ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

রাক্ষুসি ২০১২। এই একটি বছরেই এক এক করে দেশের বেশ কজন প্রতিথযশা শ্রেষ্ঠ সন্তান বিলীন হয়ে গেলেন মহাকালের নিষ্ঠুর গর্ভে। অধ্যাপক কবির চৌধুরী, অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদী সহ আরও কজন গুণী ব্যক্তির পর আজ আবারো অচেনার দেশে পাড়ি জমালেন আমাদের সবার প্রিয় উপমহাদেশের বিখ্যাত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধে প্রান বিলিয়ে দেয়া শহীদ পিতার এক গর্বিত সন্তান অযুত হৃদয় কাঁদিয়ে চলে গেলেন তাঁর স্থায়ী ঠিকানায়।

বন্ধুর বাসায় রাতের দাওয়াত খেয়ে গাড়ি ড্রাইভ করে বাড়ি ফিরছিলাম। ফুফাতো ভাই জহির মোবাইলে কল দিয়ে এ নক্ষত্রের অকাল মৃত্যুর সংবাদটি আমাকে জানায়। কিছুক্ষনের জন্য স্তম্ভিত হয়ে যাই। বা হাত থেকে মোবাইলটি খসে পড়ে। ফুফাতো ভাইয়ের সঙ্গে আর কথা বলতে পারিনি। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে কোন রকমে মটর ওয়েতে ড্রাইভ করে বাড়ি ফিরি। হুমায়ূন আহমেদের সাথে আমার মতো নগন্য লোকের কোন ব্যক্তিগত স্মৃতি বা সম্পর্ক না থাকলেও কেন জানি অজানা একটা আবেগ বা অনুভূতি তাঁর মৃত্যু সংবাদটিকে সহজ ভাবে মেনে নিতে পারছিলনা যা কিনা আমাকে মানসিক ভাবে অনেকটাই বিচলিত করে তুলল। চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো মিসির আলি বা হিমুর মতো রহস্যময় চরিত্রে আঁকা সহজ সরল গদ্য লেখা গুলো। মনে পড়লো, হুমায়ূনের লেখা প্রথম পড়া বইটির কথা যেখানে তিনি আত্মকথা বলতে গিয়ে লিখেছেন প্রথমা স্ত্রী গুলতেকিনকে বিয়ের কাহিনী, বিয়ের পর বউকে নিয়ে সারাদিন রিক্সায় ঘুরে বেড়ানো কিংবা বড়োলোক ভাবীর কাছে দারিদ্রকে সাময়িক আড়াল করার জন্য পাশের বাড়ি থেকে ছোট বোনের কিছু জিনিস ধার করে আনার প্রানান্ত চেষ্টার গল্প।

মৃত্যু শোকের এ দিনে একে একে হৃদয়ে দোলা দিয়ে যাচ্ছে তাঁর লেখা পঠিত বই, নাটক ও নির্মিত ছবি গুলোর কথা। “কোথাও কেউ নেই” নাটকের শেষ পর্বে বাকের ভাইকে (অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর) ফাঁসিতে না ঝুলানোর জন্য প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকা শহরে যে মিছিলে অংশ গ্রহন করেছিলাম, বড়ো মনে পড়ছে সে মিছিলটির কথা। স্বৈরাচার এরশাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নাটকে পোষা পাখির কণ্ঠে “তুই রাজাকার” শব্দ দুটোর মধ্য দিয়ে দেশদ্রোহী মানবতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে জনমনে যে ঘৃণার উন্মেষ তিনি ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন তা কি এতো সহজেই ভুলা যায়?

চৌষট্টি বছর বয়স হয়তোবা খুব বেশী একটা সময় নয়। কিন্তু তারপরও নিয়তির ইশারায় জাগতিক সকল বন্ধন ছিন্ন করে তাকে চলে যেতে হল পরপারে। আর কোনদিন ধানমণ্ডির ৩/এ রোডের “দখিন হাওয়া” নামের বাড়িটি তাঁর পদচারনায় মুখরিত হয়ে উঠবেনা। ছাদে গিয়ে তিনি কোনদিন পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে যাবেননা। কিংবা গাজিপুরের নুহাস পল্লীতে আর কোন আসর বা মজলিস জমাবেননা। সন্তানতুল্য গাছদের সাথে কেউ কথা বলবেনা। তাদের ভাল মন্দ আর কেউ কোনদিন জানতে চাইবেনা। বইমেলা কাঁপিয়ে তোলার জন্য হুমায়ূন আহমেদ আর কোনদিন সেখানে যাবেননা। কোন ভক্ত পাঠককে আর কোনোদিন অটোগ্রাফও তিনি দেবেননা।

বিগত দিনে তাঁর সৃষ্ট সাহিত্যে সুন্দরের অসংখ্য বর্ণনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যে সাহিত্যে সৌন্দর্য বিরাজ করে সে সাহিত্য গৌরব পায়। মানুষের হৃদয়ে ছন্দায়িত হয়। কালের গর্ভে তিনি হারিয়ে গেছেন সত্যি, কিন্তু তাঁর ছন্দায়িত ও সুন্দর সাহিত্য কখনো তাকে হারাতে দেবেনা।তাই জন নন্দিত এ মহান পুরুষ বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ বাংলা কথা সাহিত্যের এক কিংবদন্তি মহা নায়ক হিসেবে।