ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

শীতের এক সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সোহরাওয়ার্দী পার্কে বন্ধু আকতার সোহেল, কামাল ও আমি বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। ভ্রাম্যমাণ চা বিক্রেতা একটি বাচ্চা চা নিয়ে আসল। ছেলেটির গায়ে শুধু একটি পাতলা জামা। শীতে ঠক ঠক করে কাপঁছিল। ছেলেটির কাছে আমার এক বন্ধু চা নেয়ার মাঝে ওর সম্পর্কে জানতে চাইল। তখন ছেলেটির মুখ থেকে বেরিয়ে এল অনেক কষ্টের কথা। তারা চার ভাইবোন, বাবা অসুস্থ। মা অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে। চার ভাইবোনের মাঝে সে সবার বড়। বয়স হবে ১২ বছরের মত। মা যে টাকা আয় করে তা দিয়ে সংসার চলে না। তাই সংসারের চাকা সচল রাখতে দু’বেলা দুমুঠো খাবার জোগাতে, নেমে এল চায়ের কেটলি হাতে পার্কে চা বিক্রি করতে। এই বয়সে সাধারণত বাচ্চারা স্কুলে যায় কাঁধে ব্যাগ নিয়ে। ছেলেটি বলছিল তার স্কুলে পড়ার আগ্রহের কথা। সেও একসময় বন্ধুদের সাথে স্কুলে যেত। বলতে বলতে ছেলেটির মুখ থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। ছেলেটির শীতের কাপুনি দেখে আমার বন্ধু আকতার সোহেল হঠাৎ তার গায়ের জ্যাকেটটি খুলে ছেলেটির গায়ে জড়িয়ে দিয়েছিল। তখন ছেলেটির সেই খুশি আর হাসিমাখা মুখ দেখে মনে হয়েছিল ঔ শীতে এর চেয়ে বেশি আর কিছুই হয়ত সে চায়নি। সাথে সাথে আশ্চর্য হলাম বন্ধু সোহেলের মানসিকতা দেখে। অভিজ্ঞতা হল মানব সেবার চাক্ষুস একটি প্রমাণ দেখে। আমার আপনার পাশে এভাবে অনেক শিশুই প্রতিনিয়ত অনাদরে অবহেলায় বেড়ে ওঠে। যদি সবাই সবার সামর্থ অনযায়ী একটু করে সহায়তার হাত বাড়াই তাহলে হয়ত পার্কের সেই ছেলেটির মত সবার মুখেই হাসি ফোটানো সম্ভব।

এদের যদি একটু সুযোগ করে দেয়া হলে এরাও হয়ত ভাল করতে পারে সমাজের যে কোন ক্ষেত্রে। আজকাল মানুষ সবাই আত্মকেন্দ্রিক। নিজেকে নিয়েই সবাই যেন বড় ব্যস্ত। অন্যকে নিয়ে ভাববার কোন সময়ই থাকে না। তবে সত্যি আমাদের মধ্যে অনেকে আবার আছেন যারা ভাল মনের মানুষ। তারা অনেকেই তাদের দোকানে, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিয়ে এদের কাজ দেয়, সেক্ষেত্রে ভালই কাজ করে এরা। তারা অনেক পরিশ্রম করতে পারে। কিছু কিছু মালিক এসব শিশুদের কাজের মাঝে পড়ালেখার সুযোগও দিচ্ছে। তবে এমন হৃদয়বান লোক খুবই কম। আবার অনেক মালিক আছেন যারা এদেরকে দিয়ে অমানবিক পরিশ্রমের কাজ করিয়ে নেয়। যা শিশুদের পক্ষে করা খুবই কষ্টকর। এত কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আবার অনেকে কাজ ছেড়ে পালিয়ে যায়। আবার হয়ত রাস্তায় টোকাই বন্ধুদের সাথে চলে যায়। হয়ত আর কখনও সভ্য সমাজে ফিরতে মন চায় না। চিরদিনের জন্য ডুবে যায় অন্ধকারে। কেউ হয়ত তাদেও আর খোঁজ রাখে না। কিন্তু না, আসুন আমরা অন্তত যুব সমাজের পক্ষ থেকে শপথ নেই প্রতি জনে অন্তত একজন করে টোকাইকে শিক্ষার আলো দিব, তাদের আর সমাজের বোঝা হতে দেব না।

বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের মধ্যে একটি দরিদ্রতম ও উন্নয়নশীল দেশ। এদেশ হাজারও সমস্যায় জর্জরিত। আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যার পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ায় অন্যান্য অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় এ দেশের সমস্যা যেমন বেশি তেমনি এর ভয়বহতাও প্রকট। এ দেশের বেশিরভাগ মানুষই দারিদ্র সীমার নীচে বসবাস করে। দারিদ্রতা, অশিক্ষা ও অজ্ঞতার কারণে জনসংখ্যার এ চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ধনীর ঘরের একটি বাচ্চা যেভাবে বেড়ে ওঠে, ঠিক তেমনটি ভাবে বেড়ে উঠতে পারে না আমাদের সমাজের গরীবের সন্তান। আবার এই হতদরিদ্র শ্রেণীর একাংশের মধ্যে অনেকেরই বাবা মা নেই। ছেলে মেয়েরা রাস্তার ধারেই কাটিয়ে দেয় শৈশব ও কৈশোর। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলেও সত্য যে, এই যে টোকাই বাচ্চাটি সেও কোন এক মায়ের সন্তান। যে দারিদ্রতার চরম কষাঘাতের কারণে অন্য দশজনের মত সে তার সন্তানকে মানুষ করতে পারেনা। কোন এক সময়ে একদিনের সেই ফুটফুটে সন্তানের বেড়ে ওঠার জায়গা হয় নোংরা ডাস্টবিনের কাছে। নোংরা আবর্জনার মধ্যেই তাকে খুঁজতে হয় আহার। রোদ, ঝড়, বৃষ্টিতে এদের ঠাই মেলেনা ধনীর অট্রালিকা বাড়ির গাছের ছায়ার নিচেও। শিক্ষা তো দুরের কথা, অসুখ হলে চিকিৎসা পাবার অধিকারও যেন ওদের নেই। সকাল হলেই যেখানে ধনীর সন্তানেরা প্রাইভেট গাড়ীতে চড়ে স্কুলে রওনা হয়। ঠিক তার আগে কাঁধে একটা বস্তা নিয়ে অনাহারি পেটে খাবারের সন্ধানে ছুটে যায় ডাস্টবিনের কাছে। যেখানে ধনীর সন্তানের খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলে দেয়া হয়েছে। সেখানেও ভাগ বসে তিন শ্রেণীর। রাস্তার কুকুর, কাক ও আমাদের রক্তমাংসে গড়া আঠারো হাজার মাখলুকাতের সেরা মাখলুকাত মানুষ। তবে তাদের এই সমাজে একটিই পরিচয়- টোকাই।

কেন আজ স্বাধীনতার ৪০ বছর হওয়ার পরেও হয়নি আমাদের অর্থনৈতিক সেই মুক্তি। যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক মুক্তির জন্য এ দেশের স্বাধীনতাকমী মানুষ জীবন বাঁজি রেখে যুদ্ধ করেছিল। সেই যুদ্ধের চিত্রে আজ আমরা যা দেখি, সেখানে তো দরিদ্র মানুষের সংখ্যাই বেশি ছিল। তাহলে আজ কেন এত বছর পাড় হবার পরেও সেই দরিদ্র মানুষের কথা নিয়ে দেশ ভাবে না। কেন আজ ধনীরা টাকার পাহাড় গড়ে অট্রালিকা তৈরি করে। আর তার নিচে রাস্তার সামনে, ড্রেনের পঁচা, দুর্গন্ধ পানি দিয়ে পিপাসা মেটাতে হয় টোকাইদের। এদের ঘুমানোর জায়গা রাস্তার ধারে। অবহেলায় বেড়ে ওঠা এসব পথশিশুরা সভ্য সমাজের সংগে মিলতে না পেরে একটা সময় পা বাড়ায় অপরাধের পথে। খুবই অল্প থেকে এরা প্রবেশ করে, পরে ধারাবাহিকভাবে এরা মদ, গাজা ও হেরোইন সহ সব ধরনের নেশায় আসক্ত হয়ে ওঠে। এরপর কোন এক সময় নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে শুরু করে ছিনতাই। এভাবেই পর্যায়ক্রমে অনেক টোকাই হয়ে যায়া ভাড়াটে খুনী, খুনী থেকে নাম উঠে আসে পুলিশের খাতায় শীর্ষসন্ত্রাসী হিসেবে। অথচ আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র কখনও কি খুঁজে দেখেছে তাদের এই পথে আসার পেছনের ইতিহাস? হয়তবা দেখেছে। কিন্তু নেয়া হয়নি স্থায়ী এমন কোন ব্যবস্থা, যা করলে এই দেশে এদেরও একটি স্বাভাবিক জীবন তৈরি হয়। অন্য দশজন মানুষের মত এরাও সমাজের, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে অবদান রাখতে পারে।

এখন বিভিন্ন এনজিও এদের নিয়ে কাজ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তাই মাঝে মাঝে এদের হাতে বই দিয়ে রাস্তার পাশে অস্থায়ী স্কুল করে পড়ালেখা শেখানোর চেষ্টা করা হয়। এ ক্ষেত্রে স্ব উদ্যোগী আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরাও এখন টোকাই বাচ্চাদেরও নিয়ে বিকেলে রাস্তার পাশে অস্থায়ী স্কুল বসিয়ে পড়ালেখা শেখানোর ব্যবস্থা করেছেন যা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। শাহবাগে যেতে পরিবাগের রাস্তার শেষ মাথায় বিশিষ্ট কলামিষ্ট, লেখক ও দার্শনিক আহমদ ছফার প্রতিষ্ঠিত টোকাইদের স্কুল সত্যি পথচারীদের আগ্রহী করে তোলে পথশিশুদের শিক্ষিত করে তোলার কাজে।