ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

বাংলাদেশের চা বাগানগুলোকে মোট সাতটি ভ্যালিতে বিভক্ত করা হয়েছে। বালাশিরা সবচেয়ে বড় ভ্যালি। প্রায় ১৫০ বছর পূর্বে বৃটিশ আমলে এই অঞ্চলে চা শিল্পের যাত্রা শুরু। বৃটিশরা চা শ্রমিকদের মাদ্রাজ, বিহার, উড়িষ্যা, উত্তর প্রদেশ, ঝাড়খন্ডের রাত্রি, ডোমকা, নাগপুর, পশ্চিমবঙ্গ প্রভৃতি অঞ্চল থেকে জোরপূর্বক নিয়ে এসে চা শ্রমিক হিসাবে নিয়োজিত করেছিল। এরা ছিল হরিজন, কোল, মুন্ডা, কৈরি, চন্ডাল, সাঁওতাল প্রভৃতি সমপ্রদায়ের দারিদ্র পীড়িত মানুষ। চা শিল্পের বয়সের সমান তাদের বাংলাদেশে বসবাসের ইতিহাস। এত দীর্ঘকাল বসবাসের পরেও তাদের নেই একখন্ড নিজের জমি। বংশ পরম্পরায় প্রত্যেক পরিবারের কমপক্ষে একজন সদস্য চা বাগানে কাজ করতে বাধ্য। না হলে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু হারানোর ভয় তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। চা শ্রমিকরা যেন আজ এ যুগের ভূমিদাস বা বাধ্যশ্রমিক।

 

বাগান করার জন্য বাগান মালিকরা যদি সরকারি জমি লিজ পায় তাহলে নিজের ভিটে মাটি ছেড়ে এসে বংশ পরম্পরায় শত বছরের বেশি সময় বাংলাদেশে অবস্থান করেও চা শ্রমিকদের থাকার জন্য একখণ্ড নিজের জমি না থাকা দুঃখজনক।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী ক্ষোভের সাথে বলেন, “নিজের জায়গা না থাকা তো আমাদের অপরাধ নয়। অথচ নিজের জায়গা না থাকার কারনে আমাদের সন্তানেরা যোগ্যতা থাকলেও সরকারি চাকরি পায় না”। সম্প্রতি চা শ্রমিকের দুইজন সন্তান পুলিশের চাকুরীর জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েও নিজস্ব জায়গা না থাকার অজুহাতে কর্তৃপক্ষ চাকরি দিতে গড়িমসি করছিল। তবে মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন জায়গায় ধর্ণা দেওয়ায় পরবর্তীতে তাদের চাকরি হয়। শত বঞ্চনার মাঝে চা শ্রমিকদের জন্য নিঃসন্দেহে এ এক আনন্দদায়ক সংবাদ। হয়তো নতুন প্রত্যাশার যাত্রা এখান থেকেই শুরু।

বালাশিরা ভ্যালির ভাড়াউরা চা বাগানে আমরা একাডেমি অফ ওয়ার্কের ১৩ জন শিক্ষার্থী

 

প্রায় এক লাখ স্থায়ী শ্রমিক এবং আরও প্রায় ত্রিশ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক চা বাগানে কাজ করে। কর্মক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হল- বিস্তীর্ণ বাগান জুড়ে কোথাও শৌচাগার বা ল্যাট্রিনের ব্যবস্থা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হয় খোলা আকাশের নীচে। এতে পুরুষ শ্রমিকেরা প্রকৃতির ডাক কোন রকমে সেরে নিতে পারলেও নারী শ্রমিকদের জন্য এটা একটা বড় ধরনের সমস্যা। অথচ চা শ্রমিকদের অর্ধেকের বেশী নারী শ্রমিক। শ্রম আইনের ৫৯ ধারা মতে প্রত্যেক কর্ম ক্ষেত্রে নারী পুরুষের জন্য পৃথক ও স্বাস্থ্য সম্মত শৌচাগার ও ল্যাট্রিনের ব্যবস্থা করা মালিকের দায়িত্ব। বাগান মালিকদের এ ব্যাপারে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।

আমরা ১৩ জন যুব ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠক, একাডেমি অফ ওয়ার্কের প্রাক্তন শিক্ষার্থী বিগত ৫ মে গিয়েছিলাম শ্রীমঙ্গলের বালাশিরা ভ্যালির ভাড়াউরা বাগানে। কথা হয়েছে চা শ্রমিক এবং তাদের নেতৃবৃন্দের সাথে। শুনলাম তাদের বঞ্চনার কথা। প্রথমেই আঁৎকে উঠলাম তাদের মজুরীর কথা শুনে। এই দূর্মূল্যের বাজারে দৈনিক ২৩ কেজি পাতা উত্তোলন করে তারা মজুরী পায় মাত্র ৮৫ টাকা। ফলে বেশির ভাগ সময় তাদের এক বেলা খেয়ে কিংবা আধপেটা খেয়ে জীবন চলে। অসুস্থতা বা বৃষ্টি-বাদলের দিন কাজে যেতে না পারলে মজুরী পায়না। ফলে বর্ষাকালে প্রায়ই তারা না খেয়েই থাকে জানালেন সন্ধ্যা রাণী নামের জনৈকা চা শ্রমিক।

চা শ্রমিকের প্রত্যেকের চেহারায় অপুষ্টির ছাপ দৃশ্যমান। সন্ধ্যা রাণীকে জিজ্ঞাসা করলাম, “বয়স কত”? লাজুক হেসে সন্ধ্যা রাণী জবাব দেয়, “৩০/৩৫ বছর”। কিন্তু চেহারা দেখে যে কেউ বলবে সন্ধ্যা রাণীর বয়স ৫০/৫৫। স্পষ্টতই বুঝা যায় সন্ধ্যা রাণীর চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ, অপুষ্টিরই ফল।

প্রতিদিন কাজ করে তাদেরকে কমপক্ষে ২৩ কেজি পাতা উত্তোলন করতে হয় যা থেকে ৬ কেজি পরিশোধিত চা উৎপাদন হয়, যার বাজার মূল্য কমপক্ষে ১৫০০ টাকা হলেও চা শ্রমিকেরা মজুরী হিসাবে পায় মাত্র ৮৫ টাকা। এর বাহিরে রেশন হিসাবে তারা সপ্তাহে সাড়ে তিন কেজি আটা পেয়ে থাকে।তা খুবই অপর্যাপ্ত। তারপরও সব শ্রমিক রেশন সুবিধা পায়না। চায়ের মূল্য ক্রমশ বাড়লেও, বাড়ছে না কেবল চা শ্রমিকের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা।

বিভিন্ন সেক্টর ভিত্তিক ন্যূনতম মজুরী বোর্ড গঠিত হলেও চা সেক্টরে অদ্যাবধি নূন্যতম মজরি বোর্ড গঠিত হয়নি। চা সেক্টরে নূন্যতম মজরি বোর্ড গঠিত হলে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে চা শ্রমিকদের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য নূন্যতম মজরি নির্ধারন করা সহজ হতো বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে।

বাংলাদেশের প্রায় ছয় কোটি শ্রমিকের শুধু মাত্র ১৩ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক খাতের এবং বাকি ৮৭ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক। চা শ্রমিকদের সুনির্দিষ্ট মালিক ও প্রতিষ্ঠান থাকায় তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক হিসাবে গণ্য করা হয়। সে হিসাবে মনে হতে পারে চা শ্রমিকেরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। তবে যখন শ্রম আইনের ১১৫ নম্বর ধারায় উল্লেখ থাকে কেবল মাত্র চা শ্রমিক ছাড়া সকল শ্রমিক ১০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি প্রাপ্য হবে কিংবা শ্রম আইনের ১১৭ ধারায় উল্লেখ থাকে সকল শ্রমিক প্রতি ১৮ দিন কাজের জন্য এক দিন অর্জিত ছুটি প্রাপ্য হবে আর চা শ্রমিকেরা প্রতি ২২ দিনে এক দিন ছুটি প্রাপ্য হবে। তখন বুঝতে বাকি থাকে না শ্রম আইনেও চা শ্রমিকেরা চরম বৈষম্যের শিকার।

চা শ্রমিকের অর্ধেকের বেশি নারী শ্রমিক হলেও মাতৃত্ব কল্যাণ সুবিধা সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের সুস্পষ্ট কোন ধারনা নাই। মাতৃত্বকালীন ছুটি কত দিন, জিজ্ঞাসা করলে, কেউ বলে তিন মাস-কেউ বলে চার মাস। অবশেষে সন্তানসম্ভাবা বাসন্তী নামের একজন মহিলার দেখা পেলাম। তার গর্ভে সন্তানের বয়স প্রায় ৮ মাস। যে কোন দিন বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম এই অবস্থায় সে কেন কাজ করতে এসেছে? জবাবে সে বললো কাজ না করলে মজুরি পাবেনা। মজুরি না পেলে সংসার চলবে কেমনে?

সন্তান জন্মদানের পর শুরু হয় নারী শ্রমিকদের অন্য আরেক সংগ্রাম। কারণ তাদের নবজাত শিশুদের জন্য কোন ডে কেয়ার সেন্টার নাই। ফলে সন্তান প্রতিপালন নিয়ে তাদের ব্যাপক ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়। সন্তান সম্ভবা হওয়ার পর থেকে সন্তান জন্মদানের পর তার যে বাড়তি পুষ্টির প্রয়োজন তা বরাবরই অপূর্ণ রয়ে যায়।

লোক দেখানো চিকিৎসা কেন্দ্র আছে। তাতে শ্রমিকের জটিল কোন রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়না। পর্যাপ্ত ঔষধ ও আনুষাঙ্গিক যন্ত্রপাতি তেমন বলার মত কিছুই নাই। চিকিৎসা কেন্দ্রে এমবিবিএস ডাক্তার নাই, আছে মিডওয়াইফ। তারা প্যারাসিটামল ছাড়া আর কোনো ঔষধ দেয় না। বেশি সমস্যার কথা বললে সরকারি হাসপাতালে যাবার পরামর্শ দেয়। ১৯৬২ সালের টিপ্ল্যান্টেশন লেবার অর্ডিন্যান্স এবং ১৯৭৭ সালের প্ল্যান্টেশন রুলস-এ চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য বাগান মালিকদের প্রতি সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও এর কোন বাস্তব প্রতিফলন আজ অবধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

চা শ্রমিক ইউনিয়ন এবং মালিক সমিতির সাথে সম্পাদিত চুক্তি এবং চা বোর্ডের নির্দেশ মোতাবেক প্রতিটি চা বাগানে একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা থাকলেও অধিকাংশ চা বাগানে এখনো প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। চা শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য চট্টগ্রামে একটি কেন্দ্রীয় হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাংকে বড় অঙ্কের টাকা জমা আছে কিন্তু মালিকদের গাফিলতি ও অসহযোগিতার কারনে হাই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচ্ছেনা। ইদানীং সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন বাগানে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। এখনো চা শ্রমিকদের বৃহত্তর অংশ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত।

শিক্ষা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত চা শ্রমিকরা যেন বিনোদন থেকেও বঞ্চিত। তাদের বিনোদনের তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। সবুজ চাদরে মোড়া বিস্তীর্ণ চা বাগানের ভিতর দিয়ে হাঁটতে থাকি। মাঝে মাঝে হিমেল হাল্কা হাওয়া বয়ে যায়। মিষ্টি বাতাস গায়ে পরশ বুলাতেই মনের গভিরে এক অপরূপ অনুভূতি তৈরি হয়। তারপরও কোথাও যেন একটা অতৃপ্তি রয়েই যায়। খচখচ করে বুকের গভীরে। মনে মনে ভাবি প্রাণ জুড়ানো এমন চমৎকার হাওয়ায় মিশে আছে কতশত চা শ্রমিকের দীর্ঘশ্বাস। হাঁটতে হাঁটতে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। শরীরে তাজা ভাব আনার জন্য বাগানের গেইটে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে চায়ের অর্ডার দিই। দোকানি চা এনে দিল। এ যেন শ্রমিকের রক্তে রাঙা লাল চা। চা গাছ রোপণ, পরিচর্যা করে বড় করা, পাতা ছেঁড়া তারপর পরিশোধিত চা বানানো সবই করে চা শ্রমিকেরা। কিন্তু তাদের কিংবা তাদের সন্তানদের ভাগ্যে কি চা জোটে? প্রশ্ন করতে গিয়ে আবার থমকে দাঁড়ালাম। বঞ্চিত মানুষকে তার বঞ্চনার কথা বার বার মনে করিয়ে দেওয়াও যে অসৌজন্যতা।