ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

ঈদের শুভেচছা ও কুশলাদি বিনিময়ের জন্য ফোন করেছিলাম ঢাকায় অবস্থানরত আমার প্রকৌশলী বন্ধু বিপুলকে। ঈদ কেমন কাটালো বা সার্বিক ভাবে কেমনতর দিন কাটাচ্ছে জানতে চাইলে খুব নিরস উত্তর দিয়ে বলল, “আমাদের আর থাকা! কোন রকমে দিন কাটানোটাই হচ্ছে মুখ্য। প্রবাসে গিয়েই ভালো করেছো। আমাদের কথা থাক। তোমাদের খবর বল।“ ঈদ কেমন কাটালাম কিংবা কোরবানি দিতে পেরেছিলাম কিনা ইত্যাদি প্রাত্যাহিক জীবন যাপন সম্পর্কে বেশ কিছু প্রশ্ন ফুটে উঠলো তার মুখে। আমার এ চৌকুস ও স্বভাবজাত প্রানবন্ত বন্ধুটির কথায় কেমন যেন একটা নির্জীবতা ঠের পেলাম।

আমরা যারা প্রবাসে আছি তাদের অধিকাংশই খুব বেশী ভালো না থাকলেও নেহায়াত খারাপ বলা যাবেনা। সন্ত্রাস, রাহাজানি, দুর্নীতি, জিনিসপত্রের দাম ইচ্ছে মাফিক বাড়ানো-কমানো, গন্তব্যে পৌঁছতে যাত্রীদের নাভিশ্বাস উঠা, কোন ফেসটিবালকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অকারন মুল্যবৃদ্ধি কিংবা গরু নিয়ে সিন্ডিকেটের খেলা খেলে কোরবানির মতো একটা বৃহৎ ধর্মীয় উৎসবের আমেজকে মলিন করে দেয়ার পায়তারা ইত্যাদি এ ধরনের নিচক স্বার্থান্বেষী ও হীন মন মানসিকতা সম্পন্ন ক্রিয়া-কলাপের মুখোমুখি অন্তত প্রবাসীদেরক হতে হয়না। এখানেই সম্ভবত প্রবাসীদের শান্তি।

কোরবানির প্রাসংগিকতা নিয়ে কথা উঠলে সে আয়ারল্যান্ডের কোরবানি নিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করে। আমার জানামতে মধ্যপ্রাচ্য সহ ইউরোপ বা সমসাময়িক ভৌগলিক দেশ গুলোতে ৬ নবেম্বর ’১১ অর্থাৎ রবিবার ঈদুল আযহা উদযাপিত হয়। রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় অনেকে ওইদিন কোরবানি সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়। অফিস আদালতের মতো এখানকার পশুর খামার গুলোও সাপ্তাহিক ছুটির আওতাধীন। আমরা যারা খামারে গিয়ে নিজ হাতে কোরবানির গরু জবাই করতে উৎসাহী ছিলাম তারা খামার মালিককে প্রতি গরু হিসেবে বেশ কিছু উপরি দেয়ার লোভ দেখানোর পরো রবিবারে খামার খুলতে রাজি হয়নি। হেলথ ইন্সপেক্টরের অনুপস্থিতি ও হাইজিন গত বিবিধ সমস্যার কথা বলে আমাদের প্রস্তাবকে নাকোচ করে দেয়। বাংলাদেশের মতো এখানে যত্র তত্র গরু, মেষ, ছাগল এমনকি মুরগি পর্যন্ত জবাই করা যায়না। কিছু দিন আগে আমার এক প্রতিবেশি বন্ধুকেই মুরগি জবাইয়ের ফজিলত(!) হিসেবে ১৫০ ইউরো জরিমান দিতে হয়। অগত্যা কি আর করা! পরদিন সবাই বউবাচ্চা নিয়ে ৪০/৫০ মাইল দূরের খামারে গিয়ে গরু কোরবানি দিয়ে নিজেরাই মাংশ কেটে ভাগাভাগি করে নিয়ে আসি।

প্রায় ১৬ হাজার টাকার সমমান অর্থাৎ ১৫৬ ইউরোর বিনিময়ে ৪২ কেজির চেয়েও বেশী কোরবানির মাংশ প্রাপ্তির খবরটা শুনে আমার বন্ধুটি বেশ অবাক হয়। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে কোরবানির বাজেট হিসেবে ১৫ হাজার টাকা খরচ করেও যেখানে ২৬/২৭ কেজির বেশী মাংশ মেলেনি সেখানে আয়ারল্যান্ডের মতো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ একটি দেশে অল্প পুঁজিতে অধিক পরিমান মাংশ প্রাপ্তি তাকে বেশ পীড়া দেয়। পীড়াটা মূলত আমার মাংশ প্রাপ্তির আধিক্যের জন্য নয়। “গোলা ভরা ধান আর গোয়াল ভরা গরুর” ঐতিহ্য যে দেশ বহন করছে হাজার বছর ধরে সে দেশের এ নিদারুন করুন পরিনতি-ই তার পীড়ার কারণ।

ভাবতে অবাক লাগে আজ আমাদের দেশ গরু সংকটে ভুগছে। কোরবানির হাট হাহাকার করে গরুর অভাবে। ভালো কথা। নিজেদের ঐতিহ্যের কথা বাদ দিলাম। দিন বদলের স্লোগানের সাথে সাথে না হয় “গোয়াল ভরা গরুর” পুরনো ঐতিহ্যের বিলুপ্তি ঘটছে কিন্তু কোরবানির হাট গরু সংকটে ভূগার নতুন কালচার শুরু হওয়ার পিছনে কি রহস্য? গরুর বেপারিদের সিন্ডিকেট, অপরাগতা বা অক্ষমতার কথা বলে তো পার পাওয়া যাবেনা। যারা বাজারে গরু না পেয়ে কিংবা চড়া দামে গরু কিনতে না পেরে কোরবানি দিতে ব্যর্থ হয়েছে এর দায়ভার কে বহন করবে বা কার বহন করা উচিত?

আমার এ ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুটি ঈদের পরদিন গ্রামের বাড়ি যায়। প্রাইভেট ফার্মে চাকরি। তাই ঈদের এক দিন আগে ছুটি পাওয়ায় রাস্থা-ঘাটে ছেলেমেয়েদের ভোগান্তির কথা বিবেচনায় এনে পরদিন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা করে। গ্রামে গিয়ে সহজ সরল সাধারন মানুষের সাথে কথা বলে সে যা উপলব্ধি করল তা হল দফায় দফায় তেল-সারের দাম বাড়ানর ফলে ও “রাষ্ট্র খাদ্যে সয়ং সম্পূর্ণ” এ মাজেজা দেখাতে গিয়ে সরকার ধান চালের দাম কমিয়ে দিয়ে অসামঞ্জ্যসতা সৃষ্টি করে কৃষকদেরকে ধান চাষাবাদের ক্ষেত্রে কেবল নিরুৎসাহিতই করছেননা ক্ষেপিয়েও তুলেছেন যা কিনা বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তা ঠিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এক বিরাট হুমকি।

শহুরে জনগনের একটা বিরাট অংশ শেয়ার বাজারের সাথে সম্পৃক্ত। উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত সহ নিম্নবিত্তের একটা অংশ এ ব্যবসায় লিপ্ত। অথচ কর্তা ব্যক্তিদের নির্লিপ্ততা ও গুটি কতক গ্যাম্বেলারদের নিষ্ঠুর খেলার শিকার এ বৃহৎ জনগোষ্ঠী। শেয়ার বাজার মানেই যেন আজ নিত্য কেলেংকারির হাট। যেসব রাঘব বোয়ালদের জন্য সরকারের মাথায় এ কলংক আর কেলেংকারির দায়, তারা সবাই উপযুক্ত শাস্তির ঊর্ধ্বে থেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এখানেও মান্যবর সরকার ব্যর্থ।

যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল অবস্থার কথা নতুন করে বলার কি কোন অবকাশ আছে! কয়েক মাস আগে আমাদের যোগাযোগ মন্ত্রি কি খাটুনিটাই না খাটলেন! ভদ্র লোক সাপ্তাহিক ছুটির দিনটি পর্যন্ত কামাই করেননি। জনসেবায় ব্রত হয়ে মুক্ত হস্তে বিলিয়ে দিলেন উদার ভাণ্ডার। রাস্তা মেরামতের নেশায় জরুরি বিবেচনায় মন্ত্রিবর যে অর্থ রাস্থায় ঢাললেন তার কতোটুকোই বা সঠিক রাস্থায় ব্যয় হয়েছে? ঈদে গ্রাম মুখি অনেক সাধারন যাত্রীদের হাল আমলের অনুপযোগী রাস্থাঘাট নিয়ে যে অসন্থোষ ও আকুতি দেখিয়েছেন তা থেকে আমরা কি বা ভাবতে পারি!

মন্ত্রি পরিষদের বিভিন্ন মন্ত্রীদের অযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নিতান্তই হিতাকাঙ্খি হিসেবে এ নিয়ে অনেকে গঠন মূলক লেখা লিখে খোদ প্রধানমন্ত্রীর চক্ষুশূলও হয়েছেন। দুঃখ জনক হলেও সত্য এইযে, মন্ত্রীদের এ ব্যর্থতা ও দৈন্যতার খবর শহরের সীমানা পেরিয়ে গ্রামে গঞ্জের সহজ সরল মানুষের বুকেও রেখাপাত করছে। আমার এ বন্ধুটি সহ অনেকেই যারা বুঝতে শিখেছে অবধি “বঙ্গবন্ধুর নৌকা” ছাড়া কিছুই বুঝেনি, তাদেরই অনেকে আজ দিশেহারা ক্লান্ত পথিক। নৌকা ডোবার শঙ্কায় শঙ্কিত যা কিনা তাড়া করছে তাদের নৌকা বিমুখতার দিকে।

বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি দিয়েও হালে কোল রক্ষায় সরকারের সীমাহীন ব্যর্থতা, জিনিসপত্রের অসামঞ্জ্যস্য ঊর্ধ্বমুল্য, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে প্রবাহমান দুর্নীতি, বৈদেশিক বিনোয়গের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করতে না পারা কিংবা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে অদক্ষ ও অদূরদর্শিতার জন্য আশানুরূপ সাফল্য ভেস্তে যাওয়া প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের অসাফল্যতা সাধারন মানুষকে শুধু আশাহতই করেনি, বিপরীত মুখি স্রোতের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে।

দেশের সাধারন জনতা অথবা আমারা যারা সুদূর প্রবাসে পড়ে আছি তারাও কম বেশী সরকারের এহেন নাজুকতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হচ্ছি। অথচ সরকার বা তার নীতি নির্ধারকরা এ সহজ সরল জলজ্যান্ত সত্যটাকে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছে বার বার।“পাবলিক সেন্টিমেনট” বলতে যা বোঝায় সরকার বাহাদুর তা বুঝতে যেন একেবারেই অক্ষম যা কিনা তাদের সকল ব্যর্থতাকেই হার মানায়! অতি সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রীটে ঘটে যাওয়া একটা আনঅরগানাইজড, নেতা বিহীন স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক আন্দোলনও কি তাদের ষষ্ঠান্দ্রিয়কে কার্যকর করে তুলতে পারেনি? আফসোস, এটাই সম্ভবত সরকারের এক বিরাট ট্র্যাজেডি।