ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 
14_0

ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙ্গিয়ে বা আশ্রয় প্রশ্রয়ে থেকে একটি শ্রেনি বরাবরই দুর্বৃত্তপনায় লিপ্ত হয়ে থাকে। এ দুর্বৃত্তপনার দৌরাত্ম্য এখন আর কেবল শহর বন্দরের মধ্যেই সীমিত নেই, অজ পাড়া গা তথা প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। গত ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৫ এর দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদ থেকে তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। প্রতিবেদনটি পড়ে এও মনে হল, গরীব হয়ে জন্ম নেয়াটাই যেন পাপ। যে ভাগ্যের উপর ভর করে ওরা বেঁচে থাকতে চায় সে ভাগ্যই তাঁদেরকে নির্মম ক্ষতির দিকে নিয়ে যায় বার বার। সাধারণ মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও ভাগ্য তাঁদেরকে দেয়না। ভাগ্যের কুঠিল বিধানেই যেন চিহ্নিত হয়ে থাকে ওদের নিয়তি। তাঁদের এ ভাগ্যদোষ অন্তরের সমস্থ তেজস্বীয়তাকেই ম্লান করে দেয়। যন্ত্রের মতো কাজ করেও ওরা জীবনের কোন মানে খুঁজে পায়না। প্রতারক ও জুলুমবাজদের লাথি গুঁতো ও রক্তচক্ষুর মাঝেই বন্দি হয়ে থাকে ওদের জীবনের সমস্থ আরাধনা।

প্রতিটি মানুষই নিজ নিজ অবস্থান বা যোগ্যতানুযায়ী কাজ করে থাকে। গ্রামের দরিদ্র জেলেরা উন্মুক্ত হাওরে জাল ফেলে মাছ ধরবে, জীবিকা নির্বাহ করবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এ স্বাভাবিক কাজটি-ই অস্বাভাবিক ভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে আমারই নিজ গ্রামে। প্রায় দেড় যুগ ধরে দেশ ছেড়ে কয়েক হাজার মাইল দূরে বসবাস করলেও নিজেকে বদলাতে পারিনি। এখনো শরীরে রয়েছে সবুজ শ্যমল গ্রামের গন্ধ। তাই বিষয়টি আমাকে বেশ নাড়া দিল। মৃত্তিকার প্রতি নাড়ির যে টান সে উপলব্ধি থেকেই দু’কলম লিখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম।

সংবাদের প্রতিবেদনটিকে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করলে বিষয়টি অনেকটা পরিস্কার হয়ে উঠবে। ‘কয়েক দুর্বৃত্তের কারণে মোহনগঞ্জের উন্মুক্ত হাওরে মাছ ধরতে পারছেনা চার শতাধিক জেলে” শিরোনামে প্রকাশিত রিপোর্টটিতে যা ফুটে উঠেছে তা হল – মোহনগঞ্জ উপজেলার বরান্তর গ্রামে সরকারি ভাবে হাওরগুলো উন্মুক্ত থাকা সত্ত্বেও জেলেরা মাছ ধরতে পারছেনা। আওয়ামী “সাইনবোর্ড” ধারী গুটি কতক সুবিধাবাদী ও দুর্বৃত্ত কর্মীর দ্বারা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। এতে মারাত্নক ভাবে অসহায় হয়ে পড়ে গ্রামের এসব দরিদ্র জেলেরা। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা।

খবরে আরও প্রকাশ, ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ প্রধানমন্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত সচিব-১ সাজ্জাদুল হাসান মোহনগঞ্জ গেলে দুইশতাধিক জেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করে ইউএনও হাওরগুলো লিজ দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। লিজের টাকা কোথায় জানতে চাইলে ইউএনও মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক কোন টাকা সরকারী রাজস্ব খাতে জমা হয়নি জানিয়ে বলেন, টাকা দলীয় নেতারা নিয়েছেন। অর্থাৎ সরকারী ভাবে আদৌ কোন লিজ দেয়া হয়নি। গ্রামের দু-চারজন ধূর্ত সাইনবোর্ডধারী কর্মী স্থানীয় এমপির কাছের মানুষ হিসেবে পরিচিত একজন এডভোকেট ও এমপির পিএসকে রাজি করিয়ে সম্পূর্ণ অন্যায়, অবৈধ ও অনৈতিক ভাবে সকল হাওর লিজ দিয়ে প্রায় নয় লাখ টাকার মতো হাতিয়ে নেয়। যা কিনা উল্লেখিত দুই ব্যক্তি সহ অন্যান্য নেতা, পাতিনেতা ও টাউট শ্রেণীর কয়েকজনের মাঝে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর সচিব তা’ বুঝতে পেরে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে দু’ দিনের মধ্যেই সকল হাওর উন্মুক্তের ব্যবস্থা করে সাধারণ জেলেদের মাছ ধরার সুযোগ করে দিতে ইউএনও কে কড়া নির্দেশ দেন।

যেহেতু ঘটনাটি আমার গ্রামে ঘটেছে তাই পত্রিকায় প্রকাশের পর বেশ কৌতূহলী হয়ে বাড়িতে বড় ভাইকে ফোন দেই। জানতে পারি, প্রধানমন্ত্রীর সচিবের নির্দেশ জারির প্রায় এক সপ্তাহের বেশি সময় অতিবাহিত হতে চললেও বাস্তবে কোন সুফল পাওয়া যায়নি। তাই আমি প্রবাসে বসবাস করলেও এলাকার একজন সন্তান হিসেবে বিষয়টি জানার জন্য ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ইউএনও মোজাম্মেল হকের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলি। তিনি তাঁর অবস্থান তুলে ধরে আমাকে জানান, “হাওর অঞ্চল উন্মুক্তের কথা আমি সবাইকে বলে দিয়েছি। এমনকি এ মর্মে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আজ ইউনিয়ন ভুমি কর্তা বরাবরও স্মারকলিপি প্রদান করেছি যার নাম্বার ০৫.৩০.৭২৬৩.০০৩.০০.০৫২.১৫.৬৭৯(৫)।‘

শুধু মৌখিক নির্দেশ বা স্মারকলিপি প্রদানই যথেষ্ট কিনা সন্দেহ প্রকাশ করে তাঁকে সরেজমিনে গিয়ে প্রশাসনিকভাবে ঘোষণা দিয়ে দখলদারদের উচ্ছেদ করে দরিদ্র জেলেদেরকে মাছ ধরার সুযোগ করে দিয়ে আসার অনুরোধ জানালে তিনি অত্যন্ত বিনীত ভাবে তাঁর সীমাবদ্ধতা ও অপারগতার কথা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি এও বললেন, “দয়া করে আমাকে এসব রাজনৈতিক বিষয়ে জড়াবেননা। আমি একবেলা খেলেও ডিগনিটি নিয়ে বাঁচতে চাই”
ভদ্র লোকের সাথে আমি আর কথা বাড়াইনি। তবে বুঝতে পারলাম, স্থানীয় এমপি মহোদয় চাইলে বিষয়টি অত্যন্ত সহজেই সুরাহা হয়ে যেতে পারতো। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিবাদমান এলাকাটিতে স্বেচ্ছায় গিয়ে ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে হাওর অঞ্চল উন্মুক্তকরনের ঘোষণাটি নিজ মুখে দিলে তা মাছ ধরার ক্ষেত্রে জেলেদেরকে যেমন সাহস যোগাতো তেমনি ভুয়া লিজ প্রদানকারী দলীয় দুর্বৃত্তরাও দমে যেতো। এতে তাঁর সুনাম ও প্রশংসার পরিধি বাড়ত বৈ কমতনা। কিন্তু তিনি সে পথে পা বাড়াননি। বরং চাটুকারদের কথা কানে নিয়ে কান ভারী করছেন। চাটুকাররা জেলেদেরকে ও জেলেদের পক্ষ নিয়ে যারা কথা বলে তাঁদেরকে জামায়াত হিসেবে এমপির কাছে তুলে ধরে। মাননীয় এমপিও অকপটে তা বিশ্বাস করেন।

এমপি মহোদয় নিঃসন্দেহে একজন সৎ ও ভদ্র মহিলা। তবে তাঁর কিছুটা বদমেজাজ ও একগুঁয়েমি রয়েছে বলে এলাকায় গুজব আছে। তিনি যা বুঝেন বা তাঁকে যা বুঝানো হয় এর বাইরে তিনি কিছুই বুঝতে চাননা। আর তা না হলে শুধুমাত্র কারো কানকথায় হিন্দুপ্রধান জেলে সম্প্রদায়কে “জামায়াত” আখ্যা দিয়ে দূরে ঠেলে দিতে পারতেননা। কিংবা যারা জন্মের পর থেকে বঙ্গবন্ধুর নৌকা ছাড়া কিছুই বুঝেননি কিংবা তাঁর প্রয়াত স্বামী প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী আব্দুল মমিন ভোটের জন্য যাদেরকে নিয়ে দোয়ারে দোয়ারে ঘুরে বেড়াতেন তাঁদের বা তাঁদের সন্তানদের গায়ে জামায়াতের তকমা লাগানোর জন্যও এতোটা উৎসাহী হয়ে উঠতেন না।

প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিবের নির্দেশ ও ইউএনওর সদিচ্ছা থাকা স্বত্বেও শুধুমাত্র “রাজনৈতিক” কারনে বিষয়টির নিস্পত্তি ঘটেনি। এতে গ্রামের দরিদ্র জেলেরা মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ও অসহায় হয়ে পড়েছে। তাই আমি খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই বিনীত ভাবে বলতে চাই, যারা রাজনৈতিক আশ্রয় প্রশ্রয়ে থেকে শুধু মোহনগঞ্জ নয়, সারা দেশেরই উন্মুক্ত হাওর গুলো এভাবে লুটপাট করে খাচ্ছে তাদেরকে দমনের জন্য তিনি যথোপযুক্ত জায়গায় কঠোর নির্দেশনা জারি করবেন। অন্যথায় দুর্বৃত্তপনার অভিশাপ দিনদিন কেবল ঘনীভূতই হবে।

লিমরিক, আয়ারল্যান্ড
Shajed70@yahoo.com