ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

Rameez_R9108

ওইদিন স্কটিশদের বিপরীতে বাঙ্গালিরা যে খেলাটি খেলেছিল তা উপভোগ করার সুযোগ হয়েছিলো বটে কিন্তু পরবর্তীতে বাংলাদেশ ও ইংল্যান্ডের মধ্যে যে ক্রিকেট লড়াই হয়েছিল, ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তা দেখা সম্ভব হয়ে উঠেনি। সময়ের বিশাল ব্যবধানই এর অন্যতম কারন। অস্ট্রেলিয়ার সাথে আয়ারল্যান্ডের সময়ের পার্থক্য প্রায় বারো ঘণ্টা। অ্যাডিলেডে যখন খেলাটি শুরু হয় আয়ারল্যান্ডে স্থানীয় সময় তখন ভোর সারে তিনটা। এ পর্যন্ত জেগে থেকে খেলা দেখে সাতসকালে কাজে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য যে কঠিন মনোবলের প্রয়োজন তা হয়তো আমার ছিলনা। তাই ঘুম থেকে উঠেই তড়িঘড়ি করে বড়ো মেয়ে সাইয়েরাহকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে ছুটে যাই।

সকাল নয়টা। সুপারভাইজরি ও ম্যানেজারিয়াস লেভেলে কর্মরতদের জন্য কোম্পানি বিশেষ এক ট্রেনিংএর আয়োজন করে। তিন সপ্তাহ যাবত প্রতি সোমবার এ ট্রেনিংটি করে আসছিলাম। এ সোমবার ছিল ট্রেনিংএর শেষ দিন। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও শেষদিনের মতো বেশ আনমনা হয়েই ট্রেনিং রুমে প্রবেশ করি।

এগারোটায় দশ মিনিটের কফি ব্র্যাকে গিয়ে অনলাইনে প্রচারিত আপডেটিং নিউজ দেখে কিছুটা শঙ্কিত মনেই ফিরে আসি। প্রশিক্ষকের কথায় একেবারেই কান দিতে পারছিলামনা। ছটফট করছিলাম। সারাক্ষণ একটা অস্থিরতা কাজ করছিল। ইংল্যান্ডের মতো দলকে হারিয়ে বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে পারবেতো? ট্রেনিং এর নামে প্রশিক্ষকের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমি কেবল এসব ভাবছিলাম।  ঠিক তখনি দুপুর বারোটা উনপঞ্চাশ মিনিটে বন্ধু ও সহকর্মী জাহাঙ্গীরের একটি টেক্সট ম্যাসেজ পাই। প্রশিক্ষকের চোখকে ফাঁকি দিয়ে জট ফট তা পড়ে ফেলি। “উই বিট ইংল্যান্ড বাই ফিফটিন রান”।

অবচেতন মনেই “ইয়েস” বলে চিৎকার দিয়ে উঠি। সবার কৌতূহলী দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় আমার উপর। কেউ কিছু বলে উঠার আগেই প্রশিক্ষকের দিকে তাকিয়ে বন্ধুর টেক্সট মেসেজের খবরটি উপস্থিত সবাইকে জানান দিয়ে দেই। দেশ ও জাতির প্রতি আমার এ আবগঘন ভালোবাসার গভীরতা দেখে তাঁরা কেবল অবাকই হননি, যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীলও হয়েছিলেন বলে মনে হল।

প্রশিক্ষনরতদের মধ্যে একজন ইংলিশও ছিলেন বটে। বিজয়ের আনন্দ আমাকে উৎফুল্ল ও চঞ্চল করে তুললেও পরাজয়ের গ্লানি ওই ইংরেজ ভদ্রলোককে ছুঁতে পেরেছে বলে আমার মনে হয়নি। বিন্দু পরিমান বিমর্ষ বা মলিন হতেও দেখা যায়নি তাকে। তার স্থলে কোন বাঙ্গালি হলে সে বাঙ্গালি যে মুহূর্তের মধ্যে অপমান ও লজ্জায় লাল হয়ে যেতো তাতে কোন সন্দেহ নেই। বস্তুত দেশ ও জাতির প্রতি বাঙ্গালির যে সুপ্ত ভালোবাসা লুকিয়ে রয়েছে তা অন্য কোন জাতিতে খুঁজে পাওয়া ভার। এখানেই মূলত বাঙ্গালির সাথে অন্য জাতির পার্থক্য। আর এ পার্থক্যই শত প্রতিকুলতাকে ডিঙ্গিয়ে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে সাহায্য করছে।

এ কথা সত্য ক্রিকেটের জনক বলে বিশ্বখ্যাত ইংল্যান্ডকে কপোকাত করে বিজয়ের মালা ছিনিয়ে আনা ছেলের হাতে মোয়া নয়। বেশ কঠিন কাজ। কিন্তু এ কঠিন কাজটাই সম্ভব করেছেন আমাদের দেশের সোনার ছেলেরা। কারো করুণা নয়, স্বীয় যোগ্যতা, মেধা ও খেলোয়াড় সুলভ কলাকুশলীর মাধ্যমেই দুর্ভেদ্য এ জয়কে ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন আমাদের টাইগাররা।

অথচ খবরে দেখলাম, ইনিংস বিরতির সময় লন্ডনের এক টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় পাকিস্তানের ধারাভাষ্যকার রমিজ রাজা বেশ গর্বের সাথে বলছিলেন, “বাংলাদেশের পেস অ্যাটাক অত ভালো নয়। তাই ওই ম্যাসটি ইংল্যান্ডই জিতবে।“ এর আগেও বাংলাদেশ যখন আফগানিস্তানের সাথে খেলেছিল তখন ভদ্রলোক একই কায়দায় নেতিবাচক কথা বার্তা বলেছিলেন। বাংলাদেশকে নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক বিদ্রুপ ও খেলোয়ারদেরকে অবহেলা ও অপমানসূচক কথা বার্তা বলার ধৃষ্টতা দেখায়। যার প্রেক্ষিতে ড. শাখাওয়াৎ নয়ন নামের এক ভদ্রলোক একটি অনলাইন পোর্টালে লিখেন যেখানে তার অভদ্রোচিত ও ঔদত্য মূলক ধারাভাষ্যের কথা গুলো তুলে ধরেন এবং  আইসিসির সভাপতির কাছে তার যথোপযুক্ত শাস্তি দাবি করেন।

এ লেখার ধারাবাহিকতাতেই পাঠকদের মতামত ও কমেন্টের উপর ভিত্তি করে স্বয়ং ওই পোর্টালটি আরেকটি স্বাতন্ত্রিক রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানেও রমিজ রাজাকে বরখাস্তের দাবি জানানো হয়।

রমিজ রাজার বরখাস্তের কোন খবর অদ্যাবধি আমার নজরে পড়েনি। তাই সম্ভবত এখনো তিনি ঔদ্ত্যমুলক কথাবার্তা বলে বেড়াচ্ছেন। অবশ্যি আমাদের টাইগাররা বসে নেই। তাঁরা তাদের সিরিজ বিজয়ের মাধ্যমে রমিজের দুষ্ট কথার দাতভাঙ্গা জবাব দিয়ে চলছেন। রমিজের ফেবারিট টিম আফগানিস্তানকে টাইগাররা তো মাথাই তুলতে দেয়নি। এবার ইংল্যান্ড জিতবে বলে যে অগ্রিম বড়াইবাক্য তিনি করেছিলেন তাও হালে পানি পায়নি।

ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টাইগাররা যে বিজয় সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন তা কেবল দেশ ও জাতির জন্য সম্মান, গৌরব ও গর্বের নয়, রমিজ রাজার গালে এক শক্ত চপেটাঘাতও বটে।

 

পুনশ্চঃ লেখাটি সাম্প্রতিকতা হারিয়েছে জেনেও কেবল ওই পাকির স্বরূপটি জনসমক্ষে তুলে ধরার প্রয়াসেই বিডি ব্লগের পাঠকদের উদ্দেশ্যে তা নিবেদন করলাম।

লিমরিক, আয়ারল্যান্ড