ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 
Khaleda-Birth-day-ed

ক্যাপশন: ২০১৪ সালের ১৫ অগাস্ট খালেদা জিয়া জন্মদিন পালন করেন ৫০ পাউন্ডের কেক কেটে।  

আগস্ট এলেই দেশে কান্নার রোল পড়ে। জাতি ডুবে যায় শোকের ছায়ায়। বাঙালির ললাটে শতাব্দীর নিকৃষ্টতম কলঙ্কময় ইতিহাসটি রচিত হয়েছিলো এ মাসেই। ‘৭৫ এর ১৫ আগস্ট ভোরের আলো দেখা দেবার আগেই একদল প্রশিক্ষিত ঘাতকের হাত বিশ্বাসঘাতকতায় মেতে উঠে। নিক্ষিপ্ত বুলেটের আওয়াজে প্রকম্পিত হয়ে উঠে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রোডের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়িটি। সিঁড়ির নিচে লুটিয়ে পড়ে জাতির জনকের বুলেটবিদ্ধ রক্তাক্ত দেহটি। গর্ভবতী মহিলা থেকে শুরু করে দশ বছরের বালক রাসেল সহ কেউই রেহাই পায়নি ঘাতকদের নিষ্ঠুর হাত থেকে। অত্যন্ত নির্মম ও বর্বরোচিত ভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয় বাঙ্গালি জাতির হাজার বছরের এ শ্রেষ্ঠ সন্তানকে। ফলে জাতি হারায় তার অভিবাবককে, দেশ হারায় তার স্থপতিকে, জনগন হারায় তাদের সমকাল শ্রেষ্ঠ মহান নেতাকে।

যে মহান মানুষটিকে পাকিস্তানিরা নির্জন সেলে বন্দি রেখে কবর খুঁড়েও হত্যা করার সাহস পায়নি, সেই ন্যক্কার জনক বর্বর কাজটিই করে ফেললো এ দেশেরই বাঙ্গালি নামধারি গুটিকতক পাকিস্তানি দোসর। কালজয়ী এ প্রান পুরুষকে কদমবুছি করতে পারাটাও ছিল যাদের পরম সৌভাগ্যের বিষয়, তারাই কিনা ১৫ আগস্টের মতো এক কাল অধ্যায়ের সুচনা ঘটিয়ে জাতিকে স্তম্ভিত করে দেয়। বিশ্বাসঘাতক এ কুলাঙ্গাররা বস্তুত এ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে যে কেবল একজন বঙ্গবন্ধুকেই খুন করে তা নয়, বরং হত্যা করে ত্রিশ লাখ শহিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জনগনের কাঙ্খিত সোনার বাংলা বাস্তবায়নের স্বপ্নকেই।

এর পরের ইতিহাস কারো অজানা নয়। যারা এ অমানবিক হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল তাদের বিচারের আওতায় আনাতো দুরের কথা বরং বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠিয়ে কিংবা সরকারের উচ্চ পদস্থ পদে নিয়োগ দানের মাধ্যমে পুরস্কৃত করা হয়। শুধু তাই নয় সংসদে “ইনডেমনিটি” নামের এক বিল পাস করে এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়া হয়।

দু’যুগেরও বেশি সময় ধরে জাতি “ইনডেমনিটি” নামের এ জগদ্দল পাথরটিকে বুকে চেপে সময় কাটিয়েছে। অতপর ১৯৯৬ সালে জনককন্যা শেখ হাসিনা দেশের শাসন ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকার্য শুরু করেন। কিন্ত বিচারের কাজ সমপন্ন হওয়ার আগেই তাদের শাসন কালের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে পুনরায় ক্ষমতায় এসে পুরো বিচারকার্য সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। দোষীদের অনেকের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। এতে জাতি অনেকটা কলঙ্কমুক্ত হয়েছে, স্বস্তিও পেয়েছে। কিন্তু পরক্ষনেই তা মলিন হয়ে যায় যখন বিএনপি নেত্রি বেগম জিয়া দেশের সিংহ ভাগ মানুষের হৃদয়ে পীড়ন ঘটিয়ে জন্মদিন পালনের নামে ১৫ আগস্ট এক মহোৎসবের আয়োজন করেন।

১৫ আগস্ট বেগম জিয়ার জন্মদিন কিনা তা নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। এর পরেও “বিশ্বাসে মিলায় হরি, তর্কে বহুদূর” সে মন্ত্রের আলোকে বেগম জিয়ার জন্মদিন ১৫ আগস্ট ধরে নিলেও তাঁর মতো একজন বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক, যিনি তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির মতো একটি বৃহৎ দলের সভানেত্রী, তাঁর পক্ষে কি এভাবে ঢাকঢোল পিঠিয়ে এরকম একটি জাতীয় শোক দিনে জন্মদিন পালন করাটা আদৌ শোভা পায়? সুস্থ মনমানসিকতা কিংবা মানবিক চেতনা বোধ সম্পন্ন কারো পক্ষে কি তা মোটেও সম্ভব? একি তাহলে শুধুই নিছক প্রতিহিংসা নাকি বিকারগ্রস্থতা?

যে ধর্মের ফেরারি করে তিনি আজীবন রাজনীতি করছেন, এভাবে বিশাল কেক কেটে জন্মদিন পালনের বিধান সে ধর্মেই বা কতোটুকু রয়েছে? তাঁর শুভাকাঙ্খি(?) ধর্মীয় বন্ধুরা কেন যে এ ব্যপারে মুখে কুলোপ এঁটে রাখেন তা আমি ভেবে পাইনা। স্বামী জিয়াউর রহমান কিংবা সদ্য প্রয়াত ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু দিবসে কেউ যদি প্রচারনা চালিয়ে একই কায়দায় জন্মদিন পালনের নামে বুনো উৎসবে মেতে উঠে তাহলে বেগম জিয়ার প্রতিক্রিয়া কি হবে! তাঁর হৃদয়ে কি কোনই রক্তক্ষরণ ঘটবে না?

কারো শোকে কেউ শোকাগ্রস্থ হতে না পারুক, আনন্দে নেচে উঠতে পারেনা। যে কর্ম বিতর্কের জন্ম দেয়, মনুষ্যত্ব বোধের অবমাননা ঘটায় সে কর্ম পরিহার করাই শ্রেয় নয় কি? তাই আমি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, সম্মানিত বিএনপি নেত্রি বেগম খালেদা জিয়াকে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলতে চাই, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু দিন অর্থাৎ ১৫ আগস্টের মতো একটি স্পর্শকাতর শোকাবহ দিনে জন্মদিন পালন থেকে বিরত থাকবেন। এতে তিনি ছোট হবেননা বরং তাঁর মহত্ত্বেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। রাজনৈতিক ভাবেও উজ্জ্বল হবে তাঁর ভাবমূর্তি।

লিমরিক, আয়ারল্যান্ড

১৪/০৮/১৫