ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 
Kalkatta_nespabna

 

 

 

 

 

 

 

 

 

১৮ এপ্রিল শনিবার ছিলো কলকাতার পৌরনির্বাচন। দিনব্যাপী এই নির্বাচনে দফায় দফায় হামলা, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া, বুথ দখল, বোমাবাজী, গুলি ও মারামারির মাধ্যমে শেষ হয়েছে পৌরনির্বাচন। প্রায় প্রত্যেকটি ভোট কেন্দ্রেই চলেছে এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। স্বভাবতই এই ভোট সন্ত্রাসের অভিযোগের আঙুল উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। অপরদিকে কংগ্রেসরে বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে সন্ত্রাসী কায়দায় ভোট ডাকাতির। তবে সিপিএমকে নিস্ক্রিয় দেখা গেছে শনিবার।

আর এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন পুলিশসহ শতাধিক ব্যাক্তি। এরপরেও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় বলছেন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, অবাধ হয়েছে আর এ কারণে তিনি পুলিশ বাহিনীকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন। অবশ্য এতো অভিযোগের সব মেনে নিয়েছেন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার সুশান্তরঞ্জন উপাধ্যায়। তার কথায় ‘আদর্শ পরিবেশে ভোট হলে এত অভিযোগ আসত না’।

এতো দাবি পাল্টা দাবির মাঝে আসলে শনিবার কি ঘটেছিলো কলকাতায়? শনিবার সকাল সাতটায় ভোটগ্রহন শুরুই হয়েছিল কুঁদঘাটের ১১৪ নম্বর ওয়ার্ডে সিপিএম-তৃণমূল সংঘাত দিয়ে। এর পর বাঘাযতীনে সিপিএম এজেন্টকে হুমকি, গাঙ্গুলিবাগানে সিপিএম কর্মীকে মারধর, মানিকতলায় নির্দল প্রার্থীকে আক্রমণ, বিজেপি প্রার্থী মীনাদেবী পুরোহিতকে ধাক্কাধাক্কি, সিপিএম নেতা কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের ছেলে সাম্যকে নিগ্রহ বেলা যত গড়িয়েছে ততই আরও তপ্ত হয়েছে কলকাতা শহরের হাওয়া। সকাল এগারোটায় বোমাবাজি হয় রাজভবনের মতো ভিভিআইপি এলাকার কাউন্সিল হাউস স্ট্রিটে। গুলি চলে ভারতীয় জাদুঘরের সামনে, বাঘাযতীনে এবং পার্ক সার্কাসেও। চৌরঙ্গি লেনে সিপিএম নেতা ফুয়াদ হালিমকে লক্ষ করে গুলি চলে বেলা পৌনে একটা নাগাদ। এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গা থেকে ক্যাম্প অফিস ভাঙচুর, বুথ দখল, ভোটারকে ঘাড়ধাক্কা, নকল ভোট, ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ তো ছিলই।

ভোটগ্রহন শেষ হওয়ার পরেও বিকেল সাড়ে ৪টায় গিরিশ পার্কে কংগ্রেস-তৃণমূল ঝামেলা থামাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন কলকাতা পুলিশের সাব ইনস্পেক্টর। এবং অধিকাংশ ঘটনাতেই রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক থেকে জনমত সমীক্ষা, কেউই বলেনি যে কলকাতার পৌরভোট তৃণমূলের পক্ষে কঠিন লড়াই হতে যাচ্ছে। বরং একশোর উপরে আসন পেয়ে ফের ছোট লালবাড়ির দখল নিতে যাচ্ছে তারা, এমন ইঙ্গিতই ছিল। তার পরেও এমন কাণ্ড কেন?

তৃণমূল সূত্র বলছে, বিরোধীদের এক ইঞ্চি জমিও না-ছেড়ে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দখলের মানসিকতা একটা কারণ। দ্বিতীয় কারণ, বাম ভোটের বৃদ্ধি। জনমত সমীক্ষা বলছে, লোকসভা ভোটের পরে কলকাতা শহরে বিজেপির হাওয়া বেশ খানিকটা স্তিমিত হয়ে এসেছে। তার বদলে উত্থান হয়েছে বামেদের। তাদের ভোটপ্রাপ্তির হার ৩০ শতাংশ ছুঁয়ে ফেলতে পারে। সারদা, লেক মল, ত্রিফলা কেলেঙ্কারির আবহে এই হার যদি আর ৫ শতাংশ বেড়ে যায় তা হলে যে সমূহ বিপদ, সেটা বিলক্ষণ জানেন তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব। আগামী বছরের বিধানসভা ভোটের আগে তা বামেদের বাড়তি শক্তি যোগাবে। তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতার কথায়, বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করে যতটা ভোট বাড়িয়ে নেওয়া যাবে, ততই আমাদের পক্ষে মঙ্গল। তাই সে ভাবেই রণকৌশল তৈরি করা হয়েছিল। আর তা সফলও হয়েছে।

কী ছিল শাসক দলের রণকৌশল? বিরোধীদের অভিযোগ, অনেক দিন আগে থেকেই এলাকায় এলাকায় হুমকি দিয়ে সন্ত্রাসের ক্ষেত্র তৈরি করে রেখেছিল তৃণমূল। শুধু বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদেরই শাসায়নি তারা, ঝামেলা করলে ফল ভাল হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল সাধারণ ভোটারদেরও। ভোটের আগের দিন ফের বাড়ি বাড়ি গিয়েও হুমকি-ধামকি, এমনকী ভোটার কার্ড কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও এসেছিল বহু জায়গা থেকে। পাশাপাশি, পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলিতে বহিরাগতদের জড়ো করেছিল তৃণমূল। বৃহস্পতিবার থেকেই

অপরিচিত মুখের ভিড় নিয়ে পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানাচ্ছিলেন বিরোধীরা। শনিবার সেই বহিরাগতরাই ভোটের মাঠ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন বলে অভিযোগ। আগে থেকে তৈরি হওয়া এ সকল অশান্তি দেখে অনেকেই ভোট দিতে যাননি। ফলে অন্যান্য বারের তুলনায় এ বার ভোট পড়েছে অনেক কম। ৬২ শতাংশের কাছাকাছি। যার মধ্যে আবার বেশ কিছু জাল অর্থাৎ নকল ভোট আছে বলে কবুল করছেন শাসক দলের নেতারাই।

যাঁরা ভোট দিতে গিয়েছেন তাঁদের অনেকেই বলেছেন, বুথের মধ্যে অবাধে ঘুরে বেড়িয়েছেন পরিচয়পত্রহীন অনেক লোকজন। কোথাও কোথাও শাসক দলের প্রতিনিধি, এমনকী ভোটকর্মীরাও হয় নিজেরাই ভোট দিয়ে দিয়েছেন বা ভোট দেওয়ার সময় নজরদারি চালিয়েছেন বলে অভিযোগ। কোথাও পুলিশকে তেমন সক্রিয় দেখা যায়নি। কোনও ফল হয়নি এসকল অসংগতির কথা পুলিশকে জানিয়ে। এমন অভিযোগ করেছেন ভোটাররা।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় বলে দিয়েছেন, এ দিনের ভোটে ম্যান অব দ্য ম্যাচ পুলিশ-ই। গিরিশ পার্কে গুলিবিদ্ধ এসআই জগন্নাথ মণ্ডলকে দেখতে হাসপাতালে গিয়ে তিনি বলেন, ১৪৪টা ওয়ার্ডে ভোট হয়েছে। মাত্র চার-পাঁচটা জায়গায় ছোটখাটো গোলমাল হয়েছে। বিরোধীরা যে সব জায়গায় এত দিন ভোট করিয়েছে, সেখানে তারা মাথা তুলতে পারছে না। জনগণ তাদের প্রতিহত করছে। তাই তারা গন্ডগোল পাকিয়ে শাসক দলের উপরে সেই দায় চাপাচ্ছে।

নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণ হয়েছে তা বোঝাতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, রাস্তাঘাট এত শান্তিপূর্ণ ছিল যে, কোথাও উত্তেজনার ছবিই ছিল না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর দাবির বিরোধিতা করেছেন রাজ্য নির্বাচন কমিশনারই। শান্তবাবুর কথায়, আদর্শ পরিবেশে ভোট হয়নি। তিনি জানান, সচিত্র পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়া, বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট, ভোটারদের লাইন থেকে বের করে দেওয়ার মতো অভিযোগ উঠেছে। যে পরিবেশে ভোট হয়েছে তাতে সাধারণ মানুষ স্বাধীন ভাবে তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি, এমন অভিযোগও

তিনি পেয়েছেন। আদর্শ পরিবেশে ভোট হলে এত অভিযোগ আসত না, বলেছেন সুশান্তবাবু। যা শুনে শাসক দলের নেতাদের পাল্টা প্রশ্ন, যতক্ষণ ভোট হচ্ছিল, কমিশন কোথায় ছিল? ভোট অবাধ করার দায়িত্ব তো কমিশনেরই। কমিশনকে দুষেছেন বিরোধীরাও। বিজেপির রাজ্য সভাপতি রাহুল সিংহ বলেন, কমিশন যথাযথ দায়িত্ব পালন করেনি। ডব্লিউবিসিএস অফিসার দিয়ে ভোট হয় না। ২৫টি ওয়ার্ডে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়ে সিপিএম বলছে, ভোট-পরিবেশ নিয়ে এই পর্যবেক্ষণের পরে নির্বাচন কমিশন কত বুথে ফের ভোট করায়, সেটাই দেখার বিষয়। আর প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীর বক্তব্য, কলকাতা পৌরভোট যে সন্ত্রাসপূর্ণ হবে, তা তাঁরা আগেই আশঙ্কা করেছিলেন। সেই আশঙ্কা সত্যি হয়েছে। তাঁর কথায়, তৃণমূল নেত্রীকে এত সন্ত্রাসের উপর নির্ভর করতে হল কেন, বাংলার মানুষ সে প্রশ্ন করবে।

মোটকথা ভোটের পাল্লায় তৃণমূল হারতে চায়নি কোনও ভাবেই। তাতেই কলকাতা শহরে বহিরাগতদের আবির্ভাব ঘটিয়েছিলো তারা। আর সন্ত্রাস চালিয়ে, বুথ দখল করা, এজেন্টদের বের করে দেওয়া, বোমাবাজী করাসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তারা করতে পেরেছে অনায়াসেই। তৃণমূল সবসময়েই চেয়েছিলো কলকাতা তাদের দখলে থাক। আর তাতে তারা সফল হয়েছে।

সন্ত্রাসের মাধ্যমে হলেও অন্তত পৌরভোটে সফলতা পেয়েছে তৃণমূল এতে কোনও সন্দেহ নেই।

আর কয়েকদিন পরেই বাংলাদেশের বড় দুই সিটিতে সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এ নির্বাচন ঘিরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তৃণমূলের মত চায়না যে সিটির মেয়র ক্ষমতাসীনরা ব্যতিত অন্য কেউ দখলে নিক। অপর দিকে বাংলাদেশের আরেকটি বড় দল বিএনপি চায় সিটি মেয়র পদ তাদের দখলে রাখতে। এ নিয়ে সাধারণ ভোটরদের মধ্যে এক ধরণের চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। অবশ্য সিটি নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশন ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। কদিন পূর্বে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, সিটি নির্বাচন যাতে নির্বিঘ্নে হয় তার জন্য যা যা করার তা তারা করবেন।

এখন দেখার বিষয় নির্বাচন কমিশনার কতটুকু সামর্থের মধ্যে দুই সিটির নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করে তুলতে পারেন। নাকি কলকাতার পৌরনির্বাচনের মতো সন্ত্রাসের মধ্যে শেষ হয় এ নির্বাচন। তবে যাই হোক দেশের মানুষ সব সময় চায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।