ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

পাঁচ ছেলে, দুই মেয়ে  এবং স্ত্রী নিয়ে ৭৫ বছরের আব্দুর রহিমের  সংসার। জীবনের তাগিদে যুবক বয়সে  যোগ দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের মুরাদপুরস্থ এ বি মেটাল ইন্ডাস্ট্রিতে।

এভাবেই দিন চলতে থাকে। এর মাঝে মালিক মারা যাওয়ার পর কারখানার দায়িত্ব গ্রহণ করে মালিকের ছেলে। বর্তমান মালিকের অধীনে আব্দুর রহিম  ২০০৪ সাল থেকে একটানা চাকরি করছেন।

আব্দুর রহিম ছিলেন রোলিং মেশিনের মিস্ত্রির সহকারি। তার কাজ ছিল রোলিং মেশিনের মাধ্যমে অ্যালুমিনিয়াম শিট সোজা করা।

২০১০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। কাজ করার সময় রোলিং মেশিনে তার ডান হাত চাপা পড়ে। চারটি আঙুল থেঁতলে যায়। কোনও ভাবেই আঙুলগুলো ঠিক করা যাচ্ছিলনা। পরে ঐ চারটি আঙুলই কেটে ফেলতে হয়।

তার কথা অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষ কম মজুরি দেওয়ার জন্য অদক্ষ ও আনাড়ি মিস্ত্রী নিয়োগ দিয়েছিল। ঐ মিস্ত্রীর ভুলের কারণেই সেদিন তিনি আহত হয়েছিলেন।


ডান হাতের চার আঙুল হারিয়ে আব্দুর রহিম আগের মত মিস্ত্রির সহকারি হিসাবে কাজ করতে পারেন না।

বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৫১ ধারা মোতাবেক কোনও শ্রমিক আংশিক বা পূর্ণ অক্ষম হলে, উক্ত শ্রমিক সর্বোচ্চ এক লাখ পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাবে। কিন্তু কম লেখাপড়া করা একজন শ্রমিক রহিম এই আইন ঠিক মত জানেন না। তাই মালিককে ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে কোনোদিন কিছু বলেননি।

তিনি একটি শ্রমিক সংগঠনেরও সঙ্গেও যুক্ত। তার সংগঠনের নাম মুরাদপুর, অ্যালুমিনিয়াম কারখানা শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন, রেজিঃ নং- ২৬৬৩। কিন্তু তার সংগঠনও তাকে ক্ষতিপূরণের আইনগত দিক নিয়ে  কিছু বলেনি বলেই জানান বৃদ্ধ রহিম। ফলে তিনি শ্রম আইন মোতাবেক তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিতই রয়ে গেলেন।

ক্ষতিপূরণ না পেলেও চাকরি রয়ে যায় রহিমের; তবে মিস্ত্রীর সহকারী হিসাবে নয়, তিনি এখন নিরাপত্তা কর্মি হিসাবে কাজ করেন।

জীবনের এই অধ্যায়ে এসে  আব্দুর রহিমের সঞ্চয় খুব বেশি নেই। এদিকে তিনি কোনো একভাবে জানতে পারেন চাকরি ছাড়লে শ্রম আইন অনুযায়ী একসাথে অনেক টাকা পাওয়া যাবে। ঐ টাকা দিয়ে মেয়ের বিয়ে দিবেন বলেও ভেবে রেখেছেন রহিম। তাই তিনি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

শ্রম আইন অনুযায়ী দুই মাসের নোটিশ দিয়ে গত ২০১৭ সালের ১ অক্টোবর  তারিখে মালিক বরাবর ইস্তফা পত্র জমা দেন। যথারীতি শ্রম আইন মোতাবেক তিনি নভেম্বরের ৩০ তারিখ পর্যন্ত চাকরি করেন।

এর মাঝে পাওনা টাকার বিষয়ে জানতে চাইলে কারখানার কর্তৃপক্ষ তাকে পরে যোগাযোগ করতে বলে। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় চলে গেলেও বৃদ্ধ রহিম আর টাকা পান না।

শ্রম আইনের ২৭,৪(ক) ধারা মোতাবেক একজন শ্রমিক ১০ বৎসরের বেশি চাকরি করে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিলে তিনি প্রতি বছর চাকরির জন্য একটি করে বেসিকের সমপরিমাণ টাকা পাবেন।

এই হিসাবে রহিম চাচার চাকরির বয়স ১৪ বছর পূর্ণ হওয়ায় ১৪টি বেসিকের সমপরিমাণ টাকা পাওয়া তার আইনগত অধিকার।

রহিমের কথা অনুযায়ী ওই প্রতিষ্ঠানে কোনও ধরনের ছুটি দেওয়ার নিয়ম ছিলো না। তাই ধারণা করা যায়, তিনি ৪০ দিনের অর্জিত ছুটির টাকাও পাবেন। শ্রম আইনের ১২৩(২) ধারায় উল্লেখ আছে চাকরি অবসানের ৩০ দিনের মধ্যে শ্রমিকের টাকা পরিশোধ করতে হবে। অথচ প্রায় আট মাস পার হওয়ার পরও রহিম এখনো কোন টাকা পাননি।

বৃদ্ধ রহিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, টাকাগুলো পেলে বড় মেয়েকে বিয়ে দিতে পারতেন।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি রহিম চাচা তার প্রাপ্য টাকা প্রদানের জন্য কারখানার মালিক বরাবর আবার চিঠি দেন। শ্রমিক আইন সহায়তা সেলের মাধ্যমেও টাকা আদায়ের চেষ্টা তদবির করেন। জুলাইয়ের ১৮ তারিখ কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে ধর্ণাও দেন।

বৃদ্ধ রহিম আবেগ তাড়িত হয়ে বলেন, “আমিতো সময় দিয়েই যাচ্ছি কিন্তু শরীর তো চলছে না। মৃত্যুর আগে শুধু একটা মেয়ের অন্তত বিয়ে দেখে যেতে চাই।”

তিনি আমার দুই হাত চেপে ধরে বলেন, “…আমার টাকাগুলো উদ্ধার করে দেন। আমি আপনার জন্য মন থেকে দোয়া করবো।”

বৃদ্ধ আব্দুর রহিমকে কী বলে আশ্বস্ত করা যায় ভেবে পাচ্ছিলাম না। এভাবে কত হাজার শ্রমিক তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে? তাদের পরিত্রাণের উপায় কী? উত্তর না পেয়ে গভীর বেদনায় বুকের ভিতর খচ খচ করতে লাগলো।

slide