ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

বাংলাদেশের প্রধান বন্দর নগরী চট্টগ্রাম থেকে ২০ কি. মি. উত্তর পশ্চিমে বঙ্গপোসাগরের উপকূলে ফৌজদার হাটের প্রায় ১৮ কি. মি. এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে দেশের একমাত্র জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প। পুরাতন ও অচল হয়ে যাওয়া জাহাজ উপকূলে টেনে এনে এখানে ভাঙ্গা হয়। জাহাজ ভাঙ্গার জন্য অনেক উন্নত ও আধুনিক পদ্ধতি আবিষ্কৃত হলেও বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মান্ধাতা আমলের সনাতন পদ্ধতিতেই জাহাজ ভাঙ্গার কাজ চলছে। অন্যান্য পদ্ধতির চেয়ে এই পদ্ধতিতে জাহাজ ভাঙ্গার মূল কারণ হচ্ছে স্বল্প মূলধন বিনিয়োগ করে সস্তা পারিশ্রমিকে  অধিক লোকবল পাওয়ার নিশ্চয়তা। ১০০টির বেশি ইয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই শিল্পের সাথে সরাসরি প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক জড়িত এবং পরোক্ষভাবে আরো প্রায় ২ লক্ষ মানুষ এই শিল্পের সুবিধাভোগী ।

স্থানীয় রড ও ইস্পাত শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ৬০ শতাংশের বেশি যোগান দেয়া হয় এই শিল্প থেকে। ফলে এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অনেক বড় বড় স্টিল ও রিরোলিং মিল। এছাড়াও ভাঙ্গার জন্য আনা জাহাজগুলোতে অনেক পুরাতন ভাল ও উন্নত মানের আসবাবপত্রসহ বহু মূল্যবান গৃহস্থালি সামগ্রী পাওয়া যায়। ঐ সকল পুরাতন আসবাবপত্রসহ গৃহস্থালি সামগ্রী বিক্রীর জন্য এখানে অনেক বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ষাটের দশকে শুরু হওয়া বাংলাদেশের এই শিল্প কেবল স্থানীয়ভাবে নয় বরং সমগ্র বিশ্বের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছে।

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও এই শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরী, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও পেশাগত নিরাপত্তা বলতে কিছুই নেই। শ্রমিকরা দৈনিক মাত্র ২৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪০০ টাকায় ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করে থাকে। দৈনিক ১০/১২ ঘণ্টা কাজ করলেও এ শিল্পে জড়িত শ্রমিকরা কোন ওভার টাইম ভাতা পায়না।  এখানে শ্রম আইনের কোনো বালাই নেই। কোন শ্রমিক নিয়োগ পত্র কিংবা পরিচয় পত্র পায়না।

শ্রমিকরা কেবল কাজ করলেই মজুরী পেয়ে থাকে। ফলে এখানে নৈমিত্তিক ছুটি, পীড়া ছুটি, অর্জিত ছুটি, সাপ্তাহিক কিংবা উৎসব ছুটি-কোন কিছুরই প্রচলন নেই। শ্রমিকেরা প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্য ও জীবনের মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। অস্থায়ী ভিত্তিতে এবং ঠিকাদারের অধীনে কাজ করে বিধায় শ্রমিকেরা আহত বা নিহত হলে নিয়োগকর্তা চিহ্নিত করা যায়না। ২/৩ বৎসর পূর্বেও দূর্ঘটনায় নিহত অনেক শ্রমিকের সলিল সমাধি হওয়া কিংবা বেওয়ারিশ লাশ হিসাবে রাস্তায় পড়ে থাকার প্রচুর উদাহরণ রয়েছে।

প্রচার মাধ্যম, এনজিও, শ্রমিক সংগঠন ও সরকারী তদারকি  সংস্থার তৎপরতার কারনে বর্তমানে এই অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও দূর্ঘটনায় আহত বা নিহতের মিছিল যেন থামছেইনা। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় কেবল ২০১৭ সনে ২১ জন শ্রমিক দূর্ঘটনায় নিহত হয়েছে। অর্থাৎ নিহতের হার প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২ জন। এমনিতেই জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পে কাজ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ তদুপরি ইয়ার্ডের মালিকরা নিজেরা জাহাজ ভাঙ্গার কাজ না করে অধিক মুনাফার লোভে ঠিকাদারের মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক কাজ করায়। এই সমস্ত ঠিকাদারদের মূলধন বিনিয়োগের সক্ষমতা কম থাকার কারনে শ্রমিকের নিরাপত্তার বিষয়টি তারা খুব গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে না অর্থাৎ ঝুঁকি নিরসনে পূর্ব সতর্কতামূলক কোন ব্যবস্থা এই সকল ঠিকাদারগণ  নেয়না। এমনকি শ্রমিকদের পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত আত্মরক্ষামূলক সরাঞ্জামাদী (PPE) সরবরাহ করা হয়না। ফলে মৃত্যু ঝুঁকি নিয়েই শ্রমিকেরা বছরের পর বছর কাজ করে চলেছে।

দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত হওয়াকে তারা নিয়তি হিসাবেই মেনে নিয়েছে। কাজে যোগদানের পর কোন শ্রমিকেরই নিরাপদে সুস্থ্য শরীরে বাসায় ফেরার নিশ্চয়তা নেই। চোখের সামনে সহকর্মী, বাবা-ভাইদের মৃত্যু যন্ত্রনা বুকে চেপে ধরে অসহনীয় যন্ত্রনা নিয়ে তারা কাজ করছে। পুরাতন পরিত্যক্ত জাহাজ রিসাইক্লিং সংক্রান্ত ২০০৯ সনের হংকং কনভেনশনে গৃহীত প্রস্তাবে উল্লেখ আছে- প্রতিটি পরিত্যক্ত জাহাজ বর্জ্যমুক্ত করে রিসাইক্লিং করতে হবে। কিন্তু বিষয়টি জাহাজ বিক্রেতা বা ক্রেতা কেউ আমলে নিচ্ছেনা। ফলে পরিত্যক্ত জাহাজে থাকা বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ যেমন-সিসা, পারদ, ক্রোমাইটস ইত্যাদি বায়ু ও পানি দূষণ করছে। অনেক সামুদ্রিক প্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

এছাড়া জাহাজে থাকা  ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান এসবেস্টস পরিবেষ্টিত পরিবেশে শ্রমিকদের কাজ করতে হয় বিধায় তাদের ফুসফুসের নানাবিধ জটিল রোগসহ ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিষয়ে কাজ করে  এমন একটি বেসরকারী সাহায্য সংস্থা-ওশী ফাউন্ডেশন কর্তৃক ২০১৭ সনের ফেব্রুয়ারি মাসে ১০১ জন শ্রমিকের উপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায় ৩৩ জন শ্রমিকের শরীরে ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর এজবেস্টসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ৮ জনের ৬০% এর বেশি জায়গায় এসবেস্টসের উপস্থিতি রয়েছে। এর ফলে এই সকল শ্রমিকদের ফুসফুসের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের মালিকরা স্বীকারও করেনা, যে জাহাজগুলো ভাঙ্গা হচ্ছে সেগুলোতে এসবেস্টস রয়েছে।

এসবেস্টসের কারনে ফুসফুসের জটিল রোগ কিংবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রচুর শ্রমিক ধীরে ধীরে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। এই ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব না থাকলেও ধারনা করা যায়, এই সংখ্যাটিও নেহায়েত কম হবেনা। প্রশ্ন জাগে, এত নিরাপত্তা শঙ্কা নিয়েও কেন শ্রমিকরা এখানে কাজ করতে আসে। এই ব্যাপারে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে এখানে অধিকাংশ শ্রমিক আসে উত্তরবংগ থেকে। তারা আর্থিকভাবে অত্যন্ত অসচ্ছল ও সুবিধা বঞ্চিত দুর্বল প্রান্তিক জনগোষ্ঠি। তাদের তেমন কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই বললে চলে। জীবনের তাগিদে কাজ করতে আসা এই সকল হতদরিদ্র জনগোষ্ঠির কাছে দৃশ্যমান কোন বিকল্প না থাকার কারনে অনেকেই বাপ দাদার পেশাকেই বেছে নিয়েছে আবার অনেকে বন্ধু বান্ধব বা আত্মীয় স্বজনের মাধ্যমে এখানে কাজে যোগ দিয়েছেন।

যে দেশে বেকার যুবকের সংখ্যা কোটির উপরে, রুটি রুজির জন্য কাজ যোগাড়  করাই যেখানে সোনার হরিণ পাওয়ার মত কষ্টসাধ্য-সেইদেশের হতদরিদ্র এই সকল জনগোষ্ঠির পক্ষে পছন্দ অনুযায়ী কাজ যোগাড় করা কি নিদারুন কঠীন ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানে। বছরের পর বছর এই সুযোগটাই নিচ্ছে মালিক পক্ষ। দুর্বল, নিপীড়িত ও অসহায় জনগোষ্ঠির প্রতি রাষ্ট্রেরও যেন কোন দায়িত্ব নেই। জীবন বাঁচাতে রুটি রুজির জন্য কাজ করতে এসে শ্রমিকের জীবনই যদি হুমকীর মধ্যে পড়ে যায় তাহলে তা কখনোই শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য সুখকর হতে পারেনা বরং পুরো শিল্পই হুমকির মধ্যে রয়েছে বলা যায়।

দুর্ঘটনা ঘটলেই কেবল সমাধান-এই নীতি পরিহার করে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে এমন কারনসমূহ চিহ্নিত করে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করার নীতি গ্রহণ করতে হবে। শ্রমিকদের পর্যাপ্ত পরিমাণ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামাদি যেমন হেলম্যাট, মেটাল হ্যান্ড গ্লাভস, মাস্ক, গাম বুট, আই প্রটেকশন গ্লাস, ইয়ার প্লাগ ইত্যাদি সরবরাহ করা আবশ্যক। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তদারকি জোরদার করা সহ কোনো ইয়ার্ডে দুর্ঘটনা ঘটলে তার জন্য যদি মালিক পক্ষের অবহেলা বা উদাসীনতা প্রমানিত হয় তাহলে আইনের আওতায় এনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই কেবল এ শিল্পে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।