ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

১ মে  আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা শ্রমিক সংহতি দিবস হিসাবেও বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। ১৮৯০ সাল থেকে ১ মে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে। মূলত তখন থেকে শ্রমিকের কর্মঘণ্টা দৈনিক সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা সময় রাষ্ট্র এবং মালিক পক্ষ মেনে নিতে বাধ্য হয়। এর আগ পর্যন্ত শ্রমিকের কর্মঘন্টার ব্যাপারে কোন নীতিমালা ছিল না। দৈনিক ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত তাদের কাজ করতে হতো। কাজ, আহার আর নিদ্রা এই ছিল শ্রমিকের প্রাত্যাহিক জীবন। এছাড়া বিনোদন, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত জীবন বলতে তাদের কিছুই ছিল না।

মে দিবসের প্রভাবে পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। শ্রমিকের প্রতি মালিক ও রাষ্টযন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন শুরু হয়। শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি কিংবা তাদের সঙ্কট নিরসনের উদ্দেশ্য ১৯১৯ সালে গঠিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)।

আইএলও’র  প্রথম কনভেনশনে শ্রমিকের সর্বোচ্চ কর্মঘন্টা দৈনিক ৮ ঘন্টার কথা উল্লেখ আছে। আইএলও’র সকল সদস্য রাষ্ট্রসমূহ ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস হিসাবে স্বীকৃতি দেয়।

বাংলাদেশে শ্রম আইন অনুযায়ী একজন শ্রমিকের সর্বোচ্চ কর্মঘন্টা দৈনিক ৮ ঘণ্টা। শ্রমিকের সম্মতি পাওয়া ও ভাতা প্রদেয় সাপেক্ষে একজন শ্রমিককে দিয়ে দৈনিক সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করানো যেতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশে শ্রম আইন মোতাবেক একজন শ্রমিককে দিয়ে দৈনিক সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা কাজ করানোর বিধান থাকলেও বাস্তবে আমরা সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখতে পায়।

এখানে  বিশেষভাবে বিবেচ্য হলো, সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা ১৯৪৮ এর ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদ, অর্থনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ৭ম অনুচ্ছেদ এবং আই এল ও’র কনভেনশন ১৩১ এ একজন শ্রমিক দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার পর যাতে সে আত্মসম্মান নিয়ে জীবনযাপন করতে পারে ও তার সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, এমন মজুরি নির্ধারণ করার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ধারা ১৪১ এ উল্লেখ আছে কোন সুপারিশ প্রণয়ন করা কালে মজুরী বোর্ড শ্রমিকের জীবন যাপন ব্যয়, জীবনযাপনের মান, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতা, উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্য, মুদ্রাস্ফীতি, কাজের ধরন, ঝুঁকি ও মান, ব্যবসায়িক সামর্থ, দেশের ও সংশ্লিষ্ট এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করে দেখবে।

উপরোক্ত ধারাটি বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি মোট ১১টি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি বোর্ড ন্যূনতম মজুরি সুপারিশ করে। যা অত্যন্ত জটিল এবং অবাস্তব বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে। ফলে শ্রমিক শ্রেণি বরাবরই ন্যায্য মজুরি পাওয়া থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে। যতদিন শ্রমিক শ্রেণির ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হবে না ততদিন পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণির ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস অলিক স্বপ্নই থেকে যাবে।

বাংলাদেশে তাই দৈনিক কর্মঘণ্টা এবং মজুরি দুটাকে যখন মিলানো হয় তখন এক জটিল এবং পরস্পরবিরোধী চিত্র ফুটে উঠে। এখানে পোশাক শিল্প খাত, স্বাস্থ্যখাতসহ বিভিন্ন সেক্টরে শ্রমিকদেরকে যেমন অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য করা হয় তেমনি শ্রমিকরাও অনেক সময় কোন কারখানায় অতিরিক্ত কর্মঘন্টা না থাকলে ঐ কারখানাতে কাজ করতে আগ্রহী হয়না। আবার মালিক পক্ষও অনেক সময় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসাবে কোনো কোনো শ্রমিককে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা কাজ করানো থেকে বিরত থাকে।

এই জটিল এবং পরস্পরবিরোধী চিত্রের মূলে রয়েছে কম মজুরি। একজন শ্রমিক শুধুমাত্র দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করে যে মজুরি পায় , তা এত কম যে তা দিয়ে তার জীবন নির্বাহ করা অসম্ভব ব্যাপার অর্থাৎ ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত না করে কেবল মাত্র আইন প্রণয়ন করে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস কখনই নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শ্রমিককে কম মজুরির ঘাটতি মেটাতে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা পরিশ্রম করতে হয়। তাই আজকের মে দিবসের প্রধান চ্যালেঞ্জ শ্রমিকের ন্যায়সঙ্গত মজুরি নিশ্চিত করা।

কম মজুরি কিংবা অধিক সময় কাজ করা শ্রমিকের এক মাত্র সমস্যা নয়। শ্রমিকের বঞ্চনা শুরু কারখানায় যোগদানের পর থেকেই। অধিকাংশ কল-কারখানায় নিয়োগ পত্র, পরিচয় পত্র দেয়া হয়না, সবেতন ছুটি নাই। কথায় কথায় শ্রমিক ছাঁটাই, তার সাথে যুক্ত হয়েছে অনিরাপদ কর্মক্ষেত্র।

শ্রমিকের শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ –  ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক আন্দোলন। বিশ্বব্যাপী শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন করা আইনগত স্বীকৃত অধিকার। ইউনয়িনের মাধ্যমে শ্রমিকরা তাদের শ্রম শক্তির দাম, কর্মপরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধার জন্য মালিকদের সাথে যৌথভাবে দরকষাকষি করে। কিন্তু আমাদের দেশে ট্রেড ইউনিয়ন করতে না পারা বা শ্রমিক ঐক্যবদ্ধ হতে না পারার পেছনে যেমন মালিক পক্ষের বাধা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের অসহযোগিতা রয়েছে তেমনি কতিপয় অসৎ, অযোগ্য এবং দুর্নীতিবাজ শ্রমিক নেতৃত্বও কম দায়ি নয়।

শত বঞ্চনার পরেও শ্রমিক সমাজ এগিয়ে চলছে। নানা হতাশার মাঝেও মে দিবস আমদের অনুপ্রেরণা যোগায়। মে দিবস তাই এখনো শ্রমিকের অধিকার আদায়ের দীপ্ত শপথের দিন।