ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

[প্রিয় পাঠক, ব্যাক্তিগত ঝামেলা ও কিছু সাম্প্রতিক বিষয়ের উপর নজর দিতে গিয়ে প্রবাসীর দুঃখ নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হতে দেরি হল বলে আমি প্রথমেই বিনীত ভাবে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ]

মা-বাবা, ভাই-বোনের বেদনাশ্রুকে উপেক্ষা ও বন্ধু-বান্দব সহ সকল আত্মীয়-স্বজনের মায়া বন্ধনকে ছিন্ন করে পা বাড়ালাম পরবাসের পথে। ইমিগ্র্যাশনের যাবতীয় ঝামেলা চুকিয়ে যখন বিমানে আরোহণ করলাম তখন উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম মা, মাটি ও দেশের প্রতি হৃদয়ের ভেতর লুকিয়ে থাকা দরদের পরিমান টুকু। চোখের সামনে ভেসে উঠছিল অসংখ্য পরিচিত প্রিয় চোখ। প্লেনে বসে জীবনের হিসেব নিকেশ কষতে কষতে পৌঁছে গেলাম সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি এয়ারপোর্টে। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও সৌন্দর্যের দিক থেকে পৃথিবীতে কয়েকবার ফার্স্ট হওয়া এ বন্দরে বিমান থেকে যখন পা ফেলছিলাম একটা অজানা শিহরন খেলে যাচ্ছিল সমস্থ শরীরের ভেতর। শিহরনের আবেশ কাটতে না কাটতেই ইমিগ্রেশনের ভিতর থেকে বেরিয়েই দেখতে পেলাম আমার খালাতো ভাই টিপু তার কজন ফ্রেন্ড ও কোম্পানির বসকে নিয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। সিঙ্গাপরের “ল” অনুযায়ী, বাইরের যে কোন এমপ্লয়িকে এয়ারপোর্টে পৌছার আগেই IP (Inner Permit) ইমিগ্রেশনে জমা দিতে হয় যাতে করে নব আগন্তুক এমপ্লয়িকে ইমিগ্রেশান অফিসার সহজেই শনাক্ত করে পাসপোর্টে ওয়ার্ক পারমিট স্ট্যাটাসের ভিসা দিয়ে বাইরে যাবার সুযোগ দিতে পারে। বস কেন এয়ারপোর্টে এলো, খালাতো ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলে সে আমাকে উপরোল্লেখিত উত্তর দিয়ে বলল,”সবে তো এলেন, আস্তে আস্তে সব বুঝতে পারবেন।“

বাইরে বেরোনোর সাথে সাথে বস আমার হাত থেকে পাসপোর্টটি নিয়ে যায়। অনেকটা অপমান বোধ করলাম। ব্যাপারটা আত্মসম্মানে বাঁধল। স্বাগতম জানানোকারীদের কাছ থেকে জানতে পারলাম এটাই এখানকার রীতি, দুঃখ করার কিছুই নেই। আমার পাসপোর্ট আমার কাছে রাখতে পারবোনা সেটা কি করে স্বাভাবিক রীতি হয় তা আমার আধা ঘণ্টা বয়সের সিঙ্গাপুর প্রবাসী কাঁচা মাথায় ধরছিলনা। খালাতো ভাই নতুন হিসেবে আমার কাছে অনেক কিছু চাপা দিয়ে রাখতে চাইলেও তার বন্ধুদের একজন বলেই ফেলল। বিষয়টা হচ্ছে, কোন ওয়ার্কার বা এমপ্লয়ি যাথে কোম্পানি থেকে পালিয়ে যেতে না পারে তার জন্যই বসদের এই পলিসি। এ কথা শুনে বড্ড কষ্ট হচ্ছিলো। কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। মনে হচ্ছিলো এ অপমান শুধু আমার একার নয়, সবুজ পাসপোর্টদারী সমস্থ জাতির।

চাঙ্গি এয়ারপোর্ট থেকে আধা ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম তাঞ্জং পাগারের একটি ছোট খাটো এপার্টমেন্টে। দু রুম বিশিষ্ট এ এপার্টমেন্টটের একটিতে বাঙ্গালী ও অন্যটিতে কজন ইন্ডিয়ান তামিলের বসবাস ছিল। রুমটিতে ঢুকে দেখলাম চার কোনায় দুতলা সিট বিশিষ্ট চারটি ব্যাড অর্থাৎ একটি রুমে আটজন লোকের বসবাস। আমাকে সাহায্যকারী বড়োলোক আত্মিয়টিও ওখানেই থাকতেন। অনেকটা বিমর্ষ ও মলিন চেহারা দেখে তিনি আমাকে বললেন, “তোমারতো কপাল ভালো, প্রথম দিনেই যেন ফাইভ স্টার হোটেলে উঠলে! আমরাতো অনেক বছর কন্সট্রাকশান সাইটের ভাঙ্গা ঘরে মশার কামর হজম করে রাত কাটিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছি।“ তাঁকে কোন উত্তর না দিয়ে একটু কৃতজ্ঞতার হাসি হাসলাম।

খুব ভালো ঘুম হয়নি রাতে। ঘরে শুয়ে থাকা ক্লান্ত অবসাদগ্রস্থ ঘুমন্ত লোক গুলোর ভারী নিঃশ্বাস আর সদ্য ছেড়ে যাওয়া স্বজনদের মায়াবি চেহারা আমার ক্লান্ত চোখকে অনেকটা বেদনা কাতর করে তোলে। শত চেষ্টা করেও কেন জানি ঘুমুতে পারছিলামনা। অসহ্য যন্ত্রনায় এপাশ ওপাশ করে অবচেতন মনে সব ভুলে যখন ভোর বেলায় ঘুমের জগতে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলাম ঠিক তখনি সবার জেগে ওঠার আওয়াজ আমার কানে এসে বাজলো। বুঝা গেল কাজে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে সবাই। কৌতূহল সামলাতে না পেরে আমিও উঠে পড়লাম। দুতলা ব্যাড থেকে নেমে রান্নাঘরের দিকে এগুতেই দেখা গেল কেউ দাঁত ব্রাশ করছে, কেউ কেউ টয়লেটে যেতে কিউ-এ দাঁড়িয়ে আছে, কেউ রান্না ঘরে তরকারী গরম করছে কেউ বা আবার মাখান পেপারে ( মাখান একটি মালে শব্দ যার অর্থ হচ্ছে খাওয়া, সে অর্থে মাখান পেপারের অর্থ দাঁড়ায় খাওয়ার কাগজ অর্থাৎ ভাত খাবারের জন্য প্লেটের পরিবর্তে ব্যবহৃত বাদামি রঙের এক ধরনের বর্গাকৃতি কাগজ) ভাত বাঁধছে। পুরো চিত্রটি আমাকে ঢাকা শহরে সস্তা মেসে বসবাসকারীদের জীবন যাত্রার কথাই মনে করিয়ে দিল স্পষ্ট ভাবে।

দুঃখ অনেকটা বরফ গলার মতো গলে গেল যখন দুপুরের খাবার খেয়ে বেরিয়ে যাই সিঙ্গাপুরের কিছু দর্শনীয় স্থান দেখতে। প্রথমেই যেখানে যাওয়ার সৌভাগ্য হল সেটা হচ্ছে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। (যদিও বাঙ্গালীরা সহজ ভাষায় নাম দিয়েছে – হলটেক সেন্টার)। আমাকে নিয়ে যিনি বেরিয়েছেন তার কাছ থেকে জানা গেল আমাদের বাঙ্গালী ভায়েরা কেবল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার নয় এ রকম আরও অনেক জায়গা আছে যে গুলোকে বিকৃত ভাবে ডাকতে ডাকতে স্থায়ী নাম দিয়ে ফেলেছে। যা হোক ওয়ার্ল্ড ট্রেডের ভেতরের জমজমাট চাকচিক্য আমাকে দারুন ভাবে বিমোহিত করেছে। সেন্টারের প্রতিটি জায়গায় যেন নিখুত শিল্পিত হাতের চোঁয়া। যা মানুষকে আকৃষ্ট করে বার বার। ট্রেডের সামনেই রয়েছে ছোটখাটো সৈকত। ছোট ছোট ঢেউ গুলো সূর্য স্নাত সন্ধার পরিবেশটাকে মনোরম থেকে করে তোলে আরও মনোরম। হৃদয়য়ের সকল দুঃখ বেদনা উবে যায় ঢেউয়ের সাথে দোল খেতে খেতে। দেশি বিদেশি হরেক রকমের চেহারা এনে দেয় ভিন্ন স্বাদের মাত্রা। আমার কাছে মনে হল এ যেন এক মাল্টিমুখ নিকেতন।

কে.এফ.সি খেয়ে বাসায় ফেরার পথে ট্যক্সি ক্যবে বসে শুধুই ভাবছিলাম আমাদের নিজের দেশের কথা। পৃথিবীর দ্বিতীয় দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারকে কেন আমরা অবহেলিত করে রেখেছি! আমরা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার তৈরি করতে পারি বা না পারি অন্ততপক্ষে এ দীর্ঘতম সৈকতটিকে ঢেলে সাজিয়ে প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে তোলে তো ধরা যায়।

আকৃষ্ট করা যায় শত শত বিদেশি পর্যটকদের, যার বদৌলতে সরকার আয় করতে সক্ষম হয় প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। শুধু সিঙ্গাপুর নয়, পৃথিবীতে অনেক দেশ আছে যারা কেবল পর্যটন শিল্পকে দাঁড় করিয়ে পুরো জাতি বিশ্ব বুকে দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। অথচ আমরা পারছিনা। কিন্তু কেন? কোথায় পিছুটান?