ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

হায়দার স্যার। আমার প্রাক্তন প্রিয় শিক্ষকদের একজন। ক্যামেস্ট্রির মতো কঠিন একটি সাবজেক্টকে তরল করে বুঝিয়ে দিয়ে পুরো ক্লাসকে প্রানবন্ত করে তুলতেন। রসায়ন নিরাসক্তিতে যেসব ছাত্ররা ভুগতেন তাদের মধ্যে আসক্তির উন্মেষ ঘটাতেন নিজস্ব কৌশলে। জীবন ও জগৎসংসারের প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে তুলনা করে করে রসায়ন শাস্ত্রকে পাঠ দানের মাধ্যমে দর্পণের মতো সহজতর করে তুলতেন প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছে। সহজ-সরল এ রসায়নবিদ রসায়নের এক পাঠ্যসূচীর ব্যখ্যা দানকালে একদিন বলেছিলেন, “ছাত্র ছাত্রই। সে যদি মাস্টার্স কমপ্লিট করে পি এইস ডি ও করতে যায় তারপরো তার মধ্যে ষোল কিংবা আঠার বছরের চাঞ্চল্যই রেখাপাত করবে যা কিনা তার ছাত্রত্বকেই ফুটিয়ে তুলে। পক্ষান্তরে, একজন এইট বা মাধ্যমিক পাস করুয়া কোন কর্মরত ব্যক্তির মধ্যে এর উল্টোটা প্রতীয়মান হবে। তিনি ওই মাস্টার্স বা পি এইচ ডি পড়ুয়া ছাত্রটির তুলনায় ছোট কিংবা সমবয়সী হলেও সমান চাঞ্চল্য বা তারুন্য তার মধ্যে ফুটে উঠবেনা। কারণ একটাই- একজন প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর ছাত্র, অন্যজন কর্মজগতে ডুবে থাকা ভাবগাম্ভীর্য সম্পন্ন একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। “

প্রায় দু যুগ আগে ভদ্রলোক রসায়ন পড়াতে গিয়ে এ ধরনের একটি উদাহরণ টেনেছিলেন। কিন্তু আজ উকিল ব্যরিস্টার থেকে শুরু করে ডাক্তার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনীতিবিদ প্রভৃতি উচু শ্রেণীর পেশাজীবী লোকেরাও যখন বিভিন্ন দাবী দাওয়ার নামে আন্দোলন করতে গিয়ে নিজস্ব পরিচয় ভুলে উশৃঙ্খল ও বেপরোয়া আচরনের আশ্রয় নেয় তখন তাঁর এ উদাহরণের সত্যতা যেন একেবারেই ফিকে মনে হয়। আমি আন্দোলন বিরোধী নই। বিভিন্ন দাবী দাওয়ার শর্তে মানুষ যুগ যুগ ধরে আন্দোলন করে আসছে। সাধারন বা যে কোন পেশাজীবী মানুষের ন্যয্য হিস্যা আদায়ের সর্বশেষ পন্থাই হচ্ছে আন্দোলন। কিন্তু সে আন্দোলনেরও একটি শিল্পিত ভাব থাকা চাই। এক ধরনের স্কেল থাকা চাই। আমি যে দেশটিতে বর্তমানে আছি সে দেশের এক শ্রেণীর পেশাজীবী মানুষের সাম্প্রতিক আন্দোলনের একটি রূপরেখা পাঠকদের সামনে প্রাসঙ্গিকতার খাতিরেই তুলে ধরছি।

কিছুদিন আগে এ দেশে পোস্টঅফিস কর্মচারী ও কর্মকর্তা বৃন্দ তাঁদের দাবী মেনে নেয়ার জন্য সরকারকে চাপ দেয়। এতে সরকার সাড়া না দেয়ায় তারা ধর্মঘটের মতো কঠিন আন্দোলন বেছে নেয়। কিন্তু তাঁদের ধর্মঘট আমাদের দেশের মতো জ্বালাও, পুড়াও, ভাংচুর তথা ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ বা মানুষ হত্যার মতো জঘন্যতম কোন কার্যক্রম নয়। জনজীবনে এর কোন বিন্দু পরিমান বিরুপ প্রভাবও পরেনি। সত্যিকারার্থে জনগন ওইদিন আন্দোলন বা ধর্মঘটের কোন অস্তিত্বই ঠের পায়নি। কারণ পোষ্ট কর্মচারী- কর্মকর্তা বৃন্দ প্রতিদিনের মতো অফিসে গিয়ে সকল অফিসিয়েল কাজকর্মই করেছে। কেবলমাত্র জনগনের কাজকর্ম করা থেকে বিরত রয়েছে। কোন নাগরিক পোস্টঅফিসে কাজকর্ম নিয়ে গেলে শতবার দুঃখ প্রকাশ করার মাধ্যমে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তাঁদের অপারগতার কথা জানিয়েছে। অথচ আমাদের দেশে শ্রমিক আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশাজীবী বা রাজনৈতিক সংগঠন গুলোর আন্দোলনের মধ্যে কি এ ধরনের কোন ন্যুন্যতম শিষ্টাচারবোধের উপস্থিতি দেখা যায়?

এইতো দুদিন আগে শিক্ষক সম্প্রদায়ের আন্দোলন দেখলাম। একজন শিক্ষকতনয় হিসেবে বরাবরই শিক্ষকদের প্রতি রয়েছে আমার বিরাট সহানুভূতি ও অগাধ শ্রদ্ধাবোধ। কিন্তু মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে যাদের রয়েছে বিরাট সুনাম, তারা নিজেরাই আজ স্বীয় স্বার্থে কিংবা নৈতিক অধঃপতনজনিত বিভিন্ন কাজকর্মের মাধ্যমে শিক্ষকতার মতো মহান পেশাটিকে কলঙ্ক কালিমায় লেপন করছেন অহরহ। এসব উদাহরণের অভাব নেই। সে আলোচনাতে আজ আমি যাবনা। কথা বলছিলাম শিক্ষকদের বিশেষ একটি অংশের সাম্প্রতিক আন্দোলন নিয়ে। আগেই বলেছি আন্দোলন দাবী আদায়ের একটি মুখ্যম পন্থা। কিন্তু সে আন্দোলন যেন পেশাগত ভারসাম্যবোধকে ধুলোয় মিশিয়ে না দেয়। এমপিও ভুক্তির দাবীতে মাধ্যমিক ও দাখিল পর্যায়ের ননএমপিও শিক্ষকরা আন্দোলনে জড়ো হয়ে পুলিশের ব্যরিকেড ভাঙতে চেষ্টা করলে তারা পুলিশি বাধার সম্মুখীন হন। আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা দুএকজন শিক্ষকের টিভি ফুটেজ আমাকে বেশ হতবাক করেছে। একজন গলা পর্যন্ত টিশার্ট তুলে পুলিশকে গুলি করার জন্য উস্কানিমুলক আহবান জানাচ্ছেন। অন্য একজন শহীদ নূর হোসেনের মতো খালি গায়ে বুকে ও পিঠে তাঁদের দাবীর কথা লিখে পুলিশের সাথে তর্কবিতর্ক করছেন। শিক্ষকের মতো মহান পেশাদারী আদর্শবান লোকদের কাছ থেকে জাতি অন্তত আন্দোলনের নামে এ ধরনের নগ্নতা আশা করেনা।

পক্ষান্তরে, আন্দোলন ঠেকানোর জন্য পুলিশ চড়াও হয়ে শিক্ষকদের লাঠিচার্জ ও মরিচের গুঁড়া স্প্রে করার মাধ্যমে যে জঘন্যতার পরিচয় দিয়েছে তা অবশ্যই গর্হিত অপরাধ যা কিনা সাধারন জনগন কোন অবস্থাতেই মেনে নিতে পারেছেনা। পুলিশের এ ধরনের ঘৃণ্য কালচার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এজন্য দোষী পুলিশদের বিচারের কাটগড়ায় দাঁড় করিয়ে সরকারকেই যাথাযথ পদক্ষেপ নেয়া জরুরী বলে মনে করি।

মাধ্যমিক বা দাখিল পর্যায়ের ননএমপিও ভুক্ত শিক্ষকদের আন্দোলনের ইস্যুটিকে মোটেও খাটো করে দেখার মতো নয়। আন্দোলনের পদ্ধতি যতোই নগ্ন বা দোষনীয় হোকনা কেন আন্দোলনের দাবীটি একেবারেই ন্যয্য। সুকান্ততো বলেই গেছেন, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। সুতরাং ফি বছর তারা বিনা পয়সায় পাঠ দান করবেন আর না খেয়ে মরবেন তাতো হতে পারেনা। এ ক্ষেত্রে সরকারের যথেষ্টই করনীয় রয়েছে। যদিও উন্নয়নশীল দেশের সরকার হিসেবে তাদেরও যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা আছে।

একজন পরিবার প্রধান যেমন পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মুখে হাসি ফুটাতে আপ্রান চেষ্টা করেও কখনো কখনো ব্যর্থ হন ঠিক তেমনি একটি দেশের সরকার বা সরকার প্রধানের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। সরকারও চায় তাঁর দেশের প্রতিটি জনগনের মুখে হাসি ফুটাতে। কিন্তু শত সমস্যা, প্রতিকুলতা তথা সীমাবদ্ধতার দরুন সকল চাহিদা মিটিয়ে সবার মুখে হাসি ফুটাতে সরকারও অনেক সময় ব্যর্থ হন। সচেতন নাগরিক হিসেবে এ বিষয়টিও আমাদেরকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করা উচিত।

এইতো সেদিন সরকার ছাব্বিশ হাজার দুইশ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের মাধ্যমে এক লাখের চেয়েও বেশী সংখ্যক শিক্ষককে সরকারী করে নিয়েছেন। এসব শিক্ষক তথা পরিবারের প্রতিটি সদদ্যের মুখে হাসির ঝলক ও আনন্দের বন্যা বইছে। পক্ষান্তরে, মাধ্যমিক ও দাখিল পর্যায়ের শিক্ষকরা এমপিও ভুক্তির দাবীতে আন্দোলন করছেন, রাস্থায় পুলিশ কতৃক নিপীড়িত হচ্ছেন। হতাশার গ্লানি মাথায় নিয়ে আমরন অনশনের ঘোষণা দিয়েছেন। সরকার যেহেতু শিক্ষকদেরই একাংশের খাতে অতি সম্প্রতি একটি বিরাট বাজেট প্রনয়ন করেছেন সে ক্ষেত্রে আন্দোলনরত শিক্ষকদের উচিত ছিল সরকারকে কিছুটা সময় দেয়ার। যেহেতু সে বিবেচনা তারা মাথায় নেননি সেহেতু জনগনের অভিবাবক হিসেবে সরকারকেই সহনশীলতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে হবে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা আছে জানি, এরপরও কষ্ট করে হলেও মানবিক দিক বিবেচনায় এনে তাঁদের দাবী মেনে নিয়ে কিংবা অতি দ্রুত বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট ঘোষণা দিলে সরকারের জন্য তা হবে এক ইতিবাচক ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত যা কিনা অদূর ভবিষ্যতে তা ফলবতী বৃক্ষের কাজ করবে।