ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

খবরটা সপ্তাহ খানেক আগের। আয়ারল্যান্ড ভিত্তিক অনলাইন পোর্টাল আইরিশ বাংলা বার্তায় প্রচারিত হয়। ফেসবুক বন্ধু হিসেবে আমার স্ট্যাটাসে শেয়ার হওয়ার সাথে সাথেই পড়ার জন্য বেশ উৎসাহী হয়ে উঠলাম। “নিউইয়র্ক টাইমসে শেখ হাসিনার কড়া সমালোচনা” শিরোনামটি দেখে প্রথমে মনে হয়েছিলো, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারন অধিবেশনে বক্তৃতা প্রদান কালে বিশ্ব ব্যাংক সম্পর্কিত যে সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছেন তারই আলোকে হয়তোবা নিউইয়র্ক টাইমস কোন সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। কিন্তু পড়তে গিয়ে দেখি আমার ধারনার ধারে কাছেও নেই। আইরিশ বাংলা বার্তায় বঙ্গানুবাদকৃত সংবাদটিতে চোখ বুলিয়েই মূল খবরটি পড়ার বেশ তাগাদা অনুভব করলাম। তাই অনলাইনে ঢুকে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২ এর নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত খবরটি পড়তে গিয়ে বুঝলাম, এটি কোন সাদামাটা রিপোর্ট বা প্রতিবেদন নয়। উপসম্পাদকীয় পাতায় নিয়মিত কলামিস্ট মিঃ নিকোলাস ডি ক্রিষ্টফের (Nicholas D. Kristof) লেখা “Women Hurting Women” শিরোনামের একটি কলাম। যেখানে ক্ষমতাসীন নারী নেত্রী হওয়া স্বত্বেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নারী উন্নয়নের কাঁটা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ক্ষমতায়নের পর এ নেত্রী কিভাবে নারী উন্নয়নের প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছেন তারই বিশ্লেষণ নিহিত রয়েছে লেখাটিতে।

কলামটিতে লেখক বিশ্বে নারীদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের জন্য নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে চ্যাম্পিয়ান আখ্যায়িত করে বিশেষ অগ্রদুত হিসেবে চিত্রত করেছেন। তাঁর মতে, ড. ইউনূসের ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচীর বদৌলতেই বাংলাদেশের নারীরা তাদের পরিবারকে দারিদ্রমুক্ত করতে পেরেছেন। অথচ শেখ হাসিনার সরকার এমন একজন গুণী ব্যক্তিকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে হটিয়েই ক্ষান্ত নয়, বরং ৫৫ লাখ ক্ষুদ্র শেয়ার হোল্ডারদের ৯৫% নারী মালিকানাধীন এ প্রতিষ্ঠানটির দখল ছিনিয়ে নিতেও ব্যস্ত। নারী বৈষম্যের কথা বলে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলেও সেই ক্ষমতা বলেই তিনি এমন একজন ব্যক্তির গোটা জীবনের অর্জনকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চাচ্ছেন যিনি বিশ্বের সবচেয়ে অসহায় নারীদের জন্য সম্ভাব্য সবটুকুই করেছেন।

‘একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে আছি। আমি জানি না কীভাবে এ থেকে মুক্তি পাবো।’ ড. ইউনুসের এ উদ্বৃতি তুলে ধরে তাঁর সমর্থকদের আশঙ্কার কথাটি কলামিস্ট পাঠকদের জানিয়েছেন এভাবে – “যে কোনো সময় তাদের এই ত্রাতা গ্রেপ্তার হয়ে যেতে পারেন।“ নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে মার্কিন এ সাংবাদিক তাঁর “উইমেন হার্টিং উইমেন” নিবন্ধে এ কথাই স্পষ্টত বলেছেন, ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে ন্যক্কারজনক কাজ বা তাঁকে আঘাত করার অর্থই হচ্ছে সমাজের ও উন্নয়নের মূল স্রোত ধারায় নারীর অংশগ্রহনের বিষয়টিকেই আঘাত করা যা কিনা একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিরাট বাধা স্বরূপ। নিবন্ধে কোন রাখঢাক না রেখে তীব্র সমালোচনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই এ জন্য দায়ী করা হয়েছে।

এ বছরের গোড়ার দিকে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি লিখেছিলেন যাতে তাঁর প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ড. ইউনূস কোন বাধাবিপত্তি ছাড়া তাঁর কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। এছাড়া আরও দুই পররাষ্ট্র মন্ত্রী জর্জ সুলৎস ও মেডলিন অলব্রাইটও শেখ হাসিনার কাছে এ বিষয়ে সহায়তা চেয়েছিলেন। কিন্তু ড. ইউনূসের প্রতি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ঈর্ষা ও অসন্তুষজনক মনোভাবের ফলেই এতো কিছুর পরো কোন ফল হয়নি বলে ডি ক্রিষ্টফ তাঁর লেখায় উল্লেখ করেন। এসব বিষয়ে খোলামেলা কথা বলার জন্য ক’দিন আগে নিউইয়র্কে গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এ কলামিস্ট দেখা করতে চাইলে টাইম শিডিউল ঠিক করেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করা হয় বলেও তিনি জানান। এমতাবস্থায় তিনি ইউনুসের পক্ষে কথা বলার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারেক ওবামা সহ বিশ্ব রাজনীতিকের কণ্ঠ জেগে ওঠার আহবান জানিয়েছেন।

মার্কিন এ লেখকের লেখায় বাংলাদেশ সরকারের উপর বিশ্ব শক্তির কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কিনা তা আমি জানিনা। তবে ড. ইউনূস যে একজন বিশ্ব বরন্য খ্যাতি ব্যক্তিত্ব এতে কোন সন্দেহ নেই। চলার পথে মহতেরও পা স্খলিত হয়। গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনায় ড. ইউনূসের দু একটি ভুল ভ্রান্তি হলে হতেও পারে। তাই বলে তাঁর মতো একজন নোবেল লরিয়েটকে নিয়ে ঘরে বাইরে “তামাসা” সৃষ্টি করা কি সরকারের খুব বেশী জরুরী ছিল? দেশ হাজারো সমস্যার অতলান্তিকে ডুবে আছে। সেসবে নজর না দিয়ে সরকার গ্রামীণ ব্যাংক বা ড. ইউনূসকে নিয়ে কেন এতোটা “উথলা” হয়ে উঠলেন? এতে দেশ বিদেশে সরকারের ক্রেডিবিলিটি বাড়ছে না কমছে তা সরকারকেই উপলব্ধি করতে হবে।

সরকার বুদ্ধিমান হলে এ গুণী ব্যক্তিটিকে হাতে রেখে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে সচেষ্ট হতেন। দেশে বিদেশে ড. ইউনূসের যেসব শুভাকাঙ্খি রয়েছেন তাদেরকে ব্যবহার করেও সরকার যথেষ্ট লাভবান হতে পারতেন। পদ্মা সেতুর ঋণ নিয়ে বিশ্ব ব্যাংক যে টালবাহানা করছে সে ক্ষেত্রেও ড. ইউনূসের মতো ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিলে দক্ষতার সাথে তিনি সফল ভুমিকা পালন করতে সক্ষম হতেন বলেই আমাদের বিশ্বাস। ইউনূস কাণ্ডারি হিসেবে যে ব্যক্তিটি আজ বাংলাদেশ সরকারকে চাপ প্রয়োগের জন্য বিশ্বকণ্টকে আহবান জানিয়েছেন, তিনি-ই হয়তোবা তখন সুর পালটিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ নিয়ে বিশ্ব ব্যাংককে চাপ সৃষ্টি করার মতো কোন লেখা নিউইয়র্ক টাইমসে লিখার প্রয়াস পেতেন।

পাশাপাশি এ কথা না বললেই নয়, ইউনূস ইস্যু নিয়ে মিঃ ক্রিস্টফ কঠোর সমালোচনার মাধ্যমে নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তা সত্যিকারার্থে সঠিক নয়। শেখ হাসিনাই একমাত্র নারী নেত্রী যিনি ক্ষমতায়নের পরই সংসদীয় উপনেতা থেকে শুরু করে কেবিনেটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনে নারীদেরকে সুযোগ দিয়েছেন। এ ছাড়াও বিচার বিভাগ, প্রশাসন, কূটনীতি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সহ বিভিন্ন অফিস আদালতে কর্মরত নারীদের উপস্থিতি নারী উন্নয়ন বা ক্ষমতায়নের কথাই বলে দেয়। নারী উন্নয়ন নীতিমালায় উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্যে মেয়েদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষা, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে বই বিতরণ ও গ্রামীণ নারীদেরকে বিনা সুদে ঋণ প্রদান এবং ২০০৯ সাল থেকে স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে নারীদের জন্য ভাইস চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি নারীর ক্ষমতায়নের পথকেই সুগম করেছে যা কিনা মুলত এ সরকার তথা শেখ হাসিনার আমলেই সম্ভব হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংক বা ইউনুসকে নিয়ে সরকারের বাড়াবাড়ি রয়েছে বটে, কিন্তু ওই একটি মাত্র কারণ দেখিয়ে শেখ হাসিনাকে “নারী নেত্রী হওয়া স্বত্বেও নারী উন্নয়ন বা ক্ষমতায়নে বাধা” অপবাদ দিয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে উস্কে দেয়াটা লেখকের মোটেই সমীচীন হয়নি।

ড. ইউনূস একজন বিশ্ব নন্দিত ব্যক্তি। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ান। কয়েক বছর আগে তিনি এক ভি আই পি প্রতিনিধি দলের সাথে আয়ারল্যান্ডে এসেছিলেন। আমার সঙ্গে স্বল্প সময়ের জন্য দেখাও হয়েছিলো। কয়েক মাস আগে প্রধানমন্ত্রী ড ইউনুসকে বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট পদের জন্য প্রস্তাব দিলে তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তখন তাঁর সাথে আমার সেই স্বল্প অথচ অসাধারন অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ সাক্ষাতের দাবী নিয়ে এ ধরনের একটি সম্মানজনক প্রস্তাবকে পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়ে তাঁকে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। তাঁর মতো একজন গুণী পণ্ডিত ব্যক্তিকে পরামর্শ প্রদানের ধৃষ্টতা আমার নেই। তারপরও একই দাবীর সুবাদে আজ আবারো অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলতে চাচ্ছি, হিতাকাঙ্খি হিসেবে তাঁর প্রতি বিদেশি বন্ধুদের সহানুভূতি বা দরদ যেন নিজ দেশ বা জাতির অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে না দাঁড়ায় সে বিষয়টি তিনি অবশ্যই সতর্কতার সহিত খেয়াল রাখবেন।