ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

ক’দিন আগে “প্রবাসীর দুঃখ” শিরোনামে একটি লিখা প্রকাশ পাবার পরো কেন জানি আত্মতৃপ্তি পাইনি। একটা অতৃপ্ত বেদনা অন্তর খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। মনে হল লিখাটা সীমাবদ্ধতার দুষে দুষ্ট। সেদিন আমার এক বন্ধুর মাতৃবিয়োগের দুঃসংবাদ দিয়ে প্রবাসীর দুঃখ শুরু করেছিলাম। কিন্তু প্রবাসীর দুঃখতো কেবল এ রকম একটি দুসংবাদের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। এই যে দুদিন আগে সৌদিতে আট বাংলাদেশীর শিরুচ্ছেদের মতো বর্বর ঘটনা ঘটলো তাওতো প্রবাসীদের দুখএরই একটি অংশ। মূলত প্রবাসীদের দুঃখ বহুমাত্রিক। তাই ভাবলাম বিভিন্ন দময়ে বিভিন্ন স্টেজে প্রবাসীদেরকে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়, তা স্বীয় বাস্তবতার আলোকে সহজ সাদামাটা ভাবে পাঠক কূলের সামনে তুলে ধরলে হয়তোবা মন্দ হবেনা। জানিনা প্রিয় পাঠকদের কাছে কিভাবে সমাদৃত হয়।

সম্ভবত এক যুগেরও বেশী হতে চলল প্রবাসের পথে পা বাড়িয়েছি। সেই যে শুরু হল পর বাসকে আপন করে নেয়ার ঐকান্তিক চেষ্টা তা এখনো অব্যাহত। শুরু থেকেই শুরু করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স কমপ্লিট করার পর যখন নিজেকে “আকার” করার জন্য প্রানান্ত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছিলাম তখন “এমএ পাস অকর্মণ্য” এ অপবাদের অনল থেকে বাঁচার জন্য শেষমেশ বেছে নিলাম ঢাকায় জোয়ার সাহারার নিউলাইট হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো একটি মালিখানা প্রতিষ্ঠানে গাধা পিঠিয়ে মানুষ করার পেশাটাকে। টাকা কামাই হতো যাদের মধ্যমে তাদেরকে মাসিক মাইনেটা পাবার জন্য ছাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে হতো মালিকের নিদারুন করুনার উপর। তিন থেকে চার মাস পর মিলত একেক মাসের পারিশ্রমিক (বেতন শব্দটা লিখতে কুণ্ঠা বোধ হচ্ছে)। তাওতো মহাভাগ্য যে স্কুল টিচারের নাম ভাঙ্গিয়ে দু তিনটা টিউশানিতো করা যাচ্ছে। কোন রকমে ঘর ভাড়াটা দিয়ে পেটেভাতে চলাত যাচ্ছে। এ রকম একটা দৈন্যদশা সম্পন্ন বিকারগ্রস্ত জিবনের ভেতর থেকেও যখন দু দুবার বিসিএস দিয়েও “ভাইবা” নামক প্রহসনমূলক কুরুক্ষেত্রটি থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসতে হয়েছিলো কিংবা লোভনীয় অর্থ বা খুটির জোরের অভাবে নিজের জেলাতে ফার্স্ট হয়েও চাকরি মেলেনি সেখানে নিজের যোগ্যতা নিজের কাছেই এক বিরাট প্রশ্ন বোধক হয়ে দেখা দিয়েছিলো। মনে হচ্ছিল সারা জিবনের ঘামের ফসল ওই সনদ গুলো যেন কেবলই বিদগ্ধ চিত্তের এক নিষ্ঠুর মায়ামরীচিকা।

সহসা একদিন জানতে পারলাম আমার এক সিঙ্গাপুর প্রবাসী আত্মিয় দেশে এসে হাঁকডাক করে রাজার হালে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন। বউকে প্রায় আশি ভরির বেশী স্বর্ণ দিয়ে বরন করতে যাচ্ছেন। কসমেটিকস, শাড়ি-চুড়ি সেকি এক এলাহি কাণ্ড। প্রবাসীর বিয়েতে এহেন জাকজমকতা ও হালহকিকত দেখে আমারতো আক্কেল গুড়ুম। লোভের সাগরে হাবুডুবু খেলাম। যে আমি কস্মিন কালেও বিদেশে যাবার কথাও ভাবিনি সেই আমি লোভের বশবর্তী হয়ে আকাশে বাতাসে জানিয়ে দিলাম আমার আকাঙ্ক্ষার কথা। আমার সেই মহান আত্মীয়টিও শুনে হতবাক। তিনি আমাকে অনেক বুঝাতে চেষ্টা করলেন যে বিদেশের পথে পা না বাড়ানোই ভাল। তাঁর মতে বিদেশ হল মূর্খ বা অর্ধ শিক্ষিত লোকদের জন্য। ইউনিভারসিটি পাস দিয়ে বিদেশে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠাটাতো কারো উচিত নয়। ওখানে কাগজ কলম নিয়ে খেলা করার মতো কোন চাকরি নেই। গতর খাটিয়ে টাকা কামাই করতে হয়। সহজ ভাষায় লেবার। এতো কিছু পরোও যখন তিনি আমাকে দমাতে পারেননি তখন আর কি করা! পরিশেষে আমাকে এক গাঁদা শর্তারোপের বন্ধনে বন্দি করে রাজি হলেন তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে “স্বপ্নিল ভিসা” নমক বস্তুটির ব্যাবস্থা করবেন।

ছয় মাসের গণ্ডি পেরিয়ে বছরে পা দিল। প্রতিদিন রাতেই যেন ঘুমের ঘোরে সপ্নের ভেতর দেখে আসি দেশ-বিদেশের হরেক রকমের চিত্র। অথচ স্বপ্ন বাস্তবায়ন হচ্ছিলনা। এ যেন কঠিন অপেক্ষার পালা। একেকটি দিন মনে হতো একেক বছর। এ রকম এক যন্ত্রনা কাতর সময়ে সমস্থ গ্লানি মুছে দিয়ে সহসা একদিন পায়রা এলো সুখবারতা নিয়ে। আনন্দে নেচে উঠল মনটা। হৃদয়ের ভেতরে গুন গুন করা গানের কলিগুলো কেবলই যেন বলতে লাগলো, হে বিরহি পথিক; এবারতো পেলে তোমার শুদ্ধ পথ। আর দেরি নয়। যাও, সামনের দিকে এগিয়ে যাও। পিছনে তাকানর সময় আর নেই। উন্মুচন করে ছিনিয়ে নিয়ে আসো সকল সফলতার স্বর্ণ ছাবি।

সকল সানদিক কাজ সেরে যখন বিদেশে উড়ে যাবার দিনটি ধার্য করলাম, সত্যি মনটা বিষাদে ভরে উঠেছিলো। কিন্থু উপায় কি! টাকা ছাড়া যে আমাদের সমাজে মানুষের কোন মূল্যায়ন নেই। উঁচু দরের সার্টিফিকেটের দোহাই দিয়েযে একটি বিয়েও করা যায়না। মেয়ের মা বাবা তো “অকর্মণ্য” বলে গালি দিয়ে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করতেও দ্বিধা বোধ করবেনা। তাই সব দুঃখ ও যাতনাকে মাটিচাপা দিয়ে বেরিয়ে গেলাম নির্বাসিত জীবনে।

আমার প্রয়াত শক্তিমান শিক্ষক বাবাকে কোন দিন কাঁদতে দেখিনি। আমার বিদেশ যাত্রার প্রাক্কালে সেই বাবা শিশুর মতো হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলেন। আমার কাছে মনে হল এ যেন শুধুই নিছক কান্না নয়; এক অক্ষম ব্যতিত পিতার সুতীব্র আর্তনাদ।