ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

মানুষ মরণশীল। প্রতিটি মানুষকেই আজ না হয় কাল “মৃত্যু” নামক এ অবধারিত জিনিসটির স্বাদ গ্রহন করতে হবে। জন্মই মৃত্যুর পূর্ব শর্ত। তাইতো কবি বলেছেন, “জন্মিলে মরিতে হইবে—-“। তবে হ্যাঁ, এ মৃত্যু যদি সহজ স্বাভাবিক হয় তাহলে বুকে কষ্টের পাথর বেঁধে হলেও মানুষ অনেক সময় তা মেনে নিতে পারে। কিন্তু রক্তে রঞ্জিত কোন অস্বাভাবিক বা অমানবিক মৃত্যু কেউই অতিসহজে মেনে নিতে পারেনা।

১৫ আগস্ট এমনি একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর দিন। ব্যথাতুর বেদনাবিধুর শোকাবহ এক কলঙ্কময় দিন। ১৯৭৫ সালের এ দিনে ভোরের সূর্য ওঠার আগেই একদল প্রশিক্ষিত ঘাতকের হাত বিশ্বাসঘাতকতায় মেতে ওঠে। নিক্ষিপ্ত বুলেটের আওয়াজে প্রকম্পিত হয়ে উঠে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রোডের ঐতিহাসিক সেই বাড়িটি। সিঁড়ির নীচে লুটিয়ে পড়ে জাতির জনকের বুলেট বিদ্ধ রক্তাক্ত দেহটি। গর্ভবতী মহিলা থেকে শুরু করে দশ বছরের বালক রাসেল, কেউই রেহাই পায়নি ঘাতকদের নিষ্ঠুর হাত থেকে। অত্যন্ত নির্মম ও বর্বরোচিত ভাবে সপরিবারে হত্যা করা হল বাঙ্গালী জাতির হাজার বছরের এ শ্রেষ্ঠ সন্তানকে। জাতি হারাল তার অভিবাবককে। দেশ হারাল তার স্থপতিকে। জনগন হারাল তাদের সমকাল শ্রেষ্ঠ মহান নেতাকে।

বঙ্গবন্ধুর প্রতি বাংলার মানুষের ভালোবাসা এতো গভীরতর ছিল যা পৃথিবীর অন্য কোন নেতার ক্ষেত্রে একেবারেই বিরল। আমার জানামতে এমন লোকও আছেন যিনি সিগারেট টানা অবস্থায় এ মহান নেতার মৃত্যু সংবাদ শুনেন এবং শুনামাত্রই তাঁর হাত থেকে সিগারেট খসে পড়ে। অধ্যাবদি তিনি আর সিগারেট হাতে তুলে নেননি। কেউ হয়তোবা খালি পা থাকা অবস্থায় এ মর্মান্তিক সংবাদ পান। নেতার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় অভিসিক্ত হয়ে আজ পর্যন্ত পায়ে জুতা লাগাননি। কালজয়ী এ মানুষটির প্রতি গভীর মমতা, অপরিসীম শ্রদ্ধাবোধ ও নিখাদ ভালোবাসা জনিত এ ধরনের অনেক উদাহরণ রয়েছে। অথচ এ দেশেরই কিছু বিপথগামী ঘৃণিত কুলাঙ্গার মীরজাফরী কায়দায় ১৫ আগস্টের মতো একটি কালো অধ্যায়ের সুচনা ঘটিয়ে জাতিকে হতভম্ব করে দেয়। যে পাকিস্তানিরা ১৯৭১ সালে বাঙ্গালি জাতির এ প্রাণ পুরুষকে নির্জন সেলে বন্দি রেখে তাঁর সামনে কবর খুঁড়েও তাকে হত্যা করার সাহস পায়নি, সেই নিকৃষ্টতম বর্বর কাজটি কিনা পরিশেষে বাঙ্গালি নামের গুটি কতক পাকিস্তানি দোসর দ্বারাই সম্পন্ন হল! কিন্তু এ যে কেবল একজন বঙ্গবন্ধুকেই খুন করা নয়, খুন করা হয়েছে ত্রিশ লাখ শহীদের স্বপ্ন, বীরমুক্তিযোদ্ধা ও জনগণের কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা বাস্তবায়নের স্বপ্নকেই।

তার পরের ইতিহাস সবারই কম বেশী জানা। প্রায় দু যুগেরও বেশী সময় ধরে জাতি “ইনডেমনিটি” নামের এক জগদ্দল পাথর বুকে চেপে সময় কাটিয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকার্য শুরু করেন। এবার ক্ষমতায় এসে পুরোপুরি ভাবে বিচারকার্য সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। দোষীদের অনেকের ফাঁসী হয়েছে। জাতি অনেকটা স্বস্তি পেয়েছে। কলঙ্ক মুক্ত হয়েছে। কিন্তু এখনো যারা বিদেশ বিভূঁইয়ে পালিয়ে রয়েছে তাদেরকেও দ্রুত দেশে ফিরিয়ে বিচারের মুখোমুখি করা হোক সেটাই জাতি চায়।

কান টানলে যেমন মাথা চলে আসে ঠিক তেমনি বাঙ্গালি জাতির ইতিহাস টানলে বঙ্গবন্ধু চলে আসে সবার আগে। বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ বা বাঙ্গালি জাতির কোন ইতিহাস নেই। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু বা শেখ মুজিব একটি জাতির অনুপ্রেরণার নাম। একটি স্বাধীন দেশ গড়ে তোলার বিপ্লবী নাম – শেখ মুজিব। বাঙ্গালি জাতি যতদিন বেঁচে থাকবে শেখ মুজিব নামটিও ততদিন সোনার হরফে লেখা থাকবে। তাই বিশাল এ ব্যক্তিত্বকে আমরা যেন আর কোন বিশেষ দলের গণ্ডির ভেতরে আঁটকে রেখে তাঁকে খাট করে না রাখি।

একটি শোষণহীন সাম্যবাদ সমাজ গঠনের মধ্য দিয়ে সোনার বাংলা গড়ার সপ্ন ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। তিনি সে সপ্ন পুরন করে যেতে পারেননি। কালের আবর্তে তাঁরই যোগ্য উত্তরসূরি জননেত্রী শেখ হাসিনা আজ শাসন ক্ষমতায়। আমারা আশা করবো, তিনি বা তাঁর দল অযাচিত বালখিল্যতা পরিহার করে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার আদর্শ, লক্ষ্য ও চেতনাকে সামনে রেখে সত্যিকার অর্থে সোনার বাংলা গঠনের মধ্য দিয়ে তাঁর বাবার অসমাপ্ত স্বপ্ন সম্পন্ন করতে সক্ষম হবেন। আর এই হোক আজকের প্রদীপ্ত অঙ্গীকার।