ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

যার যে লয়, মরলে দূর হয় – গ্রামীন এই প্রবাদ বাক্যটি দিয়েই আজকের লেখাটি শুরু করি। কয়েক মাস হল এক ভদ্র লোক ওমরা হজ পালন করে এসে মুখে কয়েকটা ফ্রেঞ্চ স্টাইলে দাড়িও রেখেছে দেখলাম। কিছু দিন আগে ক্রিসেন্ট শপিং সেন্টারে যখন তার সঙ্গে দেখা হল তার আল্লাহয়ালা টাইপের কথা শুনে ভেবেছিলাম, মানুষতো পরিবর্তনশীল, হয়তোবা তার ক্ষেত্রেও এ পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। কিন্তু না, বাস্তব বড়ো রূঢ়। কয়লা ধুলে তো ময়লা যায়না।

একটু গভীরে যাই। গত সপ্তাহে স্থানীয় ভোট কেন্দ্র প্যারী স্কয়ার হোটেলে গিয়েছিলাম আয়ারল্যান্ডস্থ বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েসন কতৃক আয়োজিত নির্বাচনে ভোট প্রদান করতে। সেখানে কথায় কথায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার মিঃ লিটন বলেছিলেন নির্বাচন নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখতে। বলেছিলাম- লিখবো। মনে মনে ঠিক করেছিলাম বেশ বাহবা দিয়েই একটি লিখা লিখবো। অপেশাদারি হয়েও সাত সদস্যের একটি কমিশন পুরো আয়ারল্যান্ডে সমস্থ বাঙ্গালী কমিউনিটির অংশ গ্রহনের মাধ্যমে যেভাবে একটি সফল নির্বাচন সম্পন্ন করতে সক্ষম হতে যাচ্ছে সেখানে তাদেরকে বাহবা না দিতে পারলে অবিচার করা হবে। হৃদয়ে যে স্বতঃস্ফূর্ততা রেখাপাত করেছিলো তা অনেকটাই দমে গেল যখন “শেষ ভালো যার, সব ভালো তার” এ মর্ম বাণীকে উপলব্ধি করি।

কমিউনিটি নিয়ে লিখার খুব বেশী একটা ইচ্ছে ছিলনা। কয়েক মাস আগে আয়ারল্যান্ডস্থ বাংলাদেশ কমিউনিটি ও নির্বাচন বিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে লিখা দু একটি আর্টিকেল প্রথম শ্রেণীর জাতীয় দৈনিক সহ অন লাইন ভিত্তিক মিডিয়া গুলোতে যথেষ্ট যত্ন সহকারে মুদ্রিত হয়। প্রেমে সফলতা বা ব্যর্থতার একটি পরিসংখ্যান করলে দেখা যাবে ৯৫% প্রেমই ব্যর্থতায় পরযবেশিত হয়। লেখালেখির ক্ষেত্রেও যদি এ উদাহরণটা টেনে আনি তবে খুব বেশী একটা অমুলক হবে বলে মনে হয়না। আমার কমিউনিটি ভিত্তিক লেখা গুলো যে খুব বেশী একটা কাজ করেছে তাও ভাবতে পারিনা। তাই অনেকটা আক্ষেপ, ক্ষোভ নিয়েই নিজেকে সরিয়ে রেখেছি কমিউনিটি নামক বস্তুটি থেকে। শুধু শুধু উলু বনে মুক্তা ছড়িয়ে কি লাভ! কিন্তু সেদিন কথা প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার জাকির হোসেন (গেল নির্বাচনে সভাপতি প্রার্থী) একটি মুল্যবান কথা বললেন। তার মতে, “কমিউনিটির নাজুকতা দেখে সবাই যদি দূরে সরে থাকে তাহলে ওই নাজুকতা আজ না হয় কাল সবাকে এসেই গ্রাস করবে। তাই কাউকে না কাউকে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে এসে হাল ধরতে হবে।“ তার কথাটা আমার মনে বিঁধল। ভদ্র লোক সত্যি কথাই বলেছেন। তাই ভাবলাম প্রত্যক্ষ ভাবে না হোক, অন্তত পক্ষে পরোক্ষ ভাবে হলেও কমিউনিটিকে কিছুটা কন্ট্রিবিউট করার চেষ্টা করি। গ্রহন করা না করার দায়িত্ব তাদের।

অনেক চরাই উৎরাইয়ের পর দুবার তারিখ বদল করে অবশেষে গত ১৬ অক্টোবর ২০১১ অল বাংলাদেশী অ্যাসোসিয়েসান অফ আয়ারল্যান্ডের নির্বাচন সম্পন্ন হয়। নির্বাচন পরিচালনার জন্য ইকবাল হুসেন লিটনকে প্রধান করে সাত সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিশন গঠন করা হয় যা কিনা আয়ারল্যান্ডস্থ বাঙ্গালী কমিউনিটির কাছে নির্বাচন কমিশন হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। লিটন সাহেব ছাড়াও যারা কমিশনের দায়িত্তে ছিলেন তারা হল সর্ব জনাব আজাদ তালুকদার, মোনায়েম খন্দকার রানা, আব্দুস সালাম দুলাল, মেহেদি, জামাল ও রিপন। উপরল্লেখিত এ সাত ব্যাক্তিকে যথেষ্ট আস্তাশীল ও কর্মক্ষম দায়িত্বশীল ভেবেই কমিউনিটি তাদেরকে নির্বাচন পরিচালনা করার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের এখতিয়ার দান করে। কিন্তু নির্বাচনোত্তর ভোট গননার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ত্রুটি ও অসাধু, অদক্ষ বা অযোগ্য লোকদের দিয়ে ভোট গনানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হযবরল ভাবে করানোর ফলে তাদের দায়িত্ববোধ ও নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও অসন্তুষ দেখা দিয়েছে। অনেকে এ ফলাফল মেনে নিতে মোটেও রাজি নয়। তাই নির্বাচনে বিজয়ী মনে করে যারা তৃপ্তির ঢেকুর তুলে তরিঘড়ি করেই টিভিতে এড দিয়ে অভিষেকের আসেকে আসক্তি দেখাচ্ছেন, তৃণমূল পর্যায়ের নিরীহ জনগন সহ বিজিত প্রার্থীদের অনেকের কাছেই ব্যাপারটা শিশু সুলভতার মাত্রাকেও যেন ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। আবারো কমিউনিটির ঈশান কোনে বিভাজনের কাল মেঘ জমতে শুরু করেছে। দুমুখি ত্রিমুখি ধারায় কমিউনিটি বিভক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাহলে কি ধরে নিতে হবে সাংগঠনিক ব্যাক্তিত্ত জনাব তৌহিদুল ইসলাম টম (সম্প্রতি নির্বাচনে বিজিত সভাপতি প্রার্থী) মুস্তাফিজুর রহমান সাহেবকে নিয়ে (Acting president) সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে কমিউনিটিতে যে ঐক্য ও অভিন্নতার সুর তুলতে চেয়েছিলেন তা কি অঙ্গুরেই বিনষ্ট হতে যাচ্ছে?

এ ব্যপারে আরেক বিজিত সভাপতি প্রার্থী ব্যারিস্টার জাকিরের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, “আমি বাংলাদেশের মতো নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে, ফলাফল সঠিক হয়নি এসব কথা বলে পুরনো কালচারের ধারাবাহিকতা বজায়ে রাখতে চাইনা। কিন্তু যা বাস্তব তা না বলেও পারা যায়না।“ তার মতে নির্বাচন যেমনই হোক, ত্রুটিপূর্ণ গননা কোন মতেই মেনে নেয়া যায়না। তিনি মনে করেন, সঠিক গননা হলে তার জয় নিশ্চিত হোক আর না হোক তার প্যানেলের কম করে হলেও আর আটটি পদের প্রার্থী বিজয়ী হবেন। কেন তার এ ধারনা? আসুন নিচে ভোট গননার কিছু চিত্র তুলে ধরি।

ভোট গননার জন্য লিমরিকের খিলমরি লজ হোটেলকে বেছে নেয়া হয়েছিল। সেখানে আমি রাত সাড়ে এগারটায় গিয়ে দেখি এতো কোন ভোট গননা কেন্দ্র নয় যেন একটা মাছের বাজার। অগোছালো ও বিশৃংকল পরিবেশে প্রার্থী সহ আগত উৎসুক জনগণকে বিচ্ছিন্ন ভাবে হাঁটাহাঁটি করতে দেখ গেল। চেহারায় ফুটে উঠল একটা অস্তিরতা, অতৃপ্তি ও প্রশ্নের ছাপ। এ ব্যাপারে কথা হল সভাপতি প্রার্থী টম ও ব্যারিস্টার জাকির সহ আর কয়েকজনের সঙ্গে। কথা বলে বুঝা গেল ভোট গননার পদ্ধতি নিয়ে তারা মোটেও সন্তুষ্ট নন। কিন্তু এ অসন্তুষ্টির কথা কে কাকে বলবে! তাই নির্ঘুম ক্লান্ত চোখে অপেক্ষার প্রহর গোনা ছাড়া কোন উপায় নেই!

ভোর সাড়ে পাঁচটায় যখন বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করি তখন দেখা গেল চার পাচ জনের সমন্বয়ে একেকটি দল চার টেবিলে বসে ভোট গননা করছে। দূর থেকে দেখে মনে হবে এ যেন প্রাইমারী স্কুলের কোন পরিক্ষা চলছে। কে কার ভোট কিভাবে গুনছে কিংবা সেখানে কোন দায়িত্বশীল বাক্তি পর্যবেক্ষণে ছিল কিনা, এ বিষয় গুলো ছিল অস্পষ্ট। একটি অসমর্থিত সুত্র অনুযায়ি জানা যায়, সকাল বেলায় প্রার্থী সহ সকলেই যখন প্রায় ক্লান্ত ঠিক এমনি একটা সময়ে ফাঁকা মাঠে একটি বিশেষ প্যানেলের কিছু প্রার্থী নিজেরাই নিজেদের ভোট গননায় লিপ্ত হয়ে যায়। যা কিনা নির্বাচন কমিশন ও ভোট গণনাকে প্রশ্ন বিদ্ধ করে।

পরের ঘটনা আরো বেশী পীড়াদায়ক ও দুঃখজনক। পরদিন দুপুরে দুটো ফোন কল পাই। প্রথমে যিনি ফোন করলেন তিনি হলেন লিমরিকের আব্দুল মান্নান। তার স্ত্রী লিলি মহিলা সম্পাদিকা পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলো এবং পাসও করেছেন। সফল ফলাফলটি বাগিয়ে আনতে ভদ্রলোককে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। লেখার শুরুতেই যে ওমরা হজ পালনকারী দাড়ি ওয়ালা ব্যাক্তিটির কথা উল্লেখ করেছিলাম তিনি নির্বাচন কমিশন বডির কেউ না হয়েও ভোট গননার ক্ষেত্রে সহযোগী ভুমিকা পালন করতে গিয়েছিলেন। মান্নান সাহেব লিমরিক কাউনটিতে তার স্ত্রীর ফলাফল জানতে চাইলে ঐ ভদ্রলোক জানান, লিলি ভাবী ১৫৬ কাস্টকৃত ভোটের মধ্যে ৬৬ ভোট পেয়ছিল কিন্তু আমি দয়া পরবশ হয়ে তাঁকে আরও দুটো বাড়িয়ে মোট ৬৮ ভোট দিয়েছি। ইস! কী মহান দয়াশীল ব্যাক্তি! আরে সাহেব দুটো ভোট বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেয়ার আপনি কে? এ অধিকার কে দিয়েছে আপনাকে বা এতো দুঃসাহস হল কি করে আপনার? জনগন ক্ষেপে গিয়ে যদি কালার ছেপে বসত তাহলে নিজেকে বাচাতেন কি করে! লজ্জা কি কেবল নারীদেরই ভূষণ? একটু ভেবে দেখবেন।

মান্নান সাহেব তার সাথে একমত না হতে পারায় কিছুক্ষন পর ঘুরেফিরে এসে তিনি আবারো জানালেন লিলি ৮৮ ভোট পেয়েছে। এর পরো মিঃ মান্নান অনর থেকে অন্য এক ভদ্র লোকের সহযোগিতা নিয়ে নিজে ভোট গুনে দেখলেন তার স্ত্রীর ভোট প্রাপ্তির সংখ্যা ১৪১।

পরপর দ্বিতীয় বাক্তিটি যিনি ফোন করে ভোট গননায় অনৈতিকতা ও অবিচারের কথা জানালেন তিনি হলেন ধর্ম সম্পাদক পদপ্রার্থী জনাব মোযাম্মেল হক। তিনিও লিমরিকেরই অধিবাসী। দুঃখ ভারাক্রান্ত স্বরে তিনি ঐ একই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ টানলেন। তাকেও মহান (!) ব্যাক্তিটি একই কায়দায় দুটো ভোট বেশী দেয়া হয়েছে জানিয়ে বললেন, আপনি লিমরিকে ভোট পায়েছেন ১১২ ও আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ২১। কিন্তু তিনি তার কথায় আস্তা আনতে না পেরে অন্য একজনকে দিয়ে ভোট গুনিয়ে যে সংখ্যাটি পেলেন তা হল ১২১ ও ১৪। ভদ্র লোক এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করতে গেলে তার প্যানেলেরই এক উঁচু স্থরের ব্যক্তি কিছুটা ধমকের সুরেই তাঁকে থেমে থাকতে বলেন। “খেচু খুঁড়তে গিয়ে যদি সাপ বেরিয়ে আসে,” এই ভয়ে নয় কি?

এ ধরনের অভিযোগ শুধু ওদের দু জনেরই নয়, জুয়েল, তুষার সহ আরও অনেকের। সে যাই হোক, আমি অবাক হচ্ছি এই মহান (!) ব্যাক্তিটির নিকৃষ্টতা দেখে! ভদ্রলোক আমার বন্ধু মানুষ। তার কৃত কর্মের বিবরন এভাবে লিখতে আমার বড্ড কষ্ট হচ্ছে। ধিক! শত ধিক!

সহমর্মিতার প্রশ্নে নির্বাচনকে সুষ্ঠু ধরে নিলেও এতো কিছুর পর আর বলা যায়না ভোট গননা সঠিক হয়েছে। কিছু সংখ্যক লোকের বিচ্ছিন্ন ভণ্ডামির জন্য পুরো নির্বাচন ও ফলাফল আজ প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচন কমিশনের যে ক্রেডিবিলিটি অর্জিত হয়েছিলো তা ধুলুয় মিশে গেছে। যারা প্রকৃত অর্থেই সঠিক ভোট পেয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন তাদের বিজয়ও আজ অনেকটা ম্লান। সুতরাং “অভিশেক”, “রিসিপ্সান পার্টি” “সমন্বয়কারী” ইত্যাদি শব্দ গুলোর বরাত দিয়ে দুশ ইউরো খরচ করে টিবিতে এড দিয়ে সস্তা পরিচিতি লাভ করা যেতে পারে বটে কমিউনিটির ঐক্য ও অভিন্ন সুর তোলার ক্ষেত্রে কতোটুকু অর্থ বহ হবে তা আমার জানা নেই। তবে টিবি ওয়ালাদের ব্যবসা বেশ ভালই জমজমাট হচ্ছে এতে কোন সন্দেহ নেই।

এসব বিষয়ে কথা বলেছিলাম প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত ইকবাল হুসেন লিটনের সঙ্গে। তিনি অত্যন্ত কৌশলে স্বীয় দায়ভার এরিয়ে গিয়ে অন্য নির্বাচন কমিশনারদের দায়িত্তে অবহেলা ও উদাসীনতাকেই বেশী দায়ী করেন। বর্তমান পরিস্তিতির প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা ঠিক রেখে কিভাবে উদ্ভুত সমস্যা গূলোর সুরাহা করা যায় প্রশ্ন করলে তিনি আমাকে কোন সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। টেলিফোনে কথা হল আজাদ তালুকদার সাহেবের সাথেও। নির্বাচন কমিশনার হিসেবে তাদের দায়িত্তের কথা মনে করিয়ে দিতে চাইলে তিনি তাঁর দায়িত্তে অটল ছিলেন জানিয়ে বরং ঊল্টো তিনি নির্বাচনে অংশ গ্রহণকারী প্রার্থীদেরকেই এসব উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, ভোট গণনাস্থল থেকে ৫০০ মিটার দূরে তাঁর বাসায় ক্লান্তি দূর করার জন্য একবারো যেতে পারেননি, অথচ প্রার্থীদের অনেকেই ভোট গণনা কেন্দ্রকে ফাঁকা করে অরক্ষিত রেখে অনেকেই আরাম আয়েশের জন্য বিভিন্ন জায়গায় চলে যায়। এ সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে মতলববাজরা। আজাদ সাহেবের কথাও যদি সত্যি ধরে নেই তাহলে কে দোষী বা কে দোষী নয় সে বিচারে না গিয়ে এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে ভোট গণনাটি ফ্রি এন্ড ফেয়ার হয়নি। সুতরাং ভোট পূণ গণনার ব্যাপারে অনেকের যে দাবী ঊটেছে তা মোটেও অযৌক্তিক নয়। তালুকদার সাহেবকে নির্বাচন কমিশনের সুনামের স্বার্থে দ্রুত সুরাহা করার তাগিদ দিলে পক্ষে বিপক্ষে অনেক যুক্তি উত্থাপনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিকুল বাস্তবতার কথা ঊল্লেখ করে বলেছিলেন যে সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যাপারটির দ্রুত ফয়সালা করবেন। অপ্রিয় হলেও সত্য এইযে এক সপ্তাহের চেয়ে বেশী সময় অতিক্রান্ত হলেও অদ্যাবধি আমরা কোন ইতিবাচক পদক্ষেপের খবর পাইনি।

লেখাটি যখন শেষ পর্যায়ে ঠিক তখন ডাবলিন থেকে ফোন দিলেন ব্যারিস্টার জাকির হোসেন। সর্বশেষ তাজা খবর হিসেবে যা জানালেন তা হল ডাবলিনের কিছু নেতৃ স্থানীয় লোক নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে এক টেবিল টকে বসে। সেখানে নির্বাচন কমিশন অর্থনৈতিক দীনতার কথা তুলে ধরেন। সে ক্ষেত্রে ব্যারিস্টার সাহেব পুরো খরচ বহনের দায়ভার স্বীকার করে নিলে নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ফলাফল রহিত করে পুনরায় ভোট গননার আশ্বাস দেন। কিন্তু একদিন পরই কোন এক বিশেষ ব্যক্তি হার্ড লাইনে চলে যাবেন ভেবে তারা তাদের সিদ্ধান্ত থেকে দুঃখ জনক ভাবে সরে দাঁড়ান। কিন্তু কে হার্ড লাইনে গেল কি গেলনা সেটাতো তাদের দেখার বিষয় নয়। ন্যায় নীতির প্রশ্নে যা সঠিক, নির্বাচন কমিশনকে সে দিকেই এগিয়ে যাওয়া সমীচীন বলে মনে করি। তা ছাড়া তারা যে কেবল ঐ বিশেষ ব্যক্তির বিশেষ হার্ড লাইনের চিন্তায় অস্থির সে ক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন, প্রশ্ন বিদ্ধ নির্বাচন ও ফলাফলে অসন্তুষ্টি প্রকাশের মাধ্যমে যদি অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট মুস্তাফিজুর রহমান সাহেব তার দায়িত্ব হস্থান্তর করতে অনীহা প্রকাশ করেন তবে কমিউনিটি ও সংগঠনের অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? আম ছালা দুটো হারিয়েই তখন সর্বস্বান্ত হতে হবে।

নির্বাচন কমিশনে যারা আছেন তারা আমার পরিচিত ও বন্ধু মানুষ। আমার আলোচনা বা সমালচনা কেউ ব্যাক্তিগত ভাবে নিবেননা। আমি চাইনা কিছু ছোট ত্রুটি বা কিছু ভণ্ড কেরামতদের কেরামতির জন্য আপনাদের সমস্থ অর্জন বিসর্জন হয়ে যাক। তাই কমিশনের স্বার্থেই কিছু কথা অকপটে আলোকপাত করতে হচ্ছে।

কিছু কিছু ব্যাপারে কমিশনের ভুমিকা এখনো অস্পষ্ট। তারা অর্থনৈতিক সমস্যার কথা বলছেন। অথচ অনেকের মতে প্রার্থীদের কাছ থেকে নমিউনেসান ফি বাবদ যে অর্থ আদায় করা হয়েছে তার পরিমানতো ২৫/২৬ হাজারের কোটায় (ইউরো – স্থানীয় মুদ্রা) গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি জানতাম নির্বাচন কমিশন ভল্যুয়নটারি সার্ভিস দিয়েছেন। কিন্তু একটি সুত্র মতে, পারিশ্রমিক বাবদ তারা প্রত্যেকে ভাতা হিসেবে ৫০০ ইউরো করে নিয়েছেন। এসব কথা এখন তিল থেকে তাল হয়ে ছড়াচ্ছে। সত্যি যদি তারা এ পরিমান অর্থ নিয়ে থাকেন তাহলে আমি বলবো – তাদের পারিশ্রমিকের তুলনায় এটা খুবই নগন্য। ভাতার প্রশ্নই যদি উঠে থেকে থাকে তাহলে সঠিক হিস্যাই নেয়া উচিত ছিল। কর্ক থেকে রফিক খান আরও কয়েকজন নেতৃ স্থানীয় লোকের বরাত দিয়ে বলেছেন এসব বিষয়ে খুলাসা করে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা ফুটিয়ে তোলা উচিত। আমি মনে করি, সাধারন জনগণকে জানান হোক বা না হোক, যাদের অর্থায়নের মাধ্যমে নির্বাচন পরিচালনা ও সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়ছেন অন্তত পক্ষে তাদের কাছে খরচের একটা খতিয়ান তুলে ধরা শুধু দায়িত্বই নয়, মানবিকও বটে। এ জন্য সবাকে নিয়ে গোল টেবিল আলোচনা বা টিবিতে একটা ছোটখাটো বিজ্ঞাপনের আশ্রয় নেয়া যেতে পারে। কোন পদ্ধতি গ্রহন করবেন তা কমিশনের মর্জি। তবে তা করলে তাদের গ্রহন যোগ্যতা বাড়বে বৈ কমবেনা।

শেষ কথা – নির্বাচন কমিশনে যারা আছেন তারা ফরমাল কেউ নন। এ কমিউনিটিরই সদস্য। আমার বিশ্বাস অন্য দশ জনের মতো তারাও চান আয়ারল্যান্ডে একটি সুন্দর, কর্মক্ষম ও গ্রহনযগ্য বাঙ্গালী কমিউনিটি গড়ে উঠুক। এ ধারনা যদি প্রকৃত পক্ষেই সত্য হয় তবে বর্তমান ক্রাইসিসকে কাটিয়ে তুলতে হলে ভোট পুনঃ গননা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। তবে সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকুল অবস্থার কথা বলে নির্বাচন কমিশন তা করতে যদি অক্ষমতা প্রকাশ করে তবে সংগঠন ও কমিউনিটিকে সচল রাখার স্বার্থে যে ভাবেই হোক সকলকে এক প্ল্যাটফর্মে এনে দাঁড় করাতে হবে। এ জন্য নির্বাচন কমিশনকে যদি কোন ত্যগ স্বীকার বা অনুনয় বিনয়ের আশ্রয় নিতে হয় তাই করা উচিত। এতে তাদের সুনাম ও মর্যাদা বৃদ্ধিই পাবে। নিরপেক্ষ বা সুশীল সমাজ বলতে যারা আছেন তারা অন্তত পক্ষে তাই আশা করে। আমি নিজেও ঐ আশাবাদীদের দলেরই একজন।