ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

অধ্যাপক আবু সায়ীদকে নিয়ে সংসদে সম্প্রতি যে বিরুপ মন্তব্য করা হয়েছিলো তার বিপরীতে মাননীয় স্পিকার এক রুলিংয়ে দুঃখ প্রকাশ করে অসংসদীয় সব বক্তব্য কার্য বিবরণী থেকে বাদ দেয়ার কথা জানিয়েছেন। কফি খেতে খেতে এ রকম একটি সংবাদ পড়ছিলাম। বেশ ভাল লাগলো। কফির মতোই সংবাদটিও আমাকে বেশ চাঙ্গা করে তুলল। মনে হল দেশ থেকে সহনশীলতার রাজনীতি এখনো একেবারে উঠে যায়নি। সংসদের পক্ষ থেকে মাননীয় স্পিকারের এ রুলিং কেবল অধ্যাপক আবু সায়ীদের মতো একজন গুণী ও সম্মানী ব্যক্তির মানই রক্ষা করেনি বরং তা স্পিকারের সঠিক দায়বদ্ধতা, সংবেদনশীলতা ও উদার মনমানসিকতারও বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।

মাননীয় স্পিকার একজন স্পষ্টবাদী নীতিসিদ্ধ লোক। নিজের আত্মসম্মানের ব্যাপারে যেমন সজাগ ঠিক তেমনি অন্য কারো ব্যক্তিত্ব বা সম্মান রক্ষা করার ক্ষেত্রেও বেশ সতর্ক। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার একটি উদাহরণ দেই। ১৯৯৬ সালের কথা। তিনি তখনো স্পিকাররের মর্যাদায় অভিসিক্ত হননি। ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। সে সময় আমরা ঢাকাস্থ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বৃহত্তর ময়মনসিংহ কল্যাণ পরিষদের পক্ষ থেকে বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে একটি স্মরনিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেই। এতে বৃহত্তর ময়মনসিংহের লোক হিসেবে ডেপুটি স্পিকারের একটি বাণী নেয়ার জন্য সংগঠনটির সাধারন সম্পাদক হিসেবে আমি কিশরগঞ্জের বিশিষ্ট সাংবাদিক হাজী মোহাম্মদ আফতাব খানকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর মিন্টু রোডের সরকারী বাসভবনে গিয়েছিলাম। সেখানে অপেক্ষমান অনেকের মধ্যে একজন ছিলেন তাঁর নিজ গ্রামেরই বাল্যবন্ধু। বন্ধুত্বের অধিকারে তিনি গিয়েছিলেন একটি ব্যক্তিগত সুপারিশ নিয়ে। ডেপুটি স্পিকার সাহেব টেলিফোনে তাঁর ডাক্তার শালাকে “হ্যালো” বলে দিলেই ভদ্রলোকের কার্য সিদ্ধি হয়ে যায়। কিন্তু তিনি কোন ক্রমেই রাজি হননি। বন্ধুটি অসন্তুষ্ট হয়েছে বুঝতে পেরে তিনি এক পর্যায়ে তাকে বললেন, “আমার শালাকে যদি হাজার বারো অনুরোধ করা হয় তাতেও কোন ফল হবেনা। যা সত্যি তাই সে লিখবে। সুতরাং রাগ না করে এবার চা খেয়ে বিদায় হও।“

এই হলেন আব্দুল হামিদ এডভোকেট, আজকের জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার। যিনি সত্য ও ন্যায় নীতির প্রশ্নে যথেষ্ট শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব। গত ৩ জুন কতিপয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক আবু সায়ীদকে নিয়ে সংসদের ভেতর অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলে যে তুলকালাম কাণ্ডের রচনা করেন, আমার বিশ্বাস ওইদিন মাননীয় স্পিকার সংসদে উপস্থিত থাকলে এ ন্যাক্কারজনক ঘটনাটির উদ্ভব হওয়ার আগেই হয়তোবা তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হতেন।

বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদকে নিয়ে সংসদের আলোচনায় যেসব অসংসদীয় কথাবার্তা ও বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে, সেগুলোকে এক্সপাঞ্জ করার ঘোষণা ও ওই আলোচনার জন্য সংসদের পক্ষ থেকে স্পিকারের দুঃখ প্রকাশ একটি নৈতিক, ইতিবাচক ও উদার উদাহরণ। জাতির কাছে অবশ্যই তা আনন্দজনক ও প্রশংসনীয়।

কিন্তু যেসব সাংসদদের অসংসদীয় কথাবার্তার জন্য মাননীয় স্পিকারকে দুঃখ প্রকাশ করতে হয়েছে তাদেরকেও এতো সহজে ছাড় দেয়া যায়না। একটি বিশেষ পত্রিকার রিপোর্ট পড়েই একজন গুণী ব্যক্তির চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে ছাড়া কোন জন প্রতিনিধির কাজ নয়। বাজারেতো আরও অসংখ্য পত্রিকা রয়েছে। যাচাই বাচাইয়ের জন্য কোন নিরপেক্ষ পত্রিকার পাতায় দৃষ্টি বুলানোর মতো ফুসরতটুকু কি আমাদের মাননীয় সাংসদদের হয়ে উঠেনি?

যে বিশেষ পত্রিকার রিপোর্টটির বরাত দিয়ে আমাদের সম্মানিত সাংসদরা সেদিন সংসদে বিষোদগারে মেতে উঠেছিলেন সে পত্রিকাটির চরিত্র আমরা সবাই কম বেশী জানি। এর প্রতিপালক বা প্রতিষ্ঠাতা কে বা কারা তাও আমাদের জানা। ইনকিলাবের বালখিল্যতা আজকের নতুন নয়। স্বৈরাচারী এরশাদ আমলে একটি বিকৃত সংবাদ ছাপিয়ে পুরো দেশব্যাপী যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সুচনা ঘটিয়েছিল তা কি আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্য বৃন্দ এতো সহজেই ভুলে গেলেন?

মাননীয় স্পিকার, মানীর মান রাখতে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে যে মহত্তের পরিচয় দিয়েছেন, সে জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। যাদের হ্লুদ সাংবাদিকতার ফলে সংসদে উত্তাল পরিবেশের সৃষ্টি হল, এবং যে সব সাংসদ কোন কিছুর যাচাই বাচাই ছাড়াই সংসদের মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষার কথা বলে অতি উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন তাদের বিরুদ্ধে যথাযত আইনী ব্যবস্থার দ্রুত প্রয়োগ জাতি দেখতে চায়।