ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

রোডমার্চ করতে গিয়ে গতকাল থেকে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া যে গরম গরম বক্তব্য দিচ্ছেন তা শুনে আমার কান দুটো জ্বালা পোড়া করতে করতে গরম হয়ে গেছে।কতো কথা যে তিনি বলছেন তাঁর কোন ইয়ত্তা নেই। ক্ষমতার জন্য এভাবে মরিয়া হয়ে উঠলে কি চলে! সস্তা গতানুগতিক সাদামাটা কথাবার্তার মাজেজাতো এখন গ্রামের অশিক্ষিত সহজ সরল মফিজ মিয়ারও বুঝতে অসুবিধে হয়না। ডিজিটাল যুগের সাথে সাথে দেশ যেখানে ডিজিটাল হতে শুরু করেছে সেখানে আমাদের বিরোধী দলীয় নেতার এহেন ব্যাকডেটেড রাজনৈতিক কথন একেবারেই বড্ড বেমানান। বিরোধী দলে থেকে ভারত বিরোধী কথা (সরকারে থাকা কালিন ভারত প্রীতি যেখানে উপচে পড়ে), সরকারের দুর্নীতি, নিজেরা ক্ষমতায় থাকাকালীন একেবারে সাধু-সিদ্ধ ইনোসেন্ট, আল্লাহর অশেষ রহমতে আবার ক্ষমতার মসনদ খানায় বসতে পারলে সকল সমস্যার মিরাকল সমাধান ইত্যাদি “বাকবাকুম” জাতীয় কথাবার্তা বলে বক্তৃতার মঞ্চে সাময়িক ঝড় তোলা যায় বটে, কিন্তু অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছার ক্ষেত্রে এসব সস্তা ডায়ালগ জনগনের কাছে অনেকটা অচল টাকার মতোই বলে মনে হয়।

ধর্মের দোহাই বা সাম্প্রদায়িকতা নামক ট্রাম কার্ডটির মাধ্যমে সহজ সরল ধর্মপ্রাণ মানুষকে বাগিয়ে নেয়ার মতো সময় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। বেশ ক’ বছর আগে গফরগাঁওয়ের এক বন্ধু বিএনপির নির্বাচনী ক্যাম্পিংয়ের বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ওইখানকার বিএনপি পন্থী তরুণ প্রজন্মরা দুটো মূর্তি সাথে নিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের ঘরে ঘরে ভোট চাইতে যেতো। মূর্তি দুটোর একটি মসজিদ, অন্যটি মন্দির। তারা এসব দেখিয়ে সাধারণ জনগণকে কোথায় ভোট দেবেন বলে জানতে চাইতো। স্বভাবতই সহজ সরল ধর্মভীরু মানুষ ঐসব ধূর্তবাজদের ধোকাবজিতে পরাস্ত হয়ে মসজিদের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে দিতেন। কূঠিল হাসিতে আত্মহারা হয়ে তারা বুঝাতো ঐ মসজিদই হচ্ছে ধানের শীষের প্রার্থী। সুতরাং বেহেশতের চাবি পেতে হলে তাকেই ভোটটা দিতে হবে। বিগত দশক গুলোতে এভাবেই তারা ধর্মকে পূঁজি করে হাঁচিল করে নিয়েছেন রাজনৈতিক স্বার্থ।

শরৎ বাবূ লিখেছেন, “মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেচে থাকলে বদলায়।“ প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারনা ও মন মানসিকতার ক্ষেত্রেও উন্নতি ঘটেছে। আমাদের সমাজেও তার প্রভাব পড়েছে। তারা এখন আর আগের মতো ধর্মান্ধ নয়। ধর্মের ঢাক-ঢোল বাজিয়ে তাদেরকে টলিয়ে আর ফায়দা লুটা যায়না। মানুষ এখন অনেক সচেতন। কি আওয়ামীলীগ বা কি বিএনপি এসব তারা বূঝতে চায়না। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটিই নিতে শিখেছে বাংলার মানুষ। সুতরাং গলাবাজিতে ভেল্কিবাজির বেলা একেবারেই শেষ।

ফিরে যাই রোডমার্চের কথায়। বিভিন্ন জায়গায় থেমে থেমে বিএনপি ও জামায়াতের অনেক নেতা অনেক মন্তব্যই করেছেন। এতকিছু আলোকপাত করার সময় কোথায়! কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার কয়েকটি গরম কথা এ লিখাতে না এনে পারছিনা। তিনি ভৈরবের পথ সভায় বলেন, আ’মীলীগ আল্লাহ নয়, মা দুর্গাকে বিশ্বাস করে। নরসিংদীর ইটাকোলায় বলেছেন, দেবদেবীতে বিশ্বাসী সরকার আল্লাহর ঊপর আস্থা হারিয়ে পূজা পার্বণ করতে শুরু করে দিয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঙ্গাল পাড়ায় বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেছেন, ভালো লোক আ’মীলীগ করেনা। আবার সিলেটে বিশাল জনসভায় বলেছেন, সরকারের লোকেরা হিন্দুদের জায়গাজমি এমনকি মন্দির পর্যন্ত দখল করছে। আ’মীলীগ যখনই ক্ষমতায় যায় তখনই হিন্দুদের ঊপোড় নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে। আ’মীলীগে থাকলে শুধু নির্যাতিতই হবেন, কিছুই পাবেনা বলেও তিনি বিএনপিতে যোগদানের জন্য তাদেরকে আহবাণ জানিয়েছেন।

আপোষহীন খেতাবে ভূষিত এ নেত্রীর বক্তব্যের ধরণতো এমনটা হইয়াই স্বাভাবিক। কিছুদিন আগেও যিনি বলেছেন শুধুই মানুষের মুক্তির জন্যই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আবারো তিনি রাজনৈতিক প্রত্যয়ী হয়ে ঊঠেছেন, তাহলে তিনি কি করে জীবনের এ সন্ধ্যা বেলায় অনবরত মিথ্যাচার করে যাচ্ছেন ! একী শুধুই রাজনৈতিক মাঠকে গরম করার জন্য নাকি ক্ষমতার সেই রসদকে আবারো বগল বন্দী করার সুচতুর পায়তারা। মানুষ কি এতোটাই বোকার স্বর্গে বসবাস করে, তিনি যা বলবেন তাই জনগণ গিলে খাবে! তিনবারের প্রধানমন্ত্রী (তার দাবী অনুযায়ী) ও বর্তমান বিরোধী দলীয় নেত্রীর মতো গুরুত্তপূর্ণ দায়িত্তে থেকেও কাণ্ড জ্ঞানহীন ভাবে মূখে যা আসছে তাই বলে বেড়াচ্ছেন। তিনি কি মনে করেন এসব বক্তব্যে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সুনাম বৃদ্ধি পাচ্ছে? তাঁর বুদ্ধিমান উপদেষ্টারা কি বলেন!

আওয়ামীলীগ যারা করেন তারা সবাই আল্লাহকে ছেড়ে দিয়ে মা কালির সাগরেদ হয়ে গেছেণ, কোন ভালো মানুষই আওয়ামীলীগ করেননা, বিরোধী দলীয় নেতার শাসনামলে সংখ্যালঘুরা কতোটা শান্তিতে ছিল বা ছিলনা, তাঁর সরকার ভারতপ্রেমে কতটুকু হাবুডুবু খেত বা খেতনা, দুর্নীতিতে চ্যম্পিয়ান হতে কার ক্রেডিট(?) কতো বেশী ইত্যাদি বিতর্কিত বিষয় গুলো নিয়ে আলোচনা করে আরব্য উপন্যাসের মতো লম্বা কাহিনী সৃষ্টি করার কোন ইচ্ছেই আমার নেই। এসব বিষয় সবাই কম বেশী জানেন। আমি শুধু এতোটুকু বলতে চাই, তিনি ভৈরবে বলেছেন – আওয়ামীলীগ আল্লাহ নয়, মা দুর্গাকে বিশ্বাস করে, আবার সিলেটে বলেছেন সরকারের লোকেরা হিন্দুদের জায়গাজমি এমনকি মন্দির পর্যন্ত দখল করছে। আ’মীলীগ যখনই ক্ষমতায় যায় তখনই হিন্দুদের ঊপর নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে। কথাটা কেমন জানি বেসুরা হয়ে গেলনা! যারা আল্লাহকে ভুলে মা দুর্গায় বিশ্বাসী হয়ে ঊঠেছেন তারাই আবার কি করে মা দুর্গার লোকজনকে নির্যাতন করে বা তাঁর পবিত্র ঘর দখল করার মতো দুঃসাহসী খেলায় মত্ত হয়ে ঊঠে! এসব স্ববিরোধী বক্তব্য কি তাঁকে হস্যস্পদে পরিনত করছেনা?

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে এবার তিনি কোন রাখঢাক রেখে কথা বলেননি। আ’মীলীগের আমলে মুজিব বাহিনী কত্রিক যে চল্লিশ হাজার লোক নিহত হয়েছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আগে তাদের বিচার তিনি দাবী করেছেন। সুন্দর কথা। যাদের মাধ্যমে লোকজন নির্যাতিত, ক্ষতিগ্রস্থ ও নিহত হয়ছেন তাদের অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত। তবে তা বিচ্ছিন্ন ভাবে খোলা মাঠে না বলে সংসদে গিয়ে বলুন। জনমত গঠন করুন। তা ছাড়া এসব হত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত করতে হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আগে হওয়া উচিত। কেননা তারাতো আগে অপরাধ করেছে। সুতরাং সাজাটা আগেই হওয়া উচিত। যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতার কেন যে এতো মায়াকান্না তা বুঝে উঠা বড়ই মুশকিল।

বাংলা নিউজ ২৪.কমের একটি খবর দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই। খবরে বলা হয়ছে, “জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কাছে সরকার পরাভব মানতে বাধ্য হবে হবে হবে। আমি রাস্তায় নেমেছি। অত্যাচারী সরকারের পতন না ঘটিয়ে ঘরে ফিরবো না।’ এও বলেছেন জনগন ধাক্কা মেরে সরকারকে ফেলে দেবে। এসব মুখরোচক ও প্রতিহিংসা পরায়ন কথাবার্তার মাধ্যমে খালেদা জিয়া নিজের ক্ষতি বৈ মঙ্গল করছেন বলে মনে হয়না। তিনি যেভাবে একটি নির্বাচিত সরকারকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেবার বা পতনের কথা বলছেন তা শুনে মনে হচ্ছে, এসব কোন রাজনৈতিক বা গনতান্ত্রিক ভাষার কথা নয়, যেন মামার বাড়ির আবদার।