ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

.বিষয়টা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। লিখতে গিয়েও আর লেখা হয়ে উঠেনি। গত শুক্রবার যখন সৌদিতে ইসলামি শরিয়াহ আইনের নাম করে আট বাংলাদেশিকে প্রকাশ্য দিবালোকে শিরশ্ছেদের মাধ্যমে আদিম বন্যতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিল তখনো পেশাগত ব্যস্ততার দরুন স্বীয় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারিনি। চাপা ক্ষোভ ভেতরে ধারণ করেই রাখছিলাম। এরি মধ্যে সেদিন রাতে আমার স্ত্রী ইউটিউবে শিরশ্ছেদের মর্মান্তিক বর্বরতা দেখে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়ে। সারা রাত ঘুমুতে পারেনি। মনটাকে হাল্কা করার জন্য বাসায় ফোন দেয়। মা বাবার সাথে বিষয়টি শেয়ার করার চেষ্টা করে। তারপর আমার শ্বশুর সাহেব এ ব্যাপারে তাকে আরো নতুন কিছু ধারনা দেয়।

কয়েক বছর আগে আমার এক চাচা শ্বশুর সৌদিতে গিয়েছিলেন চাকরি করতে। সেই সুবাদে সৌদির অনেক কিছুই তাঁর নখ দর্পণে। সৌদিদের এ পাশবিক বর্বরতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশে কোন সভা সমাবেশের আয়োজন করা হলে মাইকিঙের মাধ্যমে সর্ব সাধারণকে জানিয়ে যেভাবে যোগদানের জন্য আহবান করা হয় তদ্রূপ ওই দেশের সরকার কোন অপরাধিকে শরিয়াহ আইনের আওতায় এনে শিরশ্ছেদের মতো ঘৃণ্য শাস্তি কার্যকর করার আগে শহর ব্যাপী মাইকিঙের মাধ্যমে সাধারনত জূমা নামাজের পর কেসাসে যোগদানের জন্য অনূরোধ করে। এ যেন এক মহা আনন্দ ঘন সমাবেশ। উপস্থিত উল্লসিত জনতার সামনে হাত পা বেঁধে নির্দয় ও অমানবিক ভাবে বর্বর কাজটি তারা সম্পন্ন করে। বাড়িতে গিয়ে মহা আনন্দে কূড়মা পোলাও আহার ও মুখ রোচক গল্পের মাধ্যমে নাটকের সমাপ্তি টানা হয়।

ছিঃ সৌদি সরকার ছিঃ! সভ্য যুগে বাস করেও অসভ্য ইতরের বৃত্ত থেকে এখনো বেরিয়ে আসতে পারলেনা। পাঁচশ সাতশ বছর আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে অসভ্যতা ও বর্বরতা ছিল তা সৌদি সরকার আজকের প্রাযুক্তিক সভ্য বিশ্বেও বহন করে চলছে নির্লজ্জের মতো। ইসলামি শরিয়াহ আইনের দোহাই দিয়ে তলোয়ার দিয়ে সভ্যতাকে কুচি কুচি করে কেটে নির্বাসন দিচ্ছে আরব সাগরে । সময়ের সাথে সাথে সারা বিশ্বে সবকিছুতে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। এক কালে ইউরোপ সহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও শাস্তি মুলক পন্থা হিসেবে শিরশ্ছেদের প্রচলন ছিল। কিন্তু সভ্যতায় সিদ্ধ মানুষ এসব বর্বরোচিত শাস্তির বিধানকে পরিহার করেছে, এমনকি কোন কোন দেশে মৃত্যুদণ্ডের মতো একটি নির্মম শাস্তিকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে যে কোন জগন্যতম অপরাধের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকেই গন্য করে নিচ্ছে। তাছাড়া মৃত্যুদণ্ডকে কার্যকর করতে হলেও তারা অন্য কৌশল অবলম্বন করে। কিছু দিন আগেও ইয়াহু ম্যাসাঞ্জারের হোম পেজে দেখতে পেলাম ইউরপের কোন একটি দেশে এক ধরনের ইঞ্জেকশান প্রয়োগের মাধ্যমে একজনের মৃত্যুদণ্ডকে কার্যকর করা হচ্ছে। মানবতা ও সভ্যতার গান তারা গাইছে অন্য ধর্মাবলম্বী হয়েও। কিন্তু ওই আরবরা মুসলিম হয়েও হিন্দুয়ানি কায়দায় (চৈত্র সংক্রান্তিতে হিন্দুরা যেভাবে পাঁটা বলি দেয়) মানুষ বলি দিয়ে সভ্য যুগে পা রেখে সভ্যতাকেই পরিহাস করছে নির্মম ভাবে। অথচ পৃথিবীতে যুগে যুগে যতো ধর্ম এসেছে তাঁর মধ্যে ইসলাম হচ্ছে এক পরম শান্তিকামি ও সিভিলাইজড ধর্ম। অপ্রিয় হলেও নিখাদ সত্য এই যে আরব বিশ্ব ও আলকায়দা ধর্মটার বারটা বাজিয়ে দিয়েছে। যার ফলে কলংকের কালিমা বহন করে চলতে হচ্ছে আমদের প্রানের ধর্ম ইসলামকে। কখনো কখনো অন্য ধর্মীয় সমাজে মাথা হেট করে থাকতে হয় ইসলাম ধর্মাবলম্বী মুসলিমদের।

শুরুতেই যে বিষয়টা ভুলে গিয়েছিলাম বলে লিখেছি, প্রাসঙ্গিকতার খাতিরে তারই অবতারনা করি পাঠকদের সামনে। দু আড়াই বছর আগের কথা। আমি আয়ারল্যান্ডে একটি ফাইভ স্টার হোটেলের এফ এন্ড বি (ফুড অ্যান্ড বেবারেজ) ডিপারটম্যনটে জব করি। সেই সুবাদে হরেক রকম লোকের সাথে দেখা-সাক্ষাত ঘটে প্রতিনিয়তই। এর আগের একটি লিখাতেও বলেছিলাম, বিল ক্লিনটন থেকে শুরু করে আমদের ডঃ ইউনুস পর্যন্ত এরকম অনেক লোককে কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ফিরে আসি মূল কথায়। একদিন রাতে দুজন এরাবিয়ান মুসলিম এসেছেন ডিনার করতে। একজন পাইলট, অন্যজন গলফ এয়ার লাইন্সের শেয়ার হোল্ডার মালিক। দুজনের সঙ্গে সুন্দরী দুজন তরুনিও ছিল। আমি বুঝে উঠতে পারিনি তারা তাদের গার্ল ফ্রেন্ড নাকি ভাড়াটিয়া কেউ। তবে এতোটুকু বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে তরুনি দুজন ইউরোপিয়ান কোন দেশের ইহুদি বা ক্রিশ্চিয়ান ধর্মাবলম্বী অথবা এমনো হতে পারে, কোন ধর্মের ধারই তারা ধারেনা।

ডিনারের অর্ডার নিতে গিয়ে দেখি ভদ্রলোক দুজন দিব্যি বিয়ার (একজন পাইন্ট অফ হ্যানিকেন, অন্যজন বুডবাইজারে বোতল) গিলছেন যেখানে অন্য ধর্মাবলম্বী বা বিধর্মী মেয়ে দুটো শুধুই পান করছিল সফট ড্রিংস (কোকাকোলা)। মেইন কোর্স হিসেবে অর্ডার দিলেন “সিবাস” আর মেয়ে গুলো শুধু ভেজিটেবল সূপ। সিবাস হচ্ছে এক ধরনের সামুদ্রিক স্কিনি মাছ। মাছ খেতে তো মুস্লিমদের কোন বাধা নিষেধ নেই। খেতেই পারেন। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। সিবাস ডিশটি পরিবেশন করা হয় দুটো ত্রাফল নকি,(truffle knokee- ভেজিটেবল ম্যাশের মাধ্যমে বানানো ছোট পিঠা আকৃতির এক ধরনের জিনিস) এস্পারাগুচ, ক্রিস্পি বেকন পানসেটা, গার্লিক ও ট্যারাগণ সসের মাধ্যমে। ক্রিস্পি বেকন পানসেটা হচ্ছে কড়া ভাজা শূকরের মাংসের সরু,চিকন,পাতলা ও ছোট বর্গাকৃতির টুকরো যা সিবাসের দু টুকরোর উপর দিয়ে পরিবেশন করা হয়। পানসেটা সম্পর্কে তাদেরকে এ ধারনা দেয়ার পরো তারা তাদের মনোভাব পরিবর্তন করেননি। মুসলিম বিধায় আমি আরেক ধাপ এগিয়ে বললাম, ইচ্ছে করলে আপনারা বেকন পানসেটা বাদ দিয়েও এ ডিস পেতে পারেন (কোন কাস্টমারকে এভাবে বলা যদিও আমার আমার চাকরির রীতি বিরুধি)। বুঝা গেল একটু বিরক্ত হয়েও তারা আমাকে বলল, “please do, whatever we ordered. We are in little rush.” আমার ও তাদের বাক্য বিনিময় শুনে মুখুমুখি বসা মেয়ে দুটু মুচকি মুচকি হাসছিল। আমি অহেতুক কথা না বাড়িয়ে অত্যন্ত আহত চিত্তে অর্ডারটি কিচেনে পৌঁছে দিয়ে তাদেরকে দেখবাল করার জন্য আমার অন্য এক কলিগকে দায়িত্ব দিয়ে সরে যাই। দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখেছি ফিস নাইফ দিয়ে কেটে কেটে সিবাসের সাথে পানসেটা মিশিয়ে খাবার ঘৃণ্য দৃশ্য। আমার বমি বমি ভাব হচ্ছিলো যদিও এর আগে অন্য ধর্মীয় কাউকে খেতে দেখলে কোন দিনই এ রকম হয়নি।

প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন, যাদেরকে আমরা বিধর্মী বলে যখন তখন গালি দেই তারা মুসলিম টেবিলে বসে ইসলামকে সমীহ করে মদ্যপায়ী হয়েও মদ পান থেকে বিরত রয়েছে, শুকর প্রেমী হয়েও শুকরের মাংশ ভক্ষন করার মতো দৃষ্টতা অন্তত ওই টেবিলে তারা দেখায়নি। বরং উলঠো চিত্র ফুটে উঠলো বিশ্ব সেরা(!) মুসলিম দাবীদার দুই এরাবিয়ান মুসলিমের হারাম ক্রিয়াকলাপে। এ যেন মুসলিমের করাত দিয়ে তরমুজের পিসের মতো কেটে ফেলা হল মুসলিম শিষ্টাচার তথা ধর্মীয় বিধানকে।

এতো গেল দুই মামুলি এরাবিয়ানের গল্প। গ্লোবালিজেশনের এ যুগে কোন কিছুই আর গোপন থাকেনা। ফেসবুক বা ইউটিউবের মাধ্যমে সৌদি প্রিন্সের শরাব প্রেমী ও নারি লোভী লাম্পট্যের কথা কে বা না জানে! কিছুদিন আগে দুবাইয়ের এক নাইট ক্লাবে গিয়ে অর্ধ নগ্ন এক সুন্দরী তরুণীর গায়ে ডলার ছিটিয়েছে, এক রাত কাটিয়েছে এক মিলিয়ন ডলার খরচ করে। শুধু যে যুবরাজরা এসব ইসলাম বিরোধী কাজে লিপ্ত তাতো নয়, স্বয়ং বাদশাহ সাহেব নিজেও শরাব ও নারীতে আসক্ত। বিডি ব্লগের হোম পেজে ইউটিউবের মাধ্যমে ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজটি-ই এর প্রমান। ভিডিওটি প্লে করলেই দেখা যাবে বাদশাহ প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সাথে গ্লাসে হুইস্কি নিয়ে কিভাবে “চিয়ার্স” করছে! এসব বিষয় আজকের বিশ্বে ওপেন সিক্রেট মাত্র।

এরপরো কি আমরা অন্ধের মতো সমর্থন দিয়ে বলবো, ওরা আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে শিরশশ্ছেদর বিধান পালন করছে? আল্লাহ, শরিয়াহ আইন ইত্যাদি শব্দ গুলো মুখে এনে ফেনা তোলার মাধ্যমে ধর্ম ব্যবসায়ীদের মতো ভণ্ডামি করছেনা? যারা নিজেরা ঘর সামলাতে পারছেনা কিংবা তারা নিজেরাই আল্লাহ ওয়ালা কায়দায় শরিয়া বিরোধী কাজে লিপ্ত, তারা কিসের জোরে কোন মন-মানসিকতায় শরিয়া শরিয়া বলে চিল্লিয়ে গলা ফাটায়? তাই সবাকে আজ উপলব্ধি করতে হবে, ওদের বর্বরতায় উল্লসিত না হয়ে সমুচিত জবাব দেয়ার সময় এখনি। এইতো আর কদিন পরেই আরো তিনজন বাংলাদেশীকে শিরশ্ছেদ করার প্রক্রিয়া চলছে। তাই সরকার সহ দল মত নির্বিশেষে সবাই এগিয়েআসুন, আর দেরি নয়। বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থা গুলোর কাছে ওদের এসব ধর্ম বিরোধী বন্য ক্রিয়াকলাপ তুলে ধরার মাধ্যমে মানবতার আবেদনকে বলিষ্ঠ ভাবে পৌঁছে দিতে চেষ্টা করি। যে তিনজন বাংলাদেশীর শিরশ্ছেদ আসন্ন, অদেরকে বাঁচাতে চেষ্টা করি। আল্লাহ চাইলে সফল হয়াও যেতে পারে।