ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে দুটি বড় দুর্ঘটনা বাংলাদেশের শ্রমিকদের ইতিহাসে এক নির্মম বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে আছে। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর তাজরীন ফ্যাশনে আগুনে পুড়ে ১১২ জন শ্রমিক মারা যায়। এর ঠিক পাঁচ মাস পর ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের কারণে ১১৩২ জন শ্রমিকের নির্মম মৃত্যু হয়। আহত হয় অজস্র শ্রমিক।

সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাকির হোসেন তত্ত্বাবধানে বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন এইড পরিচালিত এক গবেষণার তথ্যমতে আহত শ্রমিকদের ৫১.৩ শতাংশ কর্মরত আছে এবং বাকি ৪৮.৭ শতাংশ শ্রমিক এখনো বেকার। কর্মরত শ্রমিকদের মাত্র ২১.৬% পোশাক কারখানার সাথে যুক্ত রয়েছে বাকিরা পেশা বদল করেছে।

আহত শ্রমিকদের ১৪ শতাংশ শ্রমিক ট্রমায় ভুগছেন, ১২ শতাংশ শ্রমিকের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ এবং ৭০ শতাংশ শ্রমিকের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল নয়। এই পরিসংখ্যান মনে করিয়ে দেয়, দুর্ঘটনার ৫ বৎসর পরেও এক ভয়াবহ দু:সহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে আহত শ্রমিকেরা এবং তাদের পরিবার-পরিজন।

দৈনিক পত্রিকা সমূহে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী রানা প্লাজায় অবস্থিত গার্মেন্টসের শ্রমিকেরা দুর্ঘটনা ঘটার আগের দিন নিরাপত্তা শঙ্কার কথা বুঝতে পেরে কারখানা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন এবং দুর্ঘটনা ঘটার দিন কাজে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাদেরকে অনেকটা জোর করে কাজে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়।

কাজে যোগ না দিলে মজুরি প্রদান না করে চাকরিচ্যুতির হুমকিও প্রদান করা হয়েছিল। আবার একই বিল্ডিংয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের একটি শাখা ছিল। ঐ দিন ব্যাংক বন্ধ থাকায় এত বড় দুর্ঘটনার পরেও ব্র্যাক ব্যাংকের সকল কর্মচারী প্রাণে রক্ষা পায়। সেদিন যদি ব্র্যাক ব্যাংকের মত পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ থাকতো তাহলে হয়তো পোশাক শ্রমিকরাও ঐ নির্মম দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেত।

কিন্তু প্রশ্ন জাগে শ্রমিকরা নিরাপত্তা শঙ্কার কথা জেনেও কেন তারা পরের দিন কাজে যোগ দিয়েছিল। মালিকরাই বা কী করে শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করতে সক্ষম হয়েছিল। কারণ প্রধানত শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দুরাবস্থা। দুর্ঘটনাটি ঘটে ২৪ এপ্রিল অর্থাৎ শ্রমিকেরা প্রায় এক মাস চাকরি করেছিল। যদি তারা কাজে যোগ না দিত তাহলে ঐ মাসের মজুরি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল বা মজুরি পেলেও তাদেরকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হত।

পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মাসের আয় দিয়ে মাস চলে। তাদের কোনো উদ্বৃত্ত আয় নেই। তাদের কোনো আপদকালীন সঞ্চয় থাকেনা। কোনো এক মাসের মজুরি না পেলে পরবর্তী মাসে তাকে কঠিন দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়। ফলে তা্দের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার কোনো বিকল্প ছিলনা।

এই বিকল্প হতে পারতো শ্রম আইন। কিন্তু শ্রম আইন ২০০৬ এর ৮৬ (১) ও (২) ধারায় উল্লেখ আছে যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক দেখতে পান যে, উহার কোন ভবন বা যন্ত্রপাতি, যাহা শ্রমিকেরা সাধারণত ব্যবহার করেন এমন বিপজ্জনক অবস্থায় আছে যে, উহা যে কোন সময় কোন শ্রমিকের শারীরিক জখম প্রাপ্তির কারণ হতে পারে, সে ক্ষেত্রে তিনি অবিলম্বে তৎসম্পর্কে লিখিতভাবে মালিককে অবহিত করবেন৷ উক্তরূপ সংবাদ প্রাপ্তির পর মালিক যদি তিন দিনের মধ্যে তৎসম্পর্কে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হন এবং উক্ত ভবন বা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার কারণে কোন শ্রমিক যদি জখম প্রাপ্ত হন তাহা হলে মালিক, অনুরূপ জখমপ্রাপ্ত শ্রমিককে, দ্বাদশ অধ্যায়ের অধীন উক্তরূপ জখমের জন্য প্রদেয় ক্ষতিপূরণের দ্বিগুন হারে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবেন৷

শ্রম আইন মোতাবেক একজন শ্রমিক কর্মস্থলে জখমপ্রাপ্ত হয়ে নিহত হলে সর্বোচ্চ এক লক্ষ টাকা এবং স্থায়ীভাবে কাজ করতে অক্ষম হলে এক লক্ষ ২৫ হাজার টাকা প্রাপ্য হবে। আর উপরোক্ত ধারা মতে নিরাপত্তা শঙ্কার কথা মালিককে শ্রমিক কর্তৃক অবহিত করার পরও যদি মালিক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হন তাহলে সেক্ষেত্রে শ্রমিক নিহত হলে দুই লক্ষ টাকা এবং স্থায়ীভাবে কাজ করতে অক্ষম হলে দুই লক্ষ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রাপ্য হবে।

শ্রম আইনের এই ধারাটি শ্রমিকের জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করে না। বরং নিরাপত্তা শঙ্কা দেখা দিলে উক্ত শঙ্কা দূর না হওয়া পর্যন্ত শ্রমিক যাতে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে সেই অধিকার শ্রমিককে দিতে হবে। শ্রমিকের প্রাপ্য মজুরি নিয়ে যাতে মালিক পক্ষ কোনো প্রকার তালবাহনা করতে না পারে সেই ব্যাপারে আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তাই শ্রম আইনের ৮৬ ধারাটি সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে।

শ্রমিকদের নিজ মতামত প্রকাশের সংগঠিত পন্থা না থাকার কারনেও রানা প্লাজার মত ভয়াবহ দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। রানা প্লাজায় অবস্থিত কারখানাগুলোতে যদি নিয়মতান্ত্রিকভাবে শ্রমিক সংগঠন থাকতো তাহলে ঐ সংগঠনের পক্ষ থেকেও শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারতো।

শ্রমিকদের কোনো সংগঠিত শক্তি না থাকার কারণে শ্রমিকদের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পাঁচ বছর পূর্ণ হবে। বিগত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অবকাঠামোগত বেশ উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়েছে কিন্তু এই উন্নয়ন টেকসই হবে না যদি শ্রমিকের অর্থনৈতিক অবস্থা, শ্রমিকের আইনগত সুরক্ষা এবং শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নিশ্চিত না হয়।