ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

মূল ঘটনায় যাবার আগে আমার ছেলেবেলাকার একটি ঘটনা দিয়েই লেখাটি শুরু করা যাক। আমি তখন প্রাইমারী ষ্টেজের ছাত্র। কতিপয় বন্ধু সহ স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। পথিমধ্যে একটি ডোবায় কয়েকটি ব্যাঙ খেলা করছিল। তাদের খেলা দেখে আমরাও খেলায় মত্ত হয়ে গেলাম। সবাই মিলে ঢিল ছুড়তে লাগলাম। ব্যাঙ গুলো বাঁচার জন্য প্রাণপণে এদিক থেকে ওদিক লাফাচ্ছিল। যতই লাফাচ্ছিল ততোই আমরা আনন্দ সাগরে ডুবে যাচ্ছিলাম। এরি মধ্যে আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাহেব ঘটনা স্থলে এসে উপস্থিত। নিষ্ঠুর খেলার কথা জানতে পেরে তিনি আমাদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, “তোমরা তো খেলা করে বেশ মজা পাচ্ছো, কিন্তু বেচারা ব্যাঙদের অবস্থা ততৈবচ। এ খেলা যে তাদের জীবন মরনের খেলা তা কি একবারও ভেবে দেখেছো!”

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে “গ” ইউনিটে ভর্তি সংক্রান্ত যে কেলেংকারী ঘটে গেলো মূলত সে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে গত ২৫ নবেম্বর ’১১ বিডি নিউজ ২৪.কমে একটি সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে যা কিনা যথেষ্ট সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদটির হেড লাইন হচ্ছে- “ঢাবির “গ” ইউনিটঃ ভুলের জন্য দায়ী ১৮ শিক্ষক”। সংবাদটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়লে বুঝতে মোটেও কষ্ট হয়না আমাদের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের “মানুষ গড়ার কারিগর গুলোর” মধ্যে যে বিরাজ করছে কি নিদারুন উদাসিনতা ও কর্তব্যহীনতা।

সংবাদে প্রকাশ, “গ” ইউনিট ভর্তি পরীক্ষার প্রধান সমন্বয়কারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জামাল উদ্দিন আহমদের দায়িত্বহীনতাই দেশের সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপীঠের মান মর্যাদাকে ধুলায় লুটিয়ে দিয়েছে। প্রশ্নপত্রে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরপত্রে, উত্তর পত্র পূনর্মল্যায়নে যত ভুল সহ তার মূল কারিগর এই অধ্যাপক জামাল উদ্দিন। এ ছাড়াও ভর্তি কমিটির আটার জন সদস্য ব্যতিত যাদেরকে দায়ী করতে হয় তারা হলেন ইন্টারন্যাশনাল বিজনেসের চেয়ারম্যান ড. আবু হেনা রেজা হাসান ও ব্যাংকিং বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো: রফিকুল ইসলাম।

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ও “প্রাচ্যের অক্সফোর্ড” বলে খ্যাত এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এর রয়েছে এক প্রাচিন ঐতিহ্য, স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও গর্বিত সুনাম। অথচ “ডঃ” পদধারী কজন শিক্ষকের খামখেয়ালিপনা, দায়িত্বহীনতা ও ভুলের জন্য মাশুল দিতে হচ্ছে কয়েক হাজার উদ্দীপ্ত তরুন শিক্ষার্থী সহ পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব ও ঐতিহ্য আজ প্রশ্নবিদ্ধ ও ম্লান। এ ম্লানতা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই নয়, সমস্থ জাতির জন্য কলঙ্ক ও লজ্জাজনক।

মানুষ মাত্রই ভুল হওয়া স্বাভাবিক। ক্ষেত্র বিশেষ মহতেরও ভুল হয়। সে হিসেবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের “স্যারদের” কোনই ভুল হবেনা সে আশাও করা যায়না। তবে ভুলেরও একটা মাপ থাকা চাই। ভুলকৃত ভুল যদি কেউ করেই থাকে তবে সে ভুলটা শুধরিয়ে নিলেই হয়। আবার শুধরাতে গিয়েও যদি পুনঃ ভুল করা হয় সেটারও হয়তোবা একটা রফাদফা করার পথ বের করা যায়। কিন্তু এর পরো যদি কেউ নিচক খামখেয়ালিপনায় কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো বার বার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে , তাহলে সে ভুলের অনলে সবাইকে পুড়তে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সমন্বয়কারী সহ কমিটির অন্যান্য সদস্যদের ক্রিয়াকলাপে বারবার ভুল করার বিষয়টি-ই ফুটে উঠেছে । গত ২৮ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষার ফলাফল ৩১ অক্টোবর প্রকাশ ফেলে প্রত্যাশিত ফল না পেয়ে কিছু দৃঢ় বিশ্বাসী শিক্ষার্থী ব্যবসা শিক্ষা অনুষদে গিয়ে অভিযোগ করেন। পাশাপাশি ওই দিনই বাংলা নিউজের গর্বিত ও মেধাবি প্রতিবেদক “উত্তরপত্রে ভুল” শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী মূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের টনক নরে ও সত্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করেন। এখানেও তারা ভুলের সিঁড়িতে পা রেখে সঠিক মুল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

শুধু কি তাই! সঠিক প্রশ্ন ও কোর কমিটির বাছাইয়ে ভুল, প্রশ্নকর্তার ভুল, উত্তর শিটে ভুল, ভুল সেটের মাধ্যমে মুল্যায়ন, উত্তরপত্র তৈরিতে ভুল, অভিজ্ঞদের ডাকার ক্ষেত্রে দীনতা, ম্যানুয়ালি উত্তরপত্র মুল্যায়নে তাদের যে হীন মনমানসিকতার উন্মেষ ঘটেছে তা প্রতিবেদক সংবাদটিতে নিখুঁত বিশ্লেষনাকারে ফুটিয়ে তুলেছেন।

এদের হীনমন্যতা ও দায়িত্বহীন ভুলের ছুরিতে আহত ও আঘাতপ্রাপ্ত তরুন শিক্ষার্থীরা আজ দিশেহারা। সমুজ্জল ভবিষ্যতের তাড়নায় তাড়িত এসব তরুন তরুণী ঝুলছে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অনিশ্চিত শিক্ষা জীবনের দোলায়। শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলাটা যেন শুরুতে লিখা আমার সেই ছেলেবেলাকার ব্যাঙ নিয়ে খেলা করারই নামান্তর বলে মনে হলো।
সকল ভর্তিচ্ছূক শিক্ষার্থীদের প্রতি সুবিচারের সুমহান (!) দায়িত্বের কথা ভেবে পুনরায় “গ” ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানিয়ে মাননীয় উপাচার্য গতকালের এক পত্রিকায় মানবিক ও দরদী কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গ’ ইউনিটের দুই দফা ফলাফলে মেধাতালিকায় স্থান করে নেওয়া শিক্ষার্থীরা আগামী ৯ ডিসেম্বরের পুনঃভর্তি পরীক্ষায় চান্স না পেলে অন্য যে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা চান্স পেয়েছিলেন সেখানে ভর্তির সুযোগ প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুরোধ করবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।“ তিনি চিন্তাশীল উদার পণ্ডিত ব্যাক্তি। শিক্ষাবিদ। তিনি তার অবস্থান থেকে যে মানবিক আবেদনের কথা বলেছেন তা অবশ্যই প্রশংসনীয়।

উপাচার্য মহোদয়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলতে চাই, তার এ মানবিক আবেদনে যদি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ সফল সাড়া দেন তো ভালো। যদি না দেন? যারা মেধা তালিকায় ঠিকে অনেকেই গ্রামে গঞ্জে গিয়ে মিলাদ মাহফিল করে কিংবা ঢাক ঢোল পিঠিয়ে স্বীয় সার্থকতার কথা জানান দিয়েছেন তারা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন? গ্রামীণ প্রত্যন্ত অঞ্চলের এমনো অনেক শিক্ষার্থী আছেন যারা নিতান্তই গরিব। ঘরবাড়ি বা ভূমিহীন। বাবা দিনমজুর। দিন আনতে পান্তা পুরোয় অবস্থা। মানুষের সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে ও নিজ যোগ্যতা ও মেধার জোরে আজকের অবস্থানে আসা। তার পক্ষে দুদিন পর পর ঢাকা শহরে এসে থাকা খাওয়া বা যাথায়াতের ভাড়া মেলানোই ভার। এ রকম কোন নিতান্তই দরিদ্র শিক্ষার্থী যদি দু দুবার মেধা তালিকায় স্থান করে নেয়ার পরো তার অর্থনৈতিক দৈন্যতা বা সামগ্রিক প্রতিকূলতার দরুন পুনরায় ভর্তি পরিক্ষায় অংশ গ্রহন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সে ব্যর্থতার দায়ভার কে নেবে?

ভর্তি সংক্রান্ত এ নাটকীয় ঘটনার সর্বশেষ খবর হল, ‘গ’ ইউনিটের পুনর্মূল্যায়িত ফলাফল বাতিলের সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২২ নভেম্বর ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১২ শিক্ষার্থী হাইকোর্টে রিট করেন। আবেদনের ওপর দুই দিন শুনানি নিয়ে গত বুধবার আদালত আগামী সোমবার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করার সাথে সাথে সৃষ্ট জটিলতা সমাধানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতামত জানার জন্য ২৮ নভেম্বর তাঁকে আদালতে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।

আদালতের এখতিয়ার নিয়ে কথা বলার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই। আদালত চাইলে যে কোন সমস্যা সমাধানে অবশ্যই জ্ঞানী গুণী পণ্ডিত ব্যাক্তিদের শরনাপন্ন হতে পারেন। কিন্তু অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কমিটির অধ্যাপকদের মতোই একজন ডক্টর অধ্যাপক। তিনি আদালতে যে মতামত প্রদান করবেন তা যে ১০০% সহিশুদ্ধ বা সর্বজন সমাদৃত হবে তার কি নিশ্চিত গ্যারেনঠি আছে? এক্ষেত্রে আদালত শুধু জাফর ইকবাল নয় সমমর্যাদা সম্পন্ন আরও কয়েকজন পণ্ডিত ব্যাক্তিদের বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহন করলে তা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ত্বরান্বিত হতে পারতো।

শেষ কথা- যাদের ভুল বা উদাসীনতার জন্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন চরম অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির মুখে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব ও ঐতিহ্য প্রশ্ন বিদ্ধ তাদের বিরুদ্ধে যথাযত দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া নিতান্তই সময়ের দাবী। আমাদের দেশে ভালো বা মন্দ যাই একবার ঘটে তা কালচারে পরিনত হয়ে যায়। তাই দোষীদের বিচারের কাটগড়ায় দাঁড় করতে ব্যর্থ হলে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নয় দেশের অন্যন্য বিশববিদ্যালয় গুলোতেও এ ধরনের অনিয়ম, ভুল বা মরনমুখি উদাসীনতা কালচারে পরিনত হয়ে যাবে। যা দেশ ও জাতির জন্য বয়ে আনবে এক অনিশ্চিত ভয়াবহতা।