ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

সেদিন সন্ধায় এক আত্মীয়ের বাসায় আড্ডা দিতে যাচ্ছিলাম। আমার গাড়িতে পাশে বসা ছিল এক বন্ধু। কথায় কথায় সে বলল দেশ থেকে তাঁর এক ব্যাংকার বন্ধু ফোন দিয়ে জানতে চাইলো পড়াশুনার জন্য আয়ারল্যান্ডে তাঁর স্ত্রী আসলে কি সুযোগ-সুবিধা পেতে পারে। বন্ধুটির কথায় দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সুর। সঠিক কোন উত্তর তাদেরকে সে দিতে পারেনি। একটা সংকুচের বেড়া জালে দোল খাচ্ছে সে। সত্য কথাটা বললে যদি বন্ধু ও পত্নি তাকে উলটো ভুল বুঝে এই ভেবে যে সাময়িক আহার ও বাসস্থানাদি ও আনুসাঙ্গিক দায়ভারের ভয়ে মিথ্যে বলে বিদেশে পরাশুনার জন্য নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে তাদেরকে।

আমার বন্ধুটির কথাবার্তা শুনে বুঝা গেল সে যথেষ্ট বিপাকে আছে। আমি তাকে মিথ্যের আশ্রয় না নিয়ে বাস্তব সত্য কথাটা তাদেরকে বুঝিয়ে বলার জন্য সাজেশান দেই। তারপরও তাঁর জড়তা কেটেছে বলে মনে হয়নি। ভাবলাম, আমার ঐ বন্ধু সংকোচের দ্বিধাদ্বন্দে তাদেরকে সত্য বলুক আর নাই বলুক আমি ব্লগাশ্রয়ী হয়ে সত্যের দামামা বাজিয়ে কারো ভূল ভাঙ্গিয়ে যদি বিন্দু পরিমাণ কল্যাণ করা যায় তাতে দোষ কী!

সাধারনত বাংলাদেশ থেকে একজন শিক্ষার্থীকে আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটেন সহ ইউরোপ বা এমেরিকার যে কোন দেশে পড়াশুনার উদ্দেশ্যে যেতে হলে প্রায় ছয় থেকে আট লাখ টাকার প্রয়োজন। আর যদি কোন দালাল বাটপারের খপ্পরে পড়া হয় তাহলেতো আমছালা দুটোই খুইয়ে ওখানেই ইতি। বাংলাদেশের সকল প্রতিকূলতাকে জয় করে সৌভাগ্যক্রমে কেউ যদি কাঙ্কিত গন্তব্যে পা ফেলতেও সক্ষম হয় তার অর্থ এই নয় যে পাতালপুরীর স্বর্ণের সন্ধান সে পেয়ে গেছে। স্বজন ও বান্ধববিহীন প্রবাস জীবন যতোটুকো আনন্দের, সপ্নের ও স্বর্গের মনে হয় বাস্তবে কিন্তু তাঁর ছিঁটেফোটাও নেই। যাদের ললাটে জুটেছে পরবাস তারাই কেবল ভাল বুঝেন এর মর্মযাতনা।

ফিরে যাই মুল বিষয়ে। একজন শিক্ষার্থী যখন প্রবাসে এসে পৌঁছায় তখন সে ঐ পরিবেশের জন্য একেবারেই নয়াগন্তুক। ডান বাম বলতে কিছুই বুঝেনা। স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে কম করে হলেও দু-তিন মাস লেগে যায়। তাই যে কেউ প্রবাসে পৌঁছেই মোটা টাকা কামিয়ে ফেলবেন বলে চোখেমুখে রঙ্গিন স্বপ্ন মেখে বিদেশে পাড়ি দেন তাদের সে আশা একেবারেই গুড়েবালি। দুনিয়া এখন খুব কঠিন হয়ে গেছে। বেশী দিন আগে নয়, এই দু হাজার আটের দিকেও এখানকার ব্যাংকগুলো মানুষকে ডেকে পারসোনাল লোণ বা বাড়ি কেনার জন্য লাখ লাখ ইউরো (স্থানীয় মুদ্রা) মরগেজ হিসেবে দিতো। বর্তমান পরিস্থিতে মরগেজ তো দুরের কথা বাক্তিগত প্রয়োজনে দু-চার হাজার স্থানীয় মুদ্রা লোন পাওয়াটাই এক দুরুহ ব্যাপার। ব্যাংকে দোষ দিয়েই বা কি লাভ! তারা নিজেরাই দেউলিয়াপনায় ভুগছে। অবস্থা যেন তথৈবচ, “ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচির মতো।”

অর্থনৈতিক অবস্থা যখন এতটাই মন্দা তখন চাকরির বাজারতো রমরমা হতে পারেনা। ক’বছর আগে যে ছাত্ররা সপ্তাহে বিশ (সামারের ছুটি ছাড়া সপ্তাহে বিশ ঘণ্টা কাজ করার বৈধ নিয়ম) ঘণ্টার স্থলে ষাট থেকে আশি ঘণ্টা কাজ করত তাদের এখন দিন আনতে পান্তা ফুরোয় এর মতো অবস্থা। স্মার্ট কৌশলে যারা আগেই স্টুডেন্ট স্ট্যাটাস থেকে নিজেদেরকে স্থায়ী রেসিডেঞ্চি নামক সোনার হরিণটির নাগাল পেয়ে গেছেন তাদের কথা আলাদা। চাকরি থাক বা না থাক সরকারি ভাতা খাবার মুখ তো তাদের আছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু ছাত্রই নয় যারা স্থায়ী কর্মজীবী তারাও যদি কোন কারনে চাকরি হারিয়ে বসেন, নতুন আরেকটি কর্ম পাওয়া যেন হাতির দাঁত পাওয়ার মতো অবস্থা। কিছুদিন আগে স্পেনে ভ্রমণকারী এক বাংলাদেশি সাংবাদিক ঢাকার একটি জাতীয় পত্রিকাতে ওইখানকার সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন সেখানে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা প্রায় ৩৫%। এমন অবস্থা শুধু আয়ারল্যান্ড বা স্পেনে নয়, ইউরোপ সহ পুরো বিশ্বের বরতমান চিত্রই অভিন্ন।

বিদেশে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের আগেই ভাবতে হবে তারা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ডিগ্রি অর্জন করতে যাচ্ছেন নাকি টাকা কামাই করতে। নাকি দুটোই! কপাল ভাল হলে কোন রকমে একটি পার্টটাইম জব জুটিয়ে নিতে পারলে কোন রকমে খেয়ে পড়ে থাকা যাবে। আয়ারল্যান্ড বা সমসাময়িক (যেহেতু আমি আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত তাই আয়ারল্যান্ডের কথা বার বার চলে আসছে, এ জন্য দুঃখিত ) দেশ গুলোতে একজন লোককে মোটামুটি ভাবে চলতে হলে নুন্যতম পক্ষে পাচ ছয়শত স্থানীয় মুদ্রার প্রয়োজন যা কিনা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫০/৬০ হাজার টাকার সমমান। তাও এ অঙ্কটা শুধু তাদের জন্যই যারা চা সিগারেটের মতো বদভ্যাস থেকে মুক্ত। এ ছাড়া রয়েছে কলেজ ফি সহ আর টুকিটাকি আনুসাঙ্গিক খরচাদি। সুতরাং বর্তমানে এ অসুস্থ অর্থনৈতিক পরিবেশে কোন শিক্ষার্থী “কলাও বেচবেন, রথও দেখবেন” মনোভাব নিয়ে প্রবাসে এলে তা হবে এক চরম আত্মঘাতী সিধদান্ত।

অর্থনৈতিক হিসেবনিকেশের কথা না হয় বাদই দিলাম। কেউ যদি হোটেল রেস্টুরেন্টের কিচেনে দাঁড়িয়ে থালাবাসন ধোয়া কিংবা পেয়াজ কাঁটার মতো কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে কিছু টাকাপয়সা আয় করে পড়াশুনা চালাতে পারে তবে তা ভাল। প্রকৃত অর্থে যারা উচ্চ শিক্ষার্থে প্রবাস মুখি হন তাদের পক্ষে আয়রুজি করা সম্ভব না হলেও দেশ থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়ে প্রাসঙ্গিক প্রয়োজনিয়তা সম্পন্ন করবেন সন্দেহ নেই। এই যে কায়িক পরিশ্রম অথবা দেশ থেকে কষ্টার্জিত অর্থ বিদেশে এনে যদি কাংখিত সফলতার দ্বারপ্রান্তে উপনিত হওয়া না যায় এর চেয়ে বড় ট্রাজেডি আর কি বা হতে পারে!

একটু খুলেই বলি। যারা উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশের পথে পা বাড়ান তারা কি আদৌ জানেন কোথায় যাচ্ছেন? কি পড়ছেন, কি শিখছেন? কারা পড়ায়? পড়া শেষে আদৌ কি কোন ডিগ্রি পাওয়া যায়? দেশ থেকে বেরুনোর আগেই এ বিষয় গুলো জেনে নেয়া উচিত।

বাংলাদেশ থেকে যে সব ছেলেমায়ারা উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ গমন করে তাদের সিংহ ভাগই কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় না। ওরা কোন কলেজে ভর্তি হয় বা হওয়ার চেষ্টা করে। যেসব কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশুনা করে এ গুলোর অধিকাংশই বেসরকারি মালিকানাধীন। ওই মালিকরা বাংলাদেশের কিন্ডারগার্টেনের ব্যবসায়ী মালিকদের মতই অনেকটা।বিভিন্ন দেশের মালিকদের মতো বাংলাদেশি মালিকরাও এ ব্যবসার সাথে জড়িত। আমাদের আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনেও আছেন একজন এ ধরনের একজন ব্যবসায়ী মালিক। মূলত এসব কলেজের অধিকাংশেরই কোন স্থায়ী ক্যাম্পাস থাকেনা। প্রায় সকলে দু’তিনটি রুম ভাড়া নিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালণা করে। যে কজন শিক্ষক থাকেন তাদের মধ্যে একজনকে পাওয়া যাবে ফুল টাইমার হিসেবে। এসব কলেজ খোলার জন্য আহামরি কোন কিছুর প্রয়োজন হয়না। স্থানীয় প্রশাসন থেকে যৎসামান্য একটা ফি দিয়ে সনদ আদায় করতে পারলেই কেল্লা ফতেহ। এই কলেজ গুলো তিন চার বছর পর একটি ডিগ্রিও দিতে পারেনা। একটা সার্টিফিকেট বা ডিপ্লোমা পাওয়া যায় যা কিনা আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক ক্ষয় ক্ষতির তুলনায় একেবারেই নগণ্য। একূল ওকূল দু’কুল হারিয়ে নৈরাশ্যের সাগরে হাবুডুবু খেতে হয় তাদের অনেককেই।

তাই ঊচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক তরুণ শিক্ষার্থীরদের বলতে চাই কেবল হরিপদ কেরানি থেকে আকবর বাদশাহ হয়ে যাবার স্বপ্নে বিভুর না থেকে বাস্তব প্রতিকুল নেতিবাচক দিকগুলোর কথা বিবেচনায় এনে তবেই সামনের দিকে এগুবেন। এতে আপনাদের জন্য, পরিবারের জন্য তথা সমগ্র জাতির জন্য হবে শুভ ও মঙ্গল।