আর লেখা থাকেনা ‘আমি চোর’, ‘আমি ডাকাত’ কিংবা ‘আমি ছিনতাইকারি’। খেলার সেই জটিল কাজটা এখনকার কিছু পুলিশ অফিসার অনেক সহজ করে ফেলেছেন। দেখে মনে হলো ডাকাত, ব্যস্ ধরে নিয়ে গেলো। তারপর যদি ভূল হয় তাহলে বেদম মারধর, চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা। পয়েন্ট মিস যাওয়ার কোন চান্স-ই নেই। এমন মার খেয়ে তো যে কেউ স্বীকার করে নেবে ‘আমি চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারি! এটা আমাদের বংশীয় পেশা!!’ তারপর যত অমীমাংসিত ডাকাতির কেস থানায় আছে দেখেশুনে একটার আসামী হয়ে ‘রাখিবো নিরাপদ, দেখাবো আলোর পথ’ এর দিকে যাত্রা অর্থ্যাৎ কেন্দ্রীয় কারাগার।

কিন্তু আব্দুল কাদের তা করলেন না। কারন তিনি সত্যি সত্যি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিভাগের ছাত্র। থাকেন এফএইচ হলের ২০২ নং কক্ষে। তার কাছে পরিচয়পত্রও ছিলো। কিন্তু পুলিশের চোখ কি ভূল করতে পারে?? মোটেই না। ব্যাটা এত কষ্ট করে রাতের বেলা ডিউটি দিয়ে তোরে ধরলাম, এই কষ্ট বৃথা যেতে দেবো না!! খিলগাঁও থানার ওসি বলে কথা, ‘পড়েছো পুলিশের হাতে, চোর-ডাকাত-ছিনতাইকারি একটা না একটা কিছু তো তোমাকে হতেই হবে!’ কিন্তু আব্দুল কাদের খেলার নিয়ম মানতে চাইলেন না, তিনি চাইলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হতে। সেখানেই তো সমস্যাটা বাধলো। ওসি হেলাল তো পয়েন্ট হারাতে পারেন না। আটককৃত ব্যক্তিকে তো একটা কিছু বানাতেই হবে!

আমাদের খেলায় মাঝে মাঝে ঝগড়া হলে সাথে সাথে কেউ গিয়ে মুরুব্বিদের খবর দিতে। একজন মুরব্বী এসে ধমকধামক দিয়ে খেলা শেষ করে দিতেন। ভাগ্য ভালো আমাদের ঢাকা শহরে কিছু ভালো সাংবাদিক আছেন যারা খবরটা মুরুব্বিদের (হাইকোর্ট) জানাতে পেরেছেন। আশা করি এই চোর-ডাকাত-পুলিশ খেলাটা মুরুব্বীরা ধমক দিয়ে বন্ধ করতে পারবেন।

তবে আমাদের খেলায় ‘পাবলিক’ নামে কোন পোস্ট ছিলো না। থাকলে খুবই ভালো হতো। আমরা সবাই রাজা, রানী, মন্ত্রী, পুলিশ না হয়ে পাবলিক হতে চাইতাম!! কারন পাবলিক হওয়া সবচে সহজ এবং মজার হতো। পাবলিক হলে চোর/ ডাকাত দুইজনকেই ইচ্ছামতো পিটানো যাইতো। পাবলিকের কাজই হতো গনপিটুনি দেয়া। কে ছাত্র, কে ডাকাত তা চিন্তা করার কোন দরকার নাই, আগে মাইর, পরে কথা!! আর পাবলিকের কোন পয়েন্ট কাটা যাবে না। কারন গণতান্ত্রিক এবং ঘনবসতিপূর্ণ দেশে পাবলিক সবচে বড় ফ্যাক্টর। সেই কারনেই আমিন বাজারে শবে বরাতের রাতে ৬ জন ছাত্রকে ডাকাত বলে পিটিয়ে মারলো পাবলিক!!

‘চোর-পুলিশ- ডাকাত’ খেলাটা আমরা খেলতাম শখের বসে, সময় কাটানোর জন্য কিন্তু এখন ‘চোর-পুলিশ-ডাকাত-পাবলিক’ খেলাটা আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। ১৭ থেকে ২৭ বছরের যে কোন কিশোর/ যুবককে আপনি পেছন থেকে চোর/ ডাকাত/ ছিনতাইকারি বলে ধাওয়া দিন, সব পয়েন্ট আপনার!! কেউ তাকে জিজ্ঞেসও করবে না সে আসলে কি? মরার আগে কিংবা পুলিশের হাতে পড়ার আগে বেচারা নিজেও হয়তো বলতে পারবে না, ‘আমি মানুষ, আমি ছাত্র, আমি ভদ্রলোকের ছেলে, আমার পরিচয়পত্র আছে!!!’