ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

সারা দুনিয়ার মানুষ জানে, ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো দাঙ্গা হয় ‘৪৭এ দেশভাগের সময়। এবং তখন ১০ লাখ (কারো মতে ২০ লাখ) লোক মারা যায়। এ বছর আগস্টে দেশভাগের সত্তর বছর পূর্ণ হলো।

প্রতি বছর আগস্টে ব্রিটিশ মিডিয়ায়, বিশেষ করে রেডিও-টিভিতে দেশভাগ নিয়ে নানারকমের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। সত্যি কথা হলো, গত একযুগে ব্রিটেনে দেশভাগ নিয়ে যত অনুষ্ঠান ডকুমেন্টারী ফিচার দেখেছি এবং পড়েছি, তার কিয়দংশও, পূর্ববর্তী তিন দশক বাংলাদেশে বাসকালীন দেখিনি বা পড়িনি। এইবার তো সালমান রুশদীর ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ নিয়ে চার পর্বের একটা ড্রামাও প্রচার করলো।

এইসব অনুষ্ঠানের মূল মটিফ(motif) একটাই ’দেশভাগ এবং দাঙ্গা’ । ‘৪৭এর ঠিক আগের এবং পরবর্তী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষ বিশ্লেষণ। হিন্দু বনাম মুসলমান বনাম শিখ – এই ত্রিমুখী দাঙ্গার পুরো কাহিনিই হলো ভারতে দুশ বছর ব্রিটিশ শাসনের মূল প্রতিপাদ্য।

কে কাকে মারলো, কোথায় মারলো, কতো নিষ্ঠুরভাবে মারলো, কতোজন কতল করলো তার বিস্তারিত বিবরণ আপনি এক ঘণ্টার একটা অনুষ্ঠানে প্যাকেজ আকারে পেয়ে যাবেন। দাঙ্গায় মোট ১০ লাখ মারা গিয়েছিল – এই তথ্য প্রায় প্রতিদিন এতো ঘনঘন পুনরাবৃত্তি করে যে এটা আপনি আর বাকী জীবনে কখনও ভুলবেন না। আপনার ভালের তলদেশে মগজের গভীরে সেটা চিরদিনের জন্য গেঁথে যাবে।

এখন কথা হলো, দুশ বছরের ভারত শাসনে ব্রিটিশদের আরো অনেক ফিচার আছে, আরো নানাবিধ কীর্তি (!) আছে । ঊপমহাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে অথবা একজন কৌতূহলী পাঠক হিসেবে, কারো মধ্যে সেগুলো জানারও আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে। যেমন দুশ বছরে সেখানে কমপক্ষে এক ডজন দুর্ভিক্ষ হয়েছে। ব্রিটিশ শাসন শুরু হয়েছিল দুর্ভিক্ষ দিয়ে আর শেষও হয়েছিলো দুর্ভিক্ষ দিয়ে। প্রথম দুর্ভিক্ষ শুরু হয় ১৭৭০ সালে। কয়েক বছরে, কোনও কোনও গবেষকের মতে, তখন ৩০-৪০ লাখ মানুষ মারা যায়। আরেকটা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয় ১৮৭০-১৮৮০/৮৫ পর্যন্ত । এই দুর্ভিক্ষে, ইতিহাসবিদদের মতে প্রায় ৫.৫ মিলিয়ন অর্থাৎ ৫৫ লাখ মানুষ মারা যায়। সর্বশেষ, তাদের প্রস্থানের আগে, ‘৪৩এর দুর্ভিক্ষ তো আমাদের কালজয়ী চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদীন তাঁর তুলিতে অমর করে রেখেছেন। এই দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে নির্মিত, সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ দেখে অবশ্য খুব বেশি জানা যায় না, শুধুমাত্র জিনিসপত্রের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ছাড়া! দুর্ভিক্ষ কেনো হলো, কিভাবে হলো বা কাদের অপকর্মের কারণে হলো, তার কিছুই সত্যজিৎ বাবু তাঁর বিখ্যাত ছবিতে দর্শকদের খোলাসা করে বলেননি। তারপরও অশনি সংকেতকে আমরা কালজয়ী ছবি হিসেবে ভূয়সী প্রশংসা করি। জানা যায়, ‘৪৩এর দুর্ভিক্ষেও কমপক্ষে ৩০ লাখ লোক মারা যায় ।

অনেক খ্যাতিমান ইতিহাসবিদের মতে, ব্রিটিশ শাসনের অধীনে সংঘটিত সবকটা দুর্ভিক্ষে, প্রায় ৬ কোটির মতো ভারতবাসীর প্রাণহানি ঘটেছে। অথচ এইসব ঘটনা, তথ্য-ঊপাত্ত সাধারণ মানুষের জানার সহজ কোন ঊপায় নেই, যেভাবে আমরা সহজেই ‘৪৭এর দাঙ্গা এবং সেখানে নিহত ১০ লাখ সম্বন্ধে জানতে পারি ! অবশ্য আমরা গুগলবাবুর কাছ থেকে এসব জানতে পারি। কিন্ত সাধারণ মানুষ গুগল করে রিয়ানা সম্পর্কে যতটুকু জানতে আগ্রহী হবে, ইতিহাস সম্পর্কে ততটা হবে না। এটাই স্বাভাবিক। সাধারণ মানুষকে জনপ্রিয় গণমাধ্যমের মাধ্যমেই গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। ব্রিটিশ এবং পাশ্চাত্য গণমাধ্যম এই কাজটিই করে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। আমরা একই কাজ করলে ক্ষতি কী?

আরো বিস্মকর তথ্য হলো, এই একযুগ ব্রিটেনে বাসকালীন আমি একটা দিনও ’সিপাহি বিদ্রোহ’ শব্দযুগল কোনও ব্রিটিশ মিডিয়ায় দেখিনি, শুনিনি বা পড়িনি ! বিস্ময়কর শব্দও এখানে মানানসই নয় । এই তথ্য জেনে হতবাক না হয়ে থাকা যায়?