ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

 

যখন দেখি বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের কোন ক্রিকেটার ছক্কা মেরে সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয় কিংবা অল রাউন্ডার হিসেবে নিজেকে দাঁড় করিয়ে দেশের সুনাম বাড়িয়ে তোলে তখন গর্বে বুকটা ফুলে উঠে। নোবেল প্রাইজের মতো বিশ্বসেরা পদক নিয়ে যখন একজন বাংলাদেশী ঘরে ফিরে তখন নিজেকে “হরিপদ কেরানি” থেকে “আকবর বাদশা” “আকবর বাদশা” বলে মনে হয়। একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার “শান্তি মডেল” প্রস্তাব যখন জাতিসঙ্গে সর্বসম্মতিক্রমে সম্মানের সাথে গৃহীত হয় তখন ভাবাবেগে মত্ত হয়ে চিৎকার দিয়ে বলে উঠি সাবাশ বাংলাদেশ, সাবাশ!

আজ আবারো গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে, সাবাশ বাংলাদেশ! সাবাশ হাসিনা সরকার! যে দিনটির জন্য জাতি একচল্লিশ বছর ধরে প্রহর গুনছিল সেই দিনটিই আজ দেশবাসীর সামনে অনন্য মহিমায় উদ্ভাসিত হল। বর্তমান সরকারের অনেক সীমাবদ্ধতা, ব্যর্থতা আছে বটে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধী ও মানবতা বিরোধীদের বিচার কাজ শুরু করার মধ্য দিয়ে কলঙ্ক মোচনের যে মহিমান্বিত অধ্যায়ের সুচনা ঘটিয়েছেন সে জন্য সরকারকে বাহবা না দিলেই নয়। দেশি বিদেশি চক্রের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সরকার যে সাহসী ভুমিকার আশ্রয় নিয়েছে সে জন্য সরকারকে জানাই সাধুবাদ।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন যে সব কুলাঙ্গার স্বীয় দেশ ও জাতির সঙ্গে বেইমানী করে পাকবাহিনিদের সহচর হিসেবে কাজ করেছে, এ দেশেরই মা- বোনদের ইজ্জত নিজেরা লুঠেছে কিংবা পাকিদের লুঠে নিতে সাহায্য করেছে, হত্যা, খুন-রাহাজানি, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও ডাকাতি প্রভৃতি অমানবিক ও জঘন্যতম কাজকাম করেছে নিঃসঙ্কোচে তারাই যুদ্ধাপরাধী রাজাকার কিংবা মানবতা বিরোধী শত্রু বলে বিবেচিত। গতকাল ২১ জানুয়ারি ২০১৩ ইং এ আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার নামের যে লোকটির বিচারের রায় প্রদান করা হয়েছে তিনিও মুলত শীর্ষ পর্যায়ের ওই ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধীদেরই একজন।

এসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবী আজকের নতুন নয়। দেশ স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরপরই ওদেরকে বিচারের কাটগরায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছিলো। কিন্তু শৃগালের মতো ধূর্ত এসব রাজাকার দেশে বিদেশে আত্মগোপন করে থাকে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে সুযোগ বুঝে একদিন ভিন্ন চেহারায় জনসমক্ষে ফিরে আসে। একটি বিশেষ দলের পতাকাতলে থেকে রাজনীতি করা শুরু করে। ধর্মভীরু মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে এক সময় ক্ষমতার রসদ মেটাতেও সক্ষম হয়। লাল সবুজ পতাকা পতপত করে উড়িয়ে গাড়িতে চড়ে বেড়ায়। “এদেশে কোন রাজাকার নেই” মিডিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে বাঁকা গাঁড়ে এ ধরনের ধৃষ্টতামূলক দম্ভোক্তি করতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি ওদেরই শীর্ষ একজন।

এতকিছুর পরও এসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবী থেমে থাকেনি। ক্রমান্বয়ে এ দাবী আরও গতিশীল ও জোরালো হয়ে উঠে ১৯৯১ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে উঠা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মাধ্যমে। ওই সময়েই জনমনে তথা তরুন প্রজন্মের মধ্যে এ বিচারের দাবীটি ব্যপক ভাবে স্ফুরিত হয়। এ কথা অনস্বীকার্য, আজ বাচ্চু রাজাকারের বিচারের রায় কিংবা আরও অন্যান্য চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদেরকে বিচারাধীন অবস্থায় জেলে দেখতে পাওয়াটা মূলত ওই নির্মূল কমিটির আন্দোলনেরই ফসল।

বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির রায়ের প্রতিক্রিয়ায় সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও সাধারন জনতার মধ্যে যে উচ্ছলতা ও আনন্দের বন্যা বইছে তা থেকে অতি সহজেই বলা যায় যে , এ রায়ে বস্তুত জনগনের দীর্ঘ দিনের প্রত্যাশাই প্রতিফলিত হয়েছে। উল্লসিত জনমনে যে আনন্দের জোয়ার তা যেন সরকারের ঘাফিলতি ও দীর্ঘসূত্রিতার দরুন ভাটায় প্রবাহিত না হয়।

যে লোকটিকে ফাঁসির রায় প্রদান করা হয়েছে তিনি আজ সরকারের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাঁর বিরদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হওয়ার আগেই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। দুঃখ জনক হলেও সত্যি, অধ্যাবদি সরকার তাঁর সঠিক অবস্থান শনাক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছেন। এমনকি যে দেশটিতে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জনমনে সন্দেহ রয়েছে সে দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশ হাই কমিশনারের কাছে তাঁর ব্যাপারে কোন তথ্য নেই বলে তিনি একটি জাতীয় দৈনিককে জানিয়েছেন। সরকার চাইলে তিনি খুঁজে পেতে সহযোগিতা করবেন বলে আশ্বাস দেন। বাহ! কি চমৎকার! সরকার চাইলে তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন! ব্যক্তিগত দায়বোধ বা বিবেকের তাড়নায় তাড়িত হয়ে কি কিছুই করার নেই তাঁর? তাছাড়া সরকারকে চাইতে হবে কেন? তিনি নিজেইতো সরকারের প্রতিনিধি বা সরকারের অংশ। একজন দায়িত্বশীল সরকারী কর্মকর্তা হিসেবে সেচ্ছায় কৌতূহলী হয়েইতো বাচ্চু রাজাকারের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া উচিত ছিল। শুধু তাই নয়, সম্ভাব্য দেশটিতে যদি সত্যি তিনি আশ্রয় নিয়ে থাকেন তবে সে দেশের সরকারের সঙ্গে কথা বলে তাঁকে দেশে প্রেরনের জোরালো সুপারিশ করাও ছিল তাঁর অন্যতম দায়িত্ব। বড্ড দুঃখ ও করুনা হয় ওইসব সরকারী কর্মকর্তাদের প্রতি!

দৈনিক সমকালের একটি রিপোর্টে বাচ্ছু রাজাকারের অবস্থানের বিষয়টি বেশ নিশ্চিত ভাবেই উঠে এসেছে। খবরে বলা হয়েছে, “ বাচ্চু রাজাকার পাকিস্তানের করাচি শহরের আয়েশা মঞ্জিলে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে তিনি স্বস্তিতে নেই। পাকিস্তানের সঙ্গে বন্দিবিনিময় চুক্তি থাকায় বাচ্চু রাজাকারকে দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে এ আশঙ্কায় তিনি তৃতীয় কোনো দেশে আশ্রয় নিতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছেন।“ তিনি ইরান বা তুরস্কে প্রবেশের চেষ্টা করছেন বলেও খবরটিতে প্রকাশ পেয়েছে।

সমকালে প্রকাশিত এ খবরটি যদি প্রকৃত অর্থেই সত্যি হয়ে থাকে তবে সরকারের আর কালবিলম্ব করা মোটেও উচিত নয়। অন্য কোথাও পালিয়ে যাবার আগেই যে কোন মুল্যে বাচ্চু রাজাকারকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। সরকারকে বুঝতে হবে, কেবল রায় প্রদান নয়, বরং রায় বাস্তবায়নের মধ্যেই নিহিত রয়েছে এ বিচারের যথার্থতা। তাই দণ্ডপ্রাপ্ত এ রাজাকারকে দেশে ফিরিয়ে এনে অতি দ্রুত ফাঁসির রায় কার্যকর করা হোক। পাশাপাশি যে কজন “ডাকসাইটে” রাজাকার জেলে বিচারাধীন রয়েছেন তাঁদের বিচার কাজে অযাচিত বিলম্ব না ঘটিয়ে তড়িৎ গতিতে রায় প্রদান করা হোক যাতে করে এ বিচার নিয়ে জনমনে সৃষ্ট সংশয় দূর হয়। আর যেসব রাজাকার বা মানবতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধী এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে তাদেরকে ক্রমান্বয়ে বিচারের আওতায় এনে বিচার কাজ শুরু করা হলে একদিকে যেমন এ বিচারের পূর্ণতা প্রকাশ পাবে অন্যদিকে স্বতঃস্ফূর্ত জনতার মুখে ফুটে উঠবে এক খণ্ড তৃপ্তির হাসি। সরকারের বুদ্ধি বা ইচ্ছার দোষে যেন এ হাসিটা মিলিয়ে না যায়।

***
একই সাথে প্রকাশিত: বাংলাদেশনিউজ২৪x৭.কম