ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

এক কালে লোকজন সপরিবারে পেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবি দেখে বিনোদনের স্বাদ মেটাত। এমনকি গ্রামগঞ্জ থেকে কেউ শহুরে আত্মীয়ের কাছে বেড়াতে গেলেও তাদেরকে সিনেমা হলে ছবি দেখিয়ে আতিথেয়তা বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হতো। এখন আর সে রেওয়াজ বা কালচার কোনটাই নেই। অনেক আগেই আমাদের সমাজ ব্যবস্থা থেকে তা বিদায় নিয়েছে। কুরুচিপূর্ণ অশ্লীলতাই মূলত অনেকাংশে এ জন্য দায়ী। নগ্নতায় ভরা সুড়সুড়ি জাতীয় ছবি এক শ্রেণীর লোককে আকৃষ্ট করলেও পরিবার পরিজন নিয়ে যেসব সজ্জন ব্যক্তিদের হলে গিয়ে ছবি দেখার কথা, তারা আস্তে আস্তে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ফলে বিনোদনের এ শক্তিশালী মাধ্যমটিতে দেখা দেয় পচনদশা। পরবর্তীতে সুষ্ঠু ও রুচিশীল বিনোদনের আশ্রয় হিসেবে মানুষ টেলিভিশনকেই বেছে নেয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে, এ মাধ্যমটিও আজ বিভিন্ন ভাবে কলুষিত, দূষিত ও ধর্ষিত। ডিজিটাল সভ্যতার নিপীড়নে হারাচ্ছে এর স্বকীয়তা। অপসংস্কৃতির হাত ধরে এগিয়ে চলছে অন্ধকার মৃত্যুর দিকে।

দু’তিন আগে একটি বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলে লাইভ অনুষ্ঠান দেখছিলাম। ফ্যাশন বিষয়ক অনুষ্ঠান। উপস্থাপিকা ও আমন্ত্রিত দুজন অতিথির বেশভূষা বলিউডের নায়িকা কিংবা পাশ্চাত্যের ব্যবহৃত পোশাককেও যেন হার মানিয়েছে। বিশেষ করে আগত অতিথিদের পশ্চিমা ধাঁচের খোলামেলা আধুনিকতা সরলমতি দর্শকদের ইন্দ্রিয় তৃপ্তির উদ্দীপনাকে সজিব করে তোলার জন্য যথেষ্ট বলেই মনে হল। শুধু ওই একটি বিশেষ চ্যানেলের বিশেষ অনুষ্ঠানের মধ্যেই এর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ নয়। সময়ে অসময়ে আরও বিভিন্ন চ্যানেলে বিভিন্ন সাপ্তাহিক বা ধারাবাহিক নাটকেও নিজস্ব কৃষ্টি, ঐতিহ্য বা সংস্কৃতির স্খলন ঘটতে দেখা যায়। কিছুদিন আগে বিপিএল উদ্বোধনীর নামে একটি বিশেষ চ্যানেল মাতাল নৃত্যের অবয়বে যে সুড়সুড়ির সম্প্রচার ঘটিয়েছে তা হয়তোবা এখনো আমাদের অনেকের হৃদয়ে অক্ষত রয়েছে। একটি ধর্মীয় অনুভূতি সম্পন্ন দেশে পারিবারিক বিনোদনের একমাত্র মাধ্যমটিতে কি করে এ ধরনের নস্টালজিয়া সম্প্রচারিত হয় তার হিসেব মেলাতেও বড্ড কষ্ট হয়।

জাতি হিসেবে গরীব হলেও সাহিত্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি বা ঐতিহ্যে আমরা মোটেও দীন নই। আমাদের রয়েছে মহিমান্বিত অতীত। হাজার বছরের গর্বিত ঐতিহ্য মাথায় নিয়ে এখনো দেশটি বঙ্গোপসাগরের পাদদেশে বীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে । এর সুপ্রাচীন সংস্কৃতিকে লালন করেই বেড়ে উঠেছেন কালিদাস, আলাওল, রবি ঠাকুর, নজরুল, জসিম উদ্দিন বা ফররুখ কিংবা আজকের শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুন, শহীদ কাদরীর মতো গুণী সন্তানরা। তারপরও কেন আমরা নিজেদের সংস্কৃতির মুণ্ডপাত করে ধার করে আনা বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রতি দরদী হয়ে উঠি? স্বীয় জাতিসত্ত্বা বা গৌরবময় সংস্কৃতির বিকাশের পরিবর্তে বিজাতীয় সংস্কৃতির পরাকাষ্টে বলি দিচ্ছি নিজেদের অস্তিত্বকে?

নিজস্ব সংস্কৃতিকে মাটি চাপা দিয়ে কোন জাতি কিংবা কেউ ব্যক্তিগত ভাবেও কখনো বড় হতে পারেনা। কয়েক বছর আগে দেশের একটি শীর্ষ সাপ্তাহিকীতে একটি খবর পড়েছিলাম। আমেরিকান প্রবাসী এক বাঙ্গালী মহিলা স্বীয় সংস্কৃতি ও জাতিস্বত্বার গৌরব ভুলে গিয়ে অতি বেশি আমেরিকান হয়ে যেতে চেয়েছিলেন। নিজের ঐতিহ্যকে ভুলে যেতে চাইলেও নাড়ীর সাথে আঁটার মতো লেগে থাকা বাঙ্গালিয়ানা তাকে ছাড়লো না। ফলে কোন একটি নাইটক্লাবে গিয়ে ‘বাস্টার্ড’ গালি শুনে বেরিয়ে আসতে হয় তাকে। নিজস্ব রাস্থা ছেড়ে দিয়ে ভুল পথে কিংবা মাঝ পথে চললে বুঝি এমনটি-ই হয়।

সময়ের পরিক্রমায় আজ আমি নিজেও প্রবাসী। তাই বিদেশীদের হৃদয়ে আমাদের সংস্কৃতি কিভাবে দোলা দেয় তা দেখার সুযোগ হয়েছে খুব কাছে থেকে। আমাদের জাতীয় বা ঐতিহ্যগত অনুষ্ঠানাদি পালনের ক্ষেত্রে কখনো কখনো স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে বিদেশী অতিথিদের আমন্ত্রন জানানো হয়। বাঙ্গালী নৃত্য ও সঙ্গীতের তালে তালে মেতে উঠা অনুষ্ঠান তাদেরকে অভিভূত করে। আমাদের সংস্কৃতিকে ‘রিস, ভেরি রিস’ বলে অভিহিত করেন। শুধু তাই নয়, আমাদের বউবাচ্চারা দেশীয় বা ঐতিহ্যগত পোশাক পরিচ্ছেদে সেজেগুজে যখন বাইরে বেরোয় তখন প্রবাসীরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থেকে “ওয়াও” “ওয়ান্ডারফুল” প্রভৃতি বিশেষণে বিশেষিত করে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেন। অথচ আমরা হীরা ফেলে কাঁচ তুলতেই যেন ব্যস্ত বিভোর।

দুতিন মাস আগে আমার স্ত্রীর সিটিজেনসিফ সেরেমনি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত অভিবাসীদের মধ্যে যারা প্রয়োজনীয় শর্তপূরণ সাপেক্ষে আইরিশ নাগরিকত্ব লাভে সক্ষম হয় তাদেরকে সরকারী ভাবে বিশেষ সম্মান প্রদর্শন পূর্বক বিচার ও আইন মন্ত্রীর (Minister of Justice and Law) উপস্থিতিতে একজন বিচারপতির মাধ্যমে আইরিশ জাতীয়তাবাদের প্রতি আনুগত্য সূচক যে শপথ বাক্য পাঠ করানো হয় তাই সিটিজেনসিফ সেরিমনি হিসেবে পরিচিত। যাহোক ওই অনুষ্ঠানে মন্ত্রী মহোদয়ের বক্তব্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। অনুষ্ঠানে আগত কয়েক হাজার মিশ্র অভিবাসীর সামনে ক্রিকেটে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের সাফল্যের কথা সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করে সবার উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলেন যা প্রকৃত অর্থেই খুব গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, “আজ যারা আইরিশ জাতীয়তাবাদে সিক্ত হয়েছেন তারা কোন ক্রমেই যেন নিজস্ব অতীত ভুলে না যান। মূল জাতীয়তাবাদ, স্বীয় ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ভেতরই নিহিত রয়েছে প্রত্যেকের যথার্থ পরিচয়। এসবকে বাদ দিয়ে কেঊ কখনো বড় হতে পারেনা। আয়ারল্যান্ড নিজে একটি অভিবাসী অধ্যুষিত দেশ হওয়া স্বত্বেও স্বীয় জাতিসত্ত্বা ও নিজস্ব সংস্কৃতিকে কখনো ব্যহত হতে দেয়নি। তাই বিভিন্ন জাতীয়তাবাদ থেকে যারা আইরিশ পতাকাতলে এসে দাঁড়িয়েছেন তারা নিজেদের মূল (Root) ধরে রেখে আদি সংস্কৃতি চর্চায় আব্যাহত থাকবেন ও পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও এর ধারাবাহিকতা ছড়িয়ে দেবেন। তবেই মূল জাতীয়তাবাদের সম্মান যেমন অক্ষুন্ন থাকবে ঠিক তেমনি তা আইরিশ জাতীয়তাবাদের জন্যও হবে গৌরবময় কল্যাণকর।“

একজন ভিনদেশী মন্ত্রী আমাদেরকে নিজেদের সংস্কৃতি ধরে রেখে তা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার আহবান জানিয়েছেন। অথচ আমরা নিজেরাই নিজেদের সংস্কৃতিকে প্রতিনিয়ত বলৎকার করি অপসংস্কৃতির আসক্তিতে। গলা টিপে হত্যা করি অতি আধুনিকতার নামে। যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে সমাজ, রাজনীতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ তথা সমগ্র জাতির উপর। দুষ্ট সংস্কৃতির এ কালো থাবা থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন গণসচেতনতা। আর এ কাজটির সফল বাস্তবায়নে প্রিন্টিং মিডিয়া সহ টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের মতো শক্তিশালী মাধ্যম গুলোর কোন বিকল্প নেই।

***
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে:http://www.bdreport24.com